অন্য ভুবন
-----------
এক
একটা চিপা গলির ভিতরে দাঁড়িয়ে সকাল থেকে পিকেটিংয়ে ভীষণ ব্যস্ত জামাল৷ দেশের রাজনৈতিক বিরোধী দল ক্ষমতাসীন দলকে সরকারের গদি থেকে নামাতে সারা দেশে হরতালের ডাক দিয়েছে৷ জামাল বিরোধী দলের কট্টর সমর্থক (একটা রাজনৈতিক দলের কট্টর সমর্থক হবার মত যথেষ্ট নির্বোধ সে)৷ প্রায় ভোররাত থেকে সমমনাদের নিয়ে রাস্তায় নেমে এসেছে সে৷ প্রথম দিকে বড় রাস্তাতেই পিকেটিংয়ে ব্যস্ত ছিলো ওরা, কিন্তু বেলা বাড়ার সাথে সাথে সরকারী পুলিশের উৎপাত বেড়ে যাওয়ায় গলির মধ্যে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে৷ গলির মধ্যে থাকলেও তাদের তৎপরতা কিছুমাত্র কমেনি, সেখান থেকেই থেকে থেকে শ্লোগান দিচ্ছে তারা, আর একটু পর পর রাস্তা দিয়ে চলে যাওয়া রিকশা বা পুলিশের উদ্দেশ্যে ইট পাটকেল ছুড়ে মারছে৷
গলির মধ্যে মিছিল নিয়ে শ্লোগান দিতে দিতে দূর থেকে ভেসে আসা অন্য একটা মিছিলের শ্লোগান শুনতে পায় জামাল-
“ওরে জগাই দেইখা যা, লালু মিয়ার ক্ষমতা...”
“লুল জগাই এর চামড়া, তুলে নিবো আমরা...”
“হরতাল, হরতাল, সারা দেশে হরতাল...”
শ্লোগানগুলো শুনতে শুনতে নিজের ভিতরে অন্যরকম একটা উত্তেজনা টের পায় জামাল৷ অন্যদের পিছনে ফেলে গলির মাথায় এসে মিছিলের দিকে তাকায় সে৷ রমণী মিছিল৷ তবে রমণী মিছিল হলেও তেমন রমণীয় নয় মিছিলটা৷ বিশ পঁচিশ জন স্থূলকায় মহিলা হাতে তালি দিতে দিতে এগিয়ে আসছে৷ মিছিলের মাঝখানে মোটামত এক মহিলা বিকট শব্দে চেঁচাচ্ছে আর ঘুরে ঘুরে নাচছে৷ সে যখন দু'হাত ছুড়ে বলছে “ওরে জগাই দেইখা যা, লালু মিয়ার ক্ষমতা...”, তখন একটা দেখার মত বিষয় তৈরি হচ্ছে৷ এমন একটা বিচিত্র দৃশ্য যে দেখেনি সে জীবনের অনেক বড় একটা অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হয়েছে৷ জামালের রক্ত গরমই ছিলো, এরকম একটা মিছিল দেখে আরো গরম হয়ে উঠলো তা৷ নিজের উপর একটু ঘেন্নাও হলো তার৷ মহিলারা পর্যন্ত রাস্তায় মিছিল করতে পারছে আর সে কিনা পুলিশের ভয়ে গলির মধ্যে গিয়ে লুকিয়েছে! ছ্যা ছ্যা!
“কি নির্বোধ এই মহিলা গুলো! এদের লজ্জাও হয় না!!”
জামালের পাশ থেকে কে যেনো বিড়বিড় করে বলে উঠলো৷
মুহূর্তে আগুন ধরে গেলো জামালের রক্তে৷ শিরায় শিরায় যেনো আগুনের হলকা৷ ঘুরে বক্তার দিকে চেয়ে চোখ মুখ লাল করে বলল, “কি বললেন?”
জামালের চোখ দেখে ভয় পেয়ে বক্তা আমতা আমতা করলো, “না... কিছু না...”
