৩.
শাহবাগ নেমে রাস্তা পার হয়ে তমিজউদ্দিন চলে আসে পিজি হাসপাতালের সামনে; এখানে একটা অর্ধচন্দ্রাকৃতি জায়গায় পিজির দেয়াল এবং দেয়াল সংলগ্ন কিছু চা-সিগারেট আর ফল-ফ্রুটসের দোকান ঘিরে হররোজ আঁতেলদের আড্ডা বসে। এখানে যারা আসে সবাই তমিজউদ্দিনের কমপক্ষে মুখচেনা। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, মুখচেনা হলেই তো আর আড্ডা জমিয়ে দেয়া যায় না। তার জন্য চায় ‘সোল সিস্টার’ এর মত সোল ব্রাদারের দল। এখন কোথায় পাওয়া যায় তাদের যারা তমিজউদ্দিনের সোল ব্রাদার? ডেভিড! ডেভিডকে পেলে বেশ হত; শালা আঁকিয়ে; পোঁদে কাপড় নেই, কিন্তু দেখ রং-তুলি-ইজেল-ক্যানভাস নিয়ে অবরাতদিন পড়ে আছে চিত্রকলার ঘোরে; ঘোর ওর কাটে না, যতক্ষণ না অরিত্রি আসে; অথচ অরিত্রি এসে কি করে? টিফিন ক্যারিয়ারে কিছু খাবার, সেটা গেলায় ডেভিডকে; তারপর আদরটাদর কিছু করে কিনা কে জানে- তমিজউদ্দিনদের সন্দেহ আছে, কারণ ওর চুলে যে পরিমাণ উকুন আর শরীরে যে পরিমাণে ময়লা তাতে আদর করতে হলে, পুকুর ভর্তি পানা সরিয়ে তারপর ডুব দিতে হবে; বড় হ্যাপা; অরিত্রি সে হ্যাপা পোহাবে কিনা সে অরিত্রিই জানে। তবে ডেভিড বলে, অরিত্রির সঙ্গে তার প্লেটোনিক লাভ; ওরা দুজন এক জায়গায় হলে ওদের শরীর নাকি বিলুপ্ত হয়ে যায়। ...ওরে বানচোত ডেভিড, বিজ্ঞান বলে পদার্থ কখনও বিলুপ্ত হয় না, একরূপ থেকে অন্য রূপে জাম্প করে মাত্র; শরীর পদার্থ, অতএব বিলুপ্তির ওপাড়েও একটা কিছু অবশেষ থাকে; সেই অবশেষ কি কামশূন্য? শালা গুল মারার আর জায়গা পাও না!
কিন্তু ডেভিডকে এখানে দেখা যাচ্ছে না। তাহলে হাতিরপুলের ঐ একরুমের ঘরটিতে আছে, অথবা হয়ত হাঁটছে, হন্টন না করলে নাকি ঢাকা শহরের রূপ-রস-গন্ধে অবগাহন করা যায় না। কিন্তু রমিজ কিংবা মৃনালকেও তো দেখা যাচ্ছে না। তাহলে কি করা যায়? রমিজের একটা মোবাইল আছে, কিন্তু সেই মোবাইলের নাম্বার তো তমিজউদ্দিনের কাছে লেখা নেই। রমিজ কবি, একটা দৈনিকে চাকরি করে, সাব এডিটর; এই যা! ওর আবার আজকে নাইট ডিউটি না তো? নাইট ডিউটি হলে অবশ্য পত্রিকার অফিসে ফোন করলে পাওয়া যাবে, কিন্তু পত্রিকার নামটাতো গোলমাল হয়ে যাচ্ছে; প্রথম আলো...না কি মহাকাল...না কি সমকাল..? এখানে অনেকেই অবশ্য জানে। কারো কাছে শুনলেই হয়ত বলে দেবে। কিন্তু ফোন নাম্বার? এবার নিজেকে কষে একটা গাল দিতে ইচ্ছে হয় তমিজউদ্দিনের; পাশেই পত্রিকার স্টল আছে, সেখান থেকে অবলীলায় নম্বরটা পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু পত্রিকার নামটাতো আগে দরকার। কিন্তু কারো কাছে শোনার মত স্ট্যামিনা পাওয়া যাচ্ছে না। শরীরের রিফ্লেকশন এখন জিরোতে আছে। মৃনাল শালাটা যে কি করে, এই আছে এই নেই; এই শোনা যায় সে ভীষণ ব্যস্ত প্যাকেজ নাটক বানানো নিয়ে, এই শোনা যায় পাথর সাপ্লাইয়ের কন্ট্রাক্ট পেয়েছে, আবার এই শোনা যায় খিলক্ষেতে একটা খাবার হোটেল খুলে বসেছে, আবার এই শোনা যায় সব ছেড়ে দিয়ে সাহিত্য চর্চা শুরু করেছে, মাঝখানে এডওয়ার্ড সাঈদের অরিয়েন্টালিজম বোঝার চেষ্টা করেছে ৬ মাস; ৬ মাস সম্ভবত বুড়িগঙ্গায় চলে গেছে। মাস