somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আরজ আলি মাতুব্বর - ১

১০ ই অক্টোবর, ২০০৭ সকাল ৯:৪৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ধর্ম নিয়ে খোলা আলোচনা কিংবা বিশেষণ বাংলাদেশের সমাজ-মতা অনুমোদন করে না৷ কিন্তু আবার সমাজ, মানুষ, মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র, বন্ধন-নিপীড়ন-শৃঙ্খল এবং সেগুলো থেকে মুক্তি পাবার লড়াইয়ের বিষয় আলোচনা করতে গেলে ধর্মের প্রসঙ্গ এসেই যায়৷ এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে গেলে, একটা পথ পেতে গেলে ধর্মের প্রসঙ্গ নীরবে পাশ কাটিয়ে যাওয়া চলে না৷ এর কারণ কি? কারণ ধর্ম একটা বিশ্বাস হিসেবে যেরূপই ধারণ করুক না কেন এই ধর্মের মধ্যে আসলে বসবাস করে সমাজ৷ বসবাস করে সমাজের নানা বিধি, নিয়মনীতি, নৈতিকতা, অনুশাসন৷ সমাজের, রাষ্ট্রের বিধিই উপস্থিত হয় ঐশ্বরিক বিধান হিসেবে, ধর্মরূপে৷ এই ধর্মের মধ্যেই আবার থাকে যেভাবে মার্কস বলেছিলেন ''হৃদয়হীনের হৃদয়, নিপীড়িতের দীর্ঘশ্বাস"৷
ধর্ম নিয়ে আরজ আলীর ভাবনা বা গবেষণা সর্বোপরি প্রশ্ন উত্থাপন কোন পরিকল্পিত কাজ নয়৷ বাস্তব জীবনে, শৈশবের একটা ধাক্কাই তাঁকে এই পথে নিয়ে আসে, প্রশ্নের মুখোমুখি তাঁকে দাঁড় করায়, প্রশ্নের উত্তর সন্ধানে তাঁকে ব্যস্ত রাখে আজীবন৷ তাঁর আলোচনা, প্রশ্ন, দার্শনিক বিশেষণ আসলে শুধুই ধর্ম গ্রন্থ নিয়ে নয়৷ ধর্মের গ্রন্থ বা শাস্ত্র আর জনগণের মধ্যে তার উপস্থিতি এক নাও হতে পারে৷ গ্রন্থ বা ধর্ম জনগণের মধ্যে কিভাবে উপস্থিত তাকে নিয়েই আরজ আলী মাতুব্বরের বিশেষ মনোযোগ৷ বস্তুতঃ জনগণ কিভাবে ধর্মকে গ্রহণ করেন তা শাস্ত্রের উপর নির্ভর করে না৷ শাস্ত্রই যদি ধর্ম নির্ধারণ করতো তাহলে একটি ধর্ম পৃথিবীর সর্বত্র এবং সর্বকালে একইরকম হতো৷ শাস্ত্র আসলে মানুষের বাস্তব জগতে ধর্মের একটি দিক গঠন করে, সেটাকে আমরা কাঠামো বলতে পারি৷ কিন্তু তার রক্তমাংস, মাথা-মগজ, শরীর, চোখ ইত্যাদি তৈরি করে তার দাঁড়ানোর জায়গা_তার সমাজ ও তার সংস্কৃতি, তার সময়৷ এই সবকিছুই আরজ আলীর মনোযোগ আকর্ষণ করে, কেননা তিনি এই সবকিছুর মধ্যে মানুষের শৃঙ্খল উপলব্ধি করেছিলেন এবং তার থেকে বেরুবার জন্য হন্যে হয়ে উঠেছিলেন৷ সেভাবেই তৈরি হলেন আমাদের আরজ আলী মাতুব্বর৷
শহুরে মধ্যবিত্ত কিংবা গ্রামীণ মতাবান কারও কাছেই আরজ আলী মাতুব্বর গ্রহণযোগ্যতা পাননি৷ কারণ এদেশে মধ্যবিত্ত কিংবা বিদ্বত্সমাজ যেভাবে গড়ে উঠেছে সেখানে ভক্তি দিয়ে জগত সংসার দেখাতেই তার স্বস্তি, তাতেই তার আসক্তি৷ এই ভক্তি যেমন সৃষ্টিকর্তা কিংবা ধর্মের প্রচলিত বয়ানের প্রতি, তেমনি এই ভক্তি বিশ্বব্যাংকের উন্নয়ন দর্শনের প্রতিও৷ দুটোই তার আশ্রয়৷ এই আশ্রয়ের খোলসে নিরাপদ জীবনযাপনের জন্য তার অস্থিরতা এখন আগের চাইতে বেশি৷ প্রশ্ন তাই তার জন্য বিপদের কারণ, অস্বস্তির কারণ৷ আরজ আলী মাতুব্বর তাই তাদের কাছে ভীতিকর৷ হাতে গোনা কিছু ব্যতিক্রম বাদে 'বুদ্ধিজীবীদের' কাছে আরজ আলী গৃহীত হননি কারণ প্রথমত, তিনি তাদের 'উঁচু নাকে' টোকা দিয়েছেন এবং দ্বিতীয়ত, আরজ আলীর প্রশ্ন উত্থাপনের ভঙ্গী ও ত্রেকে তারা বিপজ্জনক বিবেচনা করেছেন৷
