বৈশাখী রঙ
১৬ ই এপ্রিল, ২০০৮ রাত ২:২২
আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম চারুকলার সামনে ঠিক সেই জায়গায়টায় যেখানটায় দাঁড়িয়ে গতবার রূপালীকে দেখেছিলাম৷ রূপালী, যে একসময় আমার সহপাঠি ছিলো৷ যার সাথে গত ভালোবাসা দিবসে এইখানে অনেক দিন পর আমার দেখা হয়ে গিয়েছিলো৷ রূপালী, যাকে আমি খুব পছন্দ করতাম কিন্তু কখনো বলিনি৷ শেষবার দেখায় যে দাবি করেছিলো সেও আমাকে খুব পছন্দ করতো৷ কিন্তু আমাদের কারোরই পছন্দ কোন পরিণতি পায়নি৷
চারদিকে অগনিত মানুষের ভীর৷ বৈশাখের প্রথম দিনটাকে বরন করে নেবার জন্য রঙের মেলায় মেতে উঠেছে মানুষ৷ রঙ রঙ আর রঙ৷ অদ্ভুৎ এক রঙের সমুদ্রে ভেসে যাচ্ছে পৃথিবী৷ ভীরের মধ্যে আমি একা দাঁড়িয়ে ছিলাম৷ মনের মধ্যে একটা ছোট্ট প্রত্যাশা, মনের খুব গভীরে একটা ছোট্ট আশা, হয়তো আবার ওর সাথে এখানে দেখা হয়ে যাবে৷ দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে অনুভব করছিলাম আমার ছোট্ট প্রত্যাশার আগুনটা ধীরে ধীরে বেড়ে যাচ্ছে৷ আমি খুব গভীর আশা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, বুঝিবা রূপালী আসবে৷ বুঝতে পারছিলাম আমার আশার কোন ভিত্তি নেই৷ রূপালী হয়তো আসবে, কিন্তু তার সাথে নিশ্চয় তার স্বামী থাকবে৷ সে কি আর একা আসবে? সে এখন বিবাহ্তি, অন্যের স্ত্রী৷ স্বামীর হাত ধরে হারিয়ে যাওয়ারইতো দিন আজ৷ তাহলে সে কেন একা আসবে? হয়তো একসময় সে আমাকে পছন্দ করত৷ কিন্তু তাই বলে এখন তার কাছে আমার গুরুত্ব কেনই বা এত বেশি হবে যে সে একা এসে আমারই মত অপেক্ষা করবে?
কিন্তু মনটা এসব যুক্তি মানছিলো না৷ আমি অনেক আশা নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম৷ হয়তো একটু পরেই আমি তাকে দেখতে পাব৷ রূপালীর সুন্দর মুখটার দিকে তাকিয়ে আমি কিছুক্ষনের জন্য হলেও আমার একাকীত্বের যন্ত্রনা ভুলব৷
অন্যায় আশা, বড় অন্যায় আশা৷ ধুত্তারী ছাই, কেন আমি অন্যের স্ত্রীর জন্য অপেক্ষা করব? আমার রাগ হতে লাগলো নিজের উপর৷ বড় হতাশ লাগছিলো, কিন্তু আশাটাও ছাড়তে পারছিলাম না৷
অনেক্ষন অপেক্ষা করার পর বুঝতে পারলাম আর অপেক্ষা করার কোন মানে হয় না৷ তখন টিএসসিতে যাবার জন্য ঘুরে দাঁড়ালাম৷
“রডি৷”
আমি চমকে উঠে ঘুরে তাকালাম৷ খুব অবিশ্বাস নিয়ে প্রায় চিৎকার করে বললাম, “তুই?”
রূপালী হাসতে হাসতে বলল, “হ্যাঁ আমি৷ এত অবাক হচ্ছিস কেন? তুইতো আমার জন্যই অপেক্ষা করেছিলি, না?”
