বহু ঝড়-ঝাপ্টা অতিক্রম করে তোমায় লিখতে বসা। তুমি তো সবই জানো। যাই হোক, কেমন আছো বলো? শত ব্যস্ততার মাঝেও মানুষ কে আসলে ভালোই থাকতে হয় এবং সে ভালো থাকাটা কখনোই অন্যের জন্যে বা অন্য কিছুর জন্যে নয়, একেবারেই নিজের জন্যে। আমি তো কেবল ভালো থাকার খাতিরে ভালো থাকতে চাইনি কোনদিন, তাই নিজের জন্যে ভালো থাকাটাও বোধহয় আমার আর হয়ে উঠবে না
আমি জন্মসূত্রে একজন ‘মানুষ’; সেটাই আমার সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়ার কথা ছিলো, কিন্তু আমি একজন ‘মেয়ে মানুষ’, এটাই এখন আমার বড় পরিচয় হয়ে দাড়িয়েছে। অবশ্য এই প্রথা যুগ যুগ ধরেই প্রচলিত। দুঃখজনক হলেও সত্য, একবিংশ শতাব্দীতে এসেও মেয়েদেরকে আমাদের পুরুষতান্ত্রিক এ সমাজ এখনো ঠিক ‘মানুষ’ হিসেবে গণ্য করতে শিখেনি। পরিবারে, সোসাইটিতে আমরা কেবল “মেয়ে মানুষ” হয়েই রয়ে গেলাম। মানুষ হয়েও আমাদের আগে ‘মেয়ে’ এবং ‘দূর্বল’ এই দুইটি পদবী অবধারিত। সত্যিই সেলুকাস!!!
অবদমিত পুরুষ সমাজ নারীদের দমিয়ে রাখার মাধ্যমে এক ধরনের পৈশাচিক আনন্দ ভোগ করে; ইহাতে বস্তুত তাদের কি লাভ হয় তা তারাই ভালো জানবেন তবে এই আনন্দ ভোগের মাঝে তারা পরম সুখী, কেননা চিরজীবন নারীদেরকে ‘ভোগের’ বিষয় ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে তারা অভ্যস্ত নয়। একটা রিকশাওয়ালা পুরুষ থেকে শুরু করে একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা পুরুষ, সকলেই মনে মনে একজন নারীকে ভোগ উপযুক্ত পণ্যই ভেবে থাকে তা সে যে নারীই হোক আর তার পরিচয় যাই হোক না কেন!
কর্মক্ষেত্র থেকে রাস্তা-ঘাটে, পথে-প্রান্তরে, এমন কি নিজের ঘরেও নানা রকম হয়রানির শিকার হচ্ছে নারী। যৌন হয়রানি, ধর্ষন, উত্যক্ত করা এ সকল তো এখন নিত্য দিনের ঘটনা হয়ে দাড়িয়েছে, অথচ কি এর প্রতিকার? পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করে, মিডিয়া কভারেজ করে, দু’ একটা মিছিল-সভা করে কেউই এর প্রতিকার বের করতে সক্ষম হচ্ছে না কিংবা করছে না। পরিবার থেকে একটা মেয়েকে নানা রকম বেষ্টনীর মাঝে আবদ্ধ রেখেও পরিবার প্রধান তাকে কতটুকু নিরাপত্তা দিতে সক্ষম হচ্ছেন? সে কি সেখানেও পুরোপুরি নিরাপদ? নিজের ঘরে কি সে যৌন নিপীড়নের শিকার থেকে সম্পূর্ন মুক্ত? প্রশ্ন রাখলাম সচেতন পিতা-মাতার কাছে যারা নিরাপত্তার নামে কন্যা সন্তান কে ঘরের মাঝে আবদ্ধ রাখতে ভালবাসেন অথচ একটি বারের জন্যও কন্যা সন্তানটির মানসিক বিকাশ নিয়ে ভ্রুক্ষেপ করেন না।
