১। ভুল চিকিতসায় টাঙ্গাইলে ৪ শিশুর মৃত্যু
২। টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা অবহেলায় ৪ শিশুর মৃত্যু
৩। ইনজেকশন দেয়ার পর ৪ শিশুর মৃত্যু
৪। চিকিতসকের ভুলে টাঙ্গাইলে ৪ শিশুর মৃত্যু
এবং অন্যান্য ...
এগুলো ছিলো গত ২ দিনে আমাদের সাংবাদিক ভাইদের করা একটি আলোচিত ঘটনার শিরোণাম, যা দেখে আপনার নিশ্চয়ই এটা বুঝতে বাকি নেই যে আর যাই হোক টাঙ্গাইলে ব্যাটা ডাক্তারের চিকিতসা ত্রুটির কারনে জীবন দিতে হয়েছে ৪ শিশুকে - অনেক সেনসিটিভ ইস্যু!
একটু পেছনে ফিরে তাকাইঃ
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে রাজনীতিতে স্থবিরতা চলছে, নতুন কোন আলোচিত ঘটনা ঘটছে না। কোন রাজনৈতিক নেতা কিংবা রাজনৈতিক-কাম-ধর্মীয় নেতা আহামরি কোন বয়ান দিচ্ছেন না, আবার আওয়ামীলীগ বিএনপিও কোন আশানুরুপ রাজনৈতিক কাঁপানি তুলছে না - বিপদে আছেন আমাদের সাগবাদিক ভাইয়েরা। কারন উত্তেজনা ছাড়া তারা থাকতে পারেন না।
অগত্যা বেছে নিতে হলো সর্বকালের হিট টপিক - ডাক্তারদের বাঁশ বাগান ঘুরিয়ে আনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা কতো টাকার বিনিময়ে ল্যাব-এইডের ঘটনায় মুখে কুলুপ এঁটেছে আমি জানিনা, তবে কম্প্রোমাইজ যে হবে এটা তো সবাই জানতোই ...
যাই হোক, একটা খবর দরকার ছিলো - গরম খবর - মিলেও গেলো
টাঙ্গাইলে মারা গেলো মুমুর্ষ ৪টি শিশু
এবার একটু ভেতরে ঢুকি আসুনঃ
যে ৪টি শিশুর মারা গেছে আসুন তাদের কেইস সামারি জানি
- প্রথম শিশু
(নাম রাখা হয়নি)
মায়ের নাম - মোর্শেদা
২৮ সপ্তাহে জন্ম নেওয়া শিশু (৩৭-৪২ সপ্তাহ কে নরমাল ধরা হয়)
ওজনঃ ১.৩ কেজি
রোগের নামঃ প্রি-টার্ম ভেরী লো-বার্থ ওয়েট উইথ সেপটিসেমিয়া
[Pre-term with VLBW with Septicemia]
একটি শিশু জন্মানোর সময় নূন্যতম ২.৫ কেজি ওগন থাকতে হয়, নাহলে আমরা তাকে লো-বার্থ ওয়েট বেবী বলি, যার রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা অন্য যেকোন শিশুর চেয়ে অনেক কম থাকবে, কিন্তু এখানে শিশুটির ওজন ১.৩ কেজি! [লো-বার্থ ওয়েট ১.৫-২.৫ কেজি, ভেরি লো-বার্থ ওয়েট ১.০-১.৫ কেজি এবং ভেরী ভেরী লো-বার্থ ওয়েট ১.০ কেজির নিচে] সাধারণত ৩৭ সপ্তাহের নিচে জন্মে নেওয়া শিশুরা অপুষ্টি ও রোগে বেশী ভোগে, আর এখানে শিশুটির গর্ভাকালীন সময় ছিলো মাত্র ২৮ সপ্তাহ! সুতরাং এখান থেকে কি একটুও অনুমেয় না যে ঐ শিশুটির ক্নিনিক্যাল কন্ডিশন কেমন ছিলো।
সাথে ছিলো সেপটিসেমিয়া -
অর্থাৎ অতিরিক্ত মাত্রায় ইনফেকশন। যা তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনাকে আরো ক্ষীণ করে তোলে
এবার আসুন কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াই -
ঐ চিকিতসক কিংবা সেবিকা কি জীবনে এই প্রথম এরকম কোন রোগী দেখছেন? তারা কি এর আগে এরক্অম কোন রোগের চিকিতসা দেন নি? সেগুলোর কোন নিউজ কি আপনারা টিভি-পত্রিকায় দেখেছেন? ধরে কি নেওয়া যায় তাহলে ঐ শিশু গুলো হাসি-মুখেই তাদের মা-বাবা'র কোলে ফিরে গিয়েছিলো? ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন যে ভুল ছিলো তা সাংবাদিক সাহেব কি করে জানলেন (জার্নালিজমের সিলেবাসটা জানতে মন চায়)? ঐ হাসপাতালে ইনজেকশন জনিত কারন ঐ দিনই আরো অনেক শিশুর কি মারা যাবার কি কথা ছিলো না? ঔষধ এর যদিও মেয়াদ ছিলো, তারপরো ঔষধের মেয়াদ দেখা কি ডাক্তারের কাজ? যারা সাংবাদিক দের রিপোর্ট কপি-পেস্ট করে ফেইসবুক আর ব্লগ ফাটিয়ে দিচ্ছেন তাদের কয়জন জানেন ঐ শিশু কিংবা তার রোগ - রোগের চিকিতসা - রোগের পরিণতি সম্পর্কে?
