Click This Link (১ম পর্ব)
Click This Link পর্ব)
তারপর..
অমানবিক ব্যাথা নিয়ে যখন সে জেগে ওঠে ঘুমের ঘোর থেকে, দেখে, সে একটা নরম বিছানায় শুয়ে আছে। তার দু'পাশে অচেনা লোকজন, কেউ ডাক্তার, কেউ নার্স, কেউবা আর্দালি। সে জীবিত না মৃত বুঝতে পারছিলনা। আগুন তার উরু থেকে মাথা পর্যন্ত সবটুকু জায়গাই গ্রাস করে ফেলেছিল। তার হাত দুটো শক্ত কাঠির মতো দু'পাশে ঝুলছে, কোনরকম বোধশক্তি ছিল না ওগুলোতে। বুক আর চিবুকের চামড়া গলে গিয়ে জোড়া লেগে গিয়েছিল একসাথে। ফলে সে মাথা তুলতে পারছিলনা। আধো ঘুম আধো জাগরণে একটা মানুষের মূর্তি ভেসে ওঠে তার সামনে। মূর্তিটা কোন এক মহিলার। নার্স হতে পারেনা, কারণ নার্স কখনো রোগীর ঘরে এসে চেয়ারে বসে আরাম করে না। মহিলাটি চেয়ারে বসে পা দোলাচ্ছে। কান্না কান্না ভাব যেন। তার মা না এটা! হ্যাঁ, মা -ই তো বটে। মা এসেছে ওকে দেখতে? সে কি করে সম্ভব? আরব কালচারে তো ওরকম কোনো রীতি নেই। মা কিছু বলল না ওকে। হাতে একটা বোতল ছিল। নিশ্চয়ই পানির বোতল হবে। ভীষণ পানি পিপাসা পায় ওর। মা একটা গ্লাসে করে ওকে পানি এগিয়ে দেয়। সে পানি খাবার জন্য মুখ বাড়াবার চেষ্টা করে। ঠিক সেই মুহূর্তে একজন তরুন ডাক্তার এসে ঘরে ঢোকে। ওর মুখ থেকে গ্লাসটা এক ঝটকায় কেড়ে নিয়ে ফেলে দেয়। ওই ফাঁকে মা আলগোছে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। অল্পের জন্য বেঁচে গেলে, আমি আর একটু পরে এলে তোমাকে আর পাওয়া যেতনা,বলে ডাক্তারটি। ডাক্তারও প্যালেস্টাইনের মুসলমান ছেলে। রীতিনীতি জানে। এ ও জানে যে রীতিনীতি শুধু পরিবারের লোকজনের জন্যই নয়, হাসপাতালের নার্স ডাক্তার, পুলিশ উকিল, জজ-ম্যাজিস্ট্রেট সবার বেলাতেই প্রযোজ্য। হয়তো তার মনে মায়া দয়া ছিল বলেই তার সামনে একটি হত্যাকান্ড ঘটবে তা তার সহ্য হয়নি।
পরের দিন একটা তীব্র ব্যাথা বোধ করল তার তলপেটে। পোড়া চামড়ার ব্যাথা নয় ওটা, অন্যরকম ব্যাথা। নার্স এসে বলল ওটা তার প্রসব-বেদনা! বাচ্চা এসে যাচ্ছে। গর্ভধারণের মাত্র ছ'মাসের মধ্যেই। সে আশা করেনি বাচ্চা বাঁচবে। কিন্তু কি আশ্চর্য, এত ঝড়-ঝাপটার পরেও বাচ্চাটি মোটামুটি সুস্থই ছিল। নাম রাখা হলো মারোয়ান। ছেলে, ভাগ্যিস। নইলে হয়তো ওটাকেও কেউ গলা টিপে মেরে ফেলত। কিন্তু বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে আদর করবার উপায় ছিলনা। এমন কি ওকে এক নজর দেখতেও দেয়নি। ঝটপট হাসপাতাল থেকে বের করে কোনো এক এতিমখানায় রেখে এসেছিল, ওর অনুমতি ছাড়াই। অসতী মেয়েদের আবার অনুমতি কিসের?
