শিলাইদহ কুঠিবাড়িটায় পৌছতে পৌছতে বেলা বারোটা বেজে গেলো৷
বৈশাখের গরম উদাসী দুপুর৷ প্রখর রোদ্দুরে পুড়ে যাচ্ছে চারদিক৷ অনেক দিন পর শহুরে রাস্তা ছেড়ে একটা গ্রাম্য পথ ধরে আসলাম৷ আসতে আসতে চারদিক দেখতে দেখতে মনটা বড় উদাস লাগছিলো৷ মনে পড়ছিলো ছেলেবেলার স্মৃতি৷
তখন কোন ক্লাসে পড়তাম? নাহ, একটা ক্লাস না৷ ক্লাস ফাইভের শেষের দিকে থেকে ক্লাস এইটের শেষের দিক পর্যন্ত্য আমি কুমারখালীতে ছিলাম৷ আমার বাবা তখন কুমারখালীর ইউএনও ছিলেন৷ তার মানে ছেলেবেলার একটা গুরুত্বপূর্ণ সময় আমি এখানে কাঁটিয়ে দিয়েছি৷ গ্রীষ্মের উদাস দুপুরে গ্রাম্য রাস্তা ধরে আসতে আসতে সেইসব দিনগুলোর কথা মনে পড়ছিলো৷ উদাস থেকে মনটা আরো উদাস হয়ে যাচ্ছিলো৷
শিলাইদহ পৌছে বোকা বনে গেলাম৷ একি অবস্থা? এই কি রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ি? এতো মনে হচ্ছে গরুর হাঁট! চারদিকে পিকনিক পার্টির ভীর৷ পিকনিক পার্টির মাইকগুলোতে বাংলা সিনেমার যত কুৎসিত গানগুলো বাজছে৷ কুঠিবাড়ির সামনের বাগানটা জুড়ে বড় বড় হাড়িতে রান্না হচ্ছে৷ চারদিক নোংরা, হৈ চৈ, ক্যাও ভ্যাও! দেখে শুনে মেজাজটা খুব খারাপ হয়ে গেলো৷ নাহ, এই জাতির আসলে কিছু সমস্যা আছে৷
মনে পড়ে ছেলেবেলায় যখন কুঠিবাড়িতে আসতাম তখন সব কিছু কেমন সুন্দর ছিলো৷ কোন হৈ চৈ থাকতো না৷ চারদিক থাকতো শান্ত, নীরব৷ রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ি ছিলো রবীন্দ্রনাথের রচনার মতই শান্ত, মর্যাদাবান, ভাবগাম্ভীর্য্য পূর্ণ৷ এখানে আসলে মনটা ভালো হয়ে যেত৷ সুদূর কোন অতীতে চলে যেত মনটা৷ আর এখন? মনে হচ্ছে আমি কোন মাছের বাজারে এসে পড়েছি৷
সরকারী ছুটির দিন উপলক্ষে কুঠিবাড়ি বন্ধ৷ কিন্তু কাছে গিয়ে দেখলাম দারোয়ানেরা ব্যবসা খুলে বসেছে৷ পাঁচ দশ মানে যার কাছে থেকে যেমন পারে দর্শনী নিয়ে কুঠিবাড়ির ভীতরে ঢুকিয়ে দিচ্ছে৷ বাহ, ভালো ব্যবসা৷
ছোটবেলায় আব্বার সাথে যখন এখানে আসতাম তখন আব্বা কুঠিবাড়ির বাগানের মধ্যে একটা জায়গা দেখিয়ে বলতেন, “এই হচ্ছে সেই দুই বিঘা জমি৷ এটাকে নিয়েই রবীন্দ্রনাথ 'দুই বিঘা জমি' কবিতাটা লিখেছিলেন৷” বলে আব্বা বিড়বিড় শুরু করতেন, “শুধু বিঘে দুই ছিলো মোর ভুঁই, আর সবি গেছে ঋনে...”৷ জায়গাটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করলাম৷ ঠিক কোন জায়গাটা মনে করতে পারলাম না৷ মেজাজটা আরো খারাপ হয়ে গেলো৷ এই হাঁটবাজারের মধ্যে ভালো লাগছিলো না৷ কুঠিবাড়ি থেকে বের হয়ে একটা রিক্সা নিয়ে পদ্মার পাড়ের দিকে রওনা হলাম৷
আহ, তাও ভালো, পদ্মার পাড়ে বেশি মানুষজন নাই৷ আমার আজকে ভীরের মধ্যে থাকার মুড নাই৷ ভীর থাকলে মেজাজটা আবার খারাপ হয়ে যেত৷ এক যুবককে দেখলাম ক্যানভাস সাজিয়ে ছবি আঁকছে৷ আমি তার থেকে একটু দূরত্ব রেখে নদীর পাড়ে বসে পড়লাম৷
একবার কুঠিবাড়ির এক দারোয়ান আমাকে রবীন্দ্রনাথের ব্যবহৃত টর্চ দেখিয়ে বলেছিলো, সেই আমলে এই টর্চের আলো এত শক্তিশালী ছিলো যে নদীর এপাড় থেকে মারলে অন্য পাড়ে কারো চোখে পড়লে সে অন্ধ হয়ে যেত! মানুষ অসম্ভব জিনিস বিশ্বাস করতে পছন্দ করে৷ মনে পড়ে আমি সাথে সাথে তার বিশ্বাস করে নিয়েছিলাম৷ যদিও নিজেও জানতাম পাঁচ ব্যাটারীর একটা টর্চের এত শক্তি হতে পারে না, তবুও আমার মুখে এই গল্প শুনে কেউ যদি প্রতিবাদ করতো তো বলতাম, “তুই কচু জানিস!” হা হা হা৷ মনে পড়তেই একা একা হেসে ফেললাম৷