আমি লাল হয়ে উঠলাম৷ লজ্জা আর ভালোলাগা এসে আমাকে ছেঁকে ধরলো৷ কিন্তু অনুভব করলাম, লজ্জা পেলেও সত্যিটা লুকানোর কোন মানে হয়না৷ বললাম, “হ্যাঁ, কিন্তু তুই কিভাবে বুঝলি?”
“বুঝলাম কারন আমিও তোর জন্য অপেক্ষা করে ছিলাম৷ আমি আশা করছিলাম এখানে এসে তোকে দেখতে পাব৷”
“তুই কখন এসেছিস?”
“অনেক্ষন৷ তোর একটু পিছনেই আমি দাঁড়িয়ে আছি কখন থেকে৷”
আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, “তাহলে আমাকে ডাকিসনি কেন?”
রূপালী হেসে ফেলে বলল, “দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তোর পাগলামী দেখছিলাম৷ এত ভালোলাগছিলো দেখতে!”
“নাকি? কি পাগলামী করছিলাম আমি?”
“ওহ সে অনেক কিছু৷ তুই একা একা হাত ছুড়ছিলি পা ছুড়ছিলি, একা একা বিড়বিড় করছিলি৷ মাঝে মাঝে মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে দু'হাতে নিজের চুল টানছিলি৷ আমার এত মজা লাগছিলো দেখতে! খোদা, তুই এত ছেলে মানুষ!”
রূপালী খিলখিল করে হাসতে লাগলো৷ আমি লাল নীল বেগুনি কি হব ঠিক করতে না পেরে মাথা চুলকাতে লাগলাম৷ রূপালীর হাসি থামছিলোই না৷ শেষে ধমক দিয়ে বললাম, “হাসি থামা৷ তুই একা কেন? তোর হাসবেন্ড কই?”
রূপালী গম্ভীর হয়ে গেলো৷ বলল, “আমার হাসবেন্ড? সেতো অফিসের কাজে দেশের বাইরে গেছে৷ আর তাছাড়া সে এসব উৎসবে আসতেও চায় না৷ তার ভালো লাগে না৷”
আমার একটু খারাপ লাগলো৷ বললাম, “তোর হাসবেন্ড কি কাঠখোট্টা?”
“সে কথা আমি তোকে বলতে যাব কেন?”
“হুঁ তাওতো ঠিক৷ কিন্তু তোর ছেলে মেয়ে?”
“ওহ, তোকে বলিনি? আমরা এখনও বাচ্চা নিইনি৷”
“কেন?”
“সেওতো আমাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার, না?”
আমার একটু মন খারাপ হলো একথায়৷ পরক্ষনেই ভাবলাম আমার কি অধিকার আছে একথায় মন খারাপ করার? কিন্তু তা সত্বেও আমার ভাবটা মনে হয় চেহারায় ফুটে উঠলো, কারন রূপালী বলল, “রাগ করলি?”
“নাহ৷” আমি মাথা নেড়ে বললাম৷
“উঁহু রাগ করেছিস, তুই যা ছেলেমানুষ! তবে দ্যাখ, বাচ্চা নিলে কি এভাবে তোর প্রেমে বিবাগী হয়ে ছুটে আসতে পারতাম?”
“প্রেমে বিবাগী হয়ে ছুটে এসেছিস না ঘোড়ার ডিম৷ এসেছিস তো বেড়াতে, মাঝখানে আমি থাকলে একজন সঙ্গী পাবি এই যা৷”
রূপালী কি আহত হলো? মুখটা করুন করে বলল, “তুইওতো বেড়াতে এসেছিস? তুই সবসময়ই এরকম একলা একলা ঘুরে বেড়াস, ঠিক?”
“ঠিক৷” আমি বললাম৷
“তাহলে আজকে আমার জন্য অপেক্ষা করছিলি কেন? তোর আগ্রহ ছিলো না? ভালোলাগা ছিলো না?”
