এবং প্রতিবার আমি নতুন একটা বছর শুরু করি। প্রতিবার ১৩ এপ্রিল, এবং ৩১ ডিসেম্বর এই তারিখ দুটোয় এসে।
রিক্সায় উঠে বসার পরও কিছুটা ভয় ছিল, ঘুম পাড়ানোর আগেই না ঘুমন্ত সূর্যকে দেখতে হয়! সিটে বসে অশান্তি হচ্ছিল। সুযোগ খুঁজছিলাম। গতিটা একটু ঢিলে হলেই বলব - ড্রাইবার, একটু জুরে ছালাউরেবা। তারপর ড্রাইভারটা বসা থেকে উঠে-বসে চালাত। গায়ে-মুখে একটু বেশি বাতাস লাগতো। দু পাশের দোকানপাটগুলো একটু বেশি দ্রুত পাশ কাটিয়ে চলে যেত। তারপর আবার সবকিছু আগের মতো হয়ে যেত।
কিন্তু আমি সুযোগ পেলাম না। ড্রাইভারটা মোটামুটি বেশ দ্রুতই চালাচ্ছিল।
নদীতীরে গিয়ে দেখি সূর্য খিলখিল করে হাসছে!
আমার কালো টিশার্টের পিঠের উপর তারপর চড়ে বসল শেষ বিকেলের রোদ্দুর। আর আমি নদীর দু তীরে বাঁধানো কংক্রিট-টাইলসের পিঠে। সূর্যের চোখে ঘুম নেই! তবে কিছুক্ষণ পরপর দূরের সবুজ পাতাগুলোর মুখে হাসি ফোটানো বাতাসটা আমাকেও ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছিল।
অনেক নীচে, নদীর খুব কাছাকাছি, বড়বড় পাথরগুলোর আড়ালে আড়ালে গজিয়ে ওঠা লম্বা লম্বা নাম না জানা বুনো ঘাসগুলোর ফাঁকে ফাঁকে দুটো কিশোর। অথবা কিশোরী। ঠিক কৈশোর না ওদের, শৈশব-কৈশোরের মাঝামাঝি একটা সময়। দুটো ছেলে, দুটো মেয়ে অথবা একটা ছেলে-একটা মেয়ে বললেই বেঁচে যেতাম। কিন্তু দূর থেকে দেখে ওদের বুঝতে পারছিলাম না। অথচ সাধারণত দূর থেকেও ছেলে-মেয়েতে পার্থক্য করা যায়। আমি পারলাম না!
সমস্যা একজনকে নিয়ে। একজনের গায়ে ফ্রক; কোনো মেয়ে ছেলের পোশাক পড়লেও কোনো ছেলের মেয়ের পোশাক পড়ার কথা নয় ভেবে ওকে আমি মেয়েই ভেবেছি। কিন্তু অন্যজনের গায়ে জামা নেই। প্যান্টটা দেখেও কিছুই বোঝা যায় না। সমস্যা ওকে নিয়েই।
ওরা শুকনো ডাল খুঁজছিল সেই বুনো ঘাসগুলোর ফাঁকে। বেশ কিছুক্ষণ খুঁজে টুজে দুইহাত দিয়ে স্বচ্ছন্দে ধরতে পারার মতো পরিমাণ হয়ে গেলে ওগুলোকে কোলে করে এক জায়গায় জমা করছিল। আমি চুপচাপ দেখছিলাম ওদের। আড়চোখে সূর্যকেও একটু পরপর। সূর্য কিছুটা ক্লান্ত তখন। একটু একটু ঢুলুনি শুরু হয়েছে।
"বাই...এ বাই...আব্বায় মুরগী আনসোইন..." হাফপ্যান্ট পড়া আরেকটি অর্ধনগ্ন ছেলের দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে আসা দেখলাম কথাগুলোকে সঙ্গে করে। অন্যজনকে নিয়ে সংশয়টা দূর হলো। ছেলেই। এবং সংশয়টা দূর হলো আরেকজনের ডাকে। বোনকে কেউ 'বাই' ডাকে না আমি জানি। খুব সহজ সূত্র।
ছেলেটা কাছে আসল। ওর বড় ভাইয়ের কোনো মনোযোগ পেলো না। সে আগের মতোই শুকনো ডাল খুঁজছে আর জড়ো করছে। ফ্রক পড়া মেয়েটিও।
"আব্বায় মুরগী আনসোইন।" এবারে আগের চেয়ে উচ্ছ্বাসটা আরেকটু বেশি।
কিন্তু বড় ভাইয়ের গাম্ভীর্য আরো বেড়ে গেছে! আস্তে করে কিছু একটা বলেছে যেটার মানে 'তো আমি কী করব' ধরণের। একটা অবহেলা মাখানো উত্তর। কিন্তু ছোট ভাইয়ের আনন্দ কিছুতেই কমে নি তাতে!
আমি ভুলেই গিয়েছিলাম ঘুম পাড়ানোর কথা! অভিমান নিয়ে, দেখলাম, সূর্য প্রায় ঘুমিয়েই পড়েছে! আমার ওকে ঘুম পাড়ানো হলো না। একা একা ঘুমিয়ে পড়া ওর পিঠে আলতো করে কিছুক্ষণ পিঠ চাপড়ে দিলাম কেবল। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলাম আস্তে আস্তে।
সবসময় কি আর আমিই ঘুম পাড়িয়ে দিব! এখন অনেক বড় হয়েছে না ও!
১৩০৪০৯২২০০
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে জুলাই, ২০১০ রাত ১:৫৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