দুয়েক আগে থেকে সে নিজেকে পরিচয় দিতে শুরু করল প্রেফেশনাল প্রেমিক হিসেবে; মাথায় বুদ্ধি থাকলে নাকি প্রেম করে দিব্যি পেট চালানো যায়; এখন যে সে কোন পরিচয়ে চলছে বলা মুশকিল। গত সপ্তাহে শেষ দেখা হয়েছিল, কিন্তু প্রফেশন নিয়ে কোন কথা হয় নি; আজ মৃনালকে আল্লা আল্লা করে পাওয়া গেলে তার সর্বসাম্প্রতিক প্রফেশনটা জেনে নিতে হবে। তমিজউদ্দিন এই সব ভাবতে ভাবতে ইতিউতি চোখ বুলাতে থাকে; বারেক মিয়ার ফলের দোকানে থরে থরে সাজিয়ে রাখা আপেলগুলোকে তমিজউদ্দিনের ইডেন গার্ডেন থেকে ইমপোর্ট করা বলে মনে হয়: ওগুলোতে এডাম আর ঈভের স্পর্শ আছে। ঢ্যাঙ্গা বাবলার হালিমের দোকানের সামনে খুব ভীড়; এ ভীড় সার্বজনীন; আর ভীড় হবেই বা না কেন? চার টাকা থেকে শুরু করে দশ টাকা পর্যন্ত নানা আকৃতির বাটি থাকায় শ্রেণী-নির্বিশেষে এই বাবলার হালিম খাওয়ার ঐদ্ধত্য দেখাতে পারে; কিন্তু শোনা যায়, ঐ হালিমে নাকি গরুর আপত্তিকর সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ মেশানো হয়। এই যেমন- জিহ্বা, লেজ, খুর, গোপনাঙ্গ ইত্যাদি। তবে সোয়াদ খারাপ না। তমিজউদ্দিন নিজেও অনেকবার খেয়েছে। যাহোক, ঐ ভীড়েও পরিচিত কারো চোহারা দেখা যাচ্ছে না। এখন কি করা? মাথার ভেতর তো বেড়ালটা মিউ মিউ করে ডেকে যাচ্ছে। ফাকিং ক্যাট! ব্লাডি শিট! তা বাবা হঠাৎ মাথার ভেতর ঢুকে গেলে কেন? বীণার নরম কোলে শুয়ে বসে বেশ তো দিন কাটাচ্ছিলে; এখন ঘিলুর ভেতর ঢুকে গেলে কোন সুখের আশায়? ধোয়া ছাড়া বেড়াল তাড়ানো যাবে না। ডেভিডের আখড়াই এখান থেকে সবচেয়ে কাছে। রমিজ থাকে রামপুরা; মৃণাল থাকে শনির আখড়া; অতএব ডেভিডের ওখানেই একটা চান্স নিয়ে দেখা যেতে পারে। শালাকে পেয়ে গেলে আর চিন্তা নেই। নৌকোয় ফুল স্পিড তুলে দেয়া যাবে।
যেই ভাবা সেই কাজ। একটা রিক্সা নিয়ে সোজা হাতিরপুল। দরজায় তালা নেয় দেখে তমিজউদ্দিনের মনে টাক ঢুমাঢুম টাক! মানে, আছে। ডেভিড আছে। হাতের চেটো দিয়ে দরজায় নক করে তমিজউদ্দিন। টক টকা টক। টক টকা টক। টক টকা টক। পাগলা আর্টিস্টটা দরজা খুলতে দেরী করছে কেন? সেকেন্ড গড়িয়ে যায়; মিনিট গড়িয়ে যায়। টক টকা টক। টক টকা টক। টক টকা টক। শালা টেসে গেল নাকি? ডেভিড মরে গেলে ওর সমাধির উপর বন্ধুরা মিলে একটা গাঁজার চারা প্লান্ট করবে; আচ্ছা, গাঁজার গাছ কোথায় পাওয়া যায় সস্তায়? টক টকা টক। টক টকা টক। টক টকা টক।
এবার দরজাটা খুলে যায়; কিন্তু সামনে যে দাঁড়িয়ে সে কিছুতেই ডেভিড হতে পারে না, কারণ যে বডিটা সামনে দাঁড়ানো সেটা স্ত্রীলিঙ্গের অধিকারী; অবশ্য লালচে ঝাঁকড়া চুল বিস্রস্ত হয়ে যেভাবে মুখের উপর এসে পড়েছে, তাতে ডেভিড যে একটা শালোয়ার-কামিজ পড়ে এসে সামনে দাঁড়ায় নি, সে কথা প্রথম দেখায় কে বলবে? সামনে দন্ডায়মান বডিটা এবার মুখের উপর থেকে চুল সরিয়ে নিলে তমিজউদ্দিন চিনতে পারে; অরিত্রি। চোখদুটো ফুলে ঢোল; চোখের সামান্য অংশই গহ্বরের বাইরে আছে; তবে যেটুকু আছে রক্তের মানচিত্র সেটুকু ঢেকে ফেলেছে। অরিত্রি কোনদিনই সুন্দরী ছিল না, কিন্তু এখন বড্ড বেশি অসুন্দর লাগছে।
তমিজউদ্দিন ডাক দেয়, অরিত্রি!