হঠাৎ দেখি সেই শিল্পি ছবি আঁকা বাদ দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে৷ আমাকে তাকাতে দেখে সে পায়ে পায়ে কাছে এসে বলল, “আপনি, তুই রডি না?”
হায় হায়, তুই করে বলছে! এ কোন ব্যক্তি? চেনার কোন চেষ্টা করলাম না৷ অনেক আগেই আমি বুঝে আমি মানুষের মুখ মনে রাখতে পারি না৷ তাই আজকাল কাউকে চিনতে না পারলে কষ্ট করে চেনার চেষ্টা করি না৷ উদাস মুখে বললাম, “হ্যাঁ, আমিই সেই ব্যক্তি৷”
সে উল্লসিত হয়ে বলল, “আমাকে চিনতে পারছিস? কুমারখালী মথুরানাথ স্কুলে ক্লাস ফাইভে একসাথে পড়তাম! আমার নাম শিমুল, চিনেছিস?”
হোলি শিট! সেই ক্লাস ফাইভে কার সাথে পড়েছে তার নাম সহ চেহারা মনে রেখেছে? আহা, একেই বলে ব্রেন! আফসোস, আমার এইরকম ব্রেন নেই৷ কেমন করে বলি আমার গোটা স্কুল জীবনের একজন সহপাঠির নামও আমার মনে নেই? কত দীর্ঘ রজনী আমি আমার কোন এক স্কুলের অন্তত একজন সহপাঠীর নাম মনে করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছি?
শ্বাস ফেলে বললাম, “সেটা তো হতে পারে না! ক্লাস ফাইভেতো দূরের কথা, গোটা স্কুল জীবনে আমার সাথে এরকম ছ'ফুট মত লম্বা, মুখে আধ হাত দাঁড়িঅলা কেউ পড়েছে বলে মনে পড়ে না৷”
“হা হা হা৷” শিমুল আমার সামন বালিতে বসে বলল৷ “ভালো মজা করে কথা বলিসতো তুই! সত্যি আমাকে চিনতে পারিসনি? সেই সময় আমি তোর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলাম৷ মনে পড়ে স্কুলে টিফিনের সময় আমি তোকে বাদাম খাওয়াতাম, আর তুই আমাকে তোর আনা টিফিন খাওয়াতি? তুই যখন স্কুলে ভর্তি হলি, তখন আমি ছিলাম ক্লাসের ফার্স্ট বয়৷”
এবার আমি চিনতে পারলাম৷ অবশ্যই নাম মনে পড়লো না, তবে ঘটনাগুলো মনে পড়লো৷ ফাইভে আমি মথুরানাথ স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম ফাইনাল পরীক্ষার অল্প কয়েকমাস আগে, আমার আব্বা সেই সময় বদলী হয়ে কুমারখালীতে এসেছিলেন৷ তো সেই সময় একজনের সাথে বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিলো৷ মনে পড়ে তার পকেটে সবসময় টাকা থাকতো, সে প্রায়ই আমাকে এটা সেটা কিনে খাওয়াতো৷ আর আমার পকেটে কখনই কোন টাকা থাকতো না, আমি বড়জোর তাকে বাসা থেকে আনা টিফিন খাওয়াতাম৷ কিন্তু ফাইনাল পরীক্ষা হওয়ার আগেই সে স্কুল ছেড়ে চলে যায়৷ ফাইনাল পরীক্ষায় আমি হয়ে গেলাম ফার্স্ট৷ স্যারেরা বললেন, “শিমুল থাকলে তুমি ফার্স্ট হতে পারতে না৷” সেকথা মনে পড়তেই মেজাজটা বিগড়ে গেলো৷ ব্যাটা গেলো তো গেলো, গিয়েও আমাকে শান্তি দিলো না৷ আমি অবশ্য ক্লাসে ফার্স্ট সেকেন্ড নিয়ে কখনো মাথা ঘামাই নাই৷ ব্যাপারটা কখনোই আমার মাথায় থাকতো না৷ আমার ম্যাচুরিটি আসছে অনেক পড়ে৷ সেই বয়সে আমি ফার্স্ট সেকেন্ড ব্যাপারটাই ভালো করে বুঝতাম না৷ কিন্তু তারপরওতো ব্যাটার জন্যতো আমাকে কথা শুনতে হয়েছিলো? সেই হারামজাদা আবার? এই প্রায় বিশ বছর পর?
