somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নারী : তবু স্বপ্ন দেখে মন

৩০ শে আগস্ট, ২০১০ দুপুর ১২:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


'তোমাকে ভালোবাসি বলেই বেঁচে আছি। তোমার জন্যই লড়বো, যেমন করে লড়ে যাচ্ছি। তোমার জন্যই প্রাণ দিচ্ছি। আমার নামের সাথে দুঃখ জড়িয়ে নেই।'

'জীবনের কাছে আমার চাওয়া ছিল খুবই সামান্য। একটা ছোট্ট কুঁড়েঘর, কিছু গবাদি পশু আর আবাদযোগ্য খানিকটা জমি। কিন্তু তোমাকে দেখার পর উপলব্ধি করলাম : 'না, কেবল এটাই নয়- আরো অনেক কিছু চাই আমি।'

শোয়েবের মধুমাখা সেই চিঠিগুলোর কথা এখনো কানে বাজে অপর্ণার। পুরো নাম আন্তরিক রহমান অপর্ণা। একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির এক্সিকিউটিভ। সুন্দরী ও স্মার্ট। অথচ দেখে বোঝার উপায় নেই, কত্তো বড় একটা বিয়োগান্তক নাটকের নায়িকা সে।

আটপৌরে জীবনে তার চাওয়া পাওয়া খুব একটা ছিল না। সাধ ছিল ছোট্ট একটি জীবনের। যেখানে সুখ আছে, দুঃখ আছে। প্রাচুর্য আছে, দৈন্যও আছে। আর আছে এগুলো সমানভাগে ভাগ করে নেয়ার জন্য মনের মত একজন সঙ্গী, যাকে নিয়ে সাগর সৈকতে দাঁড়িয়ে অস্তাচলগামী লাল টুকটুকে সূর্যটাকে বিদায় সম্ভাষণ জানানো যায়। যাকে নিয়ে কর্ণফুলী নদীর বুক বেয়ে দূর অজানায় হারিয়ে যাওয়া যায়। যাকে নিয়ে জীবনের সবটুকু পথ সহজেই পাড়ি দেয়া যায়।

শোয়েবের সুগার কোটেড বাতচিতে অপর্ণা মুগ্ধ হয়ে যেত, নিজেকে হারাত। বাবা-মার প্রবল আপত্তি উপেক্ষা শোয়েবকে নিয়ে ঘর বাঁধে। জীবনের স্বপ্ন গাঢ় হয়। কিন্তু তার চারপাশের পৃথিবী পাল্টে যেতে দেরি হয়নি। তবে এখানে ওখানে রেখে গেছে সময়ের দাগ। এখন তার চিরচেনা স্বপ্নের জগতটাই সেই কর্কট, যে নিজেকে নিজে খেয়ে ফেলছে। প্রতিক্ষণে মনে জাগছে একটি অবিশ্বাসী প্রশ্ন-- এ স্বপ্ন তার জীবনের শুরু, নাকি শেষ?

স্বপ্নভঙ্গের নালিশ সে এখন কাকে জানাবে? হাতে মেহেদির গন্ধটুকু না শুকাতেই অন্যরকম শোয়েবকে সে চিনতে পারে। পরনারীর প্রতি তার ভয়াবহ আসক্তির কারণে শারীরিক নির্যাতনকেও অপর্ণার কাছে পানসে মনে হয়। জীবনটাকে নতুন করে শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়েও থমকে গেছে। কারণ অফিসে বিগবসদের লোলুপ দৃষ্টির কথা মনে পড়লে গায়ে কাঁটা দেয়। স্বপ্ন ভেঙে চৌচির হওয়ায় প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিজেকে সমৃদ্ধ করার সাহসটুকু হারিয়ে ফেলেছে। তার কানে বার বার বাজে সোরেন কিয়ের্কে গার্ডের সেই ফিলোসফিক্যাল ফ্যালাসি :

