গল্প লিখতে ভালোবাসি

দক্ষিণ মহল্লায় পুলিশের গাড়ি নামে

৩০ শে আগস্ট, ২০০৮ রাত ১০:৫০

শেয়ার করুন:                   Facebook


যখন মেয়েটি বুঝতে পারলো নাম দিয়ে মানুষ মূলত: নিজেকে আলাদা করে তখন সে পাখি নামে পরিচয় দিতে শুরু করে। একসময় আকিকা দেয়া নামের চেয়ে পরিচিত হয়ে ওঠে তার নিজের দেয়া দুই অক্ষরের নাম। দুধে আলতা রঙের মেয়েটি তার পরিচয়ের দাপট দিয়ে দোয়েল ময়নাদের ফেলে পরিচয় সংকটে। এক সকালে দক্ষিণ মহল্লার সব মানুষ তাকে পড়ে থাকতে দেখে বাড়ির সামনে। উপুর হয়ে। মৃত। সেদিনও সবাই ভাবলো মেয়েটি কি তা হলে জীবনের শেষ মুহূর্তে ছয় তলার ছাদ থেকে নেমে এসেছিলো পাখির মতোই? হয়েছিলো কোন সে পাখি? নাকি সে দৌড় দিয়েছিলো আজরাইলের সাথে ?

পাখি কেন পালক ফেলে গেলে...


একটি শোক সংবাদ! একটি শোক সংবাদ! দক্ষিণ পাড়া নিবাসি কানিজ সুলতানা গত রাতে ইন্তেকাল...
কানিজ সুলতানা নামতো হারিয়ে গেছে পাখি নামের আড়ালে। তাহলে বলতে হবে দক্ষিণ পাড়া নিবাসি পাখি গত রাতে ইন্তেকাল করেছেন।
রাত কয়টায়?
জানা নাই।
এসময় তার বয়স হয়েছিলো ২৫।
২৫ বছর!
এতো কম বয়স!
কি হয়েছিলো মেয়েটির? অসুখ? কি অসুখ? কোন ডাক্তার দেখতো? জানিনা।
মৃতদেহ পাওয়া গেছে বাসার সামনে।
সুইসাইড নাকি?
তা হলে ঘোষণা হবে অন্য রকম।

একটি পাখি আত্মহত্যা করেছে। তার গায়ের রঙ দুধে আলতা।

এ পর্যন্ত ভেবে চোখের পানি মোছে রফিক। সকাল হতেই খবর ছড়িয়ে পড়েছে পথে পথে। দক্ষিণ মহল্লার শুরুতে আবুলের দোকান দখল করে যে বহুতল ভবন হচ্ছে, সেখানকার শ্রমিকরাও জানে। মহল্লার শেষ প্রান্তে লেকের পানি ছুঁয়ে যাওয়া সোনালি রোদ জানে তার হারিয়ে যাওয়ার খবর।

অনেক চেষ্টায়ও একটা আনুষ্ঠানিক ঘোষণার খসড়া লিখতে পারেনা রফিক। অনেক প্রশ্নবোধকের ভীড়ে হারিয়ে যায় ঘোষণাটি।

কখন পড়লে ছাদ থেকে, রাত তখন কতো ?
কি ভেবেছিলে পড়ার আগে ? পানি খেয়েছিলে একগ্লাস? কেউ কি তাতে মিশিয়ে দিয়েছিলো একমুঠো লবণ ।

যেমনটি করেছিলো রফিক। তখন পাখি ক্লাস নাইনে। ঠিক কেন সে এসেছিলো রফিকদের বাড়ি, এখন আর তা মনে পড়ে না । কেবল মনে হয় পানি খেতে চেয়েছিলো মেয়েটি। আর রফিক তাতে লবন মিশিয়ে দিয়েছিল। লবনের সাথে মন। চায় পাখির মনযোগ কাড়তে। পুরো ব্যাপারটা কাউকে বুঝতেই দেয়নি মেয়েটি। মা ছিলো পাশে, বোনটাও ছিলো। কেবল একচিলতে তাকায় রফিকের দিকে। ঠোঁটের দুই কোণ বেয়ে বাতাসে হারায় সে হাসি। আজ এতোদিন পর রফিক ভাবে সেটা আসলে হাসি নয়, একটা পালক ফেলেছিলো পাখি।

এরপর আর কখনো রফিকদের বাড়ির দিকে আসেনি পাখি। কিন্তু রফিক পালকটা রেখেছে বুকে, রেখেছে যত্নে। যখনই মনে পড়ে লবন পানি মুখে নিয়ে, হাসি মুখে রফিকের দিকে মেয়েটির তাকিয়ে থাকা, হাসি মুখে সে পানিতে তৃষ্ণা মেটানো,বুকের ভেতর মোচড় দেয় একটা। চিনচিনে ব্যাথা লাগে। কি ম্যাজিক ফেলে গেলে মেয়ে?