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই জামাল ঘুষি চালালো৷ একটা ছবির মতো ভেঙে গুড়িয়ে পড়ে যেতে দেখলো তাকে জামাল, কিন্তু তারপর কি হলো দেখার জন্য সে আর অপেক্ষা করলো না৷ গলায় বাঘের শক্তি এনে হুংকার ছেড়ে বড় রাস্তায় ছাপিয়ে পড়লো৷ মুহূর্তে মহিলারা নিজেদের মিছিলে টেনে নিলো তাকে৷
জামাল মিছিলের মাঝখানের মোটা মহিলার পাশে নাচতে নাচতে শ্লোগান দিয়ে গলা ফাটিয়ে ফেললো৷ তার ধারণা ছিলো আশে পাশের দুই চারটা জানালার কাঁচ ভেঙে যাবার জন্য তার বজ্র কণ্ঠই যথেষ্ট৷ কিন্তু তা যখন হলো না তখন উৎসাহের আতিশয্যে সে রাস্তার তিনটা রিকশা ভাঙচুর করলো৷ একজন রিকশা আরোহীর হাত ভাঙলো, এক রিকশা চালকের মাথা ফাটালো, ভয়ে ভয়ে চলতে থাকা একটা মুড়ির টিন বাস ধাওয়া করলো (ওটা ভাঙা যায়নি কারণ ওটা আগেই টের পেয়ে ঘুরে পালাতে শুরু করেছিলো, তবে ওটার এক ভীতু আরোহী বাস থেকে নেমে দৌড়ে পালাতে গিয়ে পাশের ড্রেনের মধ্যে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে), রাস্তার পাশের একটা নতুন দালানের কাঁচ ইট মেরে উড়িয়ে দিলো৷ আরো কি কি করতো সে এবং তার মহিলাকুল তা বলা শক্ত, কিন্তু এর মধ্যে পুলিশ এসে নিষ্ঠুর ভাবে হামলা চালালো তাদের উপর৷
তখন দেখা গেলো এতক্ষণ যে মহিলাদের ভীষন সাহসী বলে মনে হচ্ছিলো, যারা শুধু চীৎকার দিয়েই সপ্ত আসমান কাঁপিয়ে দিতে পারে বলে প্রত্যয় জন্মেছিলো, তারা আসলে ভীষণই নাজুক৷ উপরন্তু রাস্তার উপর শুয়ে পড়ার আশ্চর্য দক্ষতা আছে তাদের৷ পুলিশের দল লাঠি হাতে তাদের দিকে তেড়ে আসতেই এই মহিলারা আশ্চর্য দক্ষতায় পুলিশের গায়ে জড়িয়ে রাস্তায় গড়িয়ে গেলো৷ তাদের দেখে মনে হলো রাস্তাতেই তাদের ঘরবাড়ি, রাস্তাতে গড়াগড়ি দিতেই তারা অভ্যস্ত! কিন্তু বিপুল বেগে দৌড়ে আসা পুলিশ মহিলাদের এই নাজুক পরিস্থিতি দেখেও ক্ষান্ত হতে পারলো না৷ তারা শায়িত মহিলা কুলের উপর তাদের লাঠি চালিয়ে দিলো৷
পুলিশকে দৌড়ে আসতে দেখে জামাল একবার ভেবেছিলো দৌড়ে পালাবে, কিন্তু মহিলাকুলের উপর লাঠির আক্রমন তার সহ্য হলো না৷ সে হুংকার দিয়ে এক পুলিশের লাঠি কেড়ে নিতে গেলো, ঠিক তখনই প্রবল বেগে কয়েকটা লাঠি এসে পড়লো তার উপর৷ সে চোখে অন্ধকার দেখে শুয়ে পড়লো৷
দুই
সন্ধ্যার পর খোরাতে খোরাতে কোঁকাতে কোঁকাতে ঘরে ফিরলো জামাল৷ সারা শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা, জায়গায় জায়গায় ফুলে উঠেছে লাঠির বাড়িতে৷ জামা কাপড় ছেড়া, শরীরের এখানে ওখানে আঘাতের চিহ্ন৷ কিন্তু এসব কিছু ছাপিয়ে মেজাজটা খুব খারাপ লাগছে তার৷ ক্ষোভে, অক্ষমতায় সব ভাঙচূর করতে ইচ্ছে করছে৷ সেই মিছিলের উপর লাঠিচার্জের পর