'সে বৃদ্ধ হতে পারে না। কারণ সে কখনো তরুণ ছিল না। এক অর্থে সে মৃত্যুবরণ করতে পারে না, কারণ সে কখনো বাঁচেনি। এক অর্থে সে বাঁচতে পারে না, কারণ ইতিমধ্যেই সে মৃত।'

স্বপ্নাহত ও বিচ্ছিন্ন এক দেবদারু গাছের মত সোজা ঊর্ধ্বমুখী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অপর্ণা। কোথাও যেন তার ছায়া পড়ছে না। কেবল কিছু অর্বাচীন কাঠঠোকরা পাখি এসে তার ডালপালায় বাসা বাঁধছে।

এখানে অপর্ণার মত হাজারো মেয়ের স্বপ্ন ভাঙে প্রতিদিন। ওদের শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের কত ভাগ জানা যায়? বিষয়টাকে সামাজিক-সংস্কৃতির দৃদ্বিকোণ থেকে দেখা এখন জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সমাজ একজন নারীকে কোন দৃষ্টিতে দেখছে এবং সেই দেখার মাঝে ফাঁকগুলো চিহিক্রত করতে না পারলে নারীর স্বপ্ন হয়ত স্বপ্নই থেকে যাবে।
আমাদের দেশে নারীর স্বপ্ন ভাঙার মূল উপাদান রয়ে গেছে হাজার বছরের সমাজ-সভ্যতা আর সাংস্কৃতিক চিন্তা চেতনায়। শাস্ত্রকাররা একদিকে নারীর সৌন্দর্য নিয়ে কষ্টকল্পিত হাজারো উপমা যেমন করে আমাদের সমাজ-মননে গেঁথে দিয়েছেন, অন্যদিকে লৈঙ্গিক বৈষ্যম্যের দেয়াল চিরস্থায়ী করতে হাজারো কটু শব্দ তার প্রতি অহরহ প্রয়োগের পথও খোলা রেখেছেন।

বলা হয়েছে, নারী নাকি অম্লানকুসুম। মানে যে ফুল কখনো মলিন হয় না। শাস্ত্রকাররা বলেছেন, কোনদিনই মলিন হবে না, এমন জিনিস সৃষ্টির জন্য ঈশ্বর প্রথম চাঁদ বানালেন। কিন্তু দিনে যে চাঁদ মলিন হয়ে যায়। সৃষ্টি করলেন পদ্মফুল, সেটাও আবার রাতে মলিন হয়ে যায়। তাই শেষে সৃষ্টি করলেন নারী। এ নারী সদা হাস্যময়ী অম্লানকুসুম, দিনে রাতে যার সমান উজ্জ্বলতা। পুরুষশাসিত সমাজে নারী হয়ে আছে রমণী, কামিনী, অবলা, দাসী, ভ্রষ্টা, নর্মসহচরী। কিন্তু'মানুষ' হতে পারেনি। দেহগত দিক থেকে সে কামনার এক অতি উপাদেয় ভোগ্যবস্তু। ইন্দ্রীয়ের দিক থেকে ভায়াগ্রার মত এক অতি উত্তেজক সচল অস্তিত্ব, যার পায়ের নখ থেকে শুরু করে মাথার কালো চুল পর্যন্ত কামগন্ধ মাখা। সে যেমন আনন্দের অফুরান উৎস, তেমনি হাজারো পাপেরও মূল উৎস।