আমি মুখ নিচু করে রইলাম৷ আমি একটা গাধা৷ একটা মহা মূর্খ, কথার কোন ঠিক ঠিকানা নেই৷
রূপালী বলল, “যাক বাদ দে৷ একবারওতো বললি না আমাকে কেমন লাগছে?”
আমি তখন রূপালীকে ভালো করে দেখলাম৷ লাল পাড় সাদা শাড়ি পড়েছে সে৷ দু'হাত ভর্তি লাল আর সাদা কাঁচের চুড়ি৷ কপালে একটা লাল টিপ৷ লম্বা ছেড়ে দেয়া চুল পিঠ পর্য্যন্ত নেমে গেছে৷ চোখে কি কাজল দিয়েছে সে? অসহ্য সুন্দর লাগছে তাকে৷
আমি একটা শ্বাস ছেড়ে বললাম, “বলব না৷”
সে অবাক হয়ে বলল, “কেন বলবি না?”
“কারন বললে তুই রাত্রে ঘুমাতে পারবি না৷” আমি হাসতে হাসতে বললাম৷
রূপালী আরো অবাক গলায় বলল, “আমাকে কেমন দেখাচ্ছে বললে আমি রাত্রে ঘুমাতে পারব না? সে আবার কি কথা রে?”
“হুম৷” আমি হাসতে হাসতে বললাম৷ “আমি একবার একটা মেয়েকে বলেছিলাম, 'তোমাকে দেবীর মতো লাগছে'৷ সেই মেয়েটি নাকি সেকথা শুনে রাত্রে ঘুমাতে পারেনি৷”
“তুই? তুই একটা মেয়েকে বলেছিলি তাকে দেবীর মত লাগছে?”
“হ্যাঁ৷”
“ওহ, আমি ভুলে গিয়েছিলাম তুই অনেক চেন্জ হয়ে গেছিস৷ আজকাল অনেক মেয়ে পটানো কথা বলিস৷”
আমি মাথা নেড়ে বললাম, “আমি অবশ্য পটানোর জন্য বলিনি৷ আমার মনে যা ছিলো তাই বলেছি৷”
“হুম, আগে অবশ্য সেটাও বলতি না৷” বলেই রূপালী ঝলমল করে বলল, “তাহলে আমাকে দেবীর মত লাগছে বলছিস?”
“হুঁ, সেই সোনালী দেবী আফ্রোদিতি৷ তোকে দেখে আমার তার কথা মনে পড়ছে৷”
রূপালী প্রথমে লাল হলো ভালোলাগায়, তারপর হাসতে হাসতে ভেঙে পড়লো৷ হাসতে হাসতেই বললো, “মাগো, তুই আজকাল যা পটানো পটানো কথা বলিস না!”
আমি কিছু বললাম না৷ তাকিয়ে তাকিয়ে রূপালীর সুন্দর হাসি দেখতে লাগলাম৷ রূপালী হাসি থামিয়ে বলল, “আর তোকে কেমন লাগছে বলব?”
“বল৷”
“তোকে একটা কালো কুচ্ছিৎ ভুতের মত লাগছে৷”
আমার মনটা খারাপ হয়ে গেলো৷ আমার চেহারা অবশ্য খারাপ না, অনেকে ভালো বলে৷ কিন্তু গর্ব করার মত আহামরি কিছুও না৷ আর অনেক দূর হেঁটে এসেছি বলে নিশ্চয় ধূলাটুলা লেগে একাকার হয়ে গেছে৷ কি জানি, হয়তো ভুতের মতই লাগছে৷
রূপালী আবার খিলখিল হাসিতে ভেঙে পড়লো, “কিরে, তুই আবার সত্যি সত্যি আমার কথা বিশ্বাস করে বসে আছিস? নাহ, তোর সাথে কথা বলতেইতো এখন ভয় লাগবে রে৷”
আমি হাসলাম৷ বললাম, “চল, কোথাও বসবি?”
