ঘটনাটা ২০০৯ এর কোন এক সময়ের। সকাল বেলায় ঘুম ভাঙ্গল বুয়ার কলিংবেল টেপার তোড়ে। মেসের সব কটি রুমে প্রায় ৮ জন থাকতাম আমরা, আমার রুমটি মেইন দরজা থেকে সব থেকে দুরে। আবার রুমের মধ্যেও সব থেকে কোনার বিছানাটা আমার। যার কারণে কলিংবেল বাজার শব্দ আমার কানে আসার আগে অন্যদের কানে যাবার কথা। কিন্তু কোন অজানা কারণে শব্দ আর কেউ পায় না। যাই হোক, চোখ ডলতে ডলতে এবং কিছুটা ঢুলতে ঢুলতে হাজির হলাম দরজার কাছে। দারজা খুলে দিতেই বুয়ার চিৎকার, "মরছেন নাকি সবাই?" কিছু বলার দরকার নাই, তাই বললাম না। এটা প্রতিদিনের ঘটনা। মেজাজটা মোটামোটি খারাপ ছিল, কিন্তু পত্রিকাটা পড়ে থাকতে দেখে একটু হলেও মন ভাল হল, কারণ সবার আগে পত্রিকা পাওয়া মেস জীবনে মোটামোটি ভাগ্যের বিষয়। প্রথমে পত্রিকা পেলে কোন রকম শেয়ারিং ছাড়াই পড়া যায়।
পাতা উল্টিয়ে খবর দেখছিলাম, হঠাৎ করে একটা বিজ্ঞাপন ধর্মী লেখার দিকে চোখ পড়ে গেল। তাতে যা লেখা ছিল তা কিছুটা এই রকম।
"তারহীন মাল্টিমিডিয়া কিবোর্ড মাত্র ৪৫০ টাকা। স্টক সীমিত।" এর পর দোকানের নাম এবং ঠিকানা।
কাকতালিয় হলেও সত্য যে তার আগের রাত্রেই আমি এবং আমার রুমমেট ফয়সাল তারহীন (ওয়্যারলেস) কিবোর্ডের বিষয়ে আলোচনা করছিলাম, এবং টাকা পেলে একটা করে কিনব বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। ঠিক তখনই এমন একটা সুযোগ পেতেই মন ভাল হয়ে গেল। উলেক্ষ্য, ঐ সময় তারহীন (ওয়্যারলেস) কিবোর্ডের দাম ছিল ১৫০০ টাকারও বেশি। আর শুধু মাল্টিমিডিয়া কিবোর্ডের দামও তখন ৪৫০-৭৫০ টাকা। যেহেতু আমি এবং ফয়সাল দুইজনেই মাউস ছাড়া মোটামোটি ৯০% কাজ করতে পারি, তাই আর চিন্তা কি? পরে না হয় একটা তারহীন (ওয়্যারলেস) মাউস কিনে নিব।
তাড়াতাড়ি ফয়সালকে ঘুম থেকে উঠালাম, সেও খবর পড়ে খুশিতে লাফ দিয়ে উঠল। আমার কাছে ৪৫০ টাকা ধারও চাইল। সিদ্ধান্ত নিলাম যে যেহেতু এখনও মার্কেট খোলার সময় হয়নি, সুতরাং এখনই রওনা দিতে হবে, যাতে করে স্টক শেষ হবার আগেই কিনতে পারি। মূল উদ্দেশ্য সবার প্রথমেই হাজির হওয়া, যাতে বলতে না পারে যে স্টক শেষ।
তড়িঘড়ি করে বের হলাম, সকালের মিল খেলাম না। হাসাহাসি করে বললাম যে বিছানায় বসে কম্পিউটার চালাব আর তখনই খাব।
পত্রিকাটি হাতে নিয়ে দুইজনে মেগাসিটি বাস ধরে হাজির হলাম এলিফ্যান্ট রোডের মাল্টিপ্লান সেন্টারের সামনে, ঘড়িতে তখন ৯:৩০ এর কিছু বেশি। অপেক্ষা করতে থাকলাম কখন ঢুকতে পারি (খোলে ১০:০০টায়)। অবশেষে অপেক্ষা শেষ করে ঢুকলাম মার্কেটে। নির্দিষ্ট দোকানে হাজির হয়ে দেখি দোকান বন্ধ। অবশ্য ৫মিনিটের মধ্যেই দোকানের একজন হাজির হল। নিশ্চিত হলাম যে স্টক আছে। তাও পুরাপুরি সিউর হবার জন্য আবার তাকে জিজ্ঞাসা করলাম। সে হেসে বলল যে চিন্তা করার কিছু নাই। হাফ ছেড়ে বাচঁলাম। দোকান খুলে পরিস্কার করা পর্যন্ত যেন ধর্য্য আর কুলায় না। তিনি রেডি হয়ে এবার আমাদের সামনে কিবোর্ড এর দুটি প্যাকেট নিয়ে এলেন। কিছু চিন্তা না করেই খুললাম প্যাকেট। খুলে একটু ধাক্কা খেলাম, কারণ বিজ্ঞাপনে "তারহীন" লেখা থাকলেও দুইটি কিবোর্ডেই তার ছিল। প্রিয় পাঠক, ঠিক এই কারনেই আমি আমার ইচ্ছার তারহীন কথাটি যতবার উল্লেখ করেছি, ততবারই "ওয়্যারলেস" কথাটি উল্লেখ করেছি। মজা পেতে নিচেরটুকু পড়ুন।
দোকানদারকে বললাম যে, "ভাই মনে হয় ভূল হচ্ছে, আপনি কি ঠিক কিবোর্ডটাই দিয়েছেন?" উনি বললেন, "হ্যাঁ। সমস্যা কি?"
