প্রথম পর্ব: Click This Link
দ্বিতীয় পর্ব: Click This Link
দিন যায়:
ভানুয়াতুর পরিবেশের সাথে ক্রমশঃ অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। এরই মধ্যে আমার ম্যানেজার খবর দিলেন তোমার দেশ থেকে আরো দুই জন এই প্রোজেক্টে জয়েন করবে। একদিন সেই দু'জন চলেও আসলো। এখন সেই দূরদেশে এই দুই দেশীভাই আমার সবচেয়ে নিকটজন। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে আমি যেই হোটেলে ছিলাম সেখানে তাদের স্থান সংকুলান না হওয়ায় অন্য এক রিসোর্টে রাখা হলো। প্রোজেক্টের কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য আমাদের প্রচুর খাটতে হতো । অনেক রাত পর্যন্ত। আর একেকজনের কাজ একেকদিকে হওয়ায় দেখা কিংবা আড্ডা দেয়ার সুযোগ পাওয়া যেত কদাচিৎ। তবে এই বিজন পরিবেশে দেশী ভাইদের এটুকু সান্নিধ্যই আমার পরম প্রাপ্তি মনে হতো। অন্ততঃ যখন তখন ওভার ফোনে বাংলায় কথা বলার সুযোগ তো পাওয়া যেত। দুই সপ্তাহ পর্যন্ত এরকম আমরা পো্র্ট ভিলায় ছিলাম। এরপর আমি লম্বালম্বিভাবে ভাবে বিস্তৃত ভানুয়াতুর একদম উত্তরে দেশের ২য় বৃহত্তম শহর ও প্রধান পর্যটন শহর সান্টোতে চলে এলাম। এর পূর্বেই দক্ষিন প্রশান্ত মহাসাগরের এই দেশের রাজধানী পোর্ট ভিলার দ্বীপ ইফেটে নানা চমৎকার ও অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা হলো।
একজন আবু বকর, কতিপয় বিস্ময় ও বাংলাদেশ:
আমার অনেক রকম বিচিত্র ভালো লাগার মধ্যে একটি হলো ভিন দেশী মানুষদের সাথে পরিচিত হতে। তবে আমার অভিজ্ঞতা যেচে কথা বলা আমাদের শহুরে সভ্যতায় বেশির ভাগ মানুষই খোলা মনে নেয় না। সিডনীতে মাঝে মাঝে দেখেছি দু'জন দেশী ভাই পাশাপাশি সীটে বসে ট্রেনে করে কাজ শেষে বাসায় ফিরছে - প্রায় ঘন্টা খানেকের ভ্রমন- কিন্তু কেউ কোন কথা বলছে না - প্রথম কথা শুরু করাটা অনেকেই কেন যেন অসম্মানের চোখে দেখে! তবে ভানুয়াতুর লোকজনের সাথে আমার অভিজ্ঞতা সম্পুর্ন ব্যতিক্রম। এরা বেশ সরল আর খোলা মনের। অনেকটা আমাদের সাদাসিধে গ্রামবাসী কিংবা মফঃস্বলের সরল-সাধারন মানুষের মত - এলাকায় বিদেশী দেখলে আগ্রহের অভাব নেই - নিজের থেকে নানা কথা বলতে যায়। হয়তো বাংলাদেশ সাধারনভাবে ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশন নয় বলে বিদেশীদের ব্যাপারে আমাদের অনেক আগ্রহ। তবে ভানুয়াতু পর্যটন নির্ভর দেশ হওয়া সত্ত্বেও তাদের আমাদের চামড়ার লোকদের প্রতি বিনয়ী ভাব আমাকে কিছুটা হলেও বিস্মিত করেছে। আমার স্বল্প প্রবাস অভিজ্ঞতায় এই একটি দেশ পেলাম, যারা আমাদের বাংলাদেশী পরিচয় পেয়েও, আমাদের সাথে তেমনি আগ্রহ দেখায় যেমনটি আমরা আমাদের দেশে আমরা বিদেশীদের প্রতি দেখিয়ে থাকি। তাই রেস্টুরেন্ট বা দূর এলাকায় গেলেও ভানুয়াতুবাসীর নির্মল সান্নিধ্য আমি বেশ উপভোগ করতাম। এমনি একদিন