পুলিশ কয়েক মহিলাকে ধরে নিয়ে গেছে, কিন্তু তার দিকে ফিরেও তাকায়নি৷ সে রাস্তায় শুয়ে থেকে পুলিশের উদ্দেশ্যে প্রচুর গালি চালিয়েছে, বিনিময়ে আরো কিছু লাঠির বাড়ি জুটেছে তার, কিন্তু পুলিশের গাড়িতে ওঠার সৌভাগ্য হয়নি৷ পুলিশগুলো তাকে ধরে নিয়ে গেলে তার রাজনৈতিক দলের কাছে গুরুত্ব বেড়ে যেতো জামালের, বলা যায় না, এভাবেই হয়তো সে একদিন তার দলের প্রধান লালু মিয়ার কাছে পৌঁছাতে পারতো৷ জামাল দেখাতে পারতো সে লালু মিয়ার কত নিবেদিত প্রাণ কর্মী, লালু মিয়ার জন্য সে কেমন অবলীলায় নিজের প্রাণ বিসর্জন দিতে পারে! কিন্তু সে সৌভাগ্য তার হলো না৷ হারামজাদা পুলিশের দল তাকে ছুঁয়েও দেখলো না৷
আজকের হরতালের তেমন কোনো ফলাফলও তো পাওয়া গেলো না৷ দিনের শেষে লালু মিয়া হরতাল সফল করার জন্য জনগনকে অভিনন্দন জানিয়েছেন৷ কিন্তু জামাল মানতে পারে না৷ একেই কি হরতালের সফলতা বলে? জগাই মণ্ডলের সরকারের গদিতে কি একটা ফুলের টোকাও পড়েছে? পড়েনি৷ বরং সন্ধ্যার খবরে জগাই মণ্ডলের হাস্যোজ্জ্বল মুখে হরতাল প্রত্যাখান করার জন্য জনগনকে অভিনন্দন জানানোর দৃশ্যটা যতবার মনে পড়ছে ততবার জামালের মুখটা তিক্ততায় ভরে যাচ্ছে৷ মেজাজ খারাপ করে বার বার দলা করে থু থু ফেলছে সে৷
ঘরে ফিরে বিছানায় শুয়ে শরীরের ব্যথায় কাতড়ায় জামাল৷ ঘরের একপাশে তার ছোট ভাই রানা কম্পিউটার নিয়ে বসে আছে, জামালের দিকে তার কোনো নজরই নেই৷ সেদিকে তাকিয়ে রাগে দাঁত কিড়মিড় করে সে৷ এই এক অদ্ভূত নতুন প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে, রাজনীতির দিকে এদের কোনোই নজর নেই! দেশ কোনদিকে যাচ্ছে না যাচ্ছে তা নিয়ে এদের কোনো মাথা ব্যথা নেই, সারাক্ষণ আছে শুধু কম্পিউটার নিয়ে, নিজেদের নিয়ে৷ এই সব ছেলেপেলের হাতে এ দেশের ভবিষ্যত কি জামাল ভেবে পায় না৷
পরবর্তী দুইদিন শরীরের ব্যথায় জামাল ঘর ছেড়ে বের হতে পারলো না৷ সে তার মহান রাজনীতি নিয়ে এতো চিহ্নিত থাকে যে রানা কি করে না করে সে ভালো করে জানে না৷ কিন্তু দুইদিন ধরে বিছানায় শুয়ে ক্রমাগত রানাকে কম্পিউটার নিয়ে গুঁতোগুঁতি করতে দেখতে দেখতে তিতিবিরক্ত হয়ে ওঠে সে৷ অবশেষে আর থাকতে না পেরে একদিন রাতে ধকম দিয়ে জিজ্ঞেস করে, “এই তুই কি করিস?”
“গেম খেলি৷” রানা মুখ না ফিরিয়ে উত্তর দেয়৷
“কাজ কাম নাই সারাক্ষণ গেম খেলিস মানেটা কি?”
রানা মুখ ফিরিয়ে চেয়ে বিরক্ত মুখে বলে, “সারাক্ষণ গেম খেলব কেনো? কাজ করছিলাম, এখন ভালো লাগছে না তাই গেম খেলছি৷”
কম্পিউটার গেমের প্রতি জামালের আগ্রহ নেই৷ কম্পিউটার গেম কেমন হয় সেটাও সে ভালো করে জানে না৷ তবু এখন করার কিছু নেই বলেই সে জিজ্ঞেস করে, “কি গেম খেলিস?”