“হ্যাঁ চল৷”
আমরা ভিড় ঠেলে হাঁটতে লাগলাম৷ বৈশাখের প্রথম সূর্য্য মাথার উপরে আলো দিয়ে যাচ্ছে৷ প্রখর খরতাপে পুড়ছে পৃথিবী৷ আশ্চর্য্য, রঙের এই মেলায় এই প্রচন্ড খরতাপকেও যেন মিষ্টি বলে মনে হচ্ছে!
একদল বিচিত্র মুখোশধারী ঢোল বাজিয়ে নাচতে নাচতে আমাদের পাশে চলে এলো৷ ডুগুং ডুগুং ডুগুং ডুগুং করে ঢোল বেজে যাচ্ছে৷ কেউ কেউ মিছিলে ঢুকে ঢোলের তালে তালে নেচে নিচ্ছে৷ আমি রূপালীর দিকে তাকিয়ে বললাম, “নাচবি?”
রূপালী উল্লসিত হয়ে বলল, “চল৷”
আমরা মিছিলে ঢুকে নাচতে লাগলাম৷ একটা খুব বিচিত্র মুখোশধারী আমার সামনে পরে গেলো৷ তার মুখোশের নাকটা প্রায় আধ হাত লম্বা৷ আমি লম্বা নাকটা টেনে ধরে নাচতে লাগলাম৷ রূপালী আমার পাশে নাচতে নাচতে খিলখিল করে হাসতে লাগলো৷
টিএসসির কাছে এসে আমরা মিছিল থেকে বের হলাম৷ আরেকটা দল একটা মিনি ট্রাকের উপর গান জুড়ে দিয়েছে৷ ট্রাকের এক লোক তার ইয়া ভুরি বের করে প্রবল উৎসাহে ভুরির উপর তবলা বাজাচ্ছে৷ আমাদের মুখোশধারী মিছিলটা নাচতে নাচতে ট্রাকটা পাশ কাঁটিয়ে চলে গেলো৷ আমরা পাশের ফুটপাতে একটা অপেক্ষাকৃত ফাঁকা জায়গায় বসলাম৷
“আচ্ছা তখন তুই একা একা কি বিড়বিড় করছিলি?” রূপালী প্রশ্ন করল৷
আমি হাসতে হাসতে বললাম, “কত কিছুই তো বিড়বিড় করছিলাম, সেসব বলার মত না৷ তবে একটা কবিতা মাথায় আসছিলো৷”
“তাই নাকি রে? তুই কবিতা লিখিস?”
“আরে দূর, আমি কবিতা লিখব কি! মাঝে মাঝে একটা দুইটা লাইন মাথার মধ্যে ঘোরে৷”
“হুম৷ তা বেশ, এখন কি ঘুরছিলো মাথার মধ্যে?”
আমি হাসলাম৷ একটু দূরে একটা ঘোড়ার গাড়ির উপর কতগুলো বৈশাখে সাজে সজ্জিত নারী পুরুষ হাতে তালি দিতে দিতে কি একটা গান গাইছে৷ আমি সেদিকে তাকিয়ে বললাম-
“রঙের নেশায় মেতেছে মহাবিশ্ব
আপনারে আজ বিলাব হেথায় সকলি করে নিঃস্ব
আমার সকলি করে নিঃস্ব
আজ রঙের নেশায় মেতেছে মহাবিশ্ব৷”
রূপালী উদাস হয়ে তাকিয়ে রইলো৷ একটু পর নীরবতা ভেঙে সে বলল, “খুব ভালো লাগে এইসব, নারে?”
“হুঁ৷”
কিছুক্ষন চুপচাপ কেটে গেলো৷ চারদিকে মানুষের রঙ দেখছিলাম৷ অবশ্য মাঝে মাঝে মুখ ফিরিয়ে রূপালীকে দেখে নিচ্ছিলাম৷ মিথ্যে বলব না, রূপালীর সৌন্দর্য্য আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো৷ আমার খুব ইচ্ছে করছিলো ওকে ছুঁয়ে দিতে৷ এই নারীটা যদি পরস্ত্রী না হতো, তাহলে হয়তো আমি সত্যিই ওকে ছুঁয়ে দিতাম৷
আমি আবার রূপালীর দিকে তাকাতেই রূপালী হেসে দিলো৷ অবাক হয়ে বললাম, “হাসছিস কেন?”
