এইতো ক'দিন আগে ঘন্টা দশেকের এক ঝটিকা সফরে এসেছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওচাউল দাদা প্রণব মুখার্জি। তিনি যে বাংলাদেশে ‘পদধূলি' দেবেনই, সে ব্যাপারে বোঝা যাচ্ছিল শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে থেকে। শেখ হাসিনা তাকে টেলিফোন করে অনুরোধ করেছিলেন, ‘দাদা' যাতে ‘বৌদিকে' নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন এবং তার (শেখ হাসিনার) শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্খিত থাকেন। বিচক্ষণ প্রণব মুখার্জি অবশ্য শেখ হাসিনার ডাকে সাড়া দিয়ে এত তাড়াতাড়ি ধরা পড়ে যেতে চাননি। তিনি তাই সময় নিয়েছেন। ওদিকে প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং অসুস্খ হয়ে পড়ায় দায়িত্ব ও ব্যস্ততা বেড়ে গেছে প্রণব মুখার্জির। ইতোমধ্যে তার ছয়টি দেশ সফরের কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে। তিনি নাকি বাংলাদেশেও আসতে চাননি। কিন্তু ঝামেলা বাঁধিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিচার্ড বাউচার। তিনি ঢাকায় এসেছিলেন ৭ ফেব্রুয়ারি, ফিরে গেছেন ৮ ফেব্রুয়ারি। ফলে প্রণব মুখার্জির ‘তর সয়নি'। রিচার্ড বাউচার আগে চলে আসায় ‘গেলো গেলো' বলে এবং ‘পড়ি কি মরি' করে পরদিনই, ৯ ফেব্রুয়ারি ছুটে এসেছেন প্রণব মুখার্জি। নিয়েও গেছেন তিনি ঝুলি বোঝাই করে। সবকিছু অবশ্য জানা যায়নি। কারণ, এ ব্যাপারে যথারীতি ‘রাখ-রাখ ঢাক-ঢাক' কৌশল অবলম্বন করেছে উভয় পক্ষ। শুধু জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্য চুক্তি নবায়ন এবং ভারতীয় শিল্পপতি-ব্যবসায়ীদের স্বার্থে প্রণীত নতুন একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন প্রণব মুখার্জি। এটুকুই অবশ্য বাংলাদেশকে আরো বেশি ক্ষয়ক্ষতির মুখে ঠেলে দেয়ার জন্য যথেষ্ট।
প্রণব মুখার্জির সফরকেন্দ্রিক আলোচনায় প্রাধান্যে এসেছে ভারতকে করিডোর ও চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করতে দেয়ার প্রসঙ্গ। বহুল আলোচিত বলে চুক্তি দুটির পরিবর্তে অন্য দু-একটি বিষয়ের দিকে দৃষ্টি দেয়া যেতে পারে। তার আগে বলা দরকার, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার মাত্র এক মাসের মাথায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে চিহ্নিত দুটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফর ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর মধ্য দিয়ে আসলে পরিষ্কারভাবেই জানিয়ে দেয়া হয়েছে, লগি-বৈঠার তাণ্ডব থেকে উদ্দিন সাহেবদের দিয়ে দেশ চালানো এবং সবশেষে ‘ডিজিটাল' নির্বাচনে দেশপ্রেমিক ও ইসলামী শক্তিকে হারিয়ে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেয়া পর্যন্ত সবকিছু আসলেও সুচিন্তিত একই পরিকল্পনার অংশ ছিল। এখন শুরু হয়েছে পরিকল্পনার দ্বিতীয় অংশ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া। ওয়াশিংটন ও নয়া দিল্লি কোনো রকম ঝুঁকি নিতে চায় না বলেই ‘রোডম্যাপের' শর্ত অনুযায়ী ‘নগদে আদায়' করে নেয়ার জন্য পাঠানো হয়েছিল রিচার্ড বাউচার ও প্রণব মুখার্জিকে। তারা নিয়ে গেলেও দু'জনের এই সফরকালে বড় ধরনের ধাক্কা খেতে হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। গোটা দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে সন্ত্রাস বিরোধী যে টাস্ক ফোর্স গঠনের জন্য তিনি উঠে-পড়ে লেগেছেন সে টাস্ক ফোর্সের ব্যাপারে দু'জনের কেউই উৎসাহজনক সাড়া দেননি। রিচার্ড বাউচার বলেছেন, আইডিয়াটা ‘ইন্টারেস্টিং', তবে এই অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর মতামত জানার পরই যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করবে। প্রণব মুখার্জিও শেখ হাসিনাকে অসম্মানিত ও প্রত্যাখ্যানই করে গেছেন। তিনি বলেছেন, আঞ্চলিক টাস্ক ফোর্স নিয়ে ভারতের কোনো আগ্রহ নেই। ভারত চায় বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ভিত্তিতে টাস্ক ফোর্স গঠন করতে। অর্থাৎ একমাত্র ভরসা ভারতও শেখ হাসিনার ‘খায়েশ' পূরণ করেনি।
