একুশে টেলিভিশনের (ইটিভি) বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ এনে এক ব্যবসায়ীর ডাকা সংবাদ সম্মেলন দৃশ্যত ভণ্ডুলের চেষ্টা চালিয়েছে বেসরকারি টেলিভিশনটির একদল সাংবাদিক।
হাসনাইন কবীর নামের ওই ব্যবসায়ী অভিযোগে করেছেন পাওয়া টাকা না দিয়ে তাকে জিম্মি করে ব্ল্যাঙ্ক চেকে সাক্ষর নিয়েছেন ইটিভির শীর্ষ কয়েকজন কর্মকর্তা। তার অভিযোগ, কেবল জিম্মি করাই নয়, অপসাংবাদিকতার মাধ্যমে পরিবারসুদ্ধ তাকে হেয় করার চেষ্টা করছে টেলিভিশন চ্যানেলটি।
এব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে ইটিভির চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম হাসনাইন কবীরকে প্রতারক আখ্যা দিয়ে টেলিফোনে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "এসব অভিযোগ ডাহা মিথ্যা। ইটিভি এ ধরনের কোনও কাজ করতে পারে না। এছাড়া ইটিভি যেসব সংবাদ তাকে নিয়ে করেছে সবগুলোই সত্যি।"
উল্টো অভিযোগ এনে সালাম বলেছেন, "পুলিশ ওর পৃষ্ঠপোষকতা করছে। আর বিশেষ একটি মহল, যারা আগেও ইটিভির বিরুদ্ধে লেগেছিল, ইটিভির সুনাম ক্ষুণœ করার জন্য আবার উঠেপড়ে লেগেছে।"
বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে হাসনাইন বলেন, "কম্পিউটার ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সরবরাহ করা বাবদ আমি একুশে টেলিভিশনের কাছে প্রায় ২৪ লাখ টাকা পাই। কিন্তু ওই টাকা না দিয়ে আমাকে আটকে রেখে ভয়ভীতি দেখিয়ে ব্ল্যাঙ্ক চেকে স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়া হয়। এছাড়া ক্রমাগত আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা সংবাদ প্রচার করে আমাকে নিরাপত্তাহীন করে তুলেছে।"
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য শেষ হওয়ামাত্রই ইটিভির বার্তা বিভাগের প্রধান রাশেদ চৌধুরীর উপস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে কয়েকজন লোক সাংবাদিকদের কাছে ইটিভির লিখিত বক্তব্য বিতরণ করার চেষ্টা করলে সম্মেলনস্থল আকস্মিকভাবে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ইটিভির একাধিক সাংবাদিক উত্তেজিতভাবে হাসনাইন কবীরকে চিৎকার করে প্রশ্ন করতে থাকেন।
এসময় উপস্থিত অন্য সাংবাদিকরা হতচকিত হয়ে পড়ে। প্রবীন ফটো সাংবাদিক কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে কয়েকজন সাংবাদিক ইটিভির লোকদের বাধা দেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত ইটিভির প্ল্যানিং এডিটর হারুনুর রশীদ, প্রতিবেদক মাহাথীর ফারুকী ও অখিল পোদ্দারসহ কয়েকজন সাংবাদিক এবং সংবাদকর্মী কামরুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন সাংবাদিকদের সঙ্গে তর্কে লিপ্ত হন। একপর্যায়ে অখিল পোদ্দারকে মারতে উদ্যত হন কামরুজ্জামান। ইটিভির নির্বাহী প্রযোজক প্রণব সাহা ছাড়াও প্রতিষ্ঠানটির আরো কয়েকজন সেসময় উপস্থিত ছিলেন।
উত্তেজিত হয়ে কামরুজ্জামান বলতে থাকেন, 'একটি সংবাদ সম্মেলন কাভার করতে ইটিভি থেকে কতজন এসেছেন?' তিনি আরো বলেন, "এটা তো ইটিভির সংবাদ সম্মেলন হচ্ছে না। তাহলে ইটিভি কেন লিখিত বক্তব্য প্রচার করবে ?" তিনি প্রয়োজনে তাদের আলাদা সংবাদ সম্মেলন করতে বলেন।
প্রায় ১০ মিনিটের উত্তেজনা শেষে কার্যত কামরুজ্জামানদের তাড়া খেয়ে চুপ হয়ে যায় ইটিভি। প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে সংবাদ সম্মেলনস্থলের বাইরে প্রেসক্লাবের দোতলায় দু'পক্ষের মধ্যে আবার বচসা হয়। কিছুক্ষণ পর সংবাদ সম্মেলনে আসা সাংবাদিকরা ফিরে যান।
হাসনাইন কবীর লিখিত বক্তব্যে কম্পিউটার ব্যবসায়ী হিসাবে নিজের পরিচয় দেন। তিনি বলেন, গত জুলাইয়ে ইটিভিতে যোগ দেওয়ার আগে থেকেই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে তার ব্যবসায়িক যোগাযোগ ছিল যা কাজে যোগ দেওয়ার পরও অব্যাহত থাকে।