তেমনি হাসতে হাসতেই রূপালী বলল, “এমনি৷”
বিরক্ত হয়ে বললাম, “এমনি আবার কিরে, নিশ্চয় কিছু একটা ভেবে হাসছিস৷”
“হাসছি কারন সেদিন তুই বলছিলি তুই আমার সাথে পরকিয়া করে বিবাগী হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে চাসনা৷ আজতো মনে হচ্ছে তুই আমার প্রেমে রীতিমতো হাবুডুবু খাচ্ছিস!” বলে রূপালী খিলখিল হাসিতে ভেঙে পড়লো৷
এই মেয়েগুলো আচ্ছা রসিকতা করতে পারে৷ আমি মহা বিরক্ত হয়ে বললাম, “কিসে তোর মনে হচ্ছে আমি তোর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি?”
“বোঝা যায় রে বোঝা যায়, তুই একদম মনের ভাব লুকাতে পারিস না৷”
“হ তোরে কইছে৷” আমি রেগে যাওয়ার চেষ্টা করতে করতে বললাম৷ “আমার তাকানোই ঐরকম৷ যেকোন মেয়ে দেখলে ভাবে যে আমি তার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি৷”
আমার কথা শুনে রূপালী যা হাসতে শুরু করলো তাতে আমার কান টান সব লাল হয়ে উঠলো৷ আহ, এই মেয়েগুলোর মনের কোন গভীরতা নেই, যত সব ফালতু! ইচ্ছে করছিলো ওর চুল ধরে টেনে দিই৷ ইচ্ছে করছিলো... দূর...৷
হাসি থামাতে রূপালীর বেশ কষ্ট করতে হলো৷ সে কি একটা বলতে যায়, একটা শব্দ বলতে বলতেই আবার হাসিতে ভেঙে পরে৷ অবশেষে অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে সে বলল, “মাগো, তুই যা একখান কথা বললি না! তোর তাকানো দেখেই মেয়েরা ভাবে যে তুই তার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিস? হি হি হি হি হি.....”
এবার রূপালীর সাথে আমিও হাসতে লাগলাম৷ হাসি থামিয়ে সে আবার বলল, “আচ্ছা শোন, তুই যে আমাকে পছন্দ করিস সেতো আমি জানিই৷ সেই আগেও জানতাম৷ তাহলে শুধু শুধু সেটা লুকানোর চেষ্টা করছিস কেন? আমিতো লুকানোর চেষ্টা করছি না যে আমি তোকে পছন্দ করি৷”
আমি কিছু বললাম না৷ সে আবার বলল, “তোর সাথে ঐদিন দেখা হবার পর আমি অনেক ভেবেছি৷ আমাদের সম্পর্কটা অন্যরকমও হতে পারতো৷ তা হয়নি, কিন্তু ভালোলাগাটাতো রয়ে গেছে, তাই না?”
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম, “হ্যাঁ৷”
রূপালী হেসে বলল, “তাহলে এবার বল, সেই মেয়েটা কে?”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “কোন মেয়েটা?”
“যে মেয়েটাকে তুই বলেছিলি তোমাকে দেবীর মত লাগছে৷”
“ওহ, সে আছে একজন৷”
“আহা আছে সেতো বুঝলাম৷ বলনা সে কে?”
“কেন তোর কি হিংসে হচ্ছে?”
“তাতো হতেই পারে৷”
আমি হা হা করে হাসতে লাগলাম৷ রূপালী বলল, “কি সম্পর্ক তার তোর সাথে?”
আমি উত্তর দিলাম না৷ কিছুক্ষন অপেক্ষা করে সে আবার বলল, “ভালোবাসিস তাকে?”