প্রণব মুখার্জি একই সঙ্গে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক বিধি-ব্যবস্খার প্রতিও চরম উপেক্ষা দেখিয়ে গেছেন। প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের বাইরে প্রটোকল অনুমোদন না করলেও তিনি সাক্ষাৎ করেছেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদের সঙ্গে। কিন্তু ‘সময়ের অভাবে' বিরোধী দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সৌজন্য দেখাতে পারেননি! এর মধ্য দিয়ে একই সঙ্গে তিনটি বিষয় সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেছে প্রথমত, লগি-বৈঠার তাণ্ডব থেকে ১/১১-কে অনিবার্য করা এবং আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেয়া পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহে ভারত আসলেও প্রধান নির্ধারক ছিল; দ্বিতীয়ত, জেনারেল মইন ভারতের নির্দেশ বাস্তবায়নে ভূমিকা পালন করেছেন এবং ভারত এখনো তাকেই অন্য যে কারো চাইতে বেশি ‘বিশ্বস্তজন' মনে করে; তৃতীয়ত, বাংলাদেশে গণতন্ত্র দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়াক ভারত তা চায় না। চাইলে ‘সময়ের অভাবে'র যুক্তি না দেখিয়ে প্রণব মুখার্জি অবশ্যই বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতেন। কারণ গণতন্ত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরই বিরোধী দলের নেত্রীর অবস্খান। রিচার্ড বাউচারও গণতন্ত্রসম্মত সে সৌজন্য দেখিয়ে গেছেন।
প্রণব মুখার্জির সফরকালে আওয়ামী লীগ সরকারও কম দেখায়নি। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি ‘কাণ্ডর' কথা তো বলতেই হবে। কারণ দেশের মানসম্মান একেবারে ডুবিয়ে ছেড়েছেন তিনি। মানসম্মান ডোবানোর কম্মটুকু তিনি করেছেন যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে। এক ভারতীয় সাংবাদিক বলেছেন, পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে পাতানো যুদ্ধ বা প্রক্সি ওয়ার চালাচ্ছে এবং এই যুদ্ধে বাংলাদেশকে ‘বাফার স্টেট' বানিয়ে সন্ত্রাসীদের ভারতে ঢোকানোর চেষ্টা করছে। তাছাড়া বাংলাদেশে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের একশরও বেশি ঘাঁটি রয়েছে। এদের দমন করার জন্য আপনার কর্মপরিকল্পনা কি?
লজ্জার বিষয় হলো, পাকিস্তানের ‘বাফার স্টেট' হিসেবে চিহ্নিত করার মাধ্যমে ভারতের ওই সাংবাদিক বাংলাদেশকে চরমভাবে অপমানিত করার পরও পররাষ্ট্রমন্ত্রী কোনো কথাই বলেননি। সেখানে উপস্খিত বাংলাদেশের সাংবাদিকরা তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তারা এমনকি ‘শেম, পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেম' উচ্চারণ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে উৎসাহিত করার চেষ্টাও করে দেখেছেন। কিন্তু কিছুতেই নড়াচড়া করেননি দীপু মনি। অথচ বাংলাদেশের প্রতি ভারতের নীতি-মনোভাবের কারণে ‘বাফার স্টেট' টার্মটির সঙ্গে রাজনীতিতে জড়িত তরুণ-যুবকদেরও পরিচয় রয়েছে। ‘বাফার স্টেটে'র অর্থ বোঝার জন্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তত্ত্ব বা সংজ্ঞার উল্লেখে যাওয়ার বা পন্ডিত হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। এমন ক্ষুদ্র রাষ্ট্রকেই ‘বাফার স্টেট' বলা হয় যার অবস্খান একাধিক বা কয়েকটি বড় রাষ্ট্রের মাঝখানে এবং বড় রাষ্ট্রগুলো সবাই বা সেগুলোর কোনো একটি যে রাষ্ট্রটিকে অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধে ব্যবহার করে। এখানে ভারতীয় সাংবাদিক বুঝিয়েছেন, ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী হামলা চালানোর জন্য পাকিস্তান বাংলাদেশকে তার ‘বাফার স্টেট' হিসেবে ব্যবহার করছে।
দেশপ্রেমিক সকল মহল একবাক্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ধিক্কার দিয়েছেন। তারা বলেছেন, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে অবমাননা করে ভারতীয় সাংবাদিকের ওই প্রশ্নের আড়ালে প্রত্যক্ষ খোঁচার জবাবে তাৎক্ষণিকভাবেই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কঠোর প্রতিবাদ জানানো এবং লোকটিকে ঠিকমতো শিখিয়ে-পড়িয়ে দেয়া উচিত ছিল। কিন্তু দীপু মনি একেবারে নীরব থেকেছেন। অন্য কোনো দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হলে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হলে তো অবশ্যই তাকে সংসদে তলব করে কৈফিয়ত আদায় করে পদত্যাগ করতে বলা হতো। মন্ত্রী নিজেও দেশবাসীর কাছে মাফ চাইতেন এবং পদত্যাগ করতেন। কিন্তু আমাদের দীপু মনি এখনো বুক ফুলিয়েই চলছেন!
এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্ধার করতে দৃশ্যপটে হাজির হয়েছেন স্খানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। আওয়ামী লীগের দলীয় মুখপাত্র তিনি। সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ১০ ফেব্রুয়ারি সৈয়দ আশরাফুল বলেছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রশ্নটির ‘গুরুত্ব' বোঝেননি।
প্রশ্ন উঠেছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী কি তাহলে ফিডারের নিপ্ল চোষেন এবং ফিডারেই এখনো দুধ খান? এমন প্রশ্নের কারণ, শুধু নীরব থাকলেও হয়তো সৈয়দ আশরাফুলের কৈফিয়ৎ মেনে নেয়া যেতো। কিন্তু কথা তো শুধু এটুকুই নয়। যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্খিত বাংলাদেশী সাংবাদিকরা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। একজন সিনিয়র সাংবাদিক প্রতিবাদ জানানোর আহবান পর্যন্ত জানিয়েছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী টু শব্দটি পর্যন্ত করেননি। সুতরাং সৈয়দ আশরাফুলের এই যুক্তি মেনে নেয়া যায় না যে, দীপু মনি প্রশ্নটির ‘গুরুত্ব' বুঝতে পারেননি! বাংলাদেশের সাংবাদিকরা তো তাকে ‘গুরুত্ব' বুঝিয়েই দিয়েছিলেন।
ভারতীয় সাংবাদিকের প্রশ্নটিকে ‘অবান্তর' হিসেবে চিহ্নিত করে সৈয়দ আশরাফুলও কিন্তু প্রকারান্তরে পাশ কাটাতে এবং পুরো বিষয়টিকে গুরুত্বহীন করতে চেয়েছেন। একটি স্বাধীন দেশ অন্য একটি স্বাধীন দেশের ‘বাফার স্টেট' হয় কি করে বলে প্রশ্ন তুলে এবং ‘আমরা কোনো বাফার রাষ্ট্রে বিশ্বাস করি না' ধরনের কথা বলেও সৈয়দ আশরাফুল বিষয়টিকে হাল্কা করারই চেষ্টা চালিয়েছেন। অন্যদিকে বাস্তবতা হলো, সৈয়দ আশরাফুলরা বিশ্বাস করুন আর না-ই করুন, পৃথিবীর বহু দেশকেই ‘বাফার স্টেট' হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বড় কথা, একটি টার্ম হিসেবে ‘বাফার স্টেট' এখনো ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে ভারতের কোনো কোনো মহল যে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের ‘বাফার স্টেট' মনে করে সে কথা তো ভারতের ওই সাংবাদিকও জানিয়ে গেছেন। সুতরাং সৈয়দ আশরাফুলরা বিশ্বাস না করার কথা জানালেও কিছুই যায়-আসে না।
