somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অসতী দাহ (২য় পর্ব)

১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ বিকাল ৫:১০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


Click This Link এর পর থেকে..

দেখতে দেখতে সোয়াদের বয়স আঠারো হয়। বিয়ের নাম গন্ধ নেই। পাশের বাড়ির একটি ছেলে, ফৈয়াজ তার নাম, তার দিকে নজর দিতে শুরু করেছে। সেটা সে টের পায়। ছাদের উপর কাপড় শুকাতে গেলে তার সাথে চোখাচোখি হয়। সোয়াদের বুক কেঁপে ওঠে, ভয়ে, লজ্জায়, ভালো লাগায়। তার নারী মন বুঝতে পারে ফৈয়াজ তাকে পেতে চায়। ছেলেটি গ্রামের অন্য ছেলেদের মতো নয়। স্যুট-কোট পরে, গাড়ি চালায়। নিশ্চয়ই শহরে কোন বড় চাকরী করে। শহর কেমন, গাড়ি চড়তে কেমন লাগে! এসব আকাশকুসুম কল্পনা সোয়াদের মনে। কিন্তু পোড়া কপাল। তার যে একটা বড় বোন আছে যার এখনো বিয়ে হয়নি। বিয়ের সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছেনা। পাত্রের বাবা-মা তাকে পছন্দ করে না। কিন্তু সোয়াদের কি হবে? বড় বোনের বিয়ে না হলে কি তারও বিয়ে হবে না?

চকিত লাজের আঁখি বিনিময় ধীরে ধীরে অন্যদিকে মোড় নেয়। হঠাৎ রাস্তায় দেখা হয়ে গেলে সচেতন হয়ে পড়ে দুজনেই। লজ্জায় মরে যায় সোয়াদ, যেন হাটু ভেঙ্গে গেছে আর এক পাও চলতে পারবেনা সে। একদিন মহাবিস্মিত কানে ফৈয়াজের গলার আওয়াজ শুনতে পায়- খোয়াড়ের পেছনে জলপাই গাছটার নিচে, এশার নামাজের সময়। ইঙ্গিত বুঝতে কষ্ট হয়না। একবার ভাবে, যাবে না। লোকটা ভেবেছে কি? এতই সস্তা? ইশারা দিলেই বেহায়ার মতো গিয়ে বসবে তার কোলে। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যায় সোয়াদ। দম নেবার চেষ্টা করে। না, যাবে না। বিপদজ্জনক। হেনার কথা ভোলেনি। ধরা পড়লে তো সব শেষ। পরের দিনই সালিশ বসবে। হয়তো আসাদের ওপরই দায়িত্ব পড়বে সিদ্ধান্ত কার্যকরী করার। গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায় সোয়াদের। দিনটা কাটে দারুণ অস্থিরতায়। এক মন বলে, যেও না। আরেক মন বলে, এই তোমার শেষ সুযোগ। এমন ছেলে হাজারে একটা মেলে না। কে তোমাকে রাণী সাজিয়ে নিজের গাড়িতে করে শহরে নিয়ে যাবে? সন্ধ্যা বেলা ভালো করে খেতেও পারেনা মেয়েটা। গায়ের রক্ত ঘোড়ার মতো ছুটছে। এশার নামাজে চলে যায় তার বাবা আর ভাই। শৌচাগারে যাবার নাম করে বেরিয়ে পরে ঘর থেকে। ফৈয়াজ অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে অপেক্ষা করেছিল ওর জন্য। কাছে যেতেই কোন শব্দ উচ্চারণ না করেই ওকে জড়িয়ে ধরবার চেষ্টা করল। বিদ্যুৎ স্পৃষ্টের মতো চমকে উঠল সে। কোন পুরুষের ছোঁয়া আজ পর্যন্ত তার গায়ে লাগেনি। ফৈয়াজ দমবার পাত্র নয়। তার একটা হাত চলে গেলে সোয়াদের উরুতে, সেখান থেকে আস্তে আস্তে তার পশ্চাতদেশে, যেখানে ভাগীরথীর প্রবল বন্যা আছড়ে পড়েছে মহাসাগরের জলে। সে আরও কুঁচকে উঠল। আতঙ্কে, তৃষ্ণায়। যৌবন তো তার দেহেও ক্ষুধার ফসল বুনেছিল। তারও তো ছিল মধুমালঞ্জের শাখায় বসে অমৃতের আস্বাদ পাবার সাধ। কিন্তু সে হেনার আর্তনাদ শুনেছে, শুনেছে আরও অনেক নৃশংস কাহিনী। ফৈয়াজকে জানায় তার ভয়ের কথা। ফৈয়াজ তার গা ছুঁয়ে আশ্বাস দেয়, ও তাকে ভালোবাসে, বিয়ে করতে চায়, তার বাবার কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবে, ওকে ছাড়া তার জীবন বৃথা, ইত্যাদি ইত্যাদি। ফৈয়াজের গলায় আন্তরিকতার অভাব দেখেনা সোয়াদ। বিয়েই যখন হবে তাহলে আর আপত্তি কেন। প্রেমিকের ডুবরী হাতটিকে সে আর ঠেলবার চেষ্টা করেনা। এভাবেই কিছুদিন চলে তাদের নৈশ অভিসার।

