ধর্ম নিয়ে খোলা আলোচনা কিংবা বিশেষণ বাংলাদেশের সমাজ-মতা অনুমোদন করে না৷ কিন্তু আবার সমাজ, মানুষ, মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র, বন্ধন-নিপীড়ন-শৃঙ্খল এবং সেগুলো থেকে মুক্তি পাবার লড়াইয়ের বিষয় আলোচনা করতে গেলে ধর্মের প্রসঙ্গ এসেই যায়৷ এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে গেলে, একটা পথ পেতে গেলে ধর্মের প্রসঙ্গ নীরবে পাশ কাটিয়ে যাওয়া চলে না৷ এর কারণ কি? কারণ ধর্ম একটা বিশ্বাস হিসেবে যেরূপই ধারণ করুক না কেন এই ধর্মের মধ্যে আসলে বসবাস করে সমাজ৷ বসবাস করে সমাজের নানা বিধি, নিয়মনীতি, নৈতিকতা, অনুশাসন৷ সমাজের, রাষ্ট্রের বিধিই উপস্থিত হয় ঐশ্বরিক বিধান হিসেবে, ধর্মরূপে৷ এই ধর্মের মধ্যেই আবার থাকে যেভাবে মার্কস বলেছিলেন ''হৃদয়হীনের হৃদয়, নিপীড়িতের দীর্ঘশ্বাস"৷
ধর্ম নিয়ে আরজ আলীর ভাবনা বা গবেষণা সর্বোপরি প্রশ্ন উত্থাপন কোন পরিকল্পিত কাজ নয়৷ বাস্তব জীবনে, শৈশবের একটা ধাক্কাই তাঁকে এই পথে নিয়ে আসে, প্রশ্নের মুখোমুখি তাঁকে দাঁড় করায়, প্রশ্নের উত্তর সন্ধানে তাঁকে ব্যস্ত রাখে আজীবন৷ তাঁর আলোচনা, প্রশ্ন, দার্শনিক বিশেষণ আসলে শুধুই ধর্ম গ্রন্থ নিয়ে নয়৷ ধর্মের গ্রন্থ বা শাস্ত্র আর জনগণের মধ্যে তার উপস্থিতি এক নাও হতে পারে৷ গ্রন্থ বা ধর্ম জনগণের মধ্যে কিভাবে উপস্থিত তাকে নিয়েই আরজ আলী মাতুব্বরের বিশেষ মনোযোগ৷ বস্তুতঃ জনগণ কিভাবে ধর্মকে গ্রহণ করেন তা শাস্ত্রের উপর নির্ভর করে না৷ শাস্ত্রই যদি ধর্ম নির্ধারণ করতো তাহলে একটি ধর্ম পৃথিবীর সর্বত্র এবং সর্বকালে একইরকম হতো৷ শাস্ত্র আসলে মানুষের বাস্তব জগতে ধর্মের একটি দিক গঠন করে, সেটাকে আমরা কাঠামো বলতে পারি৷ কিন্তু তার রক্তমাংস, মাথা-মগজ, শরীর, চোখ ইত্যাদি তৈরি করে তার দাঁড়ানোর জায়গা_তার সমাজ ও তার সংস্কৃতি, তার সময়৷ এই সবকিছুই আরজ আলীর মনোযোগ আকর্ষণ করে, কেননা তিনি এই সবকিছুর মধ্যে মানুষের শৃঙ্খল উপলব্ধি করেছিলেন এবং তার থেকে বেরুবার জন্য হন্যে হয়ে উঠেছিলেন৷ সেভাবেই তৈরি হলেন আমাদের আরজ আলী মাতুব্বর৷
শহুরে মধ্যবিত্ত কিংবা গ্রামীণ মতাবান কারও কাছেই আরজ আলী মাতুব্বর গ্রহণযোগ্যতা পাননি৷ কারণ এদেশে মধ্যবিত্ত কিংবা বিদ্বত্সমাজ যেভাবে গড়ে উঠেছে সেখানে ভক্তি দিয়ে জগত সংসার দেখাতেই তার স্বস্তি, তাতেই তার আসক্তি৷ এই ভক্তি যেমন সৃষ্টিকর্তা কিংবা ধর্মের প্রচলিত বয়ানের প্রতি, তেমনি এই ভক্তি বিশ্বব্যাংকের উন্নয়ন দর্শনের প্রতিও৷ দুটোই তার আশ্রয়৷ এই আশ্রয়ের খোলসে নিরাপদ জীবনযাপনের জন্য তার অস্থিরতা এখন আগের চাইতে বেশি৷ প্রশ্ন তাই তার জন্য বিপদের কারণ, অস্বস্তির কারণ৷ আরজ আলী মাতুব্বর তাই তাদের কাছে ভীতিকর৷ হাতে গোনা কিছু ব্যতিক্রম বাদে 'বুদ্ধিজীবীদের' কাছে আরজ আলী গৃহীত হননি কারণ প্রথমত, তিনি তাদের 'উঁচু নাকে' টোকা দিয়েছেন এবং দ্বিতীয়ত, আরজ আলীর প্রশ্ন উত্থাপনের ভঙ্গী ও ত্রেকে তারা বিপজ্জনক বিবেচনা করেছেন৷
