কয়েকদিন ধরে টিনার মাঝে বেশ পরিবর্তন লক্ষ্য করছে সুমি। জিজ্ঞাসা করবে করবে করেও শেষ পর্যন্ত আর কিছু জানতে চায়নি সে। আজ বাইরে থেকে রুমে ফিরে দেখে কেঁদে কেটে অস্হির টিনা, চোখ মুখ ফুলে আছে। কিছুক্ষন চুপচাপ বসে থেকে সে টিনার বিছানার দিকে এগিয়ে যায়, জড়িয়ে ধরে জানতে চায় কি হয়েছে। টিনা আরেক দফা কান্নাকাটি শুরু করে।
কান্না শেষে যা জানা গেল তা হল , এক ছেলের সাথে তার প্রায় গত দুবছর ধরে পত্র মিতালীর সম্পর্ক, কিন্তু গত এক মাস ধরে ঐ ছেলে তার কোন চিঠির জবাব দিচ্ছেনা । তো এতে অত কান্নাকটির কি আছে, এই কথা শুনে টিনা নতুন করে আবার কান্না শুরু করল। বকা দিয়ে থামিয়ে দেবার আগে যা জানা গেল তা হল টিনা আসলে ঐ ছেলের প্রেমে পড়ে গেছে।
এবার সুমির অবাক হবার পালা। যে ছেলেকে তুই এখন পর্যন্ত দেখিসনি, যার একটা ছবিও দেখিসনি, ফোনে কথা ও হয়নি, শুধু এই চিঠি চালাচালিতেই তার প্রেমে পড়ে গেলি।
কাঁদটে কাঁদতে টিনা বলে চলে তুই বুঝবিনা, তুইত আর প্রেমে পড়িসনি কখনও ।
সুমি হাসতে হাসতে বলে তা ঠিক আমি কখনো প্রেমে পড়িনি, কিন্তু তাই বলে আর যাই হউক এমন চিঠি চালাচালি করে প্রেমে পড়ব তা কখনো হবেনা এটা শিউর।
ঐ ছেলে কোথায় থাকে।
ঢাকাতেই থাকে।
তাহলে এক কাজ কর তুই ওর ঠিকানায় গিয়ে হাজির হ।
আমি পারব না !!! ওর কি হয়েছে আমি জানিনা, অন্যরকম কিছু হলে আমি সহ্য করতে পারবোনা !
আচ্ছা তোর যাওয়া লাগবেনা, ঠিকানাটা দে, আমিই যাব, দেখি ঘটনা কি ।
তুই যাবি মানে ?
তুই যেহেতু যাবিনা, আমিই যাই, দেখি আসলে ঘটনা কি ?
তুই সত্যিই যাবি।
হ্যাঁ সমস্যা আছে কোন?
না, কিন্তু, কিন্তু.......তুই গিয়ে কি বলবি!
সেটা নিয়ে তোকে চিন্তা করা লাগবেনা ।
আপনি রাশেদ !!!
হ্যাঁ, কিন্তু আপনাকেত চিনলামনা ।
আমাকে চিনার দরকার নাই, আপনি টিনার চিঠির উত্তর দিচ্ছেন না কেন।
আপনি কে ?
আমি সুমি, টিনার বন্ধু ।আপনি জানেন ওর কি অবস্হা গত একমাস ধরে, মেয়েটা যে আপনাকে ভালবেসে বসে আছে আপনি জানেন। এমন করছেন কেন!
কি বলছেন আপনি?
আমি ঠিকই বলছি।
দেখুন গত একমাস আমি আমার পারিবারিক বিষয় নিয়ে অনেক ঝামেলায় ছিলাম, তাই ওর সাথে যোগাযোগ করতে পারিনি, এটা নিয়ে অত অস্হির হবারতো কিছু নেই, ও আমার খুব ভাল বন্ধু।
কিন্তু ও তো আপনাকে নিয়ে আরও বেশী কিছু ভেবে বসে আছে।
দেখুন আমাদের মাঝে অমন কোন কথাবার্তা কখনো হয়নি যে আরও বেশী কিছু ভাবা যায়।
আচ্ছা সেটা আপনাদের ব্যাপার, আপনি ওর সাথে যোগাযোগ করুন, জানান কি হয়েছিল, ওর মন খারাপ করা দেখতে আর ভাল লাগছেনা।
পুরো ঘটনা শুনে টিনাত আকাশ থেকে পড়ল। সুমি ক্লাশমেট রাজুকে সাথে করে রাশেদ এর সাথে দেখা করতে গিয়েছিল।হাজারো প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে সুমি ক্লান্ত হয়ে পড়ল, শেষে বলল ছেলেটা দেখতে শুনতে ভাল, ভদ্র ও মনে হল, বাকীটা তুই দেখে বুঝে নিস, তোর চিঠির উত্তর সে দিবে ।
দুদিন পরেই টিনার হাসি মুখ দেখে সুমি বুঝল চিঠির উত্তর এসেছে। সে জানতে চাইল কবে তোরা দেখা করছিস। শিঘ্রই বলে একটা হাসি দিল টিনা.....।
এর বেশ কিছুদিন পরে রুমে ঢুকেত সুমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল । টিনা কান্না করে চোখ মুখ ফুলিয়ে বসে আছে। সুমিকে দেখেই কান্নার বেগ আরও বাড়ল, এবার সে সুমিকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করে দিল । পরিস্হিতি খুবই ভয়াবহ। যা জানা গেল তা হল, দেখার পর রাশেদ কোন মতেই বিশ্বাস করেনি যে টিনাই আসল টিনা। সে নাকি শিউর সুমিই টিনা, তাকে তার পছন্দ হয়নি বলেই সে অন্য কাউকে টিনা নামে পঠিয়েছে।
সুমিত আকাশ থেকে পড়ল, বলে কি ?
