somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মঞ্চে দাঁড়ানো বন্দী আমি, জোর নেই ডানায়

২৫ শে জানুয়ারি, ২০০৮ রাত ২:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার খুব কাছাকাছি আসার আগ পর্যন্ত, বেশির ভাগ মানুষ আমাকে খুব শান্ত শিষ্ট, চুপ চাপ বলে জানে, হাসি ছাড়া যে একটা কথাও বলতে পারি, বিশ্বাসই করতে পারে না। কারণ, বড় আড্ডায় আর ক্লাস ভর্তি সবার হইচইয়ের সামনে আমি খুব অল্প কথা বলি। অথচ, আমার কাউকে ভালো লেগে গেল, তার সাথে অবিরাম পট পট চালিয়ে যাই। মীরার সাথে আড্ডায় বসে মাঝে মাঝে দিব্যি রাত কাবার হয়ে যায়। ব্যক্তিবিশেষে ফোনালাপ ছ' মিনিট থেকে ছয় ঘন্টা পর্যন্ত লম্বা হয়।

আরেক জায়গায় আমি পট পট করতে জানি, ক্লাস ভর্তি সবার সামনে। স্কুলে বক্তৃতায় আত্মবিশ্বাসে বরাবর বাড়াবাড়ি রকমের মার্ক পেতাম। সেটাই হয়তো কাজে লেগেছে ক্লাস নেয়া শুরু করার পরে। বলছি, আমার নতুন চাকরির কথা। পড়াচ্ছি, এইচএসসির ছাত্র ছাত্রীদের কেমিস্ট্রি, একটা কোচিং সেন্টারের হয়ে। সিডনীতে খুব অল্প সংখ্যক কোচিং সেন্টার আছে, নভেম্বরে এপ্লাই করার সময় ভাবি নি চাকরিটা হয়ে যাবে। হয়ে গেল খুব সহজেই।

ক্লাস নেয়া শুরু করার পরেই টের পেলাম আমি আমার ছাত্র ছাত্রীদের ভালোবেসে ফেলছি। কেমিস্ট্রি পড়াতে পড়াতে কখন বিশ্বব্রাম্মান্ডের রহস্য নিয়ে আঁতলামি আলাপ শুরু করে দেই, আমার ছোটবোনের বয়সী ছেলেমেয়েগুলোর মুগ্ধ, নিষ্পাপ চোখে পৃথিবী দেখা শুরু করি, টেরই পাই না। ওদের মেধা আর কর্মঠ হওয়ার সমীকরণ বুঝাই। মেধা নিয়ে সবাই জন্মায় না, কিন্তু কর্মঠ যে কেউ হতে পারে। আর যথেষ্ঠ কর্মঠ হলে মানুষ মেধাকে অধিক্রম করতে পারে। ওদের চোখ দেখে বুঝি, আজ বাসায় গিয়ে দুই ঘন্টা বেশি পড়বে। কালই হয়তো ভুলে যাবে, কিন্তু এই দুই ঘন্টাটুকুই লাভ। অলস আমি বুঝি, আলসেমিটাই সব নষ্টের মূল। আমার কথা শুনে দশ জনের একজনও যদি আলসেমিকে ঝেড়ে ফেলতে পারে, ক্ষতি কি তাতে?

পড়াতে পড়াতেই টের পাই, আমার পড়াতে বড় বেশি ভালো লাগে। এক জীবন কাটিয়ে দিতে পারব পড়িয়ে। কিন্তু, খুব টের পাই, আমি খুব ভালো শিক্ষক হতে পারব না কখনও। খুব ভালো শিক্ষকদের ডাক্তারদের মত হতে হয়। ভালো ডাক্তাররা রোগীর চিকিৎসা করবে, কিন্তু নিজেকে খুব বেশি জড়াতে দিবে না। অপরেশন থিয়েটার থেকে বের হওয়ার সময় রোগীর রোগ ধুয়ে মুছে রেখে যাবে পিছনে। মমতার হাত বুলাবে রোগীর মাথায়, কিন্তু সে মমতা শুধুই একজন ডাক্তারের, তার রোগীর প্রতি। মমতাটুকু ডাক্তারের বুকে রক্তক্ষরন ঘটাবে না, তার রাতের ঘুম কেড়ে নিবে না। ভালো শিক্ষকও সেরকম। শিক্ষার্থীদের ডাক্তারের চোখে দেখবে, প্রত্যেকের প্রতি আলাদা মনযোগ দিবে, কারও সমস্যা থাকলে সেটার সমাধানও করবে, কিন্তু ক্লাসরুম থেকে বের হওয়ার সময় সব পিছনে ফেলে যাবে।