তিনি বলেন, "পাঁচটি কার্যাদেশ ও চালানের মাধ্যমে ইটিভি আমার কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকার কম্পিউটার ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ক্রয় করে। এর মধ্যে ২১ লাখ ১৫ হাজার টাকা পরিশোধ করে। বাকী ১৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকা ছাড়াও কার্যাদেশের বাইরে জরুরি প্রয়োজনে আরও প্রায় চার লাখ টাকার মালামাল সরবরাহ করেছি, যেগুলোর বিল এখনও পাইনি।"
এসব কার্যাদেশ, চালান ও মালামাল সরবরাহের তথ্য প্রমাণ রয়েছে দাবি করে কবীর বলেন, "গত আট সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ইটিভিতে কর্মরত অবস্থায় কনফারেন্স রুমে আমাকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চ্যানেলটির চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম, জেনারেল ম্যানেজার রুহুল আমীন, প্রোগ্রাম কোঅর্ডিনেটর সাদিয়া সিলভানা ও নাট্যকার সাখাওয়াত আল মামুনের উপস্থিতিতে ফিন্যান্স বিভাগের প্রধান আব্দুস ছোবহান জানান, আমার সমস্ত কার্যাদেশ ও চালান বাতিল করা হয়েছে। বাতিল ঘোষণাপত্র আমার হাতে দিয়ে তা রিসিভ করতে বলা হয়।"
কবীরের অভিযোগ, বাতিল করার কারণ জানতে চাইলে চেয়ারম্যানসহ অন্যান্যরা তাকে ধমক ও গালাগালি দিয়ে ভয় দেখান এবং পুলিশে দেওয়ার হুমকি দেন। বাধ্য হয়ে তিনি বাতিলপত্র রিসিভ ও জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে সই করেন।
কবীর বলেছেন, এরপরও তাকে আটকে রাখা হয় এবং জেনারেল ম্যানেজার রুহুল আমীন এসে বিল হিসেবে তাকে পরিশোধ করা ১৯ লাখ টাকা তক্ষুণি ফেরত দিতে হবে বলে দাবি করেন। এরপর তিনজন সাদা পোশাকের লোক এসে নিজেদের উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে থানায় অভিযোগ করলে ক্রস ফায়ারে হত্যার হুমকি দেন।
হাসনাইন কবীর বলেন, "তখন জেনারেল ম্যানেজার আমাকে বাসা থেকে চেক এনে ব্ল্যাঙ্ক চেক দিতে বলেন। আমি তখন নিরূপায় হয়ে আমার দোকানের কর্মচারী হাবিবকে ফোন করে বাসা থেকে চেক আনতে বলি। আমার ব্র্যাক ব্যাংকের চেকবই থেকে তারা ৬টি ব্ল্যাঙ্ক চেক কেটে রাখে এবং ভোরে আমাকে বাসায় পাঠিয়ে দেয়।"
এই অভিযোগ করেই ১৩ সেপ্টেম্বর তেজগাঁ থানায় ইটিভির ছয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন হাসনাইন কবীর। এরপর ওই রাতেই প্রতারণার মাধ্যমে টাকা আত্মসাতের অভিযোগে একই থানায় হাসনাইন কবীরের বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা দায়ের করে ইটিভি কর্তৃপক্ষ।
ইটিভির দায়ের করা মামলায় বলা হয়, কম্পিউটার মালামাল সরবরাহের জন্য হাসনাইন কবীর ১৯ লাখ ৬৫ হাজার টাকা অগ্রিম নেন। কিন্তু কোম্পানির চাকরির সুযোগ নিয়ে প্রতিশ্র"ত মালামাল সরবরাহ না করে তিনি ওই টাকা আত্মসাৎ করেন। মামলায় আরও বলা হয়, এসব বিষয় জিজ্ঞেস করলে কবীর কার্যাদেশ বাতিল করে অগ্রিম নেওয়া টাকা অ্যাকাউন্ট পেয়ি চেক দিয়ে অফিস ত্যাগ করেন।
হাসনাইন কবীর বলেন, "মামলা দায়েরের পর থেকেই নিয়মিত সংবাদ ও বিশেষ বুলেটিনে ইটিভি আমাকে প্রতারক আখ্যা দিয়ে সংবাদ প্রচার করতে থাকে। ওইসব সংবাদে জনগণকে আমাকে ধরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, আমি একুশে টেলিভিশনের টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়ে গেছি।"
তিনি বলেন, "ইটিভি অফিসে চেক পৌঁছে দিতে আসা আমার দোকানের কর্মচারী হাবিবের বিরুদ্ধেও প্রতিবেদন প্রচার করেছে ইটিভি। স্থানীয় কিছু মানুষের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাবিবের সাভারের বাড়িতে অসামাজিক কর্মকাণ্ড হচ্ছে।"
অনুষ্ঠানে উপস্থিত হাবিবুর রহমান হাবিব কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, "আমি শ্যামলীতে থাকি। সাভারে আমাদের বাড়িতে আমার মা ও বাবা থাকেন। মিথ্যা সংবাদে তারা লজ্জায় মুখ দেখাতে পারছেন না।"
হাসনাইন কবীর ও হাবিবের বিরুদ্ধে ইটিভি প্রচারিত দুটি প্রতিবেদনও ল্যাপটপ দিয়ে প্রদর্শন করা হয়।
সূত্র: বিডিনিউজ২৪.কম

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