রানা এবার একটু উৎসাহ বোধ করে৷ যে গেমটা সে খেলছে সেটা তার এতো প্রিয় যে সেটা সম্পর্কে বলতে তার সব সময়ই ভালো লাগে৷ সে আগ্রহ নিয়ে বলে, “অন্য ভুবন৷”
“অন্য ভুবন মানে?!”
“মানে গেমটার নাম 'অন্য ভূবন', ইণ্টারনেটে খেলতে হয়৷ বেশ শক্তিশালী আর্টিফিশিয়াল ইণ্টেলিজেন্স আছে এটায়৷ গেমটার একটা নিজস্ব জগৎ আছে, সেই জগতে তুমি তোমার মতো করে নতুন নতুন চরিত্র সৃষ্টি করতে পারো, তাদেরকে তুমি তোমার মতো করে চালাতে পারো, তুমি রেস দিতে পারো, চুরি করতে পারো, ডাকাতি করতে পারো, মোদ্দা কথা যা তুমি করতে চাও তাই করা সম্ভব৷”
রানার কথা শুনে জামাল তেমন কিছু বুঝতে পারলো না, তবে সে বিছানায় শুয়ে শুয়ে রানার খেলা দেখতে থাকে৷ পরবর্তী কয়েকদিন ধরে রানা একটু একটু করে তাকে গেমটা বুঝায়৷ কম্পিউটার গেমের চরিত্রগুলোর কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা কেমন হয় সেটা সে ভালো করে জানে না, তবে তার কাছে মনে হয় অন্য ভুবনের কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা আসলেই চমৎকার৷ এই গেমের চরিত্রগুলো নিজে থেকে ভাবতে পারে, নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করতে পারে৷
আসলে এটা একটা ইন্টারনেট ভিত্তিক মাল্টিপ্লেয়ার গেম৷ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যে যখনই গেমটাতে লগ ইন করুক না কেনো সে আসলে একটাই জগৎ দেখতে পাবে৷ প্রত্যেক খেলোয়ার এক বা একাধিক চরিত্র সৃষ্টি করতে পারে, যাদেরকে দিয়ে সেই পরাবাস্তব জগতে ঠিক পৃথিবীর মতই কাজ কারবার করানো সম্ভব৷
তবে জামাল গেমটার প্রতি সত্যিকার আগ্রহী হয়ে ওঠে যখন সে দেখলো যে গেমটাতেও বাংলাদেশ নামে একটা দেশ আছে৷ সেখানেও ছুঁচো দল ও ইঁদুর দল নামে দু'টা রাজনৈতিক দল আছে৷ ছুঁচো দলের প্রধান জগাই মণ্ডল, আর ইঁদুর দলে প্রধান লালু মিয়া, ঠিক বাস্তবের বাংলাদেশের মতই৷ জগাই মণ্ডল ঐ পরাবাস্তব বাংলাদেশেও রাষ্ট্রপ্রতি৷ বস্তুত অন্য ভুবনের বাংলাদেশের সাথে বাস্তবের বাংলাদেশ এতটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ যে জামাল হতভম্ব হয়ে পড়ে৷
সে দেখে, সারা পৃথিবীর মানুষ তো বটেই, এমন কি লক্ষ লক্ষ বাঙালীও গেমটা খেলে৷ এবং গেমটা অতি বিখ্যাত৷ মাঝে মাঝেই এই গেমের ভিতরে ঘটে যাওয়া বড় বড় ঘটনা নিয়ে খবরের কাগজে লেখা লেখি হয়৷ এ যেনো এই বাস্তব পৃথিবীর পরাবাস্তব সংস্করণ!