কিন্তু, আমি পারি না। এক এক জন আস্ত ছাত্র, আস্ত ছাত্রী আমার ভিতরে চুপি চুপি ঢুকে, এক একজন আস্ত মানুষের জায়গা করে নেয় একটু একটু করে।

অ্যামান্ডাকে পড়িয়েছি তিন বছর হলো। কিন্তু এখনও ভাঙা সংসারের মেয়েটার কথা মাঝে মাঝে মনে পড়ে মনটা উদাস হয়ে যায়। মা বাবা দু'জনেই ক্যারিয়ার পাগল। ঠোকাঠোকি হয়ে শেষ মেষ আলাদা হয়ে গিয়েছে। নিজেদের কাজ নিয়ে এত ব্যস্ত যে একমাত্র সন্তান অ্যামান্ডাকে দেখার কেউ নেই। দিয়ে দিয়েছে বোনের সংসারে, সাথে অঢেল টাকার হাত খরচ। ষোল বছরের একটা মেয়ে কি শুধু টাকা খেয়ে বাঁচতে পারে? মেয়েটা নাক কুঁচকে বলতো, আই হেইট মাই প‌্যারেন্টস। আর আমার বুকটা ধ্বক করে উঠতো।

প্রাইভেট স্কুলে অঢেল টাকা ঢেলেও রেজাল্ট ভালো হচ্ছে না বলে খালা জোর করে টিউটর রেখেছিল। প্রথমদিন অভিমানী মেয়েটা মুখ তুলেও তাকাবে না। যা-ই জিজ্ঞাসা করি, চোখ উল্টে কাটা কাটা জবাব দিয়ে আবার অন্য দিকে ফিরে শুয়ে পড়ে টেবিলে মাথা রেখে। আমার প্রথম ছাত্রী। আমি হকচকিয়ে গিয়েছি। এরকম করলে পড়াব কি করে? এক পর্যায়ে সে কঠিন মুখ করে বলে, "শোন, তুমি চুপ চাপ বসে থেকে টাকা নিয়ে চলে যাও। তোমারও লাভ। আমারও বাবা মায়ের টাকা নষ্ট হবে। ওদের অনেক টাকা, একটু নষ্ট হলে অসুবিধা নাই। আমি খুশিই হবো।"

দ্বিতীয় দিন থেকেই পরিস্থিতি পাল্টে গিয়েছে। মমতা দিতে জানলে কিছুটা ফেরতও পাওয়া যায়--এই থিওরী কাজ করেছিল। এক বছর পড়িয়েছিলাম। ও ইয়ার ইলেভেনে উঠে যে সাবজেক্টগুলো নিয়েছিল, তার কিছুই আমার সাথে মিলে নি। তাই আর পড়ানো হলো না। কিন্তু মাঝে মাঝেই মনে পড়ে। সপ্তাহে দু্ই ঘন্টা সময়টুকুই আমার বুক ভরা মায়া দিতাম ওকে, ও টের পেত। যেদিন জিভ ফুঁটো করে এসেছিল, সেদিন ফোনে কথা বলেই বুঝেছি একটু অন্যরকম শোনাচ্ছে।
"কিছু হয়েছে?" জিজ্ঞাসা করতেও কিছু বলে নি। পরের দিন সামনা সামনি দেখেই বুঝেছি, মেয়েটা তীব্র যন্ত্রনায় তড়পাচ্ছে। জিভ বের করে আমাকে দেখাতেই আঁতকে উঠেছিলাম। বিভৎস দৃশ্য!
"কি সর্বনাশ! তোমার খালা জানে?"
"হুহ, জানবে কোথথেকে? আমার দিকে তাকালে তো!"

