বাসার মধ্যে হট্টগোল শুনেই বুঝলাম রীতা এসেছে৷
রীতা হচ্ছে আমার এক দূর সম্পর্কের চাচার মেয়ে৷ একটা বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে৷ স্বভাবে তরলমতি, চপলমতি এবং ইত্যাদি৷ শাহরুখ খান প্রিয় নায়ক, নাম শুনলেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলে এবং অজ্ঞান অবস্থায় “কি কিউট কি কিউট” বলে চীৎকার করতে থাকে৷ হাউ কাউ করতে সে বড়ই পছন্দ করে৷ মাঝে মধ্যেই আমাদের বাসায় আসে৷ আর বাসায় এলেই হৈ চৈ শুরু করে দেয়৷
আজও বাসায় ঢুকেই সে চাচি চাচি বলে গলা ফাটাতে শুরু করে দিয়েছে৷ আমি গলা বাড়িয়ে চেঁচিয়ে বললাম, “আম্মা বাসায় নাই৷ উপরতলায় বেড়াতে গেছে, উপরতলায় গিয়ে চেঁচা৷”
রীতা আমার ঘরে ঢুকে বলল, “চাচি বাসায় নাই?”
“না৷”
“তা না থাকলো, তুমি তো আছো, তাহলেই হবে৷”
আমি বিছানায় শুয়ে বই পড়ছিলাম৷ বিরক্ত হয়ে বললাম, “আমি খুব জটিল একটা কাজ করছি৷ তোর সাথে বকর বকর করার সময় আমার নাই৷ যা ভাগ৷”
রীতা আমার হাতের বইটা উল্টে ফেলে বললো, “কি জটিল কাজ করো দেখি৷ হুহ, পড়তেছো তো গল্পের বই, তা আবার ভাব দেখো না!”
আমি রাগ দেখিয়ে বললাম, “গল্পের বইয়ের তুই কি বুঝবি রে ছেমড়ি! শিবরামের 'বৈজ্ঞানিক ভ্যাবাচাকা' গল্পটা পড়েছিস? শোন বলি৷ দুই ভাই বোম্বে যাবে বলে কলকাতা থেকে ট্রেনে উঠেছে৷ মাঝখানে আগ্রায় বিরতী৷ সেখানে নেমে ওরা তাজমহল ঘুরে এসে ভুল করে বোম্বের বদলে কলকাতার ট্রেনে উঠে পড়েছে৷ ট্রেন চলতে শুরু করার পরও তারা ভুল বুঝতে পারেনি৷ ট্রেনের উপরের বার্থে এক নতুন যাত্রীকে দেখে জিজ্ঞেস করছে সে কই যাবে৷ কলকাতা যাবে শুনে বড় ভাই বিস্মিত হয়ে ছোটো ভাইকে বলছে- 'দ্যাখরে গোবরা দ্যাখ, বিজ্ঞানের বিস্ময় দ্যাখ৷ একই ট্রেনের উপরের বার্থের যাত্রী যাচ্ছে কলকাতা, আর নীচের বার্থের যাত্রী যাচ্ছে বোম্বাই৷' হা হা হা...”
বলে হাসতে হাসতে আমার চোখে পানি এসে গেলো৷ পেট চেপে ধরে হাসতে হাসতে বিছানায় গড়াগড়ি দিলাম কিছুক্ষণ৷ রীতা ধমক দিয়ে বললো, “হইছে থামো, আর হাসা লাগবে না৷ তুমি আছো খালি এইগুলা নিয়ে, ভালোই আছো৷ এখন উঠে বসো দেখি, তোমার সাথে পরিচয় করিয়ে দেই৷”
বলে সে পিছন ফিরে কাকে যেনো ডাকলো, “আয়৷”
তখন কোথা থেকে এক তরুণী উদয় হয়ে আমার ঘরে প্রবেশ করলো৷ আমি খালি গায়ে শুয়ে ছিলাম৷ তাড়াতাড়ি উঠে গায়ে একটা গেঞ্জি গলিয়ে দিতে দিতে রীতাকে মনে মনে অভিশাপ দিলাম৷ এরকম অপ্রস্তুত অবস্থায় মানুষ ফেলে? কিন্তু রীতা আমার অভিশাপ বুঝতে না পেরে হাসিমুখে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললো, “এ হচ্ছে রানা ভাই৷ আর রানা ভাই, এ হচ্ছে রোকেয়া, আমার সাথে পড়ে৷”
রোকেয়া সালাম দিলো৷ আমি প্রশ্ন করলাম, “ভালো আছেন?”
