‘বাংলাদেশ পুলিশ'-জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক। কিন্তু সে আস্থা ও বিশ্বাস জনমন থেকে কর্পূরের মতো উবে গেছে সেই কবে। সাম্প্রতিককালে পুলিশের কর্মকান্ডে দেশজুড়েই জনমনে বদ্ধমূল এ ধারণা জন্মেছে যে, তারা প্রচলিত আইন ও বিধি দ্বারা পরিচালিত একটি সেবা প্রদানকারী বাহিনী নয়। পুলিশ এখন সরকার দলীয় ঠ্যাঙ্গাড়ে বাহিনী। যে বাহিনীর বর্তমান কাজই হচ্ছে সরকারের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা। বিরোধী দলের মত ও পথকে রুদ্ধ করা, নেতাকর্মী, সমর্থকদেরকে বেআইনী ও অন্যায়ভাবে নির্যাতন, গ্রেফতার হয়রানি করা। এ থেকে এক কদমও পিছপা হচ্ছে না পুলিশ। বরং এক কদম আগ বাড়িয়ে কিছু একটা করতে পারার মধ্যেই যেন গুরুত্বপূর্ণ এই আইন-শৃক্মখলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্বার্থকতা এবং সফলতা। পুলিশের এহেন মনোভাব ও কর্মকান্ড থেকে নিস্তার মিলছে না। বিস্তার ঘটছে পাল্লা দিয়ে।
এদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ২৪ দফা সিটিজেন চার্টারের (নাগরিক সনদ) প্রথম দফাতেই বলা হয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ নগরবাসীর আইনগত সেবা ও নিরাপত্তা প্রদানকারী একটি প্রতিষ্ঠান। অথচ এই প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের অতি উৎসাহী কর্মকান্ডের শিকার হচ্ছে নিরীহ ছাত্রজনতা। তাদেরকে পরিকল্পিতভাবে সন্ত্রাসী বানানো হচ্ছে, বানানো হচ্ছে অস্ত্রবাজ, দাঙ্গাবাজ। দেয়া হচ্ছে মিথ্যা সাজানো মামলা। নাটকীয়ভাবে গ্রেফতার করে তাদের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে অস্ত্রশস্ত্র। আর এসব পরিকল্পিত ঘটনা জনগণের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে কথিত মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে। এমন একটি ঘটনাই ঘটেছে শুক্রবার ভোররাতে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে। ঘটনার জন্ম দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা ও অপরাধ তথ্য বিভাগের দক্ষিণ জোন। ঘটনার পরিচালক সংশ্লিষ্ট জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) (ডিবি) মনিরুল ইসলাম।
যে ঘটনার জন্ম দেয়া হয়েছে
গত বুধবার গভীর রাতে রাজশাহী শহরের কাজলার বাসা থেকে সাদা পোশাকের পুলিশ গ্রেফতার করে শিবিরের কর্মী শাহাদাতকে। গ্রেফতারের পর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় অজ্ঞাত স্থানে। পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটসহ সম্ভাব্যস্থানগুলোতে শাহাদাতকে হন্যে হয়ে খোঁজেন তার স্বজনেরা। কিন্তু কোন খোঁজ মিলেনি। এ অবস্থায় তার পরিবারের পক্ষ হতে গত শুক্রবার রাজশাহী সিটি প্রেসক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে তার সন্ধান ও মুক্তির দাবি জানানো হয়। এই দাবির পরই টনক নড়ে পুলিশ প্রশাসনের। পরিকল্পনা করা হয় কিভাবে কি করা হবে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই গতকাল শনিবার ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া এন্ড কমিউনিটি সার্ভিসের অতিঃ উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) ওয়ালিদ হোসেন স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে (স্মারক নং ৩৫৩ (৫০) রাজশাহী থেকে গ্রেফতার করা শাহাদাতকে নিয়ে ডিএমপির ডিবি পুলিশের সাজানো গল্প তুলে ধরা হয়। প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে যেভাবে গল্প সাজানো হয়েছে তা হচ্ছে এভাবে, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) এর নির্দেশে অতিঃ উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) এর তত্ত্বাবধানে সহকারী পুলিশ কমিশনার এসএম রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি দল একটানা বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে গত ২৩ জুলাই ২২.০০টায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা হতে জামায়াত শিবিরের সশস্ত্র ক্যাডার আবদুল্লাহ ওমর নাছির ওরফে শাহাদত হোসেন (২৬)কে গ্রেফতার করেন।