পুরা ছয় মাস বাসার সবার থেকে চেপে গেল মেয়েটা, আমি আর ওর স্কুলের বন্ধুরা ছাড়া কেউ জানতও না।

রাতে পার্টিতে যেতে জানালা দিয়ে পালাতো ও। ওর সব গল্প শুনলে মানুষ নাক কুঁচকাবে। এমন সৃষ্টিছাড়া মেয়ে! কিন্তু আমি খুব বুঝতাম, একটু ভালোবাসা পেলেই মেয়েটা অন্য রকম হতো। যত যা-ই করুক, ওর মনে এখনও পাপের কলঙ্ক লাগে নি। বাবা মায়ের থেকে যা পায় নি, সেই ভালোবাসা পাওয়ার জন্য সব করতে রাজি ছিল। বোকা মেয়েটা ভেবেছে জিভ ফুঁটো করে, কিংবা জানালা দিয়ে পালানোর সাহস দেখিয়ে বন্ধুদের ভালোবাসা পাবে।

এক দিন ও বড় হবে জানি। বুঝতে পারবে নিজেকে। আমি শুধু খুব করে চাইতাম, যেই বিষবৃক্ষের বীজ ওর ভিতরে বপন করে দিয়েছে ওর বাবা মা, সেটা যেন অঙ্কুরিত না হতে পারে, বড় হতে না পারে। যা কিছু ও নিজে পায় নি, সেগুলোই যেন এক সময় দিতে শিখে। বিদ্রোহী হয়ে নিজের সর্বনাশের কারণের কার্বন কপি নিজেতে এঁকে না ফেলে।

আর রোবিনা? নুরতিন? স্টেফিনি? ডিলেক? কোন এক অদ্ভূত কারণে, আমার ছাত্রীদের বেশির ভাগেরই ছিল ভাঙা পরিবার। ডিলেককে নিয়ে লিখেছিলাম 'অচেনা মুখে চেনা প্রতিচ্ছবি'।

এই যে, একটা জীবনের বেদনার স্পর্শ ওদের থেকে পেতেই আমি তীব্র বিষণ্নতা নিয়ে বাড়ি ফিরতাম। অস্থিরতায় ছেঁয়ে যেতাম, একটু কিছুই কি করতে পারব না আমি?
"মাটির তৈরি ময়না বলে, 'তাইলে কেনে মনটা দিলে,
না দিলে জোড় যদি ডানায়"...

এখন ক্লাস ভর্তি ছেলেমেয়েরা। এক জীবন যদি পড়িয়ে কাটিয়ে দেই, তাহলে আরও অনেকে আসবে। আমার প্রায়েই মনে হয়, ওদের আমি যতটা না শিখাতে পারি, তার চেয়ে অনেক বেশি ওদের থেকে শিখি। এক অদ্ভূত উপায়ে ওদের জীবনে আমাকে উঁকি দিতে দেয়া হয়, জীবনকে আরেকটু জানা হয়। তীব্র যন্ত্রনাময় উপলব্ধিতে নিজের পায়ের বেড়ীটা টের পাই। নিজের সীমাবদ্ধতা চিনতে শিখি, তাই পড়াতে লোভ হয় খুব।

কিন্তু তারপরেও, মাঝে মাঝেই যেন কুঁকড়ে উঠি। লেখক আর শিক্ষকেরা সার্বক্ষনিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকে। ওদের ভুলগুলো যেমন খুব করে চোখে লাগে, মানুষ ওদের ভালোবাসলে দেব দেবীর জায়গায় বসিয়ে দেয়। "ঠিক সেরকম" হয়ে উঠার চেষ্টা করে। নিজের অসংখ্য ভুল দোষ এভাবে হয়তো অনেকগুণে বেড়ে ছড়িয়ে যাবে... ভাবতেই বড় বিরক্ত লাগে নিজের উপর। আমি আরেকটু শুদ্ধ মানুষ হলে কি হতো?
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে জানুয়ারি, ২০০৮ রাত ২:৪০
৩০টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা ও আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ০৯ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৩০

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় কী?

কর্মসংস্থান? না।

বিনিয়োগ? না।

ডলার সংকট? না।

গার্মেন্টস খাতে ছাঁটাই? না।

ব্যাংকিং খাতের আস্থা সংকট? না।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো— কোনো অনুষ্ঠানে জুলাই চেতনা কত মিলিলিটার ঢুকেছে, কে কতবার উচ্চারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×