somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একটি সাধারণ গল্প

১৮ ই এপ্রিল, ২০০৮ দুপুর ১২:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

[এটি একটা পুরনো গল্প। আবারো দিলাম। কারণ এ গল্পটা এবার সাপ্তাহিক ২০০০ এর ভালোবাসা দিবস গল্প লেখা প্রতিযোগিতায় ৪৪৬৯ এস.এম.এস ভোট পেয়ে ২য় হয়েছে। পড়ার আমন্ত্রণ রইল। ]

সকাল বাসা থেকে বের হচ্ছি দেখে ভাবী বললেন, 'কি ব্যাপার! এত সাজুগুজু করে এত তাড়াতাড়ি আজ কোথায় যাওয়া হচ্ছে?' 'এই তো এক ফ্রেন্ডের সাথে দেখা করে আসি।' আমার উত্তরে ভাবী যেন সন্তুষ্ট হলেন না। কেমন একটা রহস্যময় হাসি দিলেন। কাল মাঝরাতে যখন মোবাইলে কথা বলছিলাম ভাবী তা শুনে ফেললেন নাকি? আমি আর সময় নষ্ট না করে দ্রুত বাসা থেকে বের হয়ে গেলাম।
এখন আমাকে অনেক দূর যেতে হবে_খিলগাঁও থেকে মিরপুর। ঢাকাতে আমি তেমন একটা আসি না। তাই অপরিচিত পরিবেশে কেমন যেন অসহায়বোধ করছিলাম। এত দূর কিভাবে যাব? কিন্তু যেতে যে আমাকে হবেই। আজ এগারটায় ওর সাথে দেখা করার কথা। মিরপুর শেওড়াপাড়া ওভারব্রিজের নীচে আসবে সে। তারপর..আপাতত জানি না।
খিলগাঁও থেকে ম্যাক্সি চড়ে মালিবাগ মোড়ে পৌছালাম। তারপর একটা বাসে চড়ে বসলাম। এটা যাবে ফার্মগেট। আমি জানালার পাশে বসেছিলাম। এত মানুষ, এত ছুটোছুটি! কেমন যেন কান্তিকর মনে হচ্ছিল। ফার্মগেট এসে পড়লাম ঝামেলায়। এখন মিরপুর কিভাবে যাব-তা তো জানি না। শেষে এক পান বিক্রেতা বললেন, '10 আর 11 নম্বর বাসগুলো মিরপুর যায়।' বাসে উঠে এবার আর বসার জায়গা পেলাম না। এক হাত দিয়ে মাথার উপরের হাতল ধরে রইলাম। অন্য হাতে পকেট শক্ত করে চেপে ধরলাম পাছে যদি পকেট কাটা যায়! এবারের ড্রাইভার বেশ রসিক মানুষ মনে হল। সে গান বাজাচ্ছিল, 'গুলশান, বনানী আবার জিগায়... তেজকুনিপাড়ায় হালায় আবার জিগায়...।'
শেওড়াপাড়া পৌছে দেখি ঘড়িতে পৌনে এগারটা বাজে। আরো এখনো পনের মিনিট বাকি। কি করা যায়? ওকে একটা ফোন দিলাম, হ্যালো হিমেল! আমি তো চলে এসেছি।
-চলে এসেছেন। কোথায় আপনি?
-এই তো তোমাদের বাসার গলির ভেতর হাঁটছি।
-কি? যান যেখানে দাঁড়ানোর কথা সেখানে গিয়ে দাঁড়ান। আমি পনের মিনিটের মধ্যে আসছি।
অজানা অচেনা জায়গায় কারো জন্য অপো করাটা যে কতখানি বিরক্তিকর তা বলে বোঝানো যাবে না। কি করব বুঝতে পারছিলাম না। শেওড়াপাড়া বাজার থেকে হেঁটে ওভারব্রিজ পর্যন্ত এলাম। আবার উল্টো পথে গেলাম। একটু পরে সে এল। বাহ! গতবারের তুলনায় এবার সে অনেক সুন্দর হয়েছে। চুলও বড় হয়েছে।
-কি খবর? কেমন আছ?
-ভাল। আপনি?
-এই তো।
-তারপর কোথায় যাবেন?
-আমি কিভাবে বলব? আমি তো এখানকার তেমন কিছুই চিনি না। তুমি যেখানে নিয়ে যাবে আমি সেখানেই যাব।
এসব ঘটনায় সাধারণত ছেলেটা মেয়েটাকে পথ দেখায়। আমার েেত্র ঘটল উল্টোটা। হিমেলই চালকের আসনে বসল।
আমরা মিরপুর বাঁধের উদ্দেশ্যে রিকশা নিলাম। রিকশার পেছন রিকশা। গাড়ির পেছন গাড়ি। হাজার মানুষের ছুটে চলার মাঝে আমদের রিকশাও এগিয়ে চলল। দুজনই চুপচাপ। হঠাৎ কেমন যেন সিনেমাটিক ডায়ালগ দিয়ে ফেললাম, তুমি না আগের চেয়ে সুন্দর হয়ে গেছ..অনেক সুন্দর।
-কি যে বললেন! মুখে পিম্পলে ভরে গেল। আর আপনি বলেন সুন্দর!
সত্যি বলতে কি সেদিন ওকে আসলেই সুন্দর লাগছিল। বলতে দ্বিধা নেই ওর চোখ দুটো আমাকে যেন চুম্বকের মত টানছিল। ইচ্ছে হচ্ছিল ছুঁয়ে দেখি! আরেকটা জিনিস অনুভব করলাম। এর আগেরবার যখন ও আমার সাথে রিকশায় উঠেছিল তখন আমাদের মাঝে প্রায় পাঁচ ইঞ্চি দূরত্ব ছিল। অথচ আজ সেটা নেই।