আমি পত্রিকার বিজ্ঞাপনটি তার সামনে ধরে বললাম যে এখানে লেখা তারহীন। কিন্তু এটায়তো তার আছে।
উনি আমাকে অবাক করে দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন যে কোথায় পড়ি। সোজা উত্তর দিলাম, নর্দান বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ। তিনি এবার ফয়সালকে জিজ্ঞাসা করলেন সে কোথায় পড়ে। ফয়সালের উত্তর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
তিনি বললেন, "বিনাকারণে বাপ-মার টাকা খরচ না করে গ্রামে গিয়ে হাল চাষ করেন। কাজে দিবে।" আমি অবাক, কিবোর্ডের তারের সাথে হাল চাষের সম্পর্ক কি? উনাকে জিজ্ঞাসা করলাম। উনি যা বললেন তা শুনে মনে হল ৭তলা থেকে লাফিয়ে পড়ি। উনি বললেন, "আপনারা দুই গাধা এইটাও জানেন না যে, তারবিহীন মানে হচ্ছে ওয়্যারলেস, আর যেহেতু হীনের আগে 'বি' ব্যবহার করা হয়নি তার মানে হচ্ছে তার আছে।" ফয়সাল দেখি মারতে এগিয়ে যাচ্ছে, বহু কষ্টে তাকে থামালাম, এবং কিছু বলার আগেই তার মুখ চেপে ধরলাম। কারণ ঐ দোকানদার বা ফয়সাল দুইজনের কেউ জানেনা এখন কি হবে।
আমি ঐ লোকের কাছে পরাজয় মেনে নিয়ে খুব কাচুমাচু করে বললাম, "ভাই, দুঃখিত। আসলেই ভূল হয়েছে। তা আপনি কোথা থেকে পড়ালেখা করেছেন?" উনি খুব গর্ব গর্ব ভাব নিয়ে বললেন, "ঢাবি।"
তখন আমি উনাকে বললাম যে, "আচ্ছা তাই নাকি? তা ভাই, আমি এবং এই ছেলেতো বাবা-মার টাকা নষ্ট করছি, তাই আমরা আজকেই গ্রামে চলে যাব। আপনার সাথে কথা বলে আসলেই বুঝতে পারলাম যে কত ভূল আমরা দৈনিক করি। তা ভাই, আপনি কি একটু বলবেন যে আপনাকে কি আমি 'চরিত্রহীন' বললে আপনি খুশি হবেন, নাকি 'চরিত্রবিহীন' বললে খুশি হবেন?"
দোকানের সামনে বেশ কয়েকজন জমে গিয়েছিল এর মধ্যে, তারা সবাই অট্ট হাসিতে ফেটে পড়ল। আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম যে, "আমরা যাচ্ছি হাল চাষ করতে, আর আপনি যান, প্লে গ্রুপে ভর্তি হন। আর আপনি যে নিজে ঢাবির ছাত্র, তা কোনদিন কাউকে বলেন না, তাতে আপনার অপমানের থেকে ঢাবির অপমান বেশি হবে।"
বেশ অনেক পরে জানতে পেরেছিলাম যে ঐ ভাই আসলে ঢাবির ছাত্র নন। তবে উনি যেকোন এক জায়গা থেকে অনার্স পাশ করেছেন। সেটি অবশ্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় নয়, পাবলিক থেকেই। এই পোষ্ট কোন ভাবেই ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূল ধরছে না, যতটুকু ভূল ধরা হচ্ছে তা শুধু ঐ ভাইয়ের।
প্রিয় পাঠক, এই ঘটনার এক চুলও বানিয়ে বলা হয়নি। আসলেই আমাদের সমাজে কিছু মানুষ আছে, যারা কখনই নিজেদের ভূল স্বীকার করে না, অন্যে ভূল করুক বা না করুক, তারা সেটার পিছনে লেগেই থাকে।
পোষ্টের ভূলত্রুটি ক্ষমা করবেন।
যদিও ছোট্ট ঘটনা - ১ , ছোট্ট ঘটনা - ২ , ছোট্ট ঘটনা - ৩ (প্রভা - এবং আমার বন্ধু এবং আমরা) , এবং ছোট্ট ঘটনা - ৪ এর সাথে ছোট্ট ঘটনা - ৫ এর কোনই মিল নাই, তবুও লিংক দিলাম।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



