somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দেশের নাম ভানুয়াতু (২য় পর্ব)

৩০ শে অক্টোবর, ২০০৯ সকাল ১১:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




আগের পর্ব: Click This Link

কাটেনা সময় যেন আর কিছুতেই .........

ভানুয়াতুর প্রথম কয়েকদিন আমার বেশ ভয়াবহ গেল।

একে তো বিদেশের প্রথম চাকুরি তারপরে আবার নির্জলা একা। যেমন তেমন বিদেশ নয় একেবারে পান্ডব বর্জিত এই দেশ। সহকর্মীরা বেশির ভাগই নাক বোঁচা চাইনিজ (৭৮ জন), অন্যরা মালয়েশিয়ান, ফিলিপিনো, অস্ট্রেলিয়ান ও ইংলিশ।ইংরেজি জানি তবে কথ্য ইংরেজী রপ্ত ছিল না। একই ভাষার এত রূপ - চিংলিশ, সিংলিশ, হিন্দলিশ, অজি ইংলিশ, মার্কিন ইংলিশ আবার খাঁটি বৃটিশ ইংলিশ- আমার সব তালগোল লাগতো! আবার কালচারও ভিন্ন - একেকজনের একেকদেশীয় রূচি - অফিসিয়াল বিষয় ছাড়া আলোচনা করার বিষয়ও ভিন্ন। আমি টিপিক্যাল মুখচোরা ভেতো বাঙালী - কথা বলার কিছু পাইনা - আবার বিদেশি ভাষায় কথা বলেও সুখ পাই না। ইন্টারনেট খুব ই স্লো। সে দেশে তখনও একটি মাত্র টেলিফোন অপারেটর। রেট খুব হাই। তাই দেশেও বেশি কথা বলা সম্ভব না।
তবে সবচেয়ে কষ্ট খাওয়া দাওয়ার। এশিয়ান গুলো চলে যায় চাইনিজ শপে। শুয়োর-কুকুর,সাপ-খোপ, ঝিনুক-শামুক সবই খায়। সাদাগুলোও পর্ক ছাড়া কিছু বোঝে না। চাইনিজ রেস্টুরেন্টে তাই তাদের আপত্তি নেই। সমস্যা হয় আমার ভীষন রকম।তাদের সাথে তাল মিলাতে পারি না । প্রথম ক'দিন সী-ফুড আর টুনা-বার্গার দিয়ে চালালাম। কিন্তু দু'মাস থাকতে হবে ভেবে বিকল্প খোঁজা শুরু করলাম।
আমাকে উদ্ধার করতে ডানিয়েল এগিয়ে এলো। আমাকে যে হোটেলে রাখা হয়েছে ডানিয়েল সেই হোটেলের কেয়ারটেকার কাম সিক্যুরিটি ইন চার্জ - হাসি খুশি পন্চাশোর্ধ টিপিক্যাল মেলানেশিয়ান। যে হোটেলে ছিলাম সেটা ফ্রেন্চ মালিকানাধীন। এ ক্ষেত্রে একটু বলে রাখি, ভানুয়াতু দীর্ঘদিন ফ্রেন্চ ও ইংরেজদের যৌথ উপনিবেশ ছিল। তাই এদেশের বেশির ভাগ পর্যটন ব্যবসাই এদের কব্জায়।রিয়েল এস্টেট ব্যবসা অজি- বিশেষ করে নিউজিল্যান্ডারদের হাতে- যেহেতু রিয়েল এস্টেটের বেশির ভাগ খদ্দেরই এ দু'টি দেশের।
যা বলছিলাম, ডানিয়েলকে ভাত-মাছ কোথায় পাওয়া যেতে পারে জিজ্ঞেস করতে সে বললো, উপায় আছে। তোমাকে লোকাল মার্কেটে নিয়ে যাবো।
পোর্ট ভিলার লোকাল মার্কেট অনেকটা আমাদের দেশের সিমেন্টের মেঝের উপর টিনের চৌ-চালা দেয়া মাছের বাজারের ৩৪ গুন বৃহত্তর ভার্সন। স্বচ্ছনীল প্রবাল সাগরের তীরেই গড়ে ওঠা ভানুয়াতুর রাজধানী পোর্ট ভিলার একে বারে কেন্দ্রে অবস্থিত। সাদামাটা অবকাঠামোয় অবস্থিত এই "লোকাল মার্কেট" এর বিক্রেতারা স্থানীয় সাধারন দ্বীপবাসী।মলিন তাদের বেশ। রূক্ষ ত্বক-চুল। অনেককেই দেখেছি সপ্তাহের ৫ দিনই তাদের ফলফুলের ঝুড়ি কিংবা রেস্টুরেন্টের টেবিলের নীচে শুয়েই রাত্রিযাপন করতে। তবে দারিদ্র-পীড়িত মুখগুলো সদাহাস্যময়। বড় নরম ও উষ্ণ তাদের ব্যবহার। স্থানীয় দ্বীপগুলিতে উৎপাদিত ফল-মূল-ফুল ই এখানকার মূল পন্য। এছাড়া রয়েছে ছোট ছোট কিছু রেস্টুরেন্ট- অনেকটা আমাদের হোটেল "ছালা -দিয়া" র মত- তবে কিছুটা উন্নত, পরিচ্ছন্ন। পুরো মার্কেটে এরকম ৮১০টির মত রেস্টুরেন্ট আছে। প্রতিটি রেস্টুরেন্টের বরা্দ্দ একটি করে টেবিল, দু'পাশে লম্বা টুল।একটি মীটসেফ, একটি চুলা ও কিছু তৈজসপত্র। ঝকঝকে সাগরের পাশে বসে অপেক্ষাকৃত জনবহুল মার্কেটের রেস্টুরেন্টে বসে খাওয়ার মধ্যে একটা প্রান আছে। তাছাড়া একই টেবিলে বসে খেতে হয় বলে স্থানীয়দের সাথে পরিচিত হওয়ার ও একটা সুযোগ থাকে। খাবারও তুলনামূলক সস্তা ও ফ্রেশ। বিশেষ করে মাছ। ফ্রেশ মাছভাজা আর গরম ভাতের জন্য এই লোকাল মার্কেটই আমার প্রিয় গন্তব্য ছিল। পোর্টভিলার অনেক জমজমাট ফ্রেন্চ-ইটালিয়ান-চাইনিজ রেস্টুরেন্টের চেয়েও তাই এই রেস্টুরেন্টগুলোতে খদ্দেরের ভীড় বেশি। বেশিরভাগই ইউরোপীয়ান-ওশেনিয়ান পর্যটক। তবে সবচেয়ে অবাক হওয়ার বিষয় যখন দেখবেন মলিন বেশের বিক্রেতারা খদ্দের অনুযায়ী গড় গড় করে ইংলিশ-ফ্রেন্চ দু'ভাষাতেই কথা বলছে।
বলতে গেলে সারাদিন কঠিন কামলা খাটুনীর পরে এই লোকাল মার্কেটে কাটানো একটু আয়েশী সময়ের মাঝ দিয়েই ভানুয়াতু একই সাথে জীবনের ব্যাপারে আমার ধারনাই ধীরে ধীরে পাল্টে যেতে লাগলো।
প্রথম দু'দিন অফিসিয়াল কাজের পর শুরু হলো দ্বীপের প্রত্যন্ত অন্চলে সাইট ভিজিট। নির্জন পাহাড়, নির্বিষ জঙ্গল, প্রবাল সফেদ সাগর পাড় চষে বেড়াই দিনমান, দুপুরে বিস্কিট আর জুস দিয়ে সাইটে লান্চ আর রাতে লোকাল মার্কেটে ভাত-মাছভাজা, সব্জী সহযোগে ডিনার খেতে খেতে বিদেশি পর্যটক কিংবা লোকালদের সাথে আড্ডা।
একসময় অনুভব করতে শুরু করলাম... নাহঃ এই জীবন, এই বেঁচে থাকা মোটেই মন্দ নয়!