আমি উঠে দাঁড়ালাম৷ শিমুলও একটু অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো৷ তখন আমি তাকে জড়িয়ে ধরে বললাম, “স্যরি আমি তোর নাম মনে করতে পারছি না৷ তবে তোকে চিনতে পারছি৷ তোর সাথে কাঁটানো সময়গুলো মনে পড়ছে৷”
“আরে আরে তাতেই হবে৷” শিমুল হাসতে হাসতে বলল৷ “কেমন আছিস বল?”
আমি শিমুলকে ছেড়ে দিয়ে বললাম, “ভালো আছি৷ হেঁটে যাচ্ছি পৃথিবীর পথে পথে৷ তুই কেমন আছিস?”
“এইতো কেঁটে যাচ্ছে৷ কত দিন পর দেখা হলো বল? প্রায় কুড়ি বছরতো হবেই, কি বলিস?”
“হ্যাঁ তাতো হবেই৷ জীবন চলে গিয়েছে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার, তবু সামনে এখনো বিস্তর পারাবার! নাইকো সময় একটুকু দাঁড়াবার...”
“আরে বাহ, তুই কি কবিতা লিখিসি নাকি?
“নাহ৷” আমি হেসে বললাম৷ “প্রথমটা লাইনটা জীবনানন্দের৷ পরেরটুকু আমি বানালাম৷ তুই কি ছবি আঁকিস?”
“হ্যাঁ৷” শিমুল হেসে বলল৷
“প্রফেশনাল? না শুধু শখ?”
“দু'টোই বলতে পারিস৷”
“বাহ বাহ৷” আমি মাথা নেড়ে বললাম৷ “চিত্র শিল্পিদের আমার বড়ই হিংসা হয়৷”
শিমুল অবাক হয়ে বলল, “হিংসা হয় কেন?”
“হিংসা হয় এই কারনে যে ছবির মাধ্যমে তারা খুব সহজেই মানুষের কাছে পৌছে যেতে পারে৷ একটা ছবি একসাথে সবাই দেখতে পারে৷ অন্যদিকে সাহিত্যের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌছানো বড়ই কঠিন৷ মানুষকে সাহিত্যটার পিছনে একটা লম্বা সময় দিতে হয়৷ তারপর সবাই মিলে একসাথে একটা বই পড়া যায় না৷ অথচ ছবি কত সহজে মানুষের কাছে পৌছাতে পারে৷ এসব কারনে হিংসা হয়৷ আর উলঙ্গ নারী মডেলের ব্যাপারটাতো আছেই৷ হা হা হা৷”
শিমুল হাসতে হাসতে বলল, “নারী মডেলের ব্যাপারটা কমন, হা হা হা৷ কিন্তু মনে হচ্ছে তুই সাহিত্যচর্চা করিস?”
আমি হেসে বললাম, “কিছুটা৷”
“ওয়াও, দারুন দারুন!”
“অবশ্য আমার মনে হয় চিত্র শিল্পিরা আসলে ব্যর্থ!”