কতো বড় হলে ছাদ খেলার মাঠ হয়...

পাখিদের ছাদটা বেশ বড়। এরশাদ আমলে কন্টাকটরির টাকায় বাড়িটা বানায় তারা বাবা। হাউজ লোন কিছু ছিলো তাও ইনকাম ট্যাক্স বাঁচাতে। এতো বড় ছাদই হয়ে ওঠে পাখিদের খেলার মাঠ। রুমকী, সুমি, সুলতানা কে না সময় কাটিয়েছে এই ছাদে। পুতুল খেলার স্বামী স্ত্রী সেজে পাখিকে প্রথম এখানেই চুমু খায় মুরাদ। সে নিয়ে অনেক দিন ক্ষেপিয়েছে পাখিকে। ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির পরও দেখা হলেই মুরাদ বলতো তুই আমার লেঙটা বেলার বন্ধু। মুচকি হাসিতেই জবাব দিতো পাখি। খুব মুডে থাকলে বলতো, তোকে কতো ছোট দেখেছি মুরাদ। বড় হয়েছিস তো?

সে ছাদে পখিদের সবচেয়ে প্রিয় ছিলো রেলগাড়ি রেলগাড়ি খেলা। সামনের জনের কাঁধে হাত রেখে দৌড়ানো । আর মুখে ছড়ার তুবড়ি। খোকন খোকন ডাক পারি বদলে যায় ক্লাস বাড়ার সাথে সাথে । সে খেলা পুরনো হয়নি কখনো। ভার্সিটিতে ভর্তির পরও সে খেলা জমতো বন্ধুদের সাথে দেখা হলে। তেমনি এক রেলজার্নির পর আচমকা একদিন সুলতানাকে ডেকে নিয়ে পাখি বলেছিলো, স্বামীকে নিয়ে এই ছাদে এক পূর্ণিমার রাতে ওপেন সেক্স করতে চায় সে।

এক ধরণের আমোদ লেগেছিলো সুলতানার । তারও মনে জেগেছে একই বাসনা । ছোটদের পতন ঠেকাতে বড় করে দেয়া এরশাদ আমলের গ্রিলে হেলান দিয়ে সে ভেবেছিলো আইডিয়া মন্দ না। মুখে বলেছিলো , ভালো কইসো দোস্ত। কিন্তু বাস্তব হইবো তো?

অমন রোমান্টিক না হলে বিয়েই করমু না কোন শালাকে। সাফ ঘোষণা দেয় পাখি ।

সে ছাদ আটকে রাখতে পারলো না পাখিকে! কি এমন হয়েছিলো তার! সব কথাতো তাকে বলতো পাখি। সেই প্রথম উরু বেয়ে রক্তের ধারা বয়েছিলো যেদিন পাখি মায়ের কাছে না গিয়ে ছুটে আসে সুলতানার কাছে।
তার সে কি ভয়!
সে কি বিস্ময়!
ভাগ্যিস নানি সেদিন ছিলেন। কত মধুর করেই না ভয় মুছিয়ে দিলেন তিনি। কি এমন হলো যে সুলতানাকে একটা কথাও বলতে পারলো না পাখি। দারুণ অভিমান হয় সুলতানার। ফোনে কথা বলতে চাইলে ক'দিন ধরেই বলতো ঘুমাবে সে। ঘুমের ওষুদ খেয়েছে। দুর্বল লাগছে। তবে কি দুর্বলতার জন্যই পড়ে গেলো পাখি। না কি নিজেই উড়ে নেমে যায় সে।
জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে সুলতানা। তাকায় আরো ওপরে। অভিমানে ঠোঁট কাঁপে। নিচে তাকায় না। তাকালে সে দেখতে পেতো এরই মধ্যে পাখির দেহ ঘিরে একটা জটলা জমে গেছে।

গাল বেয়ে নামে পানির ধারা। অভিমানে থেমে থেমে ফুলে ওঠে ঠোঁট। কিন্তু নিচে তাকায় না সুলতানা। তাকালে সে কি দেখতে পেতো, এরই মধ্যে দুয়েকটি মাছি উড়তে করতে শুরু করেছে মৃতদেহ ঘিরে।


বিবমিষা বিবমিষা লাগে...