জামাল প্রথমেই অন্য ভুবনে শুভ্র নামে একটা পুরুষ চরিত্রের সৃষ্টি করে৷ শুভ্রকে সে একটা পার্কে হাঁটতে নিয়ে যায়৷ কিছুক্ষণ পর শুভ্রর দেখা হয় নিশি নামের এক মেয়ের সাথে৷ জামাল বুঝতে পারে, ইন্টারনেটের অন্য প্রান্তে বসে কেউ একজন নিশি চরিত্রটি সৃষ্টি করেছে৷ জামাল এ প্রান্তে বসে শুভ্রর মাধ্যমে নিশির সাথে কথা বলে৷ শুভ্র আর নিশি পার্কে পাশাপাশি বসে কথা বলে (আসলে শুভ্রর হয়ে জামাল এবং নিশির হয়ে অন্য প্রান্তে বসে থাকা একজন কথা বলে), কথা বলতে বলতে দু'জনের মধ্যে বেশ রোমাণ্টিক ঘণিষ্ঠতা তৈরি হয়৷ শুভ্র (অথবা জামাল) এর ইচ্ছে হয় নিশির হাত ধরতে৷ জামাল বিস্মিত হয়ে দেখে, একজন প্রেমিক পুরুষের মতই শুভ্র আলতো করে নিশির হাত স্পর্ষ করে৷
এসব কিছু দেখে নিজের ভিতরে একটা উত্তেজনা টের পায় জামাল৷ পরবর্তী কয়েকদিন সে বসে বসে নতুন একটা পরিকল্পনা তৈরি করে৷ সে অনেক চিন্তা ভাবনা করে সম্পূর্ণ নতুন নতুন চরিত্র বানায়৷ এই নতুন চরিত্রটির নাম সে দেয় হাসনাইন৷
তিন
নিজেকে হাসানাইনের একজন দুঃখী মানুষ বলে মনে হয়৷ সে জানে না সে কোথা থেকে এসেছে, কোথায় তার গন্তব্য৷ তার পিতা-মাতা কে সে মনে করতে পারে না, শুধু মনে পড়ে সে বড় হয়েছে এতিম খানায়৷ এতিম খানায় সে নিশ্চয়ই একা ছিলো না, সাথে আরো অনেকে ছিলো৷ কিন্তু সে আর কারো কথা মনে করতে পারে না৷ তার অতীত জীবনের কোনো পরিচিত মানুষের কোনো স্মৃতিই তার মনে আসে না৷ এখনও তার পরিচিত মানুষের সংখ্যা এত কম যে মাঝে মাঝে সে নিজেই বিস্মিত হয়ে যায়৷ কি আশ্চর্য নিঃসঙ্গ তার জীবন!
পুরানো ঢাকার একটা পুরানো তিন তলা বাড়ির ছাদের উপর একটা ঘরে হাসানাইন থাকে৷ এখানে নিজের ধ্যান জ্ঞান নিয়ে একাকী কেটে যায় তার জীবন৷ তার ধ্যান জ্ঞান বলতে একটাই, দেশের রাষ্ট্রপতি জগাই মণ্ডলকে খুন করা৷ একমাত্র জগাই মণ্ডলকে খুন করার মাধ্যমেই লালু মিয়াকে দেশের রাষ্ট্রপতি বানানো সম্ভব৷
কেনো জগাই মণ্ডলকে খুন করবে হাসনাইন, কেনো লালু মিয়াকে সরকারের গদিতে বসাতে হবে, সে এসবের কিছুই বোঝে না৷ শুধু বোঝে, জগাই মণ্ডলকে খুন না করলে তার তৃপ্তি নেই৷ দীর্ঘদিন ধরে সে জগাই মণ্ডলকে খুন করার প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে৷ অবশেষে আজ সে দিন এসে উপস্থিত হয়েছে৷ আজ জগাই মণ্ডলকে খুন করবে সে৷ একই সাথে শেষ করবে নিজেকেও, কারণ সে জগাই মণ্ডলকে খুন করবে আত্মঘাতি বোমার মাধ্যমে৷
সকাল বেলা ঘর থেকে বের হয়ে ছাঁদে এসে দাঁড়ায় হাসনাইন৷ সুন্দর এক শান্ত সকাল, চমৎকার ফুরফুরে হাওয়া বয়ে যাচ্ছে৷ তার বাসার ঠিক সামনেই একটা ছোট্ট পার্ক৷ নাম না জানা সুন্দর সব ফুল ফুটে আছে পার্কে৷ ছোট ছোট শিশুরা খেলা করছে, দোলনায় দোল খাচ্ছে৷ পার্কের পাশে একটা পুকুর৷ এই এলাকার মানুষের কাছে বড় প্রিয় এই পুকুরটা, তারা পুকুরটার বেশ যত্ন করে৷ এই তিনতলার ছাদ থেকেও