খবরটা ফৈয়াজ কে দেবার সাথে সাথে ওর মুখটা সাদা হয়ে গেল। যেন বাকশক্তি হারিয়ে ফেলল সে। অনেকণ চুপ থাকার পর যেন কথা খুঁজে পেল। সব ঠিক হয়ে যাবে। কিচ্ছু চিন্তা করো না প্রিয়া, আমার ওপর সব ছেড়ে দাও। তোমার বাবার সাথে কথা বলব। আমার ইশারার অপেক্ষা করো তুমি। তার আগে কাউকে কিছু বলবে না। কাউকে কিছু বলেনি সোয়াদ। ফৈয়াজের ইশারার অপেক্ষা করতে থাকে। এছাড়া উপায়ই বা কি। একদিন, দুইদিন। দু'সপ্তাহ। দু'মাস। ইশারা আসেনা। ইতিমধ্যে পেট ফুলতে শুরু করেছে। সেটা অন্য কারো নজরে পড়বার আগেই সাক্ষাৎ যমের চোখে পড়ে যায়। বাবা একদিন তার সামনে এসে দাঁড়ায়, রণমুর্তিতে। বেতের লাঠিটা মাটিতে সজোরে আঘাত করে বলে- তোর পেটে বাচ্চা! অস্বীকার করে সে। মাকে গিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করে যে তার ঋতুস্রাবে অনিয়ম ঘটেনি। কিন্তু সে নিজেও বোঝে এটা কারো কানে যাচ্ছেনা। ওদিকে ফৈয়াজের ইশারাও যেন কোথায় দিশা হারিয়ে ফেলেছে।

রীতি অনুযায়ী বাড়িতে বৈঠক বসে একদিন। বাবা-মা, বড়বোন নোরা ও তার স্বামী হুসেন। শাস্তির ব্যাপারে কারো মতভেদ ছিল না, প্রশ্ন দাঁড়াল কে সেটাকে কার্যকর করবে। বাবার প্রস্তাব, আসাদ। কিন্তু মা আপত্তি জানালেন। আসাদ এখনো কচি ছেলে, ও পারবে না। মা হয়তো ভুলে গেছে যে হেনার গলায় ফাঁসি দেবার সময় তার ছেলেটি তেমন কচি ছিল না। ঠিক আছে আসাদ না হলে আমিই করব, সোৎসাহে বলে উঠল হুসেন, সোয়াদের দুলাভাই। পাশের ঘরে বসে সব শুনছে সে। কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলনা যে বৈঠকটা তাকেই কেন্দ্র করে, এবং শাস্তির বিধান ওরই জন্য। এটা কি স্বপ্ন না দুঃস্বপ্ন? ওর বাবা হুসেনের প্রস্তাব মেনে নেয়, ঠিক আছে তুমি যদি ভার নিতে চাও, নাও। দেখো কোন গন্ডগোল যেন বাধিয়ে না ফেলো। কোন গণ্ডগোলই লাগবে না আব্বাজী, আপনি নিশ্চিত থাকুন। আমার মাথায় যে বুদ্ধিটা আছে তা একেবারেই মোম। জবাব দেয় তারই আপন বোনের স্বামী।

যথারীতি তার বাবা-মা একদিন কি এক জরুরী কাজে শহরে চলে গেল। সোয়াদ বুঝল এটাই তার জীবনের শেষ দিন। ডে অফ এক্সিকিউশন। কোনো কোর্ট-কাচারী নেই, আপিল-আদালত নেই, পরিবারের রায়ই চুড়ান্ত রায়। যথাসময়ে দুলাভাই হাজির হল বাড়িতে। হাসিমুখ। হাজার হলেও দুলাভাই তো! হাসি ঠাট্টার সম্পর্ক। মুশকিল এই যে সোয়াদের মনের অবস্থাটা তখন ঠিক হাসবার মতো ছিল না। বারান্দার একধারে বড় একটা পাথরের ওপর বসে দু'হাঁটুর মধ্যে মুখ গুঁজে থাকল। এক কোপে গর্দান কেটে ফেললে মন্দ হয় না-ভোগান্তিটা কম। কিন্তু কম ভোগান্তির কপাল ছিল না সোয়াদের। কিছুক্ষণ পর ঘাড়ের পেছন দিকটায় কি একটা তরল জিনিস অনুভব করল সোয়াদ। চোখের পলক না ফেলতেই বুঝতে পারল তার পিঠে আগুন লেগেছে, এবং সে আগুন দাউ দাউ করে ছুটে আসছে তার সামনের দিকে। পোড়া চামড়ার গন্ধ নাকে নিয়ে সে পাগলের মতো ছুটল দেয়ালের দিকে। কেমন করে যে সে দেয়াল টপকে রাস্তায় নেমে গেল কিছুই মনে নেই। তার জ্বলন্ত শরীর দেখে দুজন ভদ্রমহিলা এসে আগুন নেভাতে চেষ্টা করলেন তাদের চাদর দিয়ে। কলতলায় নিয়ে ওর গায়ে পানি ঢাললেন কয়েক বালতি। পানির ছোঁয়া পেয়ে তার গায়ের পোড়াটা যেন আরও তেতে উঠল। আহারে বেচারী, কি কষ্ট বেচারীর, বলে স্বান্তনা দিতে চেষ্টা করলেন দয়াশীল মহিলা দু'টি। তখনো চৈতন্য ছিল। ইচ্ছে হচ্ছিল গায়ের চামড়া ছিঁড়ে ফেলে দেয়, তাতে যদি যন্ত্রণা কমে। তারপর আর কিছুই মনে নেই তার।

চলবে.....
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে অক্টোবর, ২০০৯ রাত ৮:৫৭
৭টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা ও আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ০৯ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৩০

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় কী?

কর্মসংস্থান? না।

বিনিয়োগ? না।

ডলার সংকট? না।

গার্মেন্টস খাতে ছাঁটাই? না।

ব্যাংকিং খাতের আস্থা সংকট? না।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো— কোনো অনুষ্ঠানে জুলাই চেতনা কত মিলিলিটার ঢুকেছে, কে কতবার উচ্চারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×