আমি একটু চুপ করে থেকে উত্তর দিলাম, “হু, আমি তাকে ভালোবেসেছিলাম৷”
“ছিলাম মানে কি? এখন তার সাথে সম্পর্ক নেই?”
আমি মাথা নেড়ে বললাম, “না৷”
“আচ্ছা কি হয়েছিলো খুলে বল না৷”
আমি রূপালীর চোখের দিকে তাকালাম৷ গভীর মমতা নিয়ে সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে৷ তার চোখের অসম্ভব মমতা আমাকে স্পর্ষ করে গেলো৷ আমি বলতে শুরু করলাম, “হ্যাঁ আমি তাকে ভালোবেসেছিলাম৷ খুব বেশি ভালোবেসেছিলাম৷ সেও এসেছিলো, কিন্তু তারপর কি হলো ঠিক বুঝতে পারিনি৷”
রূপালী তাকিয়ে রইলো৷ আমি বললাম, “তুই সেই গানটা শুনেছিস? আর ইউ লোনসাম টু-নাইট?”
রূপালী উত্তর দিলো না৷ আমি আবার বললাম, “গানের কথা গুলা খুব মজার৷ বলি শোন- পৃথিবী একটা নাট্যমন্চ এবং প্রত্যেককেই একটা ভূমিকায় অভিনয় করতে হয়৷ আমার ভূমিকা তোমাকে ভালোবাসার৷ প্রথম দৃশ্যের শুরু হলো তখন যখন আমাদের প্রথম দেখা হয়৷ আমি প্রথ্ম দেখায় তোমার প্রেমে পড়েলাম৷ তুমি তোমার নির্ধারিত লাইনগুলো কোন ভুল ছাড়াই পড়ে গেলে আর তোমার ভূমিকায় নিখুঁত অভিনয় করে গেলে৷ তারপর এলো দ্বিতীয় দৃশ্য৷ তুমি হঠাৎ পাল্টে গেলে কিন্তু আমি কখনই জানতে পারিনি কেন৷”
আমি থামলাম৷ তারপর আবার বললাম, “কিছু বুঝতে পারছিস?”
রূপালী মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকলো৷ কোন উত্তর দিলো না৷ বললাম, “তোর কি খুব মন খারাপ লাগছে?”
সে মুখ ফিরিয়ে বলল, “আমি খুব দুঃখিত৷ বিশ্বাস কর, আমি বুঝতে পারিনি৷”
আমি হেসে বললাম, “আরে কেতাবি ঢঙে কথা বলছিস কেন? এত মন খারাপ করার কিছু নেই৷ আমি মেনে নিয়েছি৷”
রূপালী রেগে গিয়ে বলল, “কেন মেনে নিয়েছিস? কেন কিছু বলিসনি তাকে?”
ওর অসম্ভব সুন্দর মুখটার দিকে তাকিয়ে বললাম, “ভালোবাসা নিয়ে কি জোর করা যায় রে পাগলী? যায় না৷ কেউ যদি আসতে না চায়, কিভাবে তাকে জোর করি বল?”
আমাকে খুব অবাক করে দিয়ে রূপালীর চোখে পানি চলে এলো৷ মুখ নিচু করে চোখ মুছতে লাগলো সে৷ বেশ কিছুক্ষন পর মুখ তুলে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “খুব খারাপ লাগছে৷”
আমি হাসলাম৷ রূপালী আবার বলল, “তুই খুব কষ্ট পাস ওর জন্য?”
