somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সুমন

০৬ ই মার্চ, ২০০৯ সকাল ১১:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

নিলয়দের বাসার কাজের ছেলে সুমন। খুব সহজ-সরল। প্রথম প্রথম যখন ওকে দেখি, একদম কুঁকড়ে থাকত। জড়সড়। প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসহীনতা ওর সমস্ত কিছুতে। লজ্জায় চোখের দিকেই তাকাতে পারত না। নিচের দিকে তাকিয়ে থাকত সবসময়। আমি গেলে নিলয় যখন ভাঁজ করা প্লাস্টিকের টেবিলটার ভাঁজ খুলে ড্রয়িংরুমের মাঝখানটাতে রাখত, সুমন তখন ওকে সাহায্য করত - ডাইনিং থেকে চেয়ার এনে দিত। আমি তখন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতাম ওকে। ওর হাত-পা-কে। ওর হাত-পা-এর হাঁটাচলাকে। ওর শরীরে ভাষাকে। ডাঙায় তুলে আনা মাছের মতো লাগত ওকে।

সবসময় একটা স্যান্ডোগেঞ্জী থাকে ওর গায়ে। ওটার রং সবসময়ই সাদা। ধবধবে সাদা নয়, ময়লা ময়লা সাদা। চুলটা বেশ এলোমেলো। পরিপাটি করে আঁচড়ানো নয়। ভ্রু বেশ ঘন এবং মোটা। বয়স আন্দাজ করার ক্ষমতা আমার নেই। অথবা কখনও চেষ্টা করি নি। কিন্তু এটুক বলতে পারি, ওর হাতের পেশিগুলো এখনও বাঁধতে শুরু করে নি। এখনও একটা আলসেমি ভাব আছে ওদের মধ্যে। আর নিলয়দের বাসায় যখন বেশ আরামেই আছে, বিপন্নতায় পরিশ্রমী হয়ে ওঠার সম্ভাবনাটাও খুব কম ওদের।

সুমনের নির্মল হাসি এখনও দেখি নি - খুব মজা পেয়ে স্বতস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে আসা কোন হাসি। এখন পর্যন্ত যতটুকু দেখেছি, তাতে স্বতস্ফূর্ততার উপর সংকোচের একটা গাঢ় আস্তরণ। কিন্তু তাতে সরলতা আছে। সাধারণত 'বোকা বোকা' ব্যাপারটাকেই আমরা সরল বলি, তাই বললাম।

এতদিন খেয়াল করছিলাম না। চেয়ার বের করে নিলয়কে সাহায্য করা কমে গেছে ওর। গেইট খুলতেও সুমনের পরিবর্তে নিলয়ই বের হয় সবসময়। আজ অনেকদিন পর দেখলাম সুমনকে।

অবশ্য সরাসরি দেখা না হলেও ওর আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠার উর্ধ্বগামী গ্রাফের প্রতিটা বিন্দু চোখে পড়ছিল। পড়াতে পড়াতে দরজার ওপাশে হাসির রোল ওঠার মধ্যে সুমনের কণ্ঠটা ঠিকই খুঁজে পাচ্ছিলাম কিছুদিন ধরে। ওর প্রতি অভিযোগগুলোর নমনীয়তা কমে আসছিল দরজার ওপাশে। আদর করে বোঝানোর পরিবর্তে সেগুলো সত্যি সত্যিই অভিযোগ হয়ে উঠছিল। এবং ধীরে ধীরে, খুব মাঝে মাঝে, সেগুলো দ্বিপাক্ষিকও হয়ে উঠছিল! এখনও বোকা বোকা, তবু সুমনের নির্বাক চলচিত্রগুলো আস্তে আস্তে সবাক হতে শুরু করছিল। আমার চোখে পড়ছিল, তবু খুটিয়ে দেখা হচ্ছিল না।

আজ দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম সুমনকে। ওর ঘাম-তেলে চকচক করতে থাকা গ্লোসি-শরীরটা এখন অনেক বেশি ম্যাট হয়ে উঠেছে। পুরোপুরি ধবধবে না হলেও গায়ের স্যান্ডোগেঞ্জীটা সে পথেই এগোচ্ছে। কালো শরীরের মধ্যে উজ্জ্বলভাবে জ্বলে ওঠা ওর ঝকঝকে দাঁতের হাসিটার মধ্যেও সেই আত্মবিশ্বাসহীনতা উধাও! 'আমি সেই খনির সন্ধান পেয়ে গেছি, হে মানুষ'। সুমনকে সেরকমই নির্ভার লাগল। এবং নিলয়কে ঠিক সাহায্য না করলেও ওর টেবিল চেয়ার ঠিক করার প্রক্রিয়াটাতে সুমন যেখানে বোকার মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে নির্বাক দর্শক হয়ে থাকত, এতদিন, আজ সে একদম সময় নষ্ট করল না! পর্দা সরিয়ে খুব দ্রুত বেরিয়ে গেল ড্রয়িংরুম থেকে। সুমন চলে যাওয়ায় ড্রয়িংরুমে তখন কেবল আমি আর নিলয়। আর আমাদের চেয়ার টেবিল। এক ব্যাগ বই খাতা, পেন্সিল আর পেন্সিলের দাগ মোছার ইরেজার। প্রথমদিককার সুমনের সেন্ডোগেঞ্জিটার মতো ময়লা ময়লা সাদা।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে জুলাই, ২০১০ রাত ১:৫৪
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×