somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাদশাহ আকবর-৩ দীন-ই-ইলাহী

০৬ ই জুলাই, ২০০৯ সন্ধ্যা ৬:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

............বাদশাহ্ আকবর বিপদসংকুল পথে পা বাড়াইলেন। আবুল ফজলের দল
তাহাকে বুঝাইয়া দিলেন যে, ইসলাম ধর্ম পুরাপুরি বিবেকবর্জিত এক মতবাদ।
কিছু গরীব বেদুঈন এই ধর্ম প্রবর্তন করেন। তাঁহারা সকলেই ছিলেন ডাকাত ও
ফেতনা সৃষ্টিকারী (নাউজুবিলাহ্)।
বাদশাহর দরবারে নবুয়ত, দীদারে এলাহী,
শরীয়তের আনুগত্য, হাশর নশর প্রভৃতি বিষয়ে ঠাট্টা বিদ্রুপ করা শুরু হইল। অহি,
মোজেজা, ফেরেশতা প্রভৃতির অস্তিত্ব সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করাই বাদশাহ্ ও
তাঁহার দরবারীদের প্রধান কার্য হইয়া দাঁড়াইল।
বাদশাহ্ আকবর ভাবিতে শুরু করিলেন, ইসলাম ধর্ম প্রবর্তনের পর এক
হাজার বৎসর গত হইয়াছে। ইসলামের আয়ু ছিল এক হাজার বৎসর। বর্তমানে
তাই নতুন কোন ধর্ম প্রবর্তনের প্রয়োজন। কিন্তু এই নতুন ধর্মের রূপরেখা কিরূপ
হইবে তাহাই তিনি চিন্তা করিতে লাগিলেন।
তিনি দেখিলেন তাঁহার রাজত্বের শতকরা প্রায় পঁচানব্বই জন প্রজাই হিন্দু।
শিয়ারাও তাঁহার পিতার আমল হইতে মোঘল সাম্রাজ্যের উপর যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার
করিয়া আছে। অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যে জৈন সম্প্রদায় অন্যতম। ইহা ছাড়া
পারসী বা অগ্নি উপসাকদের কথাও ভাবনা করা উচিৎ। খৃষ্টানরাও সেই সময়
আনাগোনা শুরু করিয়াছিল।
বাদশাহ্ সিদ্ধান্তে আসিলেন,সব জাতির বাদশাহ্ হিসাবে তাঁহার সব ধর্মেরই
পৃষ্ঠপোষকতা করা উচিৎ এবং সকল ধর্মের ভাল মতবাদ সমূহ লইয়া নতুন ধর্ম
গঠন করিতে হইবে। ইহাতে সকল সম্প্রদায়ের লোকেরা তাঁহার প্রতি খুশী হইবে।
তাহা ছাড়া এই বিশাল সাম্রাজ্য সুষ্ঠুভাবে শাসন করিবার জন্য এই নতুন ধর্মই
হইবে সর্বাপেক্ষা বড় অস্ত্র।
বাদশাহ্ আলাহ্
পাকের উপর তাওয়াক্কোল ছাড়িয়া দিলেন। নিজের
বুদ্ধিবিবেচনা অনুযায়ী রাজত্ব রক্ষার অস্ত্র হিসাবে শুরু হইল নতুন ধর্ম রচনার
প্রস্তুতিপর্ব।
নতুন ধর্মে সর্বাপেক্ষা বেশী প্রভাব ছিল হিন্দুদের। ইহা ছাড়াও দেশের প্রত্যেক
ধর্মের বুদ্ধিমান ধর্মনেতাগণ শাহী দরবারে আসিয়া বাদশাহর সহিত তাহাদের ধর্ম
বিষয়ে আলোচনা করিতেন। বাদশাহ্ তাহাদের অত্যন্ত সমাদর করিতেন এবং
আলোচনার বিষয় লইয়া সব সময় গবেষণায় লিপ্ত থাকিতেন।
বহু গবেষণার পর তিনি নতুন এক ধর্ম প্রবর্তন করিলেন। নাম দিলেন ‘দ্বীন-ই-ইলাহী’।
আশ্চর্যের বিষয়, দ্বীন-ই-ইলাহী ছিল স্পষ্টতই কুফরী। অথচ তাহার নাম
রাখা হইয়াছিল দ্বীন-ই-ইলাহী অর্থাৎ আলাহর ধর্ম।
এই নতুন ধর্মের প্রধান উপাদান ছিল সূর্যের উপাসনা করা। বাদশাহ্ প্রভাতে,
দ্বিপ্রহরে, সন্ধ্যায় ও অর্ধরাত্রে বাধ্যতামূলকভাবে সূর্য পূজা করিতেন। তিনি তিলক
লাগাইতেন এবং পৈতা পরিতেন। সূর্যোদয়ের সময় ও মধ্যরাত্রিতে নহবত ও
নাকাড়া বাজান হইত।
এই নতুন ধর্মে সূর্যের নাম উচ্চারণকালে ‘জালাত
কুদরাতুহু’ বলিতে হইত। বাদশাহ্ বিশ্বাস করিতেন যে, সূর্য বাদশাহ্গণের
অভিভাবক ও হিতাকাঙ্খী। তিনি তাই হিন্দুদের নিকট হইতে সূর্যকে বশীভূত
করিবার মন্ত্র শিখিয়া লইয়াছিলেন। মধ্যরাত্রে ও ভোরে তিনি এই মন্ত্র পাঠ
করিতেন। শিবরাত্রিতে তিনি সমস্ত রাত্রি যোগীদের আসরে বসিয়া থাকিতেন এবং
বিশ্বাস করিতেন যে, ইহাতে আয়ু বৃদ্ধি পায়।
ব্রাহ্মদাণ নামীয় এক ব্রাহ্মণকে বাদশাহ্ ‘রাজকবি’ উপাধিতে ভূষিত
করিয়াছিলেন। ইতিহাসে এই ব্যক্তিই বীরবল নামে পরিচিত। তিনি বাদশাহর খুবই
প্রিয় ছিলেন। তাহারই সুপারিশে ‘দেবী’ নামক একজন হিন্দু দার্শনিক বাদশাহর
সহিত মেলামেশা করার সুযোগ পায়। রাত্রিকালে বাদশাহর অন্দরমহলেও এই
দার্শনিকের অবাধ যাতায়াত ছিল। বাদশাহ্ তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিবার জন্য
সর্বদা উদগ্রীব থাকিতেন। এই দেবী ও গৌতম নামে আর একজন ব্রাহ্মণের নিকট
হইতে বাদশাহ্ মূর্তি, সূর্য ও আগুন পূজার নিয়মাবলী এবং ব্রহ্মা, মহামায়া, বিষ্ণু,
কৃষ্ণ ও মহাদেব পূজার কায়দা কানুন শুনিয়া বড়ই উৎফুল্ল হইতেন এবং এইসব
গ্রহণও করিতেন।
ইহা ছাড়া এই ধর্মে আগুন, পানি, গাছ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী এবং
গাভী পূজা করা হইত। নক্ষত্র পূজার ব্যাপারেও বাদশাহ্ অত্যধিক বাড়াবাড়ি
করিতেন।
হিন্দুদের পুনর্জন্মবাদের উপর বিশ্বাস করা ছিল এই ধর্মের প্রধান কর্তব্য।
বাদশাহ্ নিজেও বিশ্বাস করিতেন যে, মৃত্যুর পর তিনিও পুনরায় অন্য কোন
সিংহাসনে শান শওকতের সহিত আরোহণ করিবেন। ব্রাহ্মণগণ তাহাকে বুঝাইয়া
দিয়াছিল যে, শক্তিশালী বাদশাহর শরীরে আত্মার জন্ম হয় এবং কামেল
মনীষীগণের আত্মা মৃত্যুর সময় মস্তকের তালু দিয়া বাহির হইয়া যায়। এই
ধারণার বশবর্তী হইয়া তিনি মস্তকের তালুর চুল কামাইয়া ফেলিতেন এবং মস্তকের
চারিদিকে চুল রাখিয়া দিতেন।