হ্যাঁ ও তাই বলেছে, এবং ও নাকি শিউর।
তুই দেখতে শুনতে সব দিক থেকে আমার চেয়ে হাজারগুন ভাল, আর ঐ বেকুব বলে কি !!!
মোটামুটি বিষয়টা দাঁড়িয়েছে এমন, রাশেদ কোন মতেই বিশ্বাস করেনি টিনাই যে আসল টিনা, সে নাকি শিউর সুমিই হচ্ছে টিনা। টিনার অনেক কান্নাকাটিও তার মন গলাতে পারেনি ।
সুমি সোজা সাপ্টা বলে দিল বাদ দে ওরে নিয়া কান্নাকাটি, সামনে ফাইনাল, পরীক্ষা শেষে এইটার একটা হেস্তনেস্ত করা যাবে। মন খারাপ অবস্হায়ই একরকম জোর করে টিনা পরীক্ষা শেষ করল। সুমিকে জানাল এর মাঝে আরও একদিন সে দেখা করেছিল, কিন্তু রাশেদ তার ধারনায় অটল।
পরীক্ষা শেষে টিনা হল ছেড়ে দেশের বাড়ী চলে গেল । এরপর আর কারো সাথেই সে কোন যোগাযোগ করেনি, এমনকি মোবাইল নাম্বারটাও বদলে ফেলেছে। টিনার দেশের বাড়ী কোথায় সেটা জানলেও সুমি এর বেশী কিছু জানেনা, হলের শেষ বর্ষে তারা রুম মেট ছিল এই যা।
সুমি তখনও হল ছাড়েনি, একদিন বিকালে খালা এসে জানাল তার ভিজিটর এসেছে। কোন ক্লাশমেট বন্ধু হবে, সুমি এই ভেবেই বেড়িয়ে এসেছিল। হলের গেটে রাশেদ কে দেখে তার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল।
কথা বলার আগেই সে উত্তিজিত হয়ে বলল আপনি কি চান, এখানে কেন।
রাশেদ খুব ঠান্ডা ভাবে বলল আমি আপনার সাথে দেখা করতে এসেছি।
মানে ?
আমার সাথে আপনার কি, আপনার সাথেত আমার কোন কথা নেই !
অনেকক্ষন ধরে দুজনই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, সুমির চেহারায় উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশ থাকলেও রাশেদ শান্ত ভাবেই দাঁড়িয়ে আছে। নিরবতা ভেঙ্গে রাশেদ বলল চলুন ঐ গাছটার নিচে বসি, আপনার সাথে আমার কথা আছে।
আজ দশবছর হয়ে গেছে সে ঘটনার, কত কিছু যে ঘটে গেল এর মাঝে। জীবনের স্রোত কখন যে কোন নদীতে গড়ায় তা আসলেই মানুষের অজানা। বাস্তবতা আর ভাবনা আসলেই দুমেরুতে তাদের বসবাস, আর বাস্তবের কাছে ভাবনার জগৎ টা মনে হয় সবসময়ই পরাজিত হয়।
এরপর টিনার সাথে সুমির আর কোন যোগাযোগ হয়নি, সে অনেক চেস্টা করেছে, কেউ জানেনা টিনা কোথায়, কখন যে এসে কাগজ পত্র -সার্টিফিকেট নিয়ে গেছে তাও কেউ বলতে পারেনা।
বাইরে টিপটিপ বৃস্টি পড়ছে, ছুটির দিন, রাশেদ বসে আছে চা আর খবরের কাগজ নিয়ে। সাত বছরের টিনার ডাকে সুমি বাস্তবে ফিরে এল।
মেয়ে বায়না ধরেছে মা চল আজ বৃষ্টিতে ভিজব ।
সুমি ও রাজি হয়ে বলল চল ছাদে যায়। মা মেয়ের পেছনে পেছনে রাশেদ ও হাঁটা ধরল..........
জীবন যখন যেমন ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