এর তিনদিন পর জ্যাকেলিন নামের এক ইউরোপিয়ান ভদ্রমহিলা এসে ওর পাশে দাঁড়ালেন। গম্ভীর অথচ খুব মোলায়েম কন্ঠে বললেন- আমি তোমাকে সাহায্য করতে চাই। বুঝতে পারছ কি বলছি? পোড়া ঘায়ের ব্যাথায় বধির হয়ে গেলেও সোয়াদ শুনতে পেল ঠিকই, কিন্তু কষ্ট হলো বিশ্বাস করতে। সে তো পরিবারের সম্মান নষ্ট করেছে। হাসপাতালের বিছানাটা লক্ষ কোটি সূঁচের মতো লেগে আছ তার শরীরে। সবাই তাকে ঘৃণার চোখে দেখে। তাকে সাহায্য করা সম্ভব কারো পক্ষে? সে চারদিন ধরে কোন খাবার মুখে দেয়নি। খেতে পারেনা বলে নয়, কেউ খেতে দেয়না বলে। হাসপাতালের ডাক্তার নার্স কেউ আশা করেনা সে বাঁচবে। সুতরাং অনর্থক খাবার নষ্ট করে লাভ কি। এ সব সে মোটামুটি বোঝে। এ সমাজে পতিতা মেয়েদের কেউ বাঁচাবার চেষ্টা করে না, কারণ পতিতার ত্রাণকর্তাকেও প্রতিফলে পতনের সম্মুখীন হতে হয়। এত সব জেনেও তার মনে একটা ক্ষীণ আশার আলো জেগে ওঠে। অতি কষ্টে পোড়া ঠোঁট দুটো নাড়াবার চেষ্টা করে সে বলে, আচ্ছা।
তারপর কোথা থেকে কি হয়ে গেল তার মনে নেই। যেন একটা লম্বা ঘুম। ঘুম ভাঙ্গবার পর সে দেখে সে একটা বিমানের ভেতর পাতা বিছানায় শুয়ে আছে। পাশের একটা ছোট্ট ক্যারাজে তার কোলের শিশু মারোয়ান। এটা কি সত্যি সত্যি ঘটছে, নাকি স্বপ্নের ঘোর! কিছুক্ষণ পর জ্যাকেলিন তার পাশে এসে বসলেন যেমন করে রুগ্ন কন্যার পাশে মায়েরা বসেন। তেমনি স্নিগ্ধ মায়াময় মুখ, স্বগীয় সুধায় ভরা হাসি। বললেন- আর ভয় নেই তোমার। তোমাকে আমরা নতুন জীবন দেব। ঘটনা পরিক্রমা সব খুলে বললেন তিনি। হাসপাতালের কতৃপক্ষ পিতা-মাতাকে আশ্বাস দিয়েছিল একটি সুইস মানবকল্যাণ সংস্থা, যার একজন স্বেচ্ছাসেবক হলেন এই দয়ার সাগর এই মহিলাটি। তিনি সোয়াদ কে অন্যত্র নিয়ে যাচ্ছেন তার অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুকে একটু সহজ করার জন্য। ওর বাবা মাকে তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে যদি কোনোক্রমে বেঁচেও যায় সে, তার মুখ কোনোদিন দেখতে হবেনা তাদের। তার নামও যেন উচ্চারণ করা না হয় তাদের কাছে। শহরের বিভিন্ন এতিমখানায় খোঁজ নিয়ে তারা বের করেছে সোয়াদের অবাঞ্ছিত জারজ সন্তানকে। সোয়াদ বিস্ময়-বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থাকে মহিলাটির দিকে। ওরা কি একই পৃথিবীর মানুষ!
সুইজারলেন্ডের সবচেয়ে নামকরা চামড়া হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে সোয়াদের চিকিৎসা চলে। সুক্ষ জটিল অস্ত্রোপচারের সাহায্যে ওর বুকের চামড়া থেকে চিবুক ছাড়ানো হয়। দুই হাতে বোধশক্তি ফিরে আসে। আস্তে আস্তে এক'পা দু'পা করে হাঁটতেও শুরু করে। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে প্রথম দু'বছর সে একটি পরিবারের সাথে বসবাস করে। এই পরিবারটিই মারোয়ানকে পালকপুত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিল। তারাই মারোয়ানের বাবা-মা। কালক্রমে তারা সোয়াদেরও বাবা-মা হয়ে ওঠে। চব্বিশ বছর বয়সে সে নিজের পথে বেড়িয়ে পরার সিদ্ধান্ত নেয়। লেখাপড়া শেখে, ছোটখাট চাকরি নেয়। এমনকি অ্যান্টনিও নামক একটি অসম্ভব ভালো ছেলে তার প্রতি দূর্বলতা প্রকাশ করলে সে সানন্দে তার প্রস্তাব গ্রহণ করে। এখন সে মুক্ত পৃথিবীর মুক্ত বাতাসে অতি সুখের জীবন যাপন করছে তার স্ত্রী-অন্ত:প্রাণ স্বামী ও দুটি কন্যার সাথে। সে তার মুসলিম পরিচয় এখনো বর্জন করেনি, করবেও না। কিন্তু আরব বর্বরতার স্মৃতি তার মনকে কুঁকড়ে দেয় অহর্নিশি।
পুণশ্চঃ আজকে সোয়াদ শুধু একটি সুখী স্ত্রী ও মা -ই নয়, লেখিকাও। হ্যাঁ, লেখিকা। অভাবনীয়, অবিশ্বাস্য,তাই না? আমার এই গল্পটি লেখিকার স্বাক্ষাৎকার অবলম্বনে রচিত।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে অক্টোবর, ২০০৯ রাত ৯:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