- দ্বিতীয় শিশু
(নাম রাখা হয়নি)
মায়ের নাম - হোসনে আরা
২৮ সপ্তাহে জন্ম নেওয়া শিশু
ওজনঃ ১.৮ কেজি
রোগের নামঃ প্রি-টার্ম লো-বার্থ ওয়েট উইথ সেপটিসেমিয়া
- তৃতীয় শিশু
(নাম রাখা হয়নি)
মায়ের নাম - বিথী
৩৪ সপ্তাহে জন্ম নেওয়া শিশু
ওজনঃ ২.২ কেজি
রোগের নামঃ প্রি-টার্ম লো-বার্থ ওয়েট উইথ পেরি-ন্যাটাল অ্যাসফিক্সিয়া ইউথ সেপটিসেমিয়া
- চতুর্থ শিশু
নামঃ লামহা
৩৭ সপ্তাহে জন্ম নেওয়া শিশু
ওজনঃ ২.৫ কেজি
রোগের নামঃ পেরি-ন্যাটাল অ্যাসফিক্সিয়া উইথ সেপটিসেমিয়া
যে রোগগুলো নিয়ে কথা বললাম, বাংলাদেশের এই সব রোগে শিশু মৃত্যুর হার শতকরা ২২% (গুগল তো আছেই, মিলিয়ে নিয়েন), এবং বাংলাদেশের মতো দেশের এসব মৃত্যুর জন্য অনেক গুলো সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত কারন আছে - এবং আশার কথা এই যে বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর হার অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে - এগুলো নিশ্চয়ই হেলথ কেয়ার যারা দিচ্ছেন তাদেরই সম্মিলিত কৃতিত্ব [একটু কষ্ট করে খোঁজ নিয়েন পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে পরিসংখ্যানটা কি রকম]
দেখুন - যেকোন মৃত্যুই অপ্রত্যাশিত এবং দুঃখজনক, কারন যে মায়ের কোন খালি হয়েছে তার ব্যাথা বোঝার সামর্থ্য আর কারো নেই, না সাংবাদিকের না ডাক্তারের - আমরাও সমব্যাথী
তবে ভেবে দেখুন একজন চিকিতসক তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন একটি মৃত্যুকে প্রতহত করতে, কারন এই কাজটা পেশাগত কারণে কেবল তারই জ্ঞানের পরিসীমায় আছে - কিন্তু দূর্ঘটনা তো দূর্ঘটনাই তাই না। একটি মৃত্যুর পর আমরা যদি গিয়ে চিকিতসকেরই চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করার সংগ্রামে নেমে যাই তবে এর পরিণতি খুব একটা মঙ্গলজনক কারো জন্যেই হবে না। টাঙ্গাইলের মতো একটি জায়গায় যেখানে অনেক প্রতুলতা সত্তেও ডাক্তাররা কাজ করে যাচ্ছেন তাদেরকে এভাবে কোনঠাসা করে দিলে এরপর থেকে কেউই আর মুমুর্ষ কোন রোগীর চিকিতসা করার দুঃসাহস করবেনা - সব রোগী রেফার করে দিতে বাধ্য হবে তারা
সুতরাং সাংবাদিক ভাইদের সাবধান হওয়া প্রয়োজন - জবাবদিহিতার নামে স্ক্রু বেশী টাইট দিয়েন না - প্যাঁচ কেটে গেলে বিপদে পড়ে যাবেন - আর সর্ব বিষয়ে আপনাদের জ্ঞান মাঝে মধ্যেই আমাদের মুগ্ধ করে - চাইলে একটা মেডিকেল কলেজ খুলে ফেলতেই পারেন!
চিকিতসকদের একটি সংগঠন আছে- বি,এম,এ ; অন্য পেশার মানুষদের জন্য আনন্দের বিষয় এই যে আমাদের এই সংগঠনটি নিতান্তই অথর্ব এবং ভোদাই গোছের, কিন্তু ভাবুন তো যদি সত্যি বিএমএ কোনদিন জাগ্রত হয় অনেকেরই ধোঁয়া বের হয়ে যাবে!
পরিশেষে মন থেকে সমবেদনা জানাচ্ছি সেই মায়েদেরকে,
অন্যান্য দিনের মতো যাদের কোলে আমরা তাদের সন্তানদেরকে তুলে দিতে পারলাম না - সৃষ্টিকর্তা আপনাদের সহায় হোন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