“কষ্টতো আছেই৷” আমি বললাম৷ “কিন্তু আমার জীবনটাইতো এরকম না? বারবার আমার সব কিছু শুধু উল্টাপাল্টা হয়ে যায়৷ যেমন তোকেও কখনো বলা হয়নি তোকে ভালোলাগে৷ তাই মেনে নিয়েছি এসব৷ আজকাল বসে বসে অন্যদের আনন্দ দেখি, ভালোই লাগে৷”
রূপালী অনেক্ষন চুপ করে রইলো৷ তারপর হঠাৎ হেসে বলল, “এই, মন খারাপ করিস নাতো৷ দাঁড়া আমি তোর মন ভালো করে দিচ্ছি৷ চল হাঁটব৷ আজ রঙের নেশায় মেতেছে মহাবিশ্ব, আপনারে আজ বিলাব হেথায় সকলি করে নিঃস্ব৷”
বৈশাখের সূর্য্যটা তখন পরম মমতায় উৎসবে মেতে ওঠা মানুষগুলোকে আলো দিয়ে যাচ্ছিলো৷ আমি আর রূপালী উঠে সামনের আরেকটা নাচুনে দলের ভীরে মিশে গেলাম৷ রূপালী আমার দিকে তাকালো৷ দু'চোখে অসম্ভব মমতা নিয়ে বলল, “তুই একবার আমার হাতটা ধরবি?”
আমি ওর চোখের দিকে তাকালাম৷ অসহ্য ভালোলাগায় আমার ভীতরটা ভরে যাচ্ছিলো৷ একটা শ্বাস ছেড়ে বললাম, “নাহ, সেটা হয়তো ঠিক হবে না৷ এটুকু দূরত্ব নাহয় আমাদের মাঝে থাক৷”
রূপালী মাথা নাড়লো, “হ্যাঁ থাক৷ সেই ভালো৷”
একদিন হঠাৎ
© রোডায়া
লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): গল্প ;
প্রকাশ করা হয়েছে: গল্প বিভাগে ।
হৃদছায়া বলেছেন:
এটা কি সত্যি ঘটনা ? তাহলে আমার মন খারাপ হয়ে গেল কিছুটা। যাইহোক, ভাই আপনার তাকানোর স্টাইল টা যদি একটু নকল করতে পারতাম.......মানে....ইয়ে......কাজে লাগতো আরকি.....
লেখক বলেছেন: আমার তাকানোর স্টাইল? হা হা হা হা হা....
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ দূরন্ত...
আপনার প্রোফাইল ছবিটা দারুন!
দূরন্ত বলেছেন:
খুশি হলাম। আপনার এ লেখাটা কিন্তু আমি এক নিশ্বাসে পড়েছি।
লেখক বলেছেন: থ্যাংকু থ্যাংকু, আমিও খুব খুশি হলাম৷
লেখক বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ প্রিয়তি আপনার সুন্দর মন্তব্যের জন্য৷
লেখক বলেছেন: হা হা হা রাশেদ, এতদিনে বুঝলা?
থ্যাংকু৷
হৃদছায়া বলেছেন:
আরে মিয়া হাসেন কেন? ফাজলামি করিনাই, সত্যি সত্যি কন তো কেমনে তাকান? ভালো টেকনিক জানা থাকলে শেয়ার করা লাগে।
লেখক বলেছেন: আচ্ছা ভাইবা দেখি কেমনে শেয়ার করন যায়৷
অ্যামাটার বলেছেন:
হুমমম........
লেখক বলেছেন: হাম৷
নিলা বলেছেন:
মন খারাপ করিয়ে দেয়া ভালো লাগা। রূপালীর কাহিনী বলতে গিয়ে অন্য দেবী আসলো কি করে?!!!!!!!!!!!!????
লেখক বলেছেন: হুম, অন্য দেবীও যে আছে, না থাকলেতো আসতো না৷
নিলা বলেছেন:
লেখক বলেছেন: “আমার তাকানোই ঐরকম৷ যেকোন মেয়ে দেখলে ভাবে যে আমি তার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি৷”আমারও খুব জানতে ইচ্ছে করছে আসলেই কি আপনি সব মেয়ের দিকে ওমন করে তাকান!!!!?
হাহাহাহাহা রূপালী আপুর মত আমারও খুব হাসি পাচ্ছে
লেখক বলেছেন: হা হা হা,,,, পাগল! ঐ ডায়ালগটা নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা, এইটা বুঝলেন না?