পোর্টভিলার কাছাকাছি একটি রেস্টুরেন্টে লান্চ করার সময় আমার টেবিলেই বসা একজন নেটিভের সাথে কথা প্রসঙ্গে জানলাম পো্র্ট ভিলার উপকন্ঠে অবস্থিত দেশের সবচেয়ে বড় গ্রাম মেলে ভিলেজে একটি মসজিদ আছে। যে কোন নতুন শহরে নতুন নতুন মসজিদে নামাজ পরা আমার শখের মত। তাই ব্যপারটি আমার মধ্যে বেশ আগ্রহ জন্মানোর সাথে সাথে একটু অবাকও হলাম। আড়াই লাখ লোকের দেশ ভানুয়াতুতে লোকাল মুসলিম জনগোষ্ঠী ২০০১৫০ এর বেশি হবে না, যাদের বেশিরভাগই দক্ষিনের টা'না দ্বীপে। তাই দূরের এই রাজধানীতে তাদের মসজিদও থাকবে তেমনটি আশা করি নি। যাই হোক ঠিক করলাম সেখানে যাব।
পরের দিন বিকেলে মেলে ভিলেজের বাসে উঠে পড়লাম। এখানে একটু বলে রাখি, ভানুয়াতুতে বাস বলতে যা বোঝায় তা সবই মাইক্রোবাস। যেখান সেখান থেকে ওঠা যায় শহরের যে কোন জায়গার উদ্দেশ্যে। যে আগে উঠবে তাকেই আগে পৌছানো হবে। শহরের মধ্যে যে কোন জায়গার ভাড়া ১০০ ভাতু। শহরের একটু দূরে গেলে ২০০ ভাতু। এরকমই একটি বাস মেলে ভিলেজের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, আমার লোকাল মসজিদ দেখানোর বাসনা পূর্ণ করতে। কিন্তু তখনও আমি জানতাম না আরো কত বিস্ময় আমার জন্য অপেক্ষা করছে সেখানে!
দু'জন বাকি থাকতে বাসের চালক আমাকে বললো, তুমি কোথায় নামবে?
আমি বললাম: মেলে ভিলেজের মসজিদের কাছে।
সে তখন বললো, বাকি দু'জনকে নামিয়ে দিয়ে তোমাকে নামাবো, যেহেতু মসজীদ একটু ভিতরে।
অন্য দু'জন নেমে গেলে চালক আমার নাম জানতে চাইলো। সন্ধ্যা ঘনায়মান চারিদিকে। অপরিচিত ভীষন দর্শন সঙ্গী। আমি আমর বাংলা নাম টা বললাম। সে তখন জানালো তার নাম আবু বকর। আমি তখন জানালাম আমিও মুসলিম। আমাকে তখন আবু বকর জিজ্ঞেস করলো, আমি ফিজির কি-না। আমি বললাম, না। আমি বাংলাদেশের। সে তখন জানালো, সে বাংলাদেশের নাম জানে। আমি একটু অবাক হলাম। এই প্রত্যন্ত গাঁয়ের লোক বাংলাদেশের নাম জানে কি করে? যদিও, আমি পরবর্তীতে এরকম অবাক আমাকে কয়েকবারই হতে হয়েছে।
একসময় আমাকে সে একটা বাড়ির সামনে রাখলো। বললো, সামনের বাড়িটায় আব্দুল্লাহ থাকে। লোকাল কনভার্টেড মুসলিম। সে মাগরিবের নামাজ পড়বে। তোমাকে মসজিদে নিয়ে যাবে। একটু পরে আমিও আসবো। আমরা এক সাথে নামাজ পড়বো। আর তুমি আমার সাথে শহরে যেতে পারো। আমার নাতনী হাসপাতালে অসুস্থ হয়ে ভর্তি আছে। নামাজের পর আমি পরিবারের সাথে সেখানে যাবো।
বাড়ির সামনে একটি হালকা দাড়ির ছেলে দাড়িয়ে ছিলো। পরে আলাপে জেনেছিলাম সেও সম্প্রতি আব্দুল্লাহ্র কাছে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছে - যদিও এখনও সে তার খ্রীষ্টান বাবা-মায়ের সাথে থাকে এবং তার ধর্মান্তরিত হওয়া নিয়ে তাঁদের কোন মাথা ব্যাথা নেই।