পা ভাঁজ করে মহাবিশ্ব দেখা আরজ আলী মাতুব্বর বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামের এক কোণে বড় হয়েছেন৷ সেই গ্রাম কোনদিক থেকেই বিশিষ্ট নয়৷ অন্য আর দশটা গ্রামের মতোই তার সবকিছু৷ সেখানে সুন্দর প্রকৃতি এবং নিষ্ঠুর সমাজ দুইই ছিল৷ তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতাও কোন অনন্য কিছু নয়৷ বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষের জীবনে এইরকম কাহিনী পাওয়া যাবে৷ তখন তো বটেই, এখনও৷ কি সেটা? ছোটবেলায় বাবা মারা যান৷ মাকে নিয়ে যখন তাঁর হাবুডুবু অবস্থা তখন মহাজনী চাপে তাঁর বাবার কৃষিজমি যায়৷ ঘর ছিল "দৈর্ঘ্যে পাঁচ হাত ও প্রস্থে চার হাত৷ ঘরখানা তৈরির সরঞ্জাম ছিল ধৈঞ্চার চাল, গুয়াপাতার ছাউনী, মাদারের খাম, খেজুরপাতার বেড়া ও ঢেঁকিলতার বাঁধ৷ আর তারই মধ্যে ছিল ভাতের হাঁড়ি, পানির কলসী, পাকের চুলো, কাঁথা-বালিশ সবই৷ রাতে শুতে হতো পা গুটিয়ে৷ ঘুমের ঘোরে কখনো পা মেলে ফেললে হয়তো ভাতের হাঁড়ি কাত হয়ে পড়তো বা জলের কলসী পড়ে গিয়ে কাঁথা বালিশ ভিজে যেতো৷ একটি এঁটেকলা দ্বারা তখন আমরা মায়ে-পুতে পান্তাভাত খেতাম দুবেলা৷"১
এরকম অবস্থায় যারা বসবাস করেন তাদের জীবনের পরবর্তী অধ্যায় এর থেকে খুব ভিন্ন হয় না৷ কেননা এটা হলো এক দুষ্টচক্রের মতো৷ এই অবস্থার কারণেই জগতের সকল সুযোগ ও সম্ভাবনা থেকে তাঁদের বঞ্চিত থাকতে হয় আবার এই বঞ্চিত থাকার কারণেই নিজেদের অবস্থার পরিবর্তনের চেষ্টা করা সম্ভব হয় না৷ নিজেদের মেধা, সৃজনশীলতা পদে পদে বাধাগ্রস্ত হয়, অপচয় হয়, বিনষ্ট হয়৷ এই দুষ্টচক্রের থেকে আরজ আলী যে খুব বেরিয়ে আসতে পেরেছেন তা নয়৷ তবে এরকম পা ভাঁজ করে শোয়ার অবস্থা থেকে যে তিনি বিশ্বকে দেখার মতা আয়ত্ত করেছিলেন সেখানেই আরজ আলী মাতুব্বর হয়ে উঠেছিলেন অসাধারণ৷
আরজ আলী মাতুব্বরের গ্রামে শিা প্রতিষ্ঠান ছিল না৷ পরে এক মক্তব হয়৷ সেখানে তিনি কিছুদিন পড়েছেন কিন্তু বই খাতা কেনার পয়সা ছিল না৷ এরকম ভাঙাচোরা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করতে গেলেও পয়সা লাগে, পরিবারের নূ্যনতম স্বাচ্ছন্দ্যের প্রয়োজন হয়৷ সেটা ছিল না বলে 'মেধাবী ছাত্র' বলে পরিচিত হবার কোন সুযোগ তিনি পাননি৷ এই প্রাতিষ্ঠানিক আগ্রহের বাইরে থেকেই তাঁর বিদ্যাচর্চার প্রতি দুর্মর আগ্রহ তৈরি হয়েছিল৷ সেজন্য তাঁর শৈশবের সবচাইতে আনন্দদায়ক, উত্তেজনাকর ঘটনা ছিল জ্ঞাতিচাচার কাছ থেকে (বাংলা ১৩২১ সাল) সীতানাথ বসাক কৃত তত্কালীন ''দুআনা দামের একখানা আদর্শলিপি বই'' পাওয়া৷ নিজের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি যা বলেছেন তা আমাদের দেশের অসংখ্য মানুষের শৈশবের আনন্দ ও বেদনার স্মৃতি৷ তিনি বলছেন, "সেদিন আমি যে কতটুকু আনন্দ লাভ করেছিলাম , তা ভাষায় ব্যক্ত করতে পারবো না৷ সেদিনটি ছিলো আমার জীবনের সর্বপ্রথম বই হাতে ছোঁয়ার দিন৷ তাই আনন্দ-স্ফূর্তিতে আমার মনটা যেনো ফেটে যাচ্ছিলো৷ আমি বইখানা হাতে নিয়ে নৃত্য করতে করতে গিয়েছিলাম প্রতিবেশীর বাড়িতে সহপাঠীদের বইখানা দেখাতে৷..সারাণ পড়তাম ও সাথে সাথে রাখতাম৷..কিন্তু আমার সে সাধের সম্পত্তিটুকু রা করতে বিষাদ দেখা দিলো বর্ষাকালে৷...চালে বৃষ্টির পানি মানায় না৷..অল্প বৃষ্টির সময় যেখানে রাখতাম, বৃষ্টি বেশি হলে সেখান থেকে সরাতে হতো, অত্যধিক বৃষ্টি হলে কোথাও স্থান পেতাম না, তখন উপুড় হয়ে বইখানা রাখতাম বুকের নীচে৷.."২
চলবে....
তথ্যসূত্রঃ
১. স্মরণিকা, আরজ আলী মাতুব্বর রচনা সমগ্র, (১, ২১১-১২)
২. আরজ আলী মাতুব্বর রচনা সমগ্র, (১, ২১২)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