এই বেশ ভালো আছি...
অনেক ধন্যবাদ খোদা!



ভানুয়াতুর রাজধানী পোর্ট ভিলা - আকাশ থেকে যেমনটি দেখা যায়। দিগন্তহীন সুনীল উপকূলে শুয়ে থাকা এক দ্বীপনগরী - ছোট্ট নীল উপসাগরের জ্বলজ্বলে লকেটের মত।




এটি হচ্ছে ভানুয়াতুর গুলিস্তান... বলতে গেলে সিটি সেন্টার।



লোকাল মার্কেট। স্থানীয়দের মূল অর্থনৈতিক কর্মকেন্দ্র। দৃশ্যতঃ এই লোকাল মার্কেট ঘিরেই ভানুয়াতুর শহরগুলোর বিস্তার। নানা দেশের নানা মানুষের মিলন কেন্দ্র এই লোকাল মার্কেট ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা।


লোকাল মার্কেটের মহিলা বিক্রেতা। সত্যিকার ভাবে বলতে গেলে লোকাল মার্কেটের সব দোকানগুলোর বিক্রেতা বা মালিকই মহিলা। অত্যন্ত কোমল তাদের ব্যবহার!! চেহারা দেখে বোঝার উপায় নাই এরা ইংরেজি বা ফরাসী ভাষায় কত পারদর্শী!


পোর্ট ভিলার প্রধান ট্যুরিস্ট রিসোর্ট - ইরিকিকি আইল্যান্ড। ছবিতে যেমন দেখা যাচ্ছে, বাস্তবে এর সৌন্দর্য্য আরো অনেক বেশি। এরই অপর পাড়ে সিটি সেন্টার। সেখানকার সাদামাটা সাগর পাড়ের হোটেলে খাওয়ার সময় মনে হয় হয় যেন একটা বিশাল এক্যুরিয়ামের পাশে বসে আছি... সাগরে একটু খাবার ছুড়ে দিলেই স্বচ্ছ জলের মাঝে ছুটে আসে নানান রং বেরং এর মাছ! আহা! ঢাকার সদরঘাটের নদীর উপরের খাওয়ার হোটেল থেকেও যদি এ দৃশ্য দেখা যেত! :)



সবচেয়ে কাছে যাওয়া যায় এমন জীবন্ত অগ্নিগিরির দেশ ভানুয়াতু



হোটেল থেকে দু'পা বেরোলেই সাগর পাড়... না না ভুল বললাম... আসলে একটুকরো স্বর্গ। কাছেই কোন সফেদ-নীলাভ সৈকত নেই- এমন আবাস মনে হয় এ দেশে নেই!!



প্রত্যন্ত গ্রামের আদিবাসী মেলেনেশিয়ানদের বুনো নৃত্য।

ছবিসূত্র: ইন্টারনেট ও ব্যক্তিগত

সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে অক্টোবর, ২০০৯ সকাল ১১:২৩
১০টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×