রীতা হৈ হৈ করে বললো, “হ্যাঁ ভালোই আছে, আর জিজ্ঞেস করতে হবে না৷ রোকেয়া, রানা ভাই খুব ভালো হাত দেখতে পারে৷ তুই হাত দেখা, আমি উপরতলা থেকে চাচিকে ধরে নিয়ে আসি৷”
বলে সে ঘর থেকে বের হয়ে গেলো৷ মেজাজটা খুব খারাপ হলো আমার৷ আমি হাত দেখতে পারিনে৷ কস্মিনকালে পারতাম না৷ তবে ভুল করে একবার রীতার হাত দেখে ফেলেছিলাম, আর সেটাই হয়েছে যন্ত্রণা৷ তার হাত দেখার পিছনে ছোট্ট একটা গল্প আছে৷ আমার এক বন্ধু কোনো মেয়ের সাথে পরিচয় হলেই তার হাত দেখতে বসে যেতো৷ হাত সে কতোটুকু দেখতো জানি না, কিন্তু মেয়েটার হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বসে থাকতো অনেকক্ষণ৷ হয়তো সে হাতই দেখতো, রেখা দেখতো না৷ রেখা অথবা হাত দেখার ভান করে মেয়েটার হাত নিয়ে নাড়াচাড়া করতো, একটু পর পর কি বলতো আর মেয়েটা হাসতে হাসতে গড়াগড়ি যেতো৷ দেখে বড় আফসোস হতো আমার৷ এমন মানব জনম বৃথা যায়- মনে করে আমি ভাবলাম আমাকেও হাত দেখা শিখতে হবে, না হলে এ জনমে আর কোনো মেয়ের হাত ধরে বসে থাকা হবে না৷ একটা হস্তরেখা বিষয়ে বই জোগাড় করে পড়তে বসে গেলাম৷ একদিন সেই বই দেখে রীতা চেঁচিয়ে বললো, “ওমা তুমি হাত দেখতে জানো? আমার হাতটা একটু দ্যাখো না!”
আমি উৎসাহ নিয়ে তার হাত দেখতে বসে গেলাম৷ হাতটা চোখের সামনে নিয়েই টের পেলাম, পুঁথিগত বিদ্যার সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই৷ অথবা মিল থাকলেও ধরার ক্ষমতা আমার নেই৷ এই হাত পঠন আমার কম্ম না৷ ভালো হতো যদি বইটা সাথে নিয়ে মিলিয়ে মিলিয়ে দেখতে পারতাম, কিন্তু ইজ্জত বলে একটা কথা আছে না! অতএব আমি গম্ভীরমুখে অনেকক্ষণ হাতটা চোখের সামনে ধরে থেকে বললাম, “হুম৷”
রীতা উৎসুক দৃষ্টিতে চেয়ে বললো, “কি দেখলে?”
আমি অনেক গম্ভীর স্বরে, অনেক টান দিয়ে আবার বললাম, “হুউউম...”
“হুম হুম করছো কেনো? কি দেখছো বলতে পারছো না?”
তখন আমি এই বয়সী একটা তরলমতি মেয়ের কাছে যে টোপটা সবচেয়ে লোভনীয়, সেটাই ফেললাম৷ বললাম, “তোর একটা এ্যাফেয়ার আছে৷ একটা রোমান্টিক, মিষ্টি এ্যাফেয়ার!”
রীতা চোখ ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালো৷ ভঙ্গি দেখে মনে হলো, মাছ টোপ গিলেছে৷ যদিও আমি জানতাম না তার আসলেই কোনো প্রেম-ট্রেম ছিলো কি না৷ কিন্তু ওর ভঙ্গিতে খুশি হয়ে মুখে রহস্যময় মিটিমিটি হাসি নিয়ে আবার বললাম, “হুম৷ ছেলেটা মনে হচ্ছে ভালোই...”
