মাষ্টার বাজারে গিয়েছেন সদাই করতে। হঠাৎ মিঠু এসে দাড়ায় মাষ্টারের সামনে।
- স্যার, রফিক দুইদিন ধইরা নিখোঁজ।
মাষ্টার অনেকটা বিষ্ময়ের ভঙ্গিতে বললেন,
- তাই নাকি রে? কই আমি তো কিছুই শুনলাম না।
- স্যার, সবার ধারণা রফিক কোথায় আছে আপনে তা জানেন।
মাষ্টার ভুরু কুচকে বলে, আর তোর কি ধারণা?
মিঠু মাথা নিচু করে আছে। কিছু বলছে না।
- ও তাইলে তোরও ধারণা রফিক কোথায় তা আমি জানি। তাহলে শোন, তোদের চেয়ারম্যানকে যাইয়া বলিস, রফিক আমার বাসায় আছে। তার যদি সাহস থাকে তাইলে আমার বাড়িতে হামলা চালাইয়া রফিকরে নিয়া যাইতে।
মিঠু খুব অপ্রস্তুত হয়ে যায়। মাষ্টারের এই সরল স্বিকারক্তি তাকে অবাক করে। মাষ্টারের সাহসী উত্তরে সে ভড়কে যায়। মিঠু জানে রফিককে মাষ্টারের ঘরে আগুন জালাতে বলা হয়েছে। তাই রফিক গা ঢাকা দিয়েছে। আর মিঠুকে রফিকের খোজ বের করতে বলেছে ২৪ ঘন্টার মধ্যে। এবং এও বলেছে, রফিককে পাওয়া মাত্র যাতে গুম করে দেয়া হয়। ওর লাশও যাতে কেউ না পায়।
মাষ্টার তখন মাছ দামাদামি করছিলেন। মাষ্টার মিঠুর দিকে তাকিয়ে বললেন, কিরে, যা...দাড়ায়া আছস কেন? নাকি তোরে আমারে মারতে কইছে? তারপর রফিকরে?
- স্যার আপন্যার কি একটুও ভয় লাগে না?
প্রশ্নের উত্তর মাষ্টার দেয় না। ব্যস্ত থাকে মাছ কেনায়। মাছ কিনে মিঠুকে বলে, চল আমার সাথে।
গ্রামের কাচা রাস্তা ধরে হাটতে থাকে মিঠু ও মাষ্টার।
- তোরা যে কাশেমের সাথে থাকোস...তোরা তো জানোস সে লোকটা কেমন।
- স্যার আমার ঘরে ভাত আসে তো ওনার দোয়াতেই।
মাষ্টার মুচকি একটি হাসি দেন।
- দোয়া! অনেক দোয়া করেন তোদের। তাই না? এতোদিন তো রফিককেও অনেক দোয়া দিয়েছেন। তো এখন সেই দোয়া গেলো কই?
- রফিক বেইমানী করছে তাই উনি.....
মাষ্টার এবার হাটা বন্ধ করে দাড়িয়ে যান। এই দাড়া দাড়া। কি বললি? বেঈমানী- তাই না? তাহলে ধর তোকে বলল আমাকে মারার জন্য। তুই তখন কি করবি? তোর ভাতের চিন্তা করবি নাকি আমার চিন্তা করবি।
- স্যার আপনে আমার বাপের মতন। স্কুলে খুব বেশীদিন যাই নাই। কিন্তু যতদিন গেছি আপনের কাছেই পরছি। পড়ার কি মূল্য তহন তো বুঝি নাই। কিন্তু এহনতো বুঝি। আপনে কত আমারে জোর কইরা স্কুলে নিয়া গেছেন আমি তাও যাই নাই। এহন তো বুঝি কত্ত বড় ভুল জীবনে করছি। আর আপনে এই গেরামের গুরু। আপনেরে আমি কেমনে......
-তোকে তো এতো কথা বলতে বলি নাই। তোকে বলছি তুই কি আমাকে মারতে পারতি কিনা।
- না স্যার।
- রফিকও সেই কাজটা পারবে না। আর যদি বেঈমানীর কথা আসে। তাহলে শোন তোদের চেয়ারম্যান একদিন এই দেশের সাথে এই দেশের মানুষের সাথে বেঈমানী করছিল। তোর আব্বারে একদিন প্রশ্ন করিস, তোর একজন ফুফু ছিল সেই ফুফু এখন কই। যাই হোক। তোর সাথে এত কথা আমি বলব না। তুই যা তোর চেয়াম্যানরে গিয়ে বলিস রফিক আমার বাসায়।
মাষ্টার হেটে যায় তার পথে। পথে ঠায় দাড়িয়ে রয় মিঠু। বেঈমানী!! দেশের সাথে বেঈমানী করছিল চেয়াম্যান! "দেশ" কি? তাই তো সে জানে না। দেশের কি মূল্য তা সে কি বুঝবে। অশিক্ষিত মূর্খ মিঠু দেশের সাথে বেঈমানী আর কি বুঝে। সে অনেকবার মাষ্টারকে বলতে শুনেছে, কাশেম একটা রাজাকার। কিন্তু রাজাকার মানে কি!! রাজাকার মানে কি বেঈমানী। তবে মিঠুর হৃদয়ে গেঁথে যায় তার ফুপুর কথা। সে শুনেছে তার একজন ফুপু ছিল। মারা গেছে। কখন কিভাবে মারা গেছে তা তার কখনও জানতে ইচ্ছা হয় নি।
মিঠু এবার হাটা শুরু করে তার বাড়ির দিকে। তাকে শুনতে হবে। তাকে শুনতে হবে কি হয়েছিল তার ফুপুর সাথে। কাশেম নিশ্চই সেই মৃত্যুর সাথে জড়িত।
- আব্বা...ও আব্বা...