একটি নারীর সারাটি জীবন কাটে পরাধীনতার শৃঙ্খলে যেন জন্মের পর নবুয়্যাতের মাধ্যমে তাকে পুরুষের দাসত্ব প্রদান করা হয়! ছোট থেকে একটি প্রচলিত কথা খুব শুনতাম, “মাইয়া হইয়া জন্মাইছো, বিয়া তো করতেই হইবো!!!” সাধারণত মুরুব্বী গোছের মানুষরা বলে থাকতেন এই সব, মনে মনে খুব বিরক্ত হতাম...যদি আমি বিয়ে না করতে চাই সেখানে কার কি করার আছে? বিয়ে ব্যাপারটা পছন্দ হোক আর না হোক, পাত্রটিকে পছন্দ হোক বা না হোক পরিবারের এবং সমাজের অবধারিত নিয়ম, বিয়ে করতেই হবে এবং বাকি জীবন, আরেকটি জালবন্দী জীবন কাটাতে হবে। আবার বিয়ের ক্ষেত্রে যদি মেয়েটির নিজের পছন্দের কাউকে বিয়ে করার কথা জানানো যায় তবেই চৌদ্দগুষ্টির জাত যাবে; কারণ এখনো আমাদের দেশের মেয়েরা বিয়ে করার অধিকার রাখে না, তাদের কে বিয়ে দেওয়া হয়! যদিও বিবাহ ব্যবস্থার বেশ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় আজ কাল, তবুও সেটা পার হতেও অনেক কাঠ খড়ি পুরোতে হয় কিংবা পিছনের খবরই বা কয় জনে রাখেন।
তারপরেও, পুরুষ সমাজ দ্বারা নিপীড়িত নারী এখনো তার দূর্দশার জন্যে বাবা, ভাই, প্রেমিক কিংবা স্বামীকে দোষারোপ করে নির্বিঘ্নে জীবন যাপন করতে পারে না, এই মানুষ গুলোর প্রতি তার ভালোবাসারা কখনোই কমে যায় না। নারীদের এই দূর্দশার জন্যে অনেকাংশেই নারীরা দায়ী কিন্তু পুরুষ শাষিত এ সমাজ ব্যবস্থায় নারীরা মাথা উঁচু করে নিজেদের অধিকার আদায়ে সচেষ্ট থাকতে গেলেই ঘটে যত বিপত্তি। নারীদের অস্তিত্বে হানা দিয়ে পরগাছার মতো সকল স্বাধীন চেতনাকে এক নিমিষেই ধূলিসাৎ করে দিতে পিছপা হয় না আমাদেরই বাবা, ভাই, বন্ধু কিংবা সুজনেরা। আজকে নারীরা শিক্ষিত হয়ে বের হচ্ছেন ঠিকই কিন্তু তাদের মধ্যে কয় জন নিজের অবস্থানকে পরিবর্তন করতে পেরেছেন? যারা পারছেন বা পেরেছেন তাদের কে সত্যিই আমি খুব শ্রদ্ধা করি।
আমি ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত আমাদের পারিবারিক এবং সামাজিক ব্যবস্থাপনায়। মধ্যযুগীয় এ সকল সংকীর্ণ চিন্তাধারা থেকে আমাদের বাবা-মা, আমাদের আত্মীয়-স্বজন, আমাদেরই কাছের মানুষগুলো কবে বের হতে পারবে বলতে পারো? আমি যা বলছি তা কোন নারীবাদী/পুরুষবাদী দৃষ্টিকোন থেকে নয়, যে সমস্যাগুলোর সম্মুক্ষীন আর দশটা মেয়ের মতো আমি নিজে প্রতিনিয়ত হচ্ছি আমার পরিবারে কিংবা সমাজের বিভিন্ন স্তরে, তাই আমাকে ভাবাচ্ছে।
তুমি বলেছিলে স্থির থাকতে; সকল পরিস্থিতিতে মাথাকে ঠান্ডা রাখতে, আমি স্থির আছি, আমার মাথাও যথেষ্ট ঠান্ডা রয়েছে কিন্তু যখন পরিবার ও সমাজের এ সকল বেড়া জালের মাঝে হাবু-ডুবু খেতে থাকি তখন শিরা উপশিরায় রক্তের যে তীব্র ছোটাছুটি অনুভূব করি, তাকে স্থির করি কেমন করে?
আমি ভালো থাকতে চাই। বিশ্বাস করো; আমারো ইচ্ছে করে ভালো থাকতে, কিন্তু......
তুমি ভালো থেকো, ভালো থাকাটা সত্যিই খুব জরুরী।
ইতি
তোমারই
“আমি”
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা মে, ২০১০ রাত ৯:০৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