মাইয়াডা আছিলো বালা । বাসমুতি চাইলের নাহান। কুনোদিন তারে সিনাটাইট জামা পড়তে দেহি নাই। সিগারেট এগিয়ে দিয়ে আগন্তুককে বলে মফিজ মিয়া। পাখিদের পাড়ার দোকানদার। আহা চুখের সামনে তরতর গাছের মতন বড় হইলো মিয়া, কুনু ফাউল করে নাই,আসতে যাইতে সালাম কইতো। আল্লা তারে বেহেস্ত নসিব কইরো।

আগন্তুক সিগারেটে আগুণ দিয়ে বিদায় নেয়।

কোন সন্দেহের মুখে না পড়ে এতগুলো কথা শুনে আপ্লুত হয় আগন্তুক। একটু এগিয়ে সদর রাস্তা থেকে নেমে একটা নারিকেল গাছের নিচে দাঁড়ায় সে। তারপর মফিজ মিয়ার দোকানের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে , শালা সিনাটাইট দেখে নাই! দেখছে নাকি শালা কোনদিন, সুপারি গাছে ডাব!
সেলফোন তার স্বগোক্তিতে বাধা দেয়।
পাইছোস ?
না।
কই এখন ?
বাসার সামনে পড়ে আছে।
মোবাইল কই ?
জানিনা। ধারে কাছে নাই। মোবাইল হাতে নিয়া পড়লে এতোক্ষণ থাকার কথা না । নকিয়া এন ৮১ । দাম আছে।
তোরে শালা আগেই কইছিলাম ফাইলটা দিস না । ব্লু টুথ ব্যবহার শিখাও এইবার! শোন ববি, পুলিশের হাতে যদি ফাইল পড়ে তাইলে ল্যাওড়া তোর পাছায় ডুকাবে।
শোন রাজু, বাজে কথা বলিস না। গ্রুপ সেক্স করার আইডিয়া তোর।
পাখির সম্মতি ছিলো।
মোটেও না। সে অংশগ্রহণ করে নাই। চেপে বসেছিল।
তলা ভিজেতো বঙ্গোপসাগর হয়েছিলো।
অসম্মতিতেও শরীর জাগতে পারে। এখন বুদ্ধি বের কর বাঁচার ।
আমি রাখি ।

সিগারেটের স্বাদে বিবমিষা লাগে ববির। সে কি সত্যিই ভালোবাসতো পাখিকে। তা না হলে দিনের পর দিন ফোন দিয়ে কেন তার মনোযোগ কাড়লো। কতজনই তো তারা একক্লাসে পড়ে। অন্য কারো কাছে কেন যায়নি সে? ববি নিজের কাছে জানতে চায়। কেন সে রাজুর সাথে শেয়ার করলো পাখিকে?
মন্টিকে একবার পেতে।
সেদিন ববির শোবার ঘরে রাজুকে দেখে খুব অবাক মানে পাখি। বিস্ময়ের ঘোর কাটার আগেই পাখির উরুসন্ধিতে মুখ ডুবায় রাজু। পেশির টানে ফর ফর করে ছিঁড়ে যায় কটনের পাজামা।
আর মন্টিকে পাবার আশায় মোবাইলে রেকর্ড করে ববি। এ হোম মেইড লাভ শো।
সেটা পাখিকে ট্রান্সফার করেছে ববি। সে তো মাসতিনেক আগে। এখনও কি তা আছে মোবাইলে?

শার্ট ভিজে গায়ের সাথে লেপ্টে যায়। পেটের ভিতর মোচড় দিয়ে ওঠে তার।
ওয়াক...
পেট চেপে বসে যায় সে।
এই কুত্তা সর।
ওয়াক...
এই ..ওয়াক .. একটা লোম ওঠা নেড়ি কুকুর এসে ববির বমি খেতে থাকে।

দোকান বন্ধ করে দাও...লোকসান অইবার পাড়ে। তারপরও দোকান বন্দ করি দাও মিয়া। আমি মফিজ চাচা যুদি আইজ বেচি, পাখি মা আমারে মাফ দিবোনা। আহা কতো বালা আছিলো মায়াডা। কুনুদিন সিনাটাইট জামা পড়ে নাই। আসতে যাইতে ফাউল করে নাই। সেলাম কইতো ...