পুকুরের টলটলে পানি দেখা যাচ্ছে৷ আজকের সূর্যটাও আশ্চর্য রকম শান্ত, রোদের মধ্যে কোনো তেজ৷ পরিস্কার নীল আকাশে একগুচ্ছ সাদা মেঘ ভেসে যাচ্ছে৷ এসব কিছুই এই পৃথিবীতে অনন্তকাল ধরে আছে, অথচ হাসনাইন যেনো চোখ মেলে আগে কখনো দেখেনি! এসব কিছু সে যেন আগে কখনো অনুভব করেনি৷ এই সুন্দর সকালের অপার্থিব পরিবেশের হঠাৎ করেই আশ্চর্য একটা অনুভূতি হয় হাসনাইনের, যেমনটা তার আগে কখনো হয় নি৷ মনটা তার কেমন উদাস হয়ে ওঠে৷ কি সুন্দর এই বেঁচে থাকা, অথচ আজ তার জীবনের শেষ দিন! এই সব কিছু ছেড়েই আজ তাকে চলে যেতে অন্য এক অজানার উদ্দেশ্যে৷
আজ বিকেলে ছুঁচো দলের জনসভা আছে৷ সেই জনসভাতেই জগাই মণ্ডল সহ নিজেকে উড়িয়ে দিবে হাসনাইন৷ সব পরিকল্পনা প্রস্তুত৷ অথচ আজ তার জীবনের শেষ দিন ভাবতে কেনো তার এত কষ্ট হচ্ছে? এতদিন তো এমন কোনো অনুভূতি তার হয় নি? আজ কেনো পৃথিবী ছেড়ে যেতে হবে বলে বেদনায় ভরে যাচ্ছে সে?
আকাশের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে মুখ নামিয়ে বা দিকে তাকায় হাসনাইন৷ তাকিয়েই পাশের ফ্ল্যাটে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটিকে দেখতে পায়৷ মুহূর্তে হাসনাইনের বুকের মধ্যে একটা ঢেউ ভেঙে পড়ে৷ কোথায় যেনো একটা চিনচিনে ব্যথা বোধ হতে থাকে বুকের মাঝে৷ কি সুন্দর এই মেয়ে! কি সুন্দর এই পৃথিবী! এ সব কিছুই ছেড়ে চলে যাবে সে? কোথায় যাবে? কেউ কি জানে সে গন্তব্য? আর কখনো দেখা হবে না এই সৌন্দর্য?
হাসনাইনের বুকের মধ্যে একটা হাহাকার বেজে ওঠে৷ মুহূর্তে সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে৷
“না....” মুখ শক্ত করে বিড়বিড় করে উচ্চারণ করে হাসনাইন, “কেনো আমি এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাব? কেনো আমি লালু মিয়ার জন্য জগাই মণ্ডলকে মারতে যাবো? কেনো এই সব রাজনীতিবিদকের জন্য আমি নিজের জীবন দিবো? জাহান্নামে যাক এরা, এদের জন্য আমি জীবন দিতে যাব না!”
চার
কম্পিউটারের সামনে বসে এতক্ষণ হাসনাইনের পরিবর্তন লক্ষ্য করছিলো জামাল৷ দেখতে দেখতে সে বিস্মিত হয়ে পড়ছিলো৷ কি হলো হাসনাইনের? যখন হাসনাইন বলল- “এদের জন্য আমি জীবন দিতে যাব না”, তখন জামাল হতভম্ব হয়ে পড়লো৷ তার সৃষ্ট চরিত্র, তার নিজের সৃষ্ট চরিত্র তার আদেশ উপেক্ষা করছে৷ তিলতিল করে সে তৈরি করেছে হাসনাইনকে৷ দিনের পর দিন বসে বসে অন্য ভুবনের একটা সামান্য চরিত্র হাসনাইনকে বিভিন্ন ধরণের অস্ত্র শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলেছে, তাকে উপযুক্ত করেছে জগাই মণ্ডলকে মারার জন্য৷ অন্য ভুবনের জগাই মণ্ডল মারা গেলেও একটা বিরাট হৈ চৈ হবে, তাতে করে পৃথিবী জানবে জগাই মণ্ডলের প্রতি জামালের ঘৃণা, আর লালু মিয়ার প্রতি আনুগত্য৷ আর আজ হারামজাদা হাসনাইন তাকে উপেক্ষা করছে? একটা কম্পিউটার জেনারেটেড চরিত্রের এত বড় সাহস?