নিলা বলেছেন:
নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা নাকি সত্যি কথাটাই বেরিয়ে আসলো?! বলা তো যায় না, ছেলেরা কিন্তু অনেক পাজি হয়। ঐ যে রূপালীর মাঝে অন্য দেবী চলে আসে যেভাবে ঠিক সেই রকম অন্য মেয়েদের চোখে তাকিয়ে প্রেমের ভেলায় ভাসা ছেলেদের জন্য কঠিন কিছু না।
লেখক বলেছেন: জ্বিনা, ভুল বুঝেছেন, সত্যি কথাটা বেরিয়ে আসেনি৷ ওটা আসলেই নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা৷
আর আমার মনে হচ্ছে রূপালীর ব্যাপারটাও আপনি ভুল বুঝছেন৷ রূপালী হচ্ছে এমন একজন যার সাথে ভালোবাসা হতে পারত, কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত হয়নি৷ আর দ্বিতীয় দেবী হচ্ছে এমন একজন যাকে ভালোবাসা হয়েছিলো৷ কাজেই রূপালীর মাঝে অন্য দেবী চলে আসার ব্যাপারটা ঠিক যেরকম বলতে চাচ্ছেন সেরকম না৷
নিলা বলেছেন:
রাগ করলেন?!!!!!!!
লেখক বলেছেন: না রাগ করিনি, আসলে আমি অনলাইনে ছিলাম না৷ আবার আসেন, আপনার সাথে ঝগড়াটা শেষ করি৷
লেখক বলেছেন: অবশ্যই না৷ এই সেজান চোরটা কে? কি আশ্চর্য্য ব্যাপার!!!
মুন্না আপনাকে অনেক ধন্যবাদ এই লিন্কটার খবর দেবার জন্য৷
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ৷ যদিও লেখা চুরির বিষয়টা নিয়ে মেজাজটা প্রচন্ড খারাপ হয়ে আছে৷
লেখক বলেছেন: আচ্ছা যুক্তি দিতে থাকেন, দেখি ভাঙতে পারি কিনা৷
নিলা বলেছেন:
লেখক বলেছেন: আর দ্বিতীয় দেবী হচ্ছে এমন একজন যাকে ভালোবাসা হয়েছিলো। তারমানে কি দাড়ালো?! রূপালী ছিলো ভালো লাগার মানুষ। আর দ্বিতীয় দেবী ভালোবাসার মানুষ! তারপর?
লেখক বলেছেন: তারপর? হ্যাঁ তাইতো, তারপর কি? আরো কোন ভালোলাগার ভালোবাসার মানুষ আছে কিনা সেইটা জানতে চাচ্ছেন?
রূপালীও হয়তো ভালোবাসার মানুষই ছিলো, কে জানে! অনেকদিন তো তার সাথে দেখা ছিলো না, মাঝখানে দ্বিতীয় দেবীর আবির্ভাব৷
জীবনটা বড় বিচিত্র, কি বলেন?
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ৷
ঊশৃংখল ঝড়কন্যা বলেছেন:
কি সুন্দর লিখেছেন ! খুব ভাল লাগলো !!!
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ, খুব ভালো লাগলো আপনার মন্তব্য৷
কালপুরুষ বলেছেন:
এই সুযোগে পড়ে নেয়া গেল। নইলে হয়তো জানতাম না এটা আপনার পোষ্ট। ভাল লাগলো।
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ কালপুরুষ৷
রন্টি চৌধুরী বলেছেন:
এইখানাকে পরকীয়া কিভাবে বলা চলে জনাব। একেতো ইহারা অতি ভাল। তারমাঝে আবার ইহারা পুর্ব হইতে পরিচিত বা প্রেমিত..। নিখাদ পরকীয়া হইতেছে বিবাহের পর কোন যৌক্তিক কারন ছাড়াই অন্য নর বা নারীতে ভুলিয়া মত্ত হইয়া যাওয়া।
লেখক বলেছেন: সেই জন্যতো কইলাম হালকা পরকীয়া, হা হা হা!


