(যারা ইতিহাস পড়তে ভালবাসেন তাদের সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করার জন্য মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ রচিত খ,ম, আমানুল্লাহ কর্তৃক প্রকাশিত হজরত মোজাদ্দেদে আলফে সানি রহঃ -এর অবিস্মরণীয় জীবন কথা ‘নূরে সেরহিন্দ’ গ্রন্থ হতে চয়িত অংশ বিশেষঃ)
সেরহিন্দ প্রকাশন , ৩৮/২-ক, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জুলাই, ২০০৯ সন্ধ্যা ৬:২৭
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অনুকুলে নয় শেখ হাসিনা (আপা) প্রতিকুল পরিস্থিতিতেই বেশি অকুতোভয়।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৪




একদিকে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন তিনি দেশে ফিরছেন, আরেকদিকে তিনি প্রায় নিশ্চিন্ন করে দেয়া আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠন করে ফেলেছেন! এবং সেই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের অগণতান্ত্রিক, ভয়ঙ্কর এবং অবৈধ রাজনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপির আবালীপনা।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮

বিএনপি ৫০ হাজার নাচের শিক্ষক নিয়োগ দিতে যাচ্ছে। যার পেছনে ১০ বছরে ব্যায় হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। যা দিয়ে ফুল প্যাকেজ ৩০ টি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান... ...বাকিটুকু পড়ুন

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×