আব্দুল্লাহ মাঝ বয়সী মেলেনেশিয়ান গড়নের। আশে-পাশের পরিবেশের মাঝে ব্যতিক্রম আরবীয় জোব্বা ও টুপি পড়া। তাঁর সাথে আলাপে জানলাম সে আগে স্থানী্য চার্চের তত্ত্বাবধায়নে ছিল। নিউজিল্যান্ড কিংবা অস্ট্রেলিয়া থেকে আগত একটি সাউথ এশিয়ান তবলীগ জামাতের দ্বারা ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছেন । সম্প্রতি হজ্ঝ্বও সম্পন্ন করেছেন।
তার সাথে মসজীদে এলাম। দেখতে দুকামরার একটি বাড়ির মতো। লম্বালম্বি বাড়ি।সামনে টানা বারান্দা।দুই প্রান্তে দু'টো কামরা। একটি নামাজ কক্ষ ও আরেকটি ইমাম সাহেবের বাসস্থান। দু'ই কামরার মাঝে রান্নাঘর ও টয়লেট। নামাজ কক্ষটির মাঝে আবার পর্দা দিয়ে দু'ভাগ করা । পর্দার আড়ালে মহিলারা সাধারনতঃ একই সাথে জামাতে নামাজ পড়েন।
তবে এই নামাজ কক্ষটিতে আমার সেদিনের শেষ চমকটি অপেক্ষা করছিলো। সেখানে দেয়ালে একটি নামাজের চিরস্থায়ী টাইম টেবিল ও আরেকটি পাঁচ ওয়াক্তের নামাজ ঘড়ি ছিলো। টাইম টেবিলটি ভালো ভাবে দেখতে গিয়ে দেখলাম সময়ের নীচে বুয়েটের একটি ঠিকানা, ঢাকা , বাংলাদেশ লেখা। আর নামাজ ঘড়িটির সময় সূচীর নীচে বড় বড় হরফে বাংলায় লেখা নামাজসূচীর ঘড়িটির প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের নাম (এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না) , চকবাজার, ঢাকা, বাংলাদেশ।
আমি বিস্মিত ভাবে আব্দুল্লাহ কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এটা তো আমাদের দেশের তৈরি। এটা এখানে এলো কি করে?
আব্দুল্লাহ জানালো, এখানকার ইমাম সাহেব সেটা ফিজি থেকে এনেছেন। উনার মাদ্রাসার শিক্ষক একজন বাংলাদেশী।
পরবর্তীতে জেনেছি ফিজিতে কোন কোন মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল আমাদের দেশের। আমাদের দেশের অনেক আলেম ফিজিতে শিক্ষকতা করেন।
আবু বকরের সাথেই হোটেলে ফিরে এলাম।
সাত সমুদ্র পারের দুর্গম এই প্রায় জন অশ্রুত দেশের সাথে অবশেষে বাংলাদেশের একটি সম্মানজনক যোগসূত্র পেয়ে অদ্ভুত এক তৃপ্তি অনুভব করছিলাম! অখ্যাত অনামা মেলে ভিলেজ বাংলাদেশের সাথে এই অতি ক্ষীণ অথচ তাৎপর্যময় এই যোগসূত্রের কারনে আমার স্মৃতিতে অক্ষয় হয়ে রইল।
ইফেট দ্বীপে চলার পথে এক টুকরো বিস্ময়
পোর্টভিলার বাস
মেলে ভিলেজের পথে
পাহাড়ের কোলে সাগর ছুঁয়ে শুয়ে থাকা "মেলে ভিলেজ"
মেলে ভিলেজের উপকূলে "মেলে বে"
চিরচেনা গ্রামীন পথ... বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামীন পথের সাথে কি অদ্ভুত মিল!!
পোর্ট ভিলার আগুন লাগা সন্ধ্যা
লাল সুড়কির বদলে সফেদ প্রবাল বিছানো ভানুয়াতুর রাস্তা
"পথের দেবতা ঈষৎ হাসিয়া কয়, পথ তো এখনো শেষ হয় নি........"
তাই যেতে হবে বহুদূর..........
(ক্রমশঃ)
ছবিসূত্র: ইন্টারনেট ও ব্যক্তিগত
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই নভেম্বর, ২০০৯ রাত ১২:৫৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