ধৃত আসামীর স্বীকারোক্তি ও দেখানো মতে গতকাল ২৪ জুলাই ৪.৩০টায় যাত্রাবাড়ী থানাধীন ৪৩/এ দক্ষিণ সায়েদাবাদ মৃত হাজী বোরহান উদ্দিনের ষষ্ঠ তলা বিল্ডিং এর ২য় তলায় অভিযান পরিচালনা করে ছাত্রশিবিরের অফিস কাম মেসের ড্রয়িং রুমের টিভি বক্সের ভিতর হতে একটি ম্যাগজিনসহ ৯ এমএম পিস্তল (Made in Italy DAO No-116) উদ্ধার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, শাহাদত হোসেন তার কতিপয় জামায়াত শিবিরের সহযোগীসহ সাংগঠনিক কাজে ব্যবহারের জন্য দেশের বিভিন্ন স্থান হতে অস্ত্র সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে থাকে। এ সংক্রান্তে যাত্রাবাড়ী থানায় অস্ত্র আইনে মামলা রুজ করা হয়।
ডিএমপির প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে যাত্রাবাড়ি থানায় এ ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে বলা হলেও গতকাল শনিবার বিকাল ৬টা ১৫ মিনিটে যাত্রাবাড়ি থানায় ফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ করা হয়। এ সময় ডিউটি অফিসার এসআই মাহবুব দৈনিক সংগ্রামকে জানান, এ থানায় অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় কোন মামলা হয়নি। তিনি উল্টো এ প্রতিবেদককে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন এমন আজগুবী মামলার খবর কোথায় পান? তখন ঘটনাটি বলা হলে তিনি জানান, এমন খবর তাদের নজরে নেই। যারা জানিয়েছে তাদেরকে জিজ্ঞেস করুন।
এ অবস্থায় ডিএমপির মিডিয়া সার্ভিসের এডিসি ওয়ালিদের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ৬টা ২০ মিনিটে জানান, মামলা হয়েছে যাত্রাবাড়ি থানায়। নাম্বার কত প্রশ্ন করা হলে বলেন, এটা থানায় আছে। থানা থেকে জেনে নিন। থানা বলেছে মামলা হয়নি- এমন প্রশ্নের জবাবে চুপসে গিয়ে তিনি সগর্ভে বলেন, মামলা হয়নি হবে। কি হয়েছে তাতে? কখন হবে? এর উত্তরে বলতে পারেননি তিনি। তাকে প্রশ্ন করা হয় মামলা হওয়ার আগেই প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে মামলার কথা বলা কতটা শুদ্ধ? এর উত্তর তিনি চেপে যান।
ডিএমপির প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে যে দলটি অভিযান পরিচালনা করে সে দলের (৩নং টিম) নেতৃত্ব দেন এসি রফিকুল ইসলাম। তার সাথে ৬টা ২৭ মিনিটে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, শাহাদাতকে শুক্রবার রাতে গ্রেফতার করে ঢাকায় পৌঁছতে পৌঁছতে ভোর হয়ে যায়। ভোরেই আবার যাত্রাবাড়িতে অভিযান চালিয়ে অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। তড়িঘড়ি হওয়ার কারণে অনেক কিছুই সাজানো হয়নি। প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে একজনকে গ্রেফতারের কথা বলা হয়েছে কিন্তু অভিযানে আরও একজনকে ধরা হয়েছে বলা হলে তিনি জানান, সময়ের অভাবে প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে আরেকজনের কথা বলা হয়নি। তিনি জানান, ঐ মেস থেকে ফরিদুল হুদাকে আপত্তিকর লিফলেট, পোস্টার, ব্যানার, পুস্তকসহ গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে পৃথক পৃথক মামলায় ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
তিনি জানান, রাজশাহী থেকে গ্রেফতার করা শাহাদাতকে অস্ত্র মামলায় এবং যাত্রাবাড়ী থেকে গ্রেফতার করা ফরিদুল হুদাকে গত ২৭ জুন হরতালের আগের রাতে গাড়ি পোড়ানোর মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। অস্ত্র উদ্ধার মামলায় তদন্ত করবেন ডিবির এসআই আবদুল হান্নান। ফরিদুল হুদার মামলার তদন্ত করবেন ডিবির এসআই মজিবুর রহমান।
রাজশাহী অফিস জানায়, গত বুধবার গভীর রাতে রাজশাহীতে আটক হওয়া ইসলামী ছাত্রশিবিরের দুই কর্মীর মধ্যে একজন কাজলা মহল্লার আব্দুল্লাহ ওমর নাফিস শাহাদাতকে অবশেষে ঢাকা মহানগর পুলিশ গ্রেফতার দেখিয়েছে। তবে শনিবার তাকে রাজধানী সায়েদাবাদের একটি মেস থেকে কথিত উদ্ধার হওয়া একটি অস্ত্রের সঙ্গে জড়িত করেছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা গতকাল শনিবার একটি অনলাইন সংবাদ সংস্থাকে বলেছেন, শুক্রবার রাতে শাহাদাতকে তার রাজশাহীর কাজলার বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়। ভোরে তাকে ঢাকা নিয়ে আসা হয়। পরে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় সায়েদাবাদে অস্ত্র উদ্ধারে। সেখানে দক্ষিণ সায়েদাবাদের ৪৩/এ নম্বর ৬তলা বাসার দুই তলায় টিভি বাক্সের ভেতর থেকে ৯ এমএম বোরের একটি পিস্তল উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ঐ কর্মকর্তা দাবি করেছেন, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবির ক্যাডার শাহাদাত ঐ অস্ত্রটি সরবরাহ করেছিল বলে স্বীকার করেছে।'