মিঠুর মা তখন তরকারি কুটছিল। ঐ হারামজাদা। চিল্লাস কেন? তোর বাপ ঘরে নাই।
- আম্মা..আম্মা...ফুপু কেমতে মরছিল?
থমকে যায় মিঠুর মা। তরকারি কুটা থেমে যায়। পুই শাক কুটছিলেন তিনি। কথাটি হঠাৎ শুনে বটির সাথে তার আঙুল কেটে যায়। সবুজ রঙের শাক তখন তার লাল রক্তে এক ভিন্ন রঙের তৈরী করে। হ্যা এমনই তো হয়েছিল সেদিন। সেই রাতে। পিছনের মাঠে মিঠুর ফুফু রোকেয়াকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। কাশেম আর সাথে এক পাকি সৈন্য নিয়ে যায় তাকে। মিঠুর বাবা মসলে উদ্দিন আর্তনাদ করতে থাকেন। চিৎকার করতে থাকেন। আমার বইনটার কি দোষ ওরে ছাইড়া দেন। ও কি করছে। আমার এত্তুটুক বইন ও কি করছে। কাশেম ভাই ওরে ছাইরা দেন।
রোকেয়া কে সবুজ ঘাসে শুইয়ে তার সমস্ত সৌন্দর্যকে নষ্ট করা হয়। শুধু কি তাই! তার যোনীপথ দিয়ে বন্দুকের বেওনেট ঢুকিয়ে দেয়া হয়। কি বিভৎস। আল্লাহ কি যন্ত্রণা!! আল্লাহর কাছে কি এর কোনো বিচার নাই? সেইদিন সেই রাত রোকেয়ার আর্তচিৎকারে ফেটে পড়েছিল সব কিছু। সবুজ ঘাস রোকেয়ার রক্তে লাল হয়ে উঠেছিল। ওরা তো মানুষ ছিল না ছিল পশু।
মিঠুর মার চোখ দিয়ে অনর্গল পানি পড়ছে। তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন সেই দিনটির কথা। সমস্ত কিছু মনের মধ্যে চাপা দিয়ে রেখেছিলেন। তবে আজ মিঠু জাগিয়ে তুল্লো সেই দিনটি। সেই বিভৎস স্মৃতি।
- বাবারে কি মনে করাইয়া দিলি এইডা। তুইও সুখে আছস আমরাও আছি।
বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন মিঠুর মা। তারপর সব কিছু মিঠুকে বলে। বলার সময় আড়ালে দাড়িয়ে চোখের পানি ঝরাতে থাকেন মিঠুর বাবা মসলে উদ্দিন।
- কিন্তু ফপুরে কেন উডাইলো?
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন মিঠুর মা। তারপর বলেন, আমাগো গেরামের এক পুলা ছিল নাম আছিল সেলিম। তার সাথে রোকেয়া সম্পর্ক ছিল। আমরা হেইডা জানতাম না। হেই রাত্রেই জানছি। সেলিম মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিছিল। আগের রাতে সেলিম নাকি চুরি কইরা আইসা রোকেয়ার সাথে দেখা করছে। কাশেমের লোক তা দেইখা ফেলছিল আর তাছাড়া তোর ফুপু জানতো গেরামের কোন জায়গায় মুক্তিবাহিনীরা আছে। তাই তারা রোকায়ার সব কিছু শেষ কইরা দিলো রে।
তিনি কাদতে কাদতে আবার বলতে থাকেন, তাও হারামজাদীটা মুক্তিবাহিনী কই তা ফাস করে নাই। নিজের জীবন দিয়া গেলো তাও মুখ খুলে নাই।
তখনই মিঠুর বাবা হাউমাউ করে কান্না শুরু করেন। বাবারে , এতো কইরা চিল্লাইয়া কইলা, বইনরে কইয়া দে.....কইয়া দে... তাও কয় না.....উল্ডা চিল্লাইয়া কয়.... ভাইজান আমি কেমনে কমু....ওরা তো আমাগো দেশ বাচাইতে আইছে। আমি কেমনে বেঈমানী করুম। শেষ বাবা সব শেষ। মইরা গেলো। দেশতো বাচলো কিন্তু.....কিন্তু আমার বইনডাতো বাচলো না রে বাবা......
মিঠুর মধ্যে এক চাপা ক্ষোভ কাজ করছে। সে চিৎকার দিয়ে বলল, বাজান তুমি জানতা কাশেম এই কাজ করছে তাও তুমি আমারে কও নাই কেন? আমি ঐ কুত্তাটার সাথে থাকি.......ঐ কুত্তার কাছে আমি কুত্তার মতো আছিলাম। তুমি আমারে কও নাই কেন। আমারে মানা করো নাই কেন? আমারে তুমি থাপড়াও নাই কেন?
- বাবারে... অভাব....চেয়ারম্যান যদি তোরে লগে না রাখতো তাইলে অভাবে তো মইরা যাইতাম। যা গেছে তাতো গেছে। এহন তো তার লাগি আমার ঘরে চুলা জলে।
- রাখো তুমাগো চুলা। ঐ হারামীর পয়সায় খাওয়ার চে না খাইয়া মরতাম বাজান। ছিহ ছিহ..... অভাব আছে বইলা তুমি তুমার বইনের মরনের কথা ভুইলা যাবা। ছিহ..
চলবে......
১ম-৩য় পর্ব: Click This Link
৪র্থ পর্ব: Click This Link
৫ম পর্ব: Click This Link
৬ষ্ঠ পর্ব: Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে নভেম্বর, ২০০৮ রাত ১০:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