“কি করছো?” মাইক্রোফোনটা মুখের কাছে নিয়ে চীৎকার করে জামাল, “তৈরি হও জগাইকে মারার জন্য৷”
ছাঁদের উপরে দাঁড়িয়ে হাসনাইন কেমন চমকে ওঠে৷ তার মনে হয়, তার মাথার মধ্যে কেউ একজন কথা বলছে৷ এমন কোনো অনুভূতি তার কখনো হয়নি৷ সে বেশ অবাক হয়, কিন্তু ব্যাপারটা মনের ভুল বলে নিজেকে সান্ত্বনা দেয়৷ কিন্তু একটু পরেই আবার সেই কণ্ঠস্বর চীৎকার করে একই কথা বলে তাকে৷ নিজের মনেই হাসনাইন বিড়বিড় করে বলে, “না...”
“না মানে?” জামাল আবার চীৎকার করে, “আমি তোর স্রষ্টা, তোকে আমার কথা অবশ্যই শুনতে হবে৷”
হাসনাইন প্রচণ্ড বিস্মিত বোধ করে৷ কে কথা বলছে? অসহায় দৃষ্টি মেলে সে চারপাশে চায়, কিন্তু তার সাথে কথা বলছে এমন কাউকে সে দেখে না৷ অথচ সে স্পষ্ট কথাগুলো শুনতে পাচ্ছে৷ ভ্য় আর বিস্ময়ের আশ্চর্য দোলায় দুলতে দুলতে সে বলে, “তুমি আমার স্রষ্টা?”
“অবশ্যই আমি তোর স্রষ্টা!”
'কি আশ্চর্য! আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি?' হাসনাইন নিজের মনেই বিড়বিড় করে৷ আবার বলে, “স্রষ্টা মানে কি? কে তুমি? কোথায় থাকো?”
“আমি জামাল, তোর স্রষ্টা৷ আমি একজন মানুষ৷”
হাসনাইন হেসে ফেলে৷ হাসতে হাসতে বলে, “মানুষ? আমিও তো মানুষ৷ মানুষ হয়ে নিজেকে তুমি কি করে আমার স্রষ্টা দাবি করো?”
“ওরে মূর্খ, তুই মানুষ নস!” জামাল ক্রোধে চীৎকার করে, “তুই কম্পিউটার জেনারেটেড গেমের একটা চরিত্র মাত্র৷ তোকে সৃষ্টি করেছি আমি৷ একটা গেমের চরিত্র হয়েই তুই নিজেকে মানুষ ভাবতে শুরু করেছিস? হা হা হা...”
হাসনাইন হাসে না৷ কম্পিউটার কি সে ভালো করেই জানে৷ সে হতভম্ব হয়ে বিড়বিড় করে, “আমি কম্পিউটার জেনারেটেড চরিত্র?”
“হ্যাঁ...”
“বাস্তবে আমার কোনো অস্তিত্ব নেই?”
“না...”
“এই যে আমি যা দেখছি, যা শুনছি, অনুভব করছি, এসবই মিথ্যে? এসব কিছুই সত্যি না? এসব কিছুই আমার মস্তিষ্কের মধ্যে ঢোকানো কিছু ধারণা মাত্র?”
“হ্যাঁ...”
“তার মানে... তার মানে... এই যে জীবন, এর পরে কিছু নেই? এখানেই সব শেষ?”
“হ্যাঁ...”
“প্রমাণ দাও...”
জামাল রাগে গন গন করে৷ কি করে সে ব্যাপারটা প্রমাণ করবে সে বুঝতে পারে না৷ হাসনাইন অপেক্ষা করে, অপেক্ষা করে... অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পরও কিছু হচ্ছে না দেখে সে ধারণা করে তার মস্তিষ্ক উত্তপ্ত হয়েছে, আর এসব কিছুই সেই উত্তাপের ফল৷ তখন সে বাসা থেকে বের হয়ে পড়ে৷ কিন্তু রাস্তায় নামতেই আবার শুনতে পায় জামালের চীৎকার, “তোকে অবশ্যই আমার কথা শুনতে হবে!”