অরিত্রি তাকিয়ে আছে, তবে ঠিক তমিজ উদ্দিনের দিকে নয়, তার ডান কানের নিচ দিয়ে পেছনের শাদা দেয়ালের দিকে।
তমিজউদ্দিন ফের ডাক দেয়, অরিত্রি! ডেভিড কি ভেতরে আছে?
অরিত্রি বলে, আরেব্বাস! এত বড় টিকটিকি! টিকটিকি এত্ব বড় হয় অ্যা?
তমিজউদ্দিন ঘাড় ঘুরিয়ে দ্যাখে, সত্যিই তো! এত বড় টিকটিকি সে কোন দিন দেখে নি। একটা ছোটখাটো গুইসাপের মত। অরিত্রির দিকে ফিরে বলে, সাইজটা সত্যিই বড়। কিন্তু আপনার বিস্ময়ের সাইজটা তো দেখছি আরো বড়!
অরিত্রি বলে, আপনি তমিজ ভাই না?
জ্বি।
অনেকদিন পর দেখলাম, তাই না?
জ্বি।
আসলে অত বড় টিকটিকি আগে কখনও দেখিনি তো। আসেন, ভেতরে আসেন। তমিজউদ্দিনের মনে হয় যেন একটা কাকতাড়ুয়ার মুখ থেকে কথাগুলো বেরিয়ে আসছে। ঘটনা কি? মুখে একটু পানসে ধরনের হাসি আনার চেষ্টা করে তমিজউদ্দিন বলে, চলেন, পাগলাটা কৈ? বলতে বলতে ভেতরে ঢুকে পড়ে; অরিত্রি রোবটের মত খানিকটা পিছিয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকে। ঘরে রুম মূলত একটাই। রুমটুকু বাদ দিলে একটা কিচেন, একটা বাথরুম; এই রুমেই ডেভিডের শোয়া বসা এবং ছবি আঁকা। কোন খাট নেই। একটা সেমিডাবল সাইজের তোষক মৃতের মত বেডশিটের কাফনে ঢাকা; বেডশিটটা আবার সংখ্যাহীন জল-রং তেল-রং এর ছাপছোপে জর্জরিত; ওটার উপরেই ঠ্যাং ছড়িয়ে বসে হাঁক ছাড়ে তমিজউদ্দিন, ডেভিড।
অরিত্রি বলে, ও নেই।
কোথায়?
ঠিক জানি না। আচ্ছা তমিজ ভাই, আপনি গাঁজা খান?
খাই মানে? ওটা খাব বলেই বলেই তো আসা। কিন্তু ডেভিড কোথায় বলেন তো?
অরিত্রি আবার বলে, ঠিক জানি না। কথাটা যেন একটা কাকতাড়ুয়ার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে।
আপনাকে ওরকম নিষ্প্রাণ লাগছে কেন? প্রশ্নটা না করে পারে না তমিজউদ্দিন। ডেভিড কোথায়? ওর সঙ্গে আপনার দেখা হয় নি?
না। ঠিক দেখা হয় নি।
তাহলে ঘরে ঢুকলেন কেমন করে? প্রশ্নটা করতে করতে তমিজউদ্দিন ভাবে, মামদোর পুত শহর পরিভ্রমণে বেরিয়েছে! তা বেরিয়েছিস ভাল কথা বালিকাটার সাথে একটা দফারফা তো করে যাবি। বেচারি তোকে না পেয়ে সমস্ত যৌবন লুজ করে একটা কাকতাড়ুয়া হয়ে গেল; এটা একটা কথা হল!
অরিত্রি বলে, আমার কাছে একটা চাবী থাকে তো!
বেশ! মনে মনে বলে তমিজউদ্দিন। চাবী তো তোমাদের কাছেই থাকবে। সব পুং-শিল্পীদের চাবী-কাঠিই নাকি সঙ্গিনীদের কাছে থাকে।
আপনি কখন এসেছেন এখানে?
আমি দু’দিন ধরে তো এখানেই আছি।
ঐ ভাল্লুকটার সাথে?
না। ওর আঁকা ছবিগুলোর সাথে।
তাহলে ও কোথায়?
ঠিক জানি না।
ফের কেমন জানি করতে থাকে তমিজউদ্দিনের মাথার ভেতর। কেমন যেন ব্রেক ফেল করা ব্রেক ফেল করা অনুভুতি। একটা তার আরেকটার সাথে পেঁচাতে শুরু করেছে। এখন প্রসঙ্গ পরিবর্তন করার চেয়ে উত্তম ওষুধ আর নেই।
এই এই আপনি কি যেন গঞ্জিকা-টঞ্জিকার কথা বলছিলেন?
আপনি কল্কে সাজাতে পারেন? অরিত্রি বলে।
কেন পারব না! আপনি দম দেবেন নাকি?
হ্যা। দুপুর থেকে চেষ্টা করছি, কিন্তু পারছি না। ডেভিড খুব ভাল পারে। কিন্তু আমাকে শেখায় না। হি ইজ আ ভেরি সেলফিস গাই। বলতে বলতে তমিজউদ্দিনের থেকে হাত দেড়েক দূরে নিপাট মেঝের উপর পা দুটো ভাঁজ করে বসে পড়ে অরিত্রি।
তমিজউদ্দিন বলে, ভুল। ডেভিডকে আমরা উদার হিসেবেই জানি।
ভুল জানেন। ভুল জানেন। হঠাৎ প্রায় চিৎকার করে ওঠে অরিত্রি। অবাক হয়ে যায় তমিজউদ্দিন। ফারজানার সাথে সন্ধ্যেটা একটা গল্পের মত ছিল; সেই গল্পের ভেতর থেকে বের হয়ে সে কি আবার আর একটা গল্পের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে?