এদিকে, শাহাদাতকে গ্রেফতার ও তার অস্ত্র সরবরাহের কথিত স্বীকারোক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশ তাকে আটক করলো বুধবার শেষ রাতে। আর সংবাদ সংস্থাকে বললো শুক্রবার রাতে গ্রেফতারের কথা। তাহলে দু'দিন ধরে শাহাদাতকে কোথায় রাখা হয়েছিল? আগে গ্রেফতার এবং পরে অস্ত্র উদ্ধার করে সেই তা সরবরাহ করেছিল বলে স্বীকারোক্তি প্রদান কতোটুকু সামঞ্জস্যপূর্ণ- এ প্রশ্নও উঠেছে। সাধারণভাবে আগে অস্ত্র উদ্ধার করে ক্লু ধরেই আসামী আটক করা হয়ে থাকে। আর শাহাদাত রাবি শিবিরের কোন ক্যাডার ছিল না। সে ছিল ছাত্রত্ব শেষ করে কর্মসংস্থানের জন্য অপেক্ষমান একজন ইলেকট্রিক মিস্ত্রী। অপরদিকে, একই দিন রাজশাহী নগরীর তেরখাদা থেকে আটক আরেক শিবির কর্মী আব্দুল্লাহ আল মাসুমের এখনো কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।
শিবিরের নিন্দা : ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের অর্থ সম্পাদক ফরিদুল হুদাকে অন্যায় ও আক্রোশমূলক গ্রেফতারের তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছেন সংগঠনের মহানগরী দক্ষিণের সভাপতি ও সেক্রটারি।
গতকাল শনিবার মহানগরী দক্ষিণের সভপতি আ.স.ম ইয়াহইয়া ও সেক্রেটরি সাজেদুর রহমান শিবলী এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, গত ২২ জুলাই দিবাগত গভীর রাত ৩টায় সায়েদবাদের বাসায় ডিবি পরিচয়ে ৭/৮ জনের একটি দল বাড়ির নিচ তলার মেইন গেটের তালা ভেঙ্গে ভিতরে প্রবেশ করে। এ সময় তালা ভাঙ্গার শব্দে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পরে। বাসার দরজাগুলো ভেঙ্গে ফেলার উপক্রম করে আঘাত করলে মানুষের ঘুম ভেঙ্গ যায়। হাসপাতালে ভর্তি অসুস্থ বাবার সেবা করে রাত ১টার দিকে বাসায় ফিরে ঘুমাচ্ছিল শিবির নেতা ফরিদুল হুদা। তাকে কিল ঘুষি দিয়ে প্রথমে আঘাত করে এবং ছাত্রশিবিরের দায়িত্বশীলদের পরিচয় জানতে চায়। পূর্ব পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ডিবির পরিচয়ধারী লোক সঙ্গে নিয়ে আসা ১টি পিস্তল দেখিয়ে বলে এটি তোর। এটা তুই কোথায় পেলি ? ফরিদুল হুদা তার এ সাজানো নাটকের প্রতিবাদ করলে তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এবং সবার সামনেই চড়-থাপ্পর মারে। অথচ তার নামে থানায় কোন মামলা তো দূরের কথা একটি জিডি পর্যন্ত নেই। তাকে সম্পূর্ণ বেআইনি ও অন্যায়মূলকভাবে গ্রেফতার করেছে ডিবি পুলিশ। যাওয়ার সময় গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে আসেপাশের লোকজনের কাছ থেকে সম্পূর্ণ ফাঁকা সাদা কাগজে শুধু উপরে লেখা ‘‘হলফনামা’’ তে ৪ জনের স্বাক্ষর নিয়ে চলে যায়। তার এ গ্রেফতারের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানয়েছেন ছাত্রশিবির নেতৃবৃন্দ।
তারা বলেন, সাজানো মিথ্যা মামলা দিয়ে প্রশাসন আ'লীগের দলীয় ক্যাডারের ভূমিকা পালন করেছে। যা একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক ও গণতন্ত্রের জন্য নিতান্তই দুঃখজনক ও হতাশাব্যাঞ্জক। সরকারী বাহিনীর নগ্নভাবে আ'লীগ দলীয় কাজ বাস্তবায়ন জনগণের সাথে প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই না। প্রশাসনকে যদি এভাবে দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যবহার করা হয় তাহলে জনগণ কখনই আ'লীগ ও পুলিশকে ক্ষমা করেবে না। পুলিশ বাহিনীর প্রতি জনগণের যে আস্থা ও বিশ্বাস এখনো আছে তা শেষ হয়ে যাবে। তারা আরও শঙ্কা করছেন যে, সরকারী বাহিনী আ'লীগের কথামত তাকে রিমান্ড নিয়ে তার প্রতি নির্মম নির্যাতন করা হতে পারে। নেতৃবৃন্দ তার জীবন ও সার্বিক সুস্থতা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন। তারা সরকারের প্রতি উদাত্ত আহবান জানান, দেশের মানুষ আর নতুনভাবে রক্ষী বাহিনীর নির্মমতা দেখতে চায় না। অবিলম্বে শিবির নেতা ফরিদুল হুদার নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানান এবং সারাদেশে ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে সরকার যে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালাচ্ছে তা অবিলম্বে বন্ধ করার আহবান জানান।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