“ভালোই কি! ভালো বলতে কষ্ট হচ্ছে? তোমার চেয়ে অনেক ভালো সে৷”
আমি হাসলাম৷ হাত দেখার নিয়মই হলো আনন্দের কথার সাথে কিছু অনিশ্চয়তার কথাও বলতে হয়, না হলে ব্যাপারটা ঠিক জমে না৷ তাই হাতটার উপর আরো ঝুঁকে একটু দুঃখী দুঃখী মুখ করে বললাম, “তবে...”
“তবে কি?”
মুখ তুলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম আমি, “মনে হচ্ছে তোদের সম্পর্কটা টিকবে না৷”
রীতা হাত কেড়ে নিয়ে ঝামটা দিয়ে বললো, “থাক তোমাকে আর হাত দেখতে হবে না৷ তুমি কচু হাত দেখতে জানো৷”
ব্যাপারটার সেখানেই সমাপ্তি হতে পারতো৷ কিন্তু কাকতালীয়ভাবে এর কিছুদিন পরে ওদের সম্পর্কটা ভেঙে যায়৷ আর তখন থেকে রীতা আমাকে হস্তরেখা বিশারদ হিসেবে মানে৷ আমি অবশ্য আর কখনও হাত দেখিনি৷ জীবনে সেই আমার প্রথম হাত দেখা, সেই শেষ৷
যাই হোক, রীতা আমাদের রেখে ঘর থেকে বের হয়ে গেলো৷ আমি রোকেয়াকে বসতে বললাম৷ সে আমার ঘরের একমাত্র চেয়ারটা টেনে বসলো৷ বললো, “আমার নামটা অনেক পুরানো, না? বিচ্ছিরি৷”
“আরে না বিচ্ছিরি কেনো হবে? বিখ্যাত মানুষের নামে নাম৷”
“বিখ্যাত হলেও বিচ্ছিরি৷ শুনলে কেমন বুড়ি বুড়ি মনে হয়৷”
“শুধু রোকেয়া শুনলে অবশ্য একটু পুরানো বলেই মনে হয়৷ তবে রোকেয়ার সাথে একটু লেজা মুড়ো যোগ করে দিলেই অনেক আধুনিক হয়ে যায়৷”
“যেমন?”
“যেমন ধরেণ রোকেয়া প্রাচী৷ অনেক আধুনিক মনে হয় না?”
রোকেয়া হাসলো৷ আমি বললাম, “আমি কিন্তু হাত দেখতে পারি না৷”
“তাই নাকি? রীতা তো বললো আপনি খুব ভালো হাত দেখতে পারেন৷ নাকি পয়সা ছাড়া আপনি হাত দেখেন না?”
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, “ঠিক আছে, দেখি আপনার হাত৷”
রোকেয়া তার হাত বাড়িয়ে দিলো৷ আমি বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে হাতটার উপর ঝুঁকে পড়লাম৷ আর ঠিক তখনই বিদ্যুত চলে গেলো৷ অন্ধকার হয়ে গেলো চারিদিক৷
প্রিয় পাঠক, বিদ্যুৎ নেই; অন্ধকার ঘরে একাকী এক তরুণীর হাত ধরে বসে আছি বলে আবার ভাবতে বসবেন না যে আমরা তখন লদকা লদকি শুরু করে দিলাম৷
না, লদকা লদকি আমরা শুরু করলাম না৷ রোকেয়া হাতটা ছাড়িয়ে নিলো৷ আমি সোজা হয়ে বসে বিড়বিড় করে একটা গালি দিলাম৷ কাকে দিলাম জানি না৷ কিন্তু দিলাম, সব সময়ই দিই৷ দিনের মধ্যে হাজার বার বিদ্যুৎ যায়, হাজার বারই গালি দিই৷ আমি অবশ্য দিই মোটামুটি ভদ্র, সভ্য সব গালি৷ আটঘাট বজায় রেখে, যাতে করে আমি যে একজন ভদ্র, সভ্য মানুষ সে অহংকারটুকু আমার বজায় থাকে৷ কিন্তু আমার বাবার বয়স হয়েছে৷ তার ভদ্রতা সভ্যতাবোধ অনেকটাই লুপ্ত৷ বিদ্যুৎ চলে গেলে সে যখন গালি শুরু করে, তখন কবর থেকে মূর্দাগুলো সব লাফিয়ে ওঠে৷ অমন কঠিন, শক্ত, ইহকাল-পরকাল মিশানো গালি শুনলে মূর্দাগুলোর লাফিয়ে না উঠে উপায় নেই৷ ইদানিং বিদ্যুৎ যায় খুব বেশী, দিনের মধ্যে আটবার দশবার লোডশেডিং হয়৷ আর বিদ্যুৎ গেলেই বাবা তার গালি শুরু করেন৷ শুনতে শুনতে আমাদের কান-মাথা গরম হয়ে পড়ে৷ ভাগ্যিস আজ তিনি বাসায় নেই৷