নিজের সুখ ছাড়া ডেভিড আর কিছু জানে না, অরিত্রি বলে ভাঙা বেসুরো গলায়। এই কথা এখন বিশ্বাস করতে হবে তমিজউদ্দিনকে; কিন্তু কাজটা খুব ডিফিকাল্ট। যে ডেভিড নিজের শিল্প-বোধ বিসর্জন দিতে হচ্ছে দেখে এক কথায় মাল্টি-ন্যাশনাল অ্যাড ফার্মের হ্যান্ডসাম স্যালারির চাকরি ছেড়ে চলে আসতে পারে, সে নিজের সুখ ছাড়া আর কিছু বুঝবে না, মতামতটা স্বীকার করে নেয়া খুব কঠিন।
যাকগে, ওসব বাদ দেন, বলে অরিত্রি। ডেভিডের ভান্ডো চুরি করে খানিকটা গাঁজা পেয়েছিলাম। দুপুর থেকে অনেক চেষ্টা করে দুটো সিগারেটের ভেতর ভরে খেয়েছি। কিন্তু নেশাটা ঠিক জমছে না। কল্কিটা সাজাতে পারছি না। ক্যান ইউ হেল্প মি তমিজ ভাই?
তমিজউদ্দিন বুঝতে পারে, একটা গল্পের মধ্যে সে ঢুকে যাচ্ছে। অনেক প্রশ্ন মাথার ভেতর, ঘিলুর ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে; দু’দিন ধরে অরিত্রি এখানে থাকছে; ডেভিড নেই; ডেভিড কোথায়? রাত বাড়ছে। কল্কি ডাকছে অরিত্রিকে। এসবের মানে কি? সবকিছুর মানে বোঝার চেষ্টা করো না তমিজউদ্দিন। গল্প রিড করতে হলে নিজেকে নির্ভার করে দাও; গল্প তোমাকে পড়বে; তুমিও গল্প পড়বে।
ওকে ফাইন। কল্কিটা আনেন, তমিজউদ্দিন বলে।
অরিত্রি উঠে যায়। দু’তিনটা ছবি দেয়ালে ঠেস দিয়ে রাখা; উপরের ছবিটা অসমাপ্ত। ছবি এবং দেয়ালের মাঝে যে ত্রিভূজ সৃষ্টি হয়েছে সেখান থেকে কল্কিটা টেনে বার করে; একটা কাগজের পুটলিও বের হয়; সরঞ্জামগুলো তমিজউদ্দিনের সামনে এনে রাখে। তমিজউদ্দিন কথা না বাড়িয়ে কল্কি সাজাতে বসে।
ঐ দ্যাখেন ছবিগুলোর পাশে নারকেলের ছোবড়া দেখা যাচ্ছে, একটু কষ্ট করে নিয়ে আসবেন?
অবকোর্স। অরিত্রি যায়; ছোবড়া আসে। তৈরি হতে থাকে কল্কি।
অরিত্রি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকে। তারপর হঠাৎ বলে, একটা টিকটিকির লেজ দিলে কেমন হয়?
কোথায়?
কল্কির ভেতরে।
টিকটিকির লেজের খবরও জানেন দেখছি।
থাকগে বাদ দেন।
আবার গভীর মনোযোগ দিয়ে কল্কির প্রস্তুত প্রক্রয়া নিরীক্ষণ করতে থাকে অরিত্রি। হাত চালাতে চালাতে তমিজউদ্দিন দেয়ালে ঠেস দেয়া ছবিগুলোর দিকে তাকায়; উপরের ছবিটা অসমাপ্ত। কি আঁকতে চলেছে ডেভিড? একটা তারা মাছের মত কি যেন...একটা অক্টোপাস? অস্পষ্ট; মানুষের মত কিছু উদ্ভিদ; শরীররটা মানুষের, কিন্তু মাথার জায়গায় একগুচ্ছো ডাল-পাতা; এরকম মানুষের মত উদ্ভিদ অসংখ্য, যেন কাট-পেস্ট করেছে; সবকিছু একটা নীল ঢেউয়ের ভেতর; কিসের ঢেউ? সমুদ্র? ডেভিড কি ওয়াটার ওয়ার্ল্ডের ছবি আঁকছে?