মফিজ মিয়ার সাথে পা মিলিয়ে পথে নামে রফিক। সুলতানা তাকায় নিচে।
দেখে সাইরেন বাজিয়ে পুলিশের গাড়ি ঢোকে দক্ষিণ মহল্লার নীরবতা ভেংগে...
@আনোয়ার সাদী।

 

 

  • ১৬ টি মন্তব্য
  • ১৯৮ বার পঠিত,
Send to your friend Print
রেটিং দিতে লগ ইন করুন
পোস্টটি ৮ জনের ভাল লেগেছে, ১ জনের ভাল লাগেনি
১. ৩০ শে আগস্ট, ২০০৮ রাত ১০:৫৬
comment by: রাতমজুর বলেছেন: শালার টেকনোলজীর অপব্যাবহার। আশেপাশে কিন্তু ঘটছে এরকম।
৩০ শে আগস্ট, ২০০৮ রাত ১১:৫১

লেখক বলেছেন: আমার ব্লগে স্বাগতম।
শুভেচ্ছা।

২. ৩০ শে আগস্ট, ২০০৮ রাত ১০:৫৮
comment by: মদন বলেছেন: লেখার হাত তো দারুন!
৩০ শে আগস্ট, ২০০৮ রাত ১১:০০

লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ,মদন।
আপনার জন্য শুভেচ্ছা।

৩. ৩০ শে আগস্ট, ২০০৮ রাত ১১:০৬
comment by: দূরন্ত বলেছেন: ভালো লিখেছেন। এক নিশ্বাসে পড়লাম। ভালো লাগলো....
৩০ শে আগস্ট, ২০০৮ রাত ১১:১০

লেখক বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ দুরন্ত। আপনার লগোটা খুব সুন্দর ।

৪. ৩০ শে আগস্ট, ২০০৮ রাত ১১:১০
comment by: চন্দন বলেছেন: জীবনমুখী পোস্ট +
৩০ শে আগস্ট, ২০০৮ রাত ১১:১১

লেখক বলেছেন: আমার ব্লগে স্বাগতম।
শুভেচ্ছা।

৫. ৩০ শে আগস্ট, ২০০৮ রাত ১১:৩১
comment by: |জনারন্যে নিসংঙগ পথিক| বলেছেন:
গল্প হোক আর সত্য হোক, আপনার লেখার হাত কিন্তু আসলেই ভালো...
৩০ শে আগস্ট, ২০০৮ রাত ১১:৩৫

লেখক বলেছেন: এটি একটি গল্প। আমি গল্প লিখতে ভালোবাসি।

মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ,জনারন্যে নিসংঙগ পথিক|
শুভেচ্ছা জানবেন।

৬. ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ সন্ধ্যা ৬:০৮
comment by: মোর্শেদ শেখ বলেছেন: গল্পটার জন্য ধন্যবাদ। ভালো লাগলো।
১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ রাত ১২:১৮

লেখক বলেছেন: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ। ভালোলাগা প্রকাশ করার জন্যও ধন্যবাদ।

৭. ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ রাত ১:২৪
comment by: সৈয়দ সাইফুল আলম শোভন বলেছেন: শুধু ভাল লেখক বললে কম হয়। তাই এজীবনের ১ম প্লাস আপনার।
১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ রাত ১১:৪২

লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ, আপনার মন্তব্যে অনেক অণুপ্রেরনা পেয়েছি....

৮. ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ রাত ৮:২৫
comment by: শোভন আরেফ বলেছেন: গল্প হয়তো সবার মাথাতেই থাকে, কিন্তু তার সার্থক প্রকাশ খুব সহজ নয়। আপনি সার্থক- ভালো লেগেছে। গল্প বলার ঢং-এ কিছুটা নাটকীয়তা ছিল বলেই মনে হয়েছে। আরো সহজ-সরল ভঙ্গী থাকলে হয়তো আরো কমিউনিকেটিভ মনে হতো। তারপরও আপনার বলার ভঙ্গীতে স্বকীয়তা আছে- পোষ্ট মর্ডানিজম বলা যেতেও হয়তো পারে। গভীর ভাবে না ভাবলে এভাবে লেখা সম্ভব নয়। ভালো লাগলো আবারো। থ্যাঙ্কস।।
১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ সকাল ৮:২৭

লেখক বলেছেন: ইউ ওয়েল কাম।

মনযোগ দিয়ে পড়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ। আরো ধন্যবাদ সুন্দর মন্তব্য করার জন্য। শোভন, ভালো থাকবেন।

 



 


পেশা সাংবাদিকতা। ভালোবাসি গল্প লিখতে।
আইনের ছাত্র ছিলাম । সুতরাং কপি রাইট সংরক্ষিত..
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

সর্বমোট হিট

 ৩২৫৩