পা ভাঁজ করে মহাবিশ্ব দেখা আরজ আলী মাতুব্বর বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামের এক কোণে বড় হয়েছেন৷ সেই গ্রাম কোনদিক থেকেই বিশিষ্ট নয়৷ অন্য আর দশটা গ্রামের মতোই তার সবকিছু৷ সেখানে সুন্দর প্রকৃতি এবং নিষ্ঠুর সমাজ দুইই ছিল৷ তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতাও কোন অনন্য কিছু নয়৷ বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষের জীবনে এইরকম কাহিনী পাওয়া যাবে৷ তখন তো বটেই, এখনও৷ কি সেটা? ছোটবেলায় বাবা মারা যান৷ মাকে নিয়ে যখন তাঁর হাবুডুবু অবস্থা তখন মহাজনী চাপে তাঁর বাবার কৃষিজমি যায়৷ ঘর ছিল "দৈর্ঘ্যে পাঁচ হাত ও প্রস্থে চার হাত৷ ঘরখানা তৈরির সরঞ্জাম ছিল ধৈঞ্চার চাল, গুয়াপাতার ছাউনী, মাদারের খাম, খেজুরপাতার বেড়া ও ঢেঁকিলতার বাঁধ৷ আর তারই মধ্যে ছিল ভাতের হাঁড়ি, পানির কলসী, পাকের চুলো, কাঁথা-বালিশ সবই৷ রাতে শুতে হতো পা গুটিয়ে৷ ঘুমের ঘোরে কখনো পা মেলে ফেললে হয়তো ভাতের হাঁড়ি কাত হয়ে পড়তো বা জলের কলসী পড়ে গিয়ে কাঁথা বালিশ ভিজে যেতো৷ একটি এঁটেকলা দ্বারা তখন আমরা মায়ে-পুতে পান্তাভাত খেতাম দুবেলা৷"১
এরকম অবস্থায় যারা বসবাস করেন তাদের জীবনের পরবর্তী অধ্যায় এর থেকে খুব ভিন্ন হয় না৷ কেননা এটা হলো এক দুষ্টচক্রের মতো৷ এই অবস্থার কারণেই জগতের সকল সুযোগ ও সম্ভাবনা থেকে তাঁদের বঞ্চিত থাকতে হয় আবার এই বঞ্চিত থাকার কারণেই নিজেদের অবস্থার পরিবর্তনের চেষ্টা করা সম্ভব হয় না৷ নিজেদের মেধা, সৃজনশীলতা পদে পদে বাধাগ্রস্ত হয়, অপচয় হয়, বিনষ্ট হয়৷ এই দুষ্টচক্রের থেকে আরজ আলী যে খুব বেরিয়ে আসতে পেরেছেন তা নয়৷ তবে এরকম পা ভাঁজ করে শোয়ার অবস্থা থেকে যে তিনি বিশ্বকে দেখার মতা আয়ত্ত করেছিলেন সেখানেই আরজ আলী মাতুব্বর হয়ে উঠেছিলেন অসাধারণ৷
আরজ আলী মাতুব্বরের গ্রামে শিা প্রতিষ্ঠান ছিল না৷ পরে এক মক্তব হয়৷ সেখানে তিনি কিছুদিন পড়েছেন কিন্তু বই খাতা কেনার পয়সা ছিল না৷ এরকম ভাঙাচোরা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করতে গেলেও পয়সা লাগে, পরিবারের নূ্যনতম স্বাচ্ছন্দ্যের প্রয়োজন হয়৷ সেটা ছিল না বলে 'মেধাবী ছাত্র' বলে পরিচিত হবার কোন সুযোগ তিনি পাননি৷ এই প্রাতিষ্ঠানিক আগ্রহের বাইরে থেকেই তাঁর বিদ্যাচর্চার প্রতি দুর্মর আগ্রহ তৈরি হয়েছিল৷ সেজন্য তাঁর শৈশবের সবচাইতে আনন্দদায়ক, উত্তেজনাকর ঘটনা ছিল জ্ঞাতিচাচার কাছ থেকে (বাংলা ১৩২১ সাল) সীতানাথ বসাক কৃত তত্কালীন ''দুআনা দামের একখানা আদর্শলিপি বই'' পাওয়া৷ নিজের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি যা বলেছেন তা আমাদের দেশের অসংখ্য মানুষের শৈশবের আনন্দ ও বেদনার স্মৃতি৷ তিনি বলছেন, "সেদিন আমি যে কতটুকু আনন্দ লাভ করেছিলাম , তা ভাষায় ব্যক্ত করতে পারবো না৷ সেদিনটি ছিলো আমার জীবনের সর্বপ্রথম বই হাতে ছোঁয়ার দিন৷ তাই আনন্দ-স্ফূর্তিতে আমার মনটা যেনো ফেটে যাচ্ছিলো৷ আমি বইখানা হাতে নিয়ে নৃত্য করতে করতে গিয়েছিলাম প্রতিবেশীর বাড়িতে সহপাঠীদের বইখানা দেখাতে৷..সারাণ পড়তাম ও সাথে সাথে রাখতাম৷..কিন্তু আমার সে সাধের সম্পত্তিটুকু রা করতে বিষাদ দেখা দিলো বর্ষাকালে৷...চালে বৃষ্টির পানি মানায় না৷..অল্প বৃষ্টির সময় যেখানে রাখতাম, বৃষ্টি বেশি হলে সেখান থেকে সরাতে হতো, অত্যধিক বৃষ্টি হলে কোথাও স্থান পেতাম না, তখন উপুড় হয়ে বইখানা রাখতাম বুকের নীচে৷.."২
চলবে....


তথ্যসূত্রঃ

১. স্মরণিকা, আরজ আলী মাতুব্বর রচনা সমগ্র, (১, ২১১-১২)
২. আরজ আলী মাতুব্বর রচনা সমগ্র, (১, ২১২)
১৭টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×