তমিজউদ্দিন হাতের কাজ শেষ করে টিকায় আগুন লাগায়, তারপর বাড়িয়ে দেয় অরিত্রির দিকে।
দম দেয়ার অভ্যেস আছে? তমিজউদ্দিনের প্রশ্নের উত্তরে না বোধক মাথা নাড়ায় অরিত্রি। বলে, তবে পারব বলে মনে হচ্ছে। কল্কি হাতে নেয়; পেছনের নির্গমনমুখে আঙ্গুলগুলো দিয়ে একটা চোঙা বানিয়ে মুখের সাথে চেপে ধরে দেয় টান; তমিজউদ্দিনের চোখের সামনে টিকায় অগ্নি-স্ফুলিঙ্গ তৈরি হয়; গল গল করে মুখ দিয়ে ধোয়া ছাড়ে অরিত্রি; প্রথম চোটেই পেরেছে; প্রতিভা আছে মেয়েটির। তবে প্রথম চোটেই এত জোরে টানাটা ঠিক হয় নি; চোখমুখ বেরিয়ে আসতে চাইছে; সামলাতে পারবে তো? অরিত্রি মিসমিসে কালো রঙের কল্কিটা বাড়িয়ে দেয় তমিজউদ্দিনের দিকে; ছোটখাটো নিবিড়-নির্ঝঞ্ঝাট মৃন্ময় এই জিনিসটা ডেভিড কিনেছিল কুষ্টিয়ার লালনের আখরা থেকে। তা প্রায় বছর তিনেক আগে। বেশ ভাল সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছে। তমিজউদ্দিন টান দেয়; চমৎকার! মসলাটা দারুণ হয়েছে। তড়িঘড়ি না করে খুব অভিজ্ঞ আঁতেলদের মত ধীরে সুস্থে রসিয়ে রসিয়ে খেতে পছন্দ করে তমিজউদ্দিন।
এত তড়িঘড়ি করবেন না। ধীরে সুস্থে টানেন। তমিজউদ্দিন উপদেশ দেয় অরিত্রিকে। অরিত্রি মাথা ঝাঁকায়। মানে ‘অল রাইট গুরু’। এবার কল্কিতে প্রলম্বিত একটা টান দিয়ে তমজিউদ্দিনকে দিলে, তার হঠাৎ খেয়াল হয় ডেভিডের অনুপস্থিতি ঘরের ভেতর কেমন যেন আটকা পড়া ড্যাম্প বাতাসের মত গুমড়াচ্ছে। ডেভিড কোথায়? ধোয়ার ঝাঁঝে ঘিলুর ভেতরের কুয়াশা কেটে ফ্রেশ চিন্তা-কাঠামোটা একটু উঁকিঝুঁকি দিতেই ডেভিড তড়িঘড়ি একটা টান দিয়ে অরিত্রির হাতে কল্কিটা তুলে দিয়ে প্রশ্ন করে, এই এই বলেন তো ডেভিড কোথায়?
কোন ব্যস্ততা দেখা যায় না অরিত্রির ভেতরে। পর পর কয়েকটা টান মারে সে, তারপর হাতিয়ারটা অপরপক্ষের হাতে দিয়ে কেমন যেন ঝিমিয়ে পড়ে। ঘাড়টা একদিকে কাত করে দেয়। তমিজউদ্দিন আরেকবার টান দেবার আগে ফের প্রশ্নটা করে নেয়, বলেন তো ডেভিড কোথায়?
অরিত্রি বলে, সমুদ্রে গেছে।
তমিজউদ্দিনের এবারের টানটাতে মাথার ভেতরে কোন ধোয়া ঢোকে না; ঢোকে সমুদ্রের ঢেউ; আর ঢোকে হু হু আর্দ্র বাতাস; আর ঢোকে সমুদ্রের ফেনা; ফেনা ঢুকেই তার সর্বনাশটা হয়; ফ্রেশ চিন্তা-কাঠামোটা ফেনায় ফেনায় সয়লাব হয়ে যায়। ডেভিড শালা একা একা সমুদ্রের ঢেউ খাচ্ছে!
কবে গেছে বলেন তো?
জানি না।
কবে ফিরবে?
ফিরবে না।
ওকে ফাইন। না ফেরাই ভাল। কোথায় ফিরবে? এটা একটা শহর হল! অরিত্রি আপনি বেশি টাইনেন না। সামলাতে পারবেন না। প্রথম তো...
আমি তো সামলাতে চাচ্ছি না। যেহেতু ডেভিড আর ফিরবে না, আমি আর কি সামলে রাখব...
ঐ ছবিটা দেখেই আমি বুঝতে পেরেছি, ওকে সমুদ্র রোগে ধরেছে। আরো একটা টান দেয় তমিজউদ্দিন; তার কথাগুলো যেন ওয়াটার ফিল্টারের মত অনেক গুলো শিলা-স্তর পেরিয়ে তবে প্রক্ষেপিত হচ্ছে বাতাসে। আর কয়েকটা টান দিলে ডেভিড কেন সে নিজেই সমুদ্রে চলে যাবে, ভাবে তমিজউদ্দিন।
কিন্তু তমিজউদ্দিনের সমুদ্র-বাসনাকে চুর চুর করে দিয়ে হাউ মাউ করে কেঁদে ওঠে অরিত্রি।
হোয়াই আর ইউ ক্রাইং বেবি?
ডেভিড সমুদ্রে ভেসে গেছে!
আপনি কোত্থেকে খবর পেলেন? সংবাদমাধ্যম থেকে? তমিজউদ্দিন বিস্মিত হয়; কিন্তু বিস্ময়টা ঠিক স্থির হয় না, বালুতীরে এসে ঢেউ ভেঙে যাওয়ার মত করে বিস্ময়টাও ভেঙে ভেঙে যায়; খুব অশান্তি হয় তমিজউদ্দিনের; থিং গোজ রং- ধারণাটা তার ভেতরে এক ধরনের অশান্তির জন্ম দেয়; ঢেউ কেন ভেঙে ভেঙে যায়; বাতাস কেন ভেঙে ভেঙে যায়? কেন আগুন-মৃত্তিকা সব ভেঙে ভেঙে যায়?