বিছানার পাশ থেকে চাইনিজদের তৈরি সস্তা চার্জার বাতিটা জ্বেলে বললাম, “গেলো বাতি৷ এখন কমপক্ষে দুইঘণ্টা থাকবে না৷ এ হলো আমাদের ডিজিটাল বাংলাদেশ বুঝলেন৷”
রোকেয়া কিছু না বলে হাসলো৷ আবার বললাম, “একটা দেশ ডিজিটাল হয় কি করে আমি প্রথমে বুঝতেই পারি নাই৷ প্রধানমন্ত্রী এসে ডিজিটাল বাংলাদেশ বললো, আর পাবলিক সেই সস্তা শব্দটা নিয়ে হাউকাউ শুরু করলো, এই ছিলো প্রথম দিকে আমার ধারণা৷ এখন অবশ্য আমি জানি ডিজিটাল দেশ কেমন৷ বিদ্যুৎ আছে অথবা বিদ্যুৎ নাই, এই হচ্ছে ডিজিটাল দেশ৷ সে কারণে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে বারো ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না৷ হা হা হা...”
“কারেন্ট না থাকলে আমরা অবশ্য টের পাই না৷” রোকেয়া বললো, “জেনারেটর ছাড়ে তো৷ কারেণ্ট চলে গেলে আমাদের তেমন অসুবিধা হয় না৷”
“ও আচ্ছা৷ কোথায় থাকেন আপনারা?”
“উত্তরা৷”
“নিজেদের বাসা?”
রীতা ঘরে ঢুকে বললো, “হ্যাঁ ওদের নিজেদের বাসা৷ ওরা অনেক বড়লোক৷ উত্তরায় ওদের দুইটা ফ্ল্যাট আছে৷ ধানমণ্ডিতে একটা৷ কোনোটার দামই দেড় কোটি টাকার নীচে না৷”
আমি বিস্মিত হয়ে রোকেয়ার দিকে তাকালাম৷ এমন হুলুস্থূল ধরণের বড়লোক আমি সামনা সামনি কখনো দেখিনি, যা দেখেছি টিভিতে৷ হিন্দি সিরিয়ালে, আজকাল বাংলা সিনেমা নাটকেও এমন সব হূলুস্থুল বড়লোক দেখা যায় যাদর বাড়িঘরের পাশে তাজমহলকেও কুড়ে ঘর মনে হয়৷ রোকেয়ারাও সেরকম নাকি? জিজ্ঞেস করলাম, “তাই? আপনার আব্বা কি করেন?”
“আসলে এসব আব্বা না, আমার ভাই করেছে৷” রোকেয়া উত্তর দিলো৷
“ও আচ্ছা৷ তা কি করেন আপনার ভাই?”
রীতা বললো, “ব্যবসা করে৷”
“কি ব্যবসা?” আমি আবার প্রশ্ন করলাম৷
রোকেয়া ইতস্তত করে বললো, “ব্যবসা না, চাকরী করে৷”
“কি চাকরী?”
রোকেয়া ইতস্তত করতে লাগলো৷ একবার রীতার দিকে তাকালো৷ রীতা আমার পাশে বসে ছিলো, হঠাৎ সে উঠে ঘর থেকে বের হয়ে গেলো৷ আমি ভালো করে কিছু বুঝলাম না৷ রোকেয়ার ইতস্তততা দেখে আমার কৌতুহল বেড়ে যাচ্ছিলো৷ অসহিষ্ণু কণ্ঠে আবার বললাম, “কই বললেন না কি চাকরী?”
“সে ইলেক্ট্রিকের মিটার রিডার৷”
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই এপ্রিল, ২০১০ সকাল ১১:৩৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