“বলিস কিরে? চিত্র শিল্পিরা ব্যর্থ? ব্যাখ্যা কর৷”
“দাঁড়া ক্ষেপিস না, বলছি৷ আমার ধারনা, একটা ছবি যতই ভালো হোক না কেন, তা মানুষের মনে প্রভাব ফেলে খুব কম সময়ের জন্য৷ মানুষ ছবিটা দেখে, মুগ্ধ হয়৷ আবার একটু পরেই তা ভুলে যায়৷ অন্যদিকে একটা ভালো সাহিত্য মানুষের মনে প্রভাব ফেলে দীর্ঘ সময়ের জন্য৷ বছরের পর বছর মানুষ সেটার কথা মনে রাখে৷ অবশ্য এটা সম্পূর্নই আমার নিজের অনুভূতি থেকে আমি বললাম৷ আমি একটা ছবি দেখে যতই মুগ্ধ হই না কেন, সেটা কিন্তু আমার মনে দীর্ঘ সময়ের জন্য দাগ কাঁটেনা৷ এই থেকেই বললাম৷”
“হুঁ হতে পারে, খুব খারাপ বলিসনি৷”
“কি ছবি আঁকছিলি তুই এখন?”
শিমুল পাড়ের উপরে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ দেখিয়ে বলল, “ওটার ছবি আঁকছিলাম৷”
আমি গাছটা দেখে হা হয়ে গেলাম৷ শালা, এই গাছটা আমি এতক্ষন দেখিনি? কি আজব! গাছটার দিকে একনজর তাকালেই মনে হয় আগুন লেগেছে৷ লাল আর লাল৷ এত সুন্দর কৃষ্ণচূড়া আমি খুব কম দেখেছি৷ অনুভব করলাম, এই গাছটার জন্যই আমাকে প্রতি বৈশাখে অন্তত একবার হলেও এখানে ফিরে ফিরে আসতে হবে৷ বিড়বিড় করে বললাম, “পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর কৃষ্ণচূড়া গাছ এটা৷”
“ঠিক বলেছিস৷ এত সুন্দর কৃষ্ণচূড়া আমি কোথাও দেখিনি৷ কি অদ্ভুৎ, না?”
“হুঁ, এরকম ভয়াবহ সৌন্দর্য্য দেখলে আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে করে!”
“হা হা হা, বেশ বলেছিস৷”
“দেখি তুই ছবি কেমন আঁকছিস?”
ছবিটা দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম৷ মুগ্ধ কন্ঠে বললাম, “আমি ছবির কোন বোদ্ধা না, খুব সাধারণ দর্শকের দৃষ্টিকোন থেকে বলছি, খুব ভালো এঁকেছিস তুই৷”
শিমুল হেসে বলল, “কিন্তু এটাতো তোর মনে কোন দাগ কাঁটবে না৷”
আমি হাসতে হাসতে বললাম, “এটা না কাটুক, আরেকটা কাটতে পারে৷ যদি তুই এঁকে দিস৷”
“অবশ্যই এঁকে দিব৷ কিসের ছবি আঁকতে হবে? তোর?”
“আরে নাহ, আমার না৷”
“তবে?”
“দাঁড়া বলছি৷”
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম৷ বৈশাখের আগুন লাগা দুপুরে আগুন লাগা সেই কৃষ্ণচূড়ার অসহ্য সৌন্দর্য্যের দিকে তাকিয়ে বললাম, “খুব সুন্দর, একটা খুব সুন্দর মেয়ের ছবি৷ দেবী আফ্রোদিতির মত সুন্দর, আবার তার মতই নিষ্ঠুর সেই মেয়ে৷ পৃথিবীর সমস্ত আনন্দ, আবার পৃথিবীর সব নিষ্ঠুরতা নিয়ে সে বসে থাকে৷ ভালোবাসা মাথা কুটে মরে তার পায়ে, সে ফিরে দেখেনা৷”
শিমুলের চোখের দিকে তাকিয়ে ঘোর লাগা বললাম, “পারবি না আমাকে তার ছবি এঁকে দিতে?”
শিমুলও ঠিক ঘোর লাগা গলায় উত্তর দিলো, “পারব৷ কি করবি তুই তার ছবি দিয়ে?”
আমি দু'হাত শূন্যে তুলে বললাম, “সাত ট্রাক চন্দন কাঠ লাগাব, সাত মন ঘি ঢালব, সাত মহলা আগুন জ্বলবে, সে আগুনে আমি ছবিটা পোড়াব৷ নিষ্ঠুর আমার প্রিয়তমার সৌন্দর্য্য বুকে নিয়ে সে আগুন সুন্দর থেকে আরো সুন্দর, আরো সুন্দর হয়ে উঠবে৷ আরো সুন্দর৷”
উৎসর্গঃ বাফড়া
গল্পের উৎস
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে মে, ২০০৮ বিকাল ৪:১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