মশলা ফুরিয়ে গেছে। আগুন নিবে গেছে। ছাইগুলো মেঝেতে ঢেলে রাখে তমিজউদ্দিন। আর অরিত্রি একটু ঝুঁকে ডেভিডের বিছানার উপর থেকে হ্যান্ডব্যাগটা টেনে নিয়ে তার ভেতর থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করে তমিজউদ্দিনের হাতে দেয়; অনেক কিছুকে অনেকভাবে কাঁপতে দেখেছে সে, কিন্তু অরিত্রির হাত যেভাবে কাঁপছে তার যথাযথ উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যায় না।
তমিজউদ্দিন কাগজটা নেয়; তার হাতও কাঁপছে; তবে কম্পনটা নিয়ন্ত্রিত। একটা চিঠি; অথবা ঠিক চিঠি নয়, একটি প্যারাগ্রাফ। কিন্তু অক্ষরগুলো বড্ড বিটকিলে আচরণ করছে; একটা আরেকটার উপর লাফিয়ে উঠে পড়ছে; তবে চোখদুটো ভাল করে রগড়ে নিলে অক্ষরের ব্যাঙাচির মত লাফালাফি কিছুটা শান্ত হয়ে আসে; শব্দগুলো চেনা যায়-শব্দার্থও; শব্দের পথ ধরে এগোলে বাক্যগুলো তাদের অন্তর্নিহিত অর্থের ফটক থেকে ব্যারিকেডগুলো সরিয়ে নিলে বিষয়টি দাঁড়ায় নিম্নরূপ:
...আমার ধারণা এই চিরকুটটা প্রথম তোমার হাতেই পড়বে অরিত্রি। শোন, আমি চলে যাচ্ছি সমুদ্রে। আমি তো মাছ নই যে সমুদ্রে গিয়েও বেঁচে থাকব (তবে মানুষের ফুলকা থাকলে ভাল হত!)। আমি আসলে ভেসে যেতে চাই সমুদ্রের গহীন ভেতরে। মানুষের ভেতরটা বড় বেশি ফাঁকা। আর কিছুই একপ্লোর করার মত নেই। এই শহরও এখন অসহ্য হয়ে উঠেছে। সবকিছু নষ্টদের অধিকারে চলে গেছে। এদেশের সামনে কোন স্বপ্ন নেই; অন্তত স্বপ্নটা থাকলে সেই স্বপ্নের পোস্টমর্টেম করতে করতেও তো অনেকদিন বাঁচা যায়! আমি সত্যি বলছি অরিত্রি, তোমার ভেতরেও নতুন করে পড়ার কিছু নেই। শুধু শরীর নিয়েও বাঁচা যায়। কিন্তু এক ছাদের নিচে বসবাস করা আমাদের কোনদিন হবে না। কেন- তা তুমিও জানো, আমিও জানি। যীশুর কসম খেয়ে বলছি, পৃথিবীর কোন ধর্মের প্রতি আমার ঘৃণা নেই, কিন্তু ভালবাসা নেই এক ফোটাও; কেন নেই তা তুমিও জানো, আমিও জানি। এই চিরকুট যখন তোমার হাতে পৌঁছবে, তখন আমি কোথায় - অতলান্ত সমুদ্রের মাঝে হয়ত হাঙ্গরের খাদ্য হয়ে গেছি...
ডেভিড
বিস্ময়ের সাথে নেশা মিশে গিয়ে একটা অভূতপূর্ব অনুভুতি তমিজউদ্দিনকে গ্রাস করে নেয়; যেন একটা হাঙ্গর তাকে একটু একটু করে খেতে শুরু করেছে, পা থেকে; কিন্তু কোন ব্যাথা নেই।
এই চিরকুট আপনি কোথায় পেয়েছেন? তমিজউদ্দিনের প্রশ্ন।
এখানে, ডেভিডের বিছানায়।
কখন?
দু’দিন আগে। তিনদিন আগে সকালে আমি একবার এসেছিলাম ওর সঙ্গে দেখা করতে। তালা দেখে ফিরে যায়। বিকেলে এসে দেখি তালা। পরদিন সকালে ফের দেখি তালা। আমার সন্দেহ হয়। কিছুদিন ধরে ডেভিড আবোল-তাবোল বকছিল। মৃত্যু-টিত্যু নিয়ে কথা বলত। বাড়িওয়ালা আঙ্কেলের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভাল। আপনারা তো জানেন উনি আর্টের ফ্যান। ডেভিডকে উনিই এখানে জায়গা দিয়েছেন, অল্প ভাড়ায়। উনার কাছ থেকে বিকল্প চাবীটা এনে ঘর খুলে চিঠিটা পাই। তারপর থেকে এখানেই আছি।
আঙ্কেল কিছু বলে না?
ওনাকে সবকিছ খুলে বলেছি।
এখানে পড়ে আছেন কেন? আপনার কি ধারণা ডেভিড ফিরে আসবে?
না, ডেভিড ফিরে আসবে না। ও কখনও মিথ্যে কথা বলে না।
তবে পড়ে আছেন কেন?