মিরপুর বাঁধ আমার কাছে আজব জায়গা বলে মনে হল। শুধু জুটি আর জুটি। রিকশায় জুটি। রাস্তায় জুটি। পার্কে জুটি। হঠাৎ এক লোক বলল, মামা সইওয়ালা নৌকা আছে। আসেন আপুরে নিয়া নৌকাই ঘুইরা আসেন।
আমি বললাম, নৌকায় উঠবে?
হিমেল আমাকে এক বাক্যে না-করে দিল।
আমরা বাঁধের উপর বসলাম। সামনে শুকনো নদী। নদীর পাড় ঘেষে ধানের চারা লাগানো হয়েছে। একটা ছোট কার্গোকে দেখলাম ঘুরে ঘুরে বালি তুলছে।
-তারপর কি অবস্থা? কি খবর? আমি বললাম।
-কি আর খবর হবে? প্রতিদিনই তো আপনার সাথে কথা হয়। সবই তো জানেন। নতুন কোন খবর নেই।
এরপর কি বলব বুঝতে পারছিলাম না। আসলে এখানে আসার আগে মনে হয়েছিল ওকে সামনে পেলে কথার ঝড় বইয়ে দেব। অথচ এখন বলার মত কিছুই খুঁজে পাচ্ছি না। আমি বললাম, মোবাইলেই তোমার সাথে গল্প জমে। এখন কেমন যেন লাগছে।
-আচ্ছা ঠিক আছে। যান দূরে যেয়ে আমাকে কল দেন আমি রিসিভ করছি।
আবার কিছুণ চুপচাপ বসে থাকি।
-আচ্ছা তুমি আমাকে আর কতদিন 'আপনি' করে বলবে? আমার এসব আপনি-টাপনি আর ভাল লাগছে না। প্লিজ 'তুমি' করে বল। প্লিজ।
-আচ্ছা বাবা বলব, বলব। পরে বলব। গান শুনবেন। নেন গান শুনেন।
হিমেল তার এমপিথ্রি প্লেয়ারের হেডফোনের একটা কড আমার কানে ভরে দিল। অন্যটা নিজের কানে রেখে দিল। মাহামুদুজ্জামান বাবুর গান বাজছে, আমি বাংলার গান গাই।
আস্তে আস্তে সূর্যের তাপ বাড়তে লাগল। এমনিতেই আমার মাথায় চুল কম। তারপর এমন খোলা জায়গায় সরাসরি সূর্যের আলো। মাথা ঝিমঝিম করা শুরু করল। ওর অবশ্য তেমন একটা লাগল না। কারন আমাকে দিয়ে সূর্যকে আড়াল করে সে বসেছিল। বসুক। বেশিণ সূর্যের আলোয় থাকলে আমার হাত-পা কাঁপতে থাকে। যাক তারপরও ওকে আড়াল করে রাখারই চেষ্টা করলাম। কেননা আমি যে ওকে ভালবাসি, ভীষণ ভালবাসি।
হঠাৎ ওর হাত ধরলাম। এক ঝটকায় ও হাত ছাড়িয়ে নিল। একটু কষ্ট পেলাম। নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, এটা ঠিক না। এটা ঠিক না।
কিন্তু পারলাম না। পরে যে কখন আবার ওর হাত ধরে ফেলেছিলাম তা নিজেই টের পাইনি। এভাবে কতণ যে ওর হাত ধরে ছিলাম তা বলতে পারব না।
দুপুর হয়ে এলে আমার জায়গা পরিবর্তন করলাম। একটা পুকুরের পাশে গাছের নিচে ছায়ায় গিয়ে বসলাম।
সত্যি বলতে কি সারাদিন আমাদের তেমন একটা কথা হল না। শুধু চুপচাপ পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে বসে থাকা হল। বেশিরভাগ সময়ই আমি বেহায়ার মত ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ও প্রায়ই বলছিল, দ্যাখেন, এভাবে তাকিয়ে থাকবেন না। আমার ব্যাপারটা ভাল লাগে না।
কিন্তু আমি কি করব? আমি যে কিছুতেই নিজেকে নিয়ন্ত্রন করতে পারছিলাম না। শুধু ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করছিল। দূরে দেখলাম, আমাদের মত এক জোড়া বসে আছে। হঠাৎ ছেলেটা মেয়েটাকে জোর করে ধরে একটা কিস দিয়ে দিল। মেয়েটা রাগ করে উঠে গেল। ছেলেটা 'সরি, সরি' বলতে বলতে তার পেছন পেছন ছুটল।
আজকের দিন আমার কাছে বছরের সবচেয়ে ছোটদিন বলে মনে হচ্ছিল। এত তাড়াতাড়ি বিকাল হয়ে গেল! ইচ্ছে হচ্ছিল না ফিরে যাই। তবুও ফিরতে হল। হিমেল রিকশা নিয়ে বাসায় চলে গেল। আমি শেওড়াপাড়া বাজারের সামনে নেমে গেলাম। আবার সেই ফেরার পালা, আবার সেই বাস, 'গুলশান, বনানী আবার জিগায়... তেজকুনিপাড়ায় হালায় আবার জিগায়...। '
৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×