যারা ইতিহাস জানেন তারা অবশ্য দীপু মনির পক্ষে সৈয়দ আশরাফুলকে সাফাই গাইতে দেখে অবাক হবেন না। কারণ, সৈয়দ আশরাফুলের পিতা মরহুম সৈয়দ নজরুল ইসলামেরও কিছু বিশেষ রেকর্ড রয়েছে। এ রকম একটি রেকর্ড হলো, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ভারতের সঙ্গে অধীনতামূলক গোপন যে সাত দফা চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল তার স্বাক্ষরদাতা ছিলেন সৈয়দ নজরুল। তিনি তখন কলকাতার থিয়েটার রোডে অবস্খিত মুজিবনগর সরকারের অস্খায়ী রাষ্ট্রপতি। দেশ ও জাতির এত বড় ক্ষতি করার পরও তার পক্ষে সাফাই গাওয়ার লোকজনেরও অভাব হয়নি যেমনটি হচ্ছে না দীপু মনির পক্ষে সাফাই গাওয়ার লোকের অভাব। এবার যেমন সৈয়দ আশরাফুল নিজে হাজির হয়েছেন, ১৯৭১ সালের ঘটনায় তেমনি হাজির হয়েছিলেন হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। আওয়ামী লীগ সরকার আমলের স্পীকার এবং তারও আগে স্বৈরশাসক এরশাদের মন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী তখন দিল্লিতে বাংলাদেশ মিশনের প্রধান ছিলেন। তিনি জানিয়ে গেছেন, ওই চুক্তিতে স্বাক্ষর করার পর সৈয়দ নজরুল নাকি ‘মূর্ছা' গিয়েছিলেন! দেশকে তিনি এতটাই ভালোবাসতেন যে, গোপন চুক্তি স্বাক্ষর না করা পর্যন্ত তার পক্ষে ‘মূর্ছা' যাওয়া সম্ভব হয়নি! ‘মূর্ছা' গিয়েছিলেন তিনি বাংলাদেশের সর্বনাশ নিশ্চিত করার পর!! (দেখুন : মাসুদুল হকের গ্রন্থ ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ও সিআইএ', পৃষ্ঠা- ৯৩।)
দীপু মনিকে অবশ্য দোষ দেয়ার তেমন সুযোগ নেই। কারণ তার নেত্রী শেখ হাসিনাও বিভিন্ন সময়ে কম দেখাননি। যেমন এর আগের দফায় প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে (১৯৯৬-২০০১) ভারতের পশ্চিম বঙ্গের এক অনুষ্ঠানে তাকে ‘মুখ্যমন্ত্রী' বলে সম্বোধন করা হয়েছিল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তো নয়ই, পরবর্তী কোনো উপলক্ষেও শেখ হাসিনা এর প্রতিবাদ করেননি। অথচ ভারতে কোনো রাজ্য সরকারের প্রধানকে ‘মুখ্যমন্ত্রী' বলা হয়। শেখ হাসিনাও একটি রাজ্যের ‘মুখ্যমন্ত্রী' এবং স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যকার বিরাট পার্থক্য না বোঝার ভাণ করেছিলেন। একটি কারণ ছিল, ‘মুখ্যমন্ত্রী' সম্বোধন করার আগে মঞ্চে ওঠার পর পর তাকে কপালে সিঁদুর ও চন্দন তিলক লাগিয়ে ‘বরণ' করা হয়েছিল। ফলে ‘মুখ্যমন্ত্রী' বলার সময় শেখ হাসিনা ছিলেন আবেগে বিগলিত অবস্খায়। তার কানে সম্ভবত ‘মুখ্যমন্ত্রী' কথাটাই ঢোকেনি। তাছাড়া ‘দাদারা পাছে যদি কিছু মনে করে বসেন' বলে ভয় তো ছিলই!