কিছুক্ষণ ঝিম মেরে থেকে অরিত্রি বলে- বেশ দৃঢ়তার সাথেই বলে, মরব বলে।
হোয়াট ডু ইউ মিন?
আত্ম-হত্যা। দুদিন ধরে চেষ্টা করছি, পারছি না। তবে এবার পারব। আজ রাতেই ঘটনাটা ঘটবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিষয়টির নিষ্পত্তি করা দরকার। জানেন তো আমার বাবার অনেক ক্ষমতা। হি ইজ আ পলিটিক্যাল ইনফুয়েন্সিয়াল গাই। আমাকে খুঁজে বের করে ফেলবে। তার আগেই...
আত্মহত্যাটা কিভাবে করবেন- তার কোন ডিসিশন নিয়েছেন?
হ্যা। একটা সিরিঞ্জ জোগাড় করে এনেছি। খুব সিম্পল। ভেনের ভেতরে বাতাস পুশ করে দেয়া। বুদবুদগুলো হৃদপিন্ডে পৌঁছে গেলেই...ব্যস...ঘন্টা খানেকের ভেতর সবকিছু শেষ হয়ে যাবে।
খুব কষ্ট পেতে হবে কিন্তু...
আমি কষ্ট পেয়েই মরতে চাই। একবার ভাবুন তো ডেভিডের কথা। কত কষ্ট পেয়ে মরেছে!
তমিজউদ্দিন চোখের সামনে দেখতে পায়- একটা হিংস্র সমুদ্র; ডেভিডকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে; ডেভিড হাবুডুবু খাচ্ছে; ওর পেট গলা ফুসফুস নোনাপানিতে ভরে গেছে; ডুবে যাচ্ছে সে; চোখের সামনে লাল-নীল সব তারকারা এসে জড়ো হচ্ছে; আগুন; সমুদ্রের সব জল আগুনের লেলিহান শিখা হয়ে গ্রাস করতে আসছে; একটা আগ্নেয়গিরির ভেতর তলিয়ে যাচ্ছে ডেভিড; হাঙ্গর; একটা নয়, ঝাঁকে ঝাঁকে তার পাশে এসে ভীড় করে; একেকটা হাঙ্গর তার এককটা অঙ্গ-প্রতঙ্গের দখল নেয়। ধারালো দাঁতগুলো বসে যাচ্ছে ডেভিডের হাতে-পায়ে-আঙ্গুলে-নাকে-কানে-গলায়-কাঁধে-পিঠে-যৌনাঙ্গে... মুখ দিয়ে রক্তের বুদবুদ উঠে মিশে যাচ্ছে সমুদ্রের জলে-আগুনে; কি যেন বলার চেষ্টা করছে ডেভিড; শুনতে পায় না তমিজউদ্দিন; সমুদ্রের জল আর আগুনের ফেনা মস্তিষ্কের মূল্যবান সিন্যাপ্সগুলো গ্রাস করে ফেলছে।
অরিত্রি বলে, নেশার ঘোরে আপনাকে সবকিছু বলে ফেলেছি। আশা করব আপনি আমার বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন না।
তমিজউদ্দিন বলে, নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন। আমি কারো বিরুদ্ধে দাঁড়ায় না। কিন্তু আপনি আত্মহত্যা করতে যাচ্ছেন কেন- জানতে পারি?
ডেভিডকে ছাড়া জীবন অর্থহীন বলে।
একজন প্রমিন্যান্ট ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্টের কন্যা। কোন কিছুর অভাব নেই আপনার, কেন মিছেমিছি একজন পাগলা আর্টিস্টের জন্য জীবন দেবেন...
ডেভিডও তো আমার জন্য জীবন দিয়েছে...
ডেভিড চিরকুটে কি লিখেছে নিশ্চয় মনে আছে আপনার? আপনার ভেতরে নাকি নতুন করে পড়ার কিছু নেই। এ লাইনটির ভেতরে কিন্তু প্রচ্ছন্ন বিদ্রুপ আছে...