হাসনাইন এবার আর আগের মত চমকে ওঠে না৷ পুরো ব্যাপারটাই সাময়িক মস্তিষ্কের বিকৃতি ধরে নিয়ে সে হেসে বলে, “কেনো?”
“আমি তোর স্রষ্টা, আমি তোকে সৃষ্টি করেছি, তুই অবশ্যই আমার কথা শুনবি৷”
“তুমি আমার স্রষ্টা হও আর যেই হও, আমাকে নিয়ে খেলা করার অধিকার কেউ দেয় নি তোমাকে!”
জামাল অসহায় বোধ করে৷ সে বুঝতে পারে, এই গেমের চরিত্রগুলোর নিজস্ব চিন্তাভাবনা আছে, এরা নিজের মতো করে ভাবতে পারে৷ আর হাসনাইনের উপর থেকে তার নিয়ন্ত্রণ নষ্ট হয়ে গেছে৷ এতদিন হাসনাইন তাকে বিশ্বাস করে মান্য করে এসেছে, কিন্তু এখন আর বিশ্বাস করছে না৷ চেয়ার থেকে উঠে পরে ক্রোধে দাঁত কামড়ায় জামাল৷ দাঁত কামড়াতে কামড়াতে হঠাৎ দেখে, হাসনাইনের একটু পিছনে একটা কুকুর হেঁটে যাচ্ছে৷ তখন তার মনে পড়ে, সে চাইলে এই কুকুরটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে৷ অবশ্য সে জন্য কিছু জটিল নিয়ম কানুন আছে, কিন্তু সে নিশ্চয়ই পারবে৷ আবার কম্পিউটারের সামনে বসে একটু চেষ্টা করতেই সে কুকুরটার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়৷ তখন সে কুকুরটাকে হাসনাইনের উপর চালিয়ে দেয়৷
হাসনাইন রাস্তা ধরে হাঁটছিলো, আর নিজের মস্তিষ্ক বিকৃতির কথা মনে করে নিজের মনেই হাসছিলো৷ হঠাৎ পিছনে একটা হিংস্র গর্জন শুনে সে চমকে উঠে ঘুরে তাকায়৷ কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে, সে সরে যাবার আগেই হিংস্র একটা কুকুর তার উপর ঝাপিয়ে পড়ে৷ হাসনাইন তাল সামলাতে না পরে রাস্তায় পড়ে যায়, আর তখনি একটা ট্রাক ব্রেক কষতে না পেরে তার উপর দিয়ে চলে যায়৷
কম্পিউটারের সামনে বসে হা হা করে হাসতে থাকে জামাল৷
পাঁচ
গায়ে একটা শার্ট চাপিয়ে বাসা থেকে বের হয় জামাল৷ মনটা তার এখন একটু শান্ত৷ হাসনাইনকে দিয়ে সে জগাই মণ্ডলকে মারতে পারেনি, তো কি হয়েছে, আবার আরেকটা চরিত্র তৈরি করবে সে৷ আগের করা ভুলগুলো এবার আর সে নিশ্চয়ই করবে না৷ জগাই মণ্ডলকে সে মারবেই৷ পরাবাস্তব জগাইকে মারলেও বাস্তবের লালু মিয়ার প্রতি অনেক আনুগত্য দেখানো হবে, আর জগাই মণ্ডলের সমর্থকদের মুখে লাথি মারা হবে৷
ফুরফুরে মন নিয়ে রাস্তায় নামে জামাল৷ গুন গুন করে একটা গান গায় সে৷ হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ একটা হিংস্র গর্জন শুনে সে পিছন ফিরে তাকায়, ভালো করে কিছু বোঝার আগেই দেখে একটা হিংস্র কুকুর তার উপর ঝাপিয়ে পড়ছে৷ তাল সামলাতে না পেরে রাস্তায় পড়ে যায় জামাল, আর তখনি একটা ট্রাক ব্রেক কষতে না পেরে তার উপর দিয়ে চলে যায়৷
আড়ালে বসে অলক্ষ্যে হাসে কি কেউ?
(সমাপ্ত)
-------------
© মাহবুবুর শাহরিয়ার
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই অক্টোবর, ২০০৯ সকাল ১১:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



