কাকের পালকের মতো অন্ধকার রাত। সেইসাথে মৃদু বৃষ্টি, মাঝে মাঝে একপশলা ঝড়ো বাতাস দক্ষিণ দিক থেকে এসে আঘাত হানছে লাশকাটা ঘরের ঠিক সামনের ঝাউগাছগুলোতে। বটের শাখার মতো নাম না-জানা অজস্র গুল্মলতা আচ্ছন্ন করে রেখেছে অনেক বছরের প্রাচীন এই লাশকাটা ঘরকে। শহরের ঠিক মাঝামাঝি জায়গা। হাড় মাংস খুলে পড়া লাশের মতো আকৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই লাশকাটা ঘর। এখানে জীবন স্থবির, নেই সামুদ্রিক স্রোত ঢেউ আর সূর্যের আলোর অনুপ্রবেশ। এখানকার বাতাসে রক্তের নোনা গন্ধ, ঘরের শীতল সিমেন্ট ওঠা মেঝেতে আধপচা লাশের ছায়ামূর্তি দেখে শিহরণ জাগে মনে। জ্যান্ত নয় তো? এইসব নানান চিন্তা করে পরেশ ডোম ঝাঁটার কাঠি দিয়ে দাঁত খোঁচাচ্ছে। তার গায়ের রং আলকাতরার মতো কালো। ডাকাত সর্দারদের মতো মোটা ভ্রুঁ। পরনে একটা ময়লা লুঙ্গি। বাইরে আবছা ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো। সেইসাথে পূর্ণিমার চাঁদের আলো এক ধরণের ধোঁয়াটে রহস্যময় পরিবেশ তৈরী করেছে।
পাশ দিয়ে চলে গেছে পাকা রাস্তা। শহরের বাতিগুলো নিভু নিভু। কিছু জ্বলে উঠছে আবার নিভে যাচ্ছে। শেয়ালের রক্ত হিম করা চিৎকার। কেঁপে উঠলো পরেশ। কিছুক্ষণ পরেই পিশাচ তাড়াবার মন্ত্র জপে সম্বিৎ ফিরে পেলো। দুই বোতল ভাতপচা বাংলা এরই মধ্যে শেষ করে ফেলেছে। এতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত। দুই বোতল ফেন্সিও আছে। হঠাৎ নাইটগার্ডের বাঁশি বেজে উঠলো। এক বোতল ফেন্সি সাবাড় করে দেবার আগেই লুঙ্গির গাঁট থেকে দ্রুত বের করলো সস্তা মুঠোফোন।
---হ্যালো! ওসি ছাব...
ওসি সাহেবের বিরক্তমাখা গলা। সম্ভবত ঘুমোচ্ছিলেন।
---কে রে? শালা চুদমারানি...এত রাতে কিয়ের জন্য ফোন দিছোস?
---ছাব আমি পরেশ! ডোম...একটা বেওয়ারিছ লাস্...
---শালা কুত্তার বাচ্চা! লাশ তো তোর মতো আমি চুদি না, আমি জ্যান্ত মানুষ চুদতেছি তার মইদ্যে তুই কল করছোস? মালডার কী হাড়-গোড় ঠিক আছে না-কি সব চাবাইয়া খাইছোস?
---কি যে বোলেন না ওসি ছাব! হামরা গরিব হইতে পারি, বেঈমান নহে। লাসের সাথে পরেশ কুনোদিনহি খারাপ কিছু করে নাই, ওসি ছাব। পরেশের এটুকু 'ভ্রেন' আছে মাথায়। আপনি অর্ডার দিলে বোলেন, এক্ষুণি আপনার দরবার পাঠিয়ে দিলছি...
---দুই পয়সার লাশখেকো আবার কথা কও বড় বড়! ঐ শুন! ঠেলাগাড়িতে কইরা তাড়াতাড়ি সরায়া ফেল। আমি এস.আই. মিজান আর দুইজন কনস্টেবলরে পাঠাইতেছি। সে পর্যন্ত অপেক্ষা কর। তোর সাথে আরো আছে না?
---না ওসি ছাব! আমি একাই আইসেছি, সারাদিন ধরে ওয়েট কইরহে একটা বেওয়ারিছ লাস পেয়েলছি। অনেক কষ্ট কইরহা ডাক্তাররে বুঝিয়েছি যে টুয়েন্টি পার্সেন্ট আপুনি পাবেন। চিন্তা নাই। তারপর ঠেলাগাড়িওয়ালা থাকতে চায় না। তারে আসি টাকা বেসি দিয়া রাখতে হয়েসে। কি যে ঝামেলা ওসি ছাব...
---ঠিক আছে! মরাকান্না কাঁদিস না...একদিন...না খাইলে তোর বউ মরবে না... তুই লাশটাকে ঠেলাগাড়িতে তুল... সোজা চলে যাবি বাইপাস দিয়ে... দক্ষিণ পাড়ার ভেতরে একটা মাটির রাস্তা আছে... তার মধ্যে দিয়ে ঠেলাওয়ালাকে যেতে বলবি। ঐ যে হেডমাস্টারের বাসার সামনের কাঁচা রাস্তাটা...লাশটাকে বস্তা দিয়ে ঢেকে রাখবি...প্রচুর গন্ধ ছুটবে... খবরদার কেউ যেন টের না পায়...পাইলে কাইলকা তোরে এনকাউন্টারে দিমু!
পরেশ ডোম এর কলিজা ঠান্ডা হয়ে গেল। সে জানে তাকে এখন কী করতে হবে। মোবাইল ঘড়িতে সময় দেখলো। রাত একটা পয়তাল্লিশ মিনিট।
ও মিঞা এইদিকে আসেন দেখি, লাসটারে উঠাইতে হোবে গাড়িতে... পরেশ ডাক দিলো ঠেলাওয়ালাকে। মৃত লাশ ভারী হয়ে যায়। ইসলাম ধর্মে বলা আছে, পিতার কাঁধে সবচেয়ে ভারী জিনিস হলো সন্তানের লাশ। বিজ্ঞান বলছে, মৃত মানুষের শরীরে অণুজীব এবং পরিবেশের ব্যাকটেরিয়া দ্রুত আক্রমণ করতে শুরু করে। এ কারণেই পানিতে লাশ ফুলে ওঠে। দুর্গন্ধ বেরোয় লাশ থেকে। পরেশ এসব জানে না। শুধু জানে এই লাশকাটা ঘরে বছর-মাস-দিন ঘুরে ফিরে যে বেওয়ারিশ লাশগুলো আসে, সেগুলো চালান করে দিতে হয় বাইপাস রোড দিয়ে একটা সাদা মাইক্রোবাসে। তারপর কী হয় তা পরেশের জানা নেই। ওসি সাহেব জানেন। এস.আই. মিজান ও তার সাঙ্গপাঙ্গ জানে। জানে তাদের উপরের লেভেলের গণমাণ্য ব্যক্তিরা।
পরেশ ডোম আর ঠেলাওয়ালা লাশের গাড়ি নিয়ে প্রস্তুত। এস.আই. মিজানের ওয়াকিটকির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। খুব সম্ভবত তারা এসে পড়েছেন।
(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই জুলাই, ২০০৯ বিকাল ৫:১৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