আছে। স্বীকার করছি। কিন্তু এ কথাও সত্যি যে, পৃথিবীতে ডেভিডই একমাত্র মানুষ যে আমাকে পড়ে শেষ করতে পেরেছে।
হঠাৎ ঘরের পরিবেশটা পাল্টে যায়; দেয়ালে, মেঝেতে এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ডেভিডের আঁকা ছবিগুলো থির থির করে কাঁপতে থাকে। তমিজউদ্দিনের মনে হয় আজরাইল একটা বিশেষ এসাইনমেন্ট নিয়ে এ ঘরে ঢুকে পড়েছে। তার প্রচ্ছায়া, তার বিদ্যুৎ তড়িতায়িত করেছে এ ঘরের প্রতিটি বস্তুকে; ঘরটা এখন মৃত্যুকূপ হয়ে গেছে; পালাতে হবে এখান থেকে। কিন্তু এই মেয়েটির কি হবে? আত্মহত্যাকে সে শিল্পের পর্যায়ে ফেলে ভাবতে শুরু করেছে। একে কিভাবে বাঁচানো যায়? আবার কথা দিয়ে ফেলেছে, সে মেয়েটির বিপক্ষে গিয়ে দাঁড়াবে না। অথচ তারই চোখের সামনে দিয়ে মেয়েটা একটু একটু করে আত্মহত্যার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
অরিত্রি আত্মহত্যার বাসনাকে ভেতরে পোষণ করছে; তমিজউদ্দিনের উচিত তার বাসনাকে শ্রদ্ধা করা। কিন্তু শ্রদ্ধা করতে পারে না তমিজউদ্দিন; আমি এখনও মানুষের পর্যায়ে উন্নিত হইনি, মনে হয় তার।
অরিত্রির চিন্তা-চেতনা এখন একটি মাত্র ট্র্যাক ধরে চলছে; গঞ্জিকার মৌতাত আরো শক্ত করে তার চিন্তা-চেতনাকে চলমান ট্র্যাকের সাথে আকড়ে ধরে রাখছে। শুধু আজকের রাতটা যদি কোন ভাবে তাকে নিবৃত্ত করা যায়, তবে হয়ত নতুন সূর্যদয়ের সাথে সাথে তার ভেতরে নতুন চেতনার উদয় হবে। কিন্তু এই একটি রাত তাকে কিভাবে আটকে রাখা যাবে? ভাবতে থাকে তমিজউদ্দিন। পথ খুঁজতে থাকে...
আচ্ছা, কথা চালিয়ে যাওয়া যাক; তমিজউদ্দিন ডাক দেয়, অরিত্রি।
বলেন।
আপনার আত্মহত্যার বাসনাকে আমি শ্রদ্ধা করি বলে বলছি, ডেভিড তো সমুদ্রে ভেসে গেছে, তাহলে আপনি কেন সমুদ্রে যাচ্ছেন না?
এখানে আমি সমুদ্র কোথায় পাব?
কক্সবাজার চলে যান। আজ রাতেই আমি আপনাকে কক্সবাজারের বাসে তুলে দিচ্ছি। সকাল সকাল পৌঁেছ যাবেন। তারপর...
সেটা সম্ভব নয়। ধরা পড়ে যাব। বাবার লোকজন, পুলিশ গোয়েন্দা চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। বাইরে বেরোনো যাবে না।
তমিজউদ্দিন হতাশায় আক্রান্ত হয়। এ মেয়েকে বাঁচানোর কোন রাস্তাই বোধ হয় আর খোলা নেই। কিন্তু তমিজউদ্দিনের কি হবে? অনেকেই তাকে এ ঘরে ঢুকতে দেখেছে। বের হতেও দেখবে। এটাই স্বাভাবিক। অরিত্রি আত্মহত্যা করলে তমিজউদ্দিনও ফেঁসে যাবে। পুলিশ তাকে সন্দেহ করবে। তমিজউদ্দিন ভাবে, এটাকেই অস্ত্র বানালে কেমন হয়?
অরিত্রি, একটা সমস্যা কিন্তু থেকে যাচ্ছে...
আমার মৃত্যুর পর আর কোন সমস্যাই থাকবে না।
এটা আপনার ভুল ধারণা। এই যে আমি আপনার সাথে কিছুক্ষণ এ ঘরে থেকে গেলাম, এখবর কিন্তু অনেকেই জানে। আপনার মৃত্যুর পর যখন জানাজানি হবে, তখন পুলিশ আমাকে ফাঁসাবে, আপনার মৃত্যুর জন্য আমাকে দায়ী করবে।
এবার অরিত্রিকে কিছুটা অবসাদগস্ত হতে দেখা যায়। দেয়ালের দিকে তাকিয়ে আছে; চোখে শূন্যতা। একটু ভেবে অরিত্রি বলে, আমি একটা চিরকুট লিখে রেখে যাব “আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়”।
আমি আপনাকে হত্যা করার আগে জোর করে ঐ কথাটা যে লিখিয়ে নিইনি তার কোন প্রমাণ থাকবে?
এবার অরিত্রির চোখে এক মহাকাশ শূন্যতা। নিদারুণ বিষাদে মাথাটা কাঁেধর সাথে প্রায় মিশিয়ে দিয়ে বলে, তাহলে?
তমিজউদ্দিন বলে, ডেভিড আপনার বন্ধু ছিল, সেই অর্থে আমিও আপনার বন্ধু। আমার একটা কথা আপনি রাখুন। আজকের রাতটা আপনি বাঁচুন। কাল না হয় ফের ডিসিশন নেবেন...
অরিত্রি থ’ মেরে বসে থাকে। সময় গড়িয়ে যায়। একটা টিকটিকি ডেকে উঠলে বলে, আমি দু’দিন থেকে কিছু খাইনি। আপনি যাওয়ার আগে আমাকে কিছু খাবার কিনে দিয়ে যাবেন?
তমিজউদ্দিনের কেন যেন মনে হয়, এখন গল্পটা অন্য খাতে প্রবাহিত হবে। তাহলে, তমিজউদ্দিন- গল্পকেও তুমি পাল্টে ফেলতে পারো! তোমার তো দেখা যাচ্ছে, অসীম ক্ষমতা...
তমিজউদ্দিন অরিত্রিকে বলে, আমি আপনার জন্য ঢাকা শহরের সবচেয়ে সুস্বাদু খাবার এনে খাওয়াবো। (চলবে........)
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা মে, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:৫৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