আমাদের পুরুষশাসিত সমাজে 'নারীমন' কখনো বিবেচনায় আসে না। তাকে 'পূর্ণমানবী' হিসেবে উপস্থাপনের প্রয়াসও তেমন চোখ পড়ে না। বোদলেয়ার পর্যন্ত তাকে 'প্রোজ্জ্বল ক্লেদ' যেমন বানিয়েছেন, তেমনি রবীন্দ্রনাথ তাকে বানিয়েছেন 'অর্ধেক নারী, তুমি অর্ধেক কল্পনা'।
'অগম্যা' শব্দটির কথা ভাবুন। ওটার দায়-দায়িত্ব স্রেফ নারীর। পুরুষের নয়। তাই শব্দটির পুরুষবাচক কোনো শব্দ অভিধানে নেই। অগম্যার পুংলিঙ্গ হিসেবে যে 'অগম্য' শব্দটি রয়েছে, তার সাথে পুরুষের সম্পর্ক নেই। নারী 'পতিতা' হয়, কিন্তু পুরুষ কখনো 'পতিত' হয় না। সাবেক এক রাষ্ট্রপতিকে আমরা গণধিকৃত অর্থে 'পতিত' বলি। পতিতার পুংলিঙ্গ হিসেবে 'পতিত' বলি না।

নারীকে আমরাও 'মানুষ' বলি না। বলি 'মেয়েমানুষ'। হালে নারীবাদীদের আপত্তির কারণে অনেক শব্দে লৈঙ্গিক সমতা আনার চেষ্টা চলছে। যেমন এক সময় ইংরেজি চেয়ারম্যান শব্দটির স্ত্রীলিঙ্গ হিসেবে চেয়ারওম্যান শব্দটি চালু হয় এবং অভিধানেও যথারীতি ঠাঁই পায়। কিন্তু নারীবাদীদের আপত্তির মুখে চেয়ারওম্যান শব্দটি উঠে যায়। তার জায়গায় এখন 'চেয়ারপারসন' শব্দটি চালু হয়েছে।

তবে বিশ্বের সব দেশের নারীবাদীর চিন্তাধারায় ঐক্য নেই বলেই নারীর 'মানুষ' হয়ে ওঠা আরো জটিল হয়ে গেছে। একেক দেশের নারীবাদী একের রকমভাবে নারীকে নিয়ে ভাবছে। ক্ষেত্র বিশেষে সমাজের বিদ্যমান সাংস্কৃতিক চেতনাকে অপটু হাতে হ্যান্ডলিং করতে গিয়ে তারা এমন উগ্রও সাজছেন, যা তাদের জন্য জরুরি নয়। আমাদের সমাজে মন নারীর, কিন্তু ওটা পরিচালনার অধিকার শুধু পুরুষের। পুরুষ নারীর গায়ে শুধু অবলাতত্ত্বের লেবেল সেঁটে দেয়নি। পুরুষ নারীর ওপর যৌন আধিপত্যের অনড় সংবিধানও চাপিয়ে দিয়েছে। নারীও তা মেনে নিয়েছে। তাই শরীর নারীর, কিন্তু সিদ্ধান্ত পুরুষের। সমাজ-সংস্কৃতির যাঁতাকলে পড়ে নারীর মেধা-মননও আজ অবনত।

দুঃখজনক ব্যাপার হলো, নারীর ওপর চাপিয়ে দেয়া শোষণমূলক কুৎসাগুলো সময়ের ব্যবধানে নারী নিজেও বিশ্বাস করতে শিখে গেছে। একবার ভাবুন, নারীর প্রসাধন, বস্ত্র আর অলংকার কি নারীর নিজের উদ্ভাবন, নাকি চাপিয়ে দেয়া?

অপর্ণার চোখ দুটি এখন লোনাজলে ভেজা! পুরুষ যদি 'মানব' হয়ে না উঠতে পারে, নারী যদি পূর্ণাঙ্গ মানবী হতে না পারে, তাহলে এ জল কে মোছাবে?
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এমন কেন?

লিখেছেন তাই-ফি, ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৪৪

একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।

শেষ বিচারের পর নরকে শাস্তি ভোগ করছে পাপীরা। বিশাল বিশাল তেলের ড্রামে তাদের একবার ডুবিয়ে আবার ভাসিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিটি ড্রামের সামনে একজন করে পাহারাদার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×