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই নীরবতা, বুঝতে না পারা কিংবা স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে তথা ইচ্ছাকৃতভাবে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার ফায়দা কিন্তু ভারত ওঠাতে ছাড়বে না। নিজেদের দেশে সন্ত্রাসী ঘটনার জন্য পাকিস্তানের ওপর দোষ চাপানোর প্রতিটি উপলক্ষেই ভারতীয়রা বলতে থাকবে, এমনকি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যন্ত ‘অস্বীকার' করেননি যে, পাকিস্তান বাংলাদেশকে ব্যবহার করে ভারতে সন্ত্রাসী হামলা চালাচ্ছে। বিষয়টির গুরুত্ব বোঝা দরকার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর।
এ কথা সত্য যে, আওয়ামী লীগ সরকারের কোনো পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে দেশের বাইরে খুব একটা যেতে হয় না। তারা মাঝে-মধ্যে বড়জোর নয়াদিল্লি যান আর সেপ্টেম্বরে যান জাতিসংঘে। এজন্যই সম্ভবত দীপু মনির মতো একজন ‘অবুঝ'কে এত বড় একটি পদে বসানো হয়েছে। একথা বুঝতে হবে যে, শুধু চোখ ঘুরিয়ে আর ঠোঁট বাঁকিয়ে কথা বলতে পারলেই কূটনীতিক হওয়া যায় না পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। যে কোনো দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকেই কূটনীতি ও কূটনৈতিক রীতি-নীতির পাশাপাশি কূটনৈতিক ভাষা-পরিভাষা সম্পর্কে শিখতে-পড়তে হয়। কারণ, কোনো কোনো দেশের ‘ঝানু' পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এমন কথাও বলেন বলে শোনা যায়, যে একটি মাত্র কথারই নাকি বেশ কয়েকটি অর্থ ও ব্যাখ্যা হতে পারে। সুতরাং পদটিতে ‘অবুঝ' কোনো ব্যক্তিকে রাখা চলে না যিনি নাকি এমনকি ‘বাফার স্টেট' টার্মটিরও অর্থ বোঝেন না! তিনি তাহলে কথার মারপ্যাঁচ বুঝবেন কি করে? হেনরি কিসিঞ্জার ধরনের কোনো পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পাল্লায় পড়লে দীপু মনি তো বাংলাদেশকেও নিলামে তুলে দিয়ে দিব্যি হাসতে হাসতে ঢাকায় ফিরে আসতে পারেন! এ ধরনের বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটবার আগেই শেখ হাসিনার উচিত, দীপু মনির জন্য কূটনীতি ও পররাষ্ট্র তথা অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ও যোগাযোগ বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্খা করা। প্রশিক্ষণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা থেকেও তাকে নিরস্ত রাখা উচিত। (বেশি বাঁকা চোখওয়ালা কেউ কেউ অবশ্য দীপু মনির পক্ষ নিয়েছেন। বলেছেন, তিনি নাকি ‘স্পোকেন ইংলিশে' ততোটা ভালো নন। এজন্যই তিনি ভারতীয় সাংবাদিকের কথাটা ঠিক বুঝে উঠতে পারেননি, কোনো জবাব দেয়াও তার পক্ষে সম্ভব হয়নি!)
ভারতীয় সাংবাদিকের কথাইবা শুধু বলি কেন, আওয়ামী লীগ সরকারের ভারতপন্থী নীতি-অবস্খানের সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতের সকল মহলই চরম অবজ্ঞা দেখিয়ে চলেছেন। যেমন প্রণব মুখার্জি ঢাকায় আসার আগের দিন ভারতকে ট্রানজিট-করিডোর দেয়ার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীদের মতামত প্রসঙ্গে হাই কমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেছেন, এগুলো ‘আউল-ফাউল' কথাবার্তা! অন্য যে কোনো দেশ হলে এবং সে দেশে জনগণের ভোটে নির্বাচিত দেশপ্রেমিক সরকার ক্ষমতায় থাকলে প্রথমত পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর মতো একজন মাঝারি মানের অফিসারের পক্ষে এত বড় ঔদ্ধত্য দেখানো সম্ভব হতো না। দ্বিতীয়ত ঘটনাক্রমে বলে ফেললেও সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় সঙ্গে সঙ্গে তাকে তলব করতো এবং কৈফিয়ত আদায় করার পাশাপাশি তাকে দিয়ে ক্ষমাও প্রার্থনা করিয়ে ছাড়তো। সবশেষে তাকে বহিষ্কার করতো। কিন্তু জাতির দুর্ভাগ্য, ক্ষমতায় এমন এক দলের সরকার রয়েছে যে দলটিই ভারতের কাছে সব সময় মাথা নুইয়ে থাকে। তা তারা থাকতেই পারেন। কিন্তু পিনাক চক্রবর্তীকে সরাসরি ছাড় দেয়ার কথাটা শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগকে মনে রাখতে হবে। কারণ, এজন্য কোনো না কোনো সময় তাদের জবাবদিহি করতে হবে।
আসলে এরা বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক মন্ত্রী বটে!
বাংলাদেশ কি বাফার স্টেট? পররাষ্ট্রমন্ত্রী কি বুঝাতে চাইলেন জনগনকে? নাকি দাদা বাবুদের মন জয়র ব্যস্ত ডা: দীপু ?
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
চলতি পথের গল্পঃ দুই

‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।
এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক
‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন
Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ
![]()
প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন
বাকি রইলো; কাঁচা কলা

স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।