somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

তেল : তুই যা জিনিস গুরু

১৯ শে মার্চ, ২০০৮ সকাল ১০:৫১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

তিলে তেল হয়, কৈয়ের তেলে কৈ ভাজা, তেলা মাথায় তেল দেওয়া। এক তেল নিয়ে কম রঙ্গ হয়নি এই বঙ্গে। এখনও যে হচ্ছে না তা নয়। হচ্ছে এবং আগের চেয়ে বেশিই হচ্ছে। তবে তেল এখন শুধু আর রঙ্গ নয় এটি আমাদের দেহ ও সমাজের একটি অঙ্গ। সময়টাই এখন তেলের। চারদিকে শুধু তেল, তেল আর তেল। একটু ভালভাবে তাকালেই দেখা যায় সবার গা থেকে থেকে এখন ঘাম নয়, ফোঁটায় ফোঁটায় তেল ঝরছে। আমরা সবাই এখন একেকটি তেলের বিশাল বিশাল আধার। আর কিছু নয়, সর্বোৎকৃষ্ট জায়গায় কিভাবে এ তেলের সর্বোচ্চ ব্যবহার করা যায় তা জানার জন্যই আমরা সবাই এখন হন্যে হয়ে ছুটছি। তেল মারতে মারতে একেকজনের গায়ের চামড়া তুলে ফেললেও আমরা ক্ষান্ত হইনা। উদ্দেশ্য হাসিল না হওয়া পর্যন্ত খুঁজতে থাকি আর কাকে তেল মারা যায়।
কান পাতলেই আমরা এখন দুই শব্দের একটা বাক্যই শুধু শুনি। তেল মার, তেল মারো এবং তেল মারুন। বাবা সন্তানকে বলে তেল মার, মা সন্তানকে বলে তেল মার, বন্ধু বন্ধুকে বলে তেল মার, আত্মীয় আত্মীয়কে বলে তেল মার, শিক্ষক ছাত্রকে বলে তেল মার, প্রেমিক প্রেমিকাকে বলে তেল মারো, প্রেমিকা প্রেমিককে বলে তেল মারো, স্ত্রী স্বামীকে বলে তেল মারো, স্বামী স্ত্রীকে বলে তেল মারো, প্রতিবেশী প্রতিবেশীকে বলে তেল মারুন, সহকর্মী সহকর্মীকে বলে তেল মারুন। আরেকটু এগোলে এর পাশে আরও দু’টি শব্দ শুনি, তেল মারুন জীবন গড়ুন। আরও শুনি, তেলেই শক্তি তেলেই মুক্তি। তেলই এখন সত্য, তেলই এখন ধর্ম। আমরা সবাই এই তেলের বশ্যতা স্বীকার করেছি। ব্রিটিশরাজকে তেল মারতে শিখে আমরা এ তৈলবিদ্যাটি আমাদের রক্তে, মাংসে, অস্থি, মজ্জাতে মিশিয়ে ফেলেছি। আমাদের মনোজগতে এখন শুধু তেল। তেল ছাড়া আমরা ভাবতে পারিনা, কথা বলতে পারিনা, চলতে পারিনা, অর্জণ করতে পারিনা, কিছু পারিনা, কিচ্ছু পারিনা। এক তেলের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ইরাক আক্রমন করে। তবে এর আগে ও পরে ব্যবহার করে আসল তেল। মিডিয়ার মাধ্যমে পুরো বিশ্ববাসীকে এই তেল মারে তারা। উদ্দেশ্য আক্রমনটাকে হালাল করা।
প্রকৃতপক্ষেই এখন তেল-তেলবাজদের জয়জয়কার। ইরাকের মতো তেলসমৃদ্ধ রাষ্ট্র যেমন পাড়ার সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ের মতো লোভনীয় তেমনি তেল মারতে জানা লোকও এখন পরম কাক্ষিত। তেল মারতে না জানা লোক ছাড়া এখন কিচ্ছু হয়না। পেশাও হয়ে উঠেছে এখন তেল নির্ভর। মেডিকেল রেপ্রিজেন্টিটিভ, ব্যাংক, বীমা ও ইন্সুরেন্সসহ বিভিন্ন কোম্পানির এক্সিকিউটিভ অফিসাররা তাদের অগ্রদূত। এদেরকে দিয়ে প্রত্যক্ষ তেল মারা ছাড়াও তেল ব্যবহারের আরও মাত্রা রয়েছে। অফিস ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঝকঝকে তকতকে রাখা, পণ্যের মান যাই হোক না কেন আকর্ষণীয় মোড়ক ব্যবহার করা, বিজ্ঞাপন দেওয়া সবকিছুর উদ্দেশ্য একটাই কাস্টমারদের তেল মারা।
তেলের এ যুগে তেল ছাড়া প্রেম হয়না, প্রেম টিকিয়ে রাখা যায় না, চুমো খাওয়া যায় না, সঙ্গম করা যায় না, বাসা ভাড়া পাওয়া যায় না, চাকরি হয়না, হলেও টিকিয়ে রাখা যায় না, ট্রেণের টিকিট পাওয়া যায় না, ডাকপিয়ন টাকা দেয়না, মন্ত্রী-এমপি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপতি হওয়া যায় না, এমনকি ঘড়ি ধরে ধরে তেল না মারলে বিশাল দয়ালু বিধাতার বিন্দু পরিমান দয়াও পাওয়া যায় না। তেল এমনই এক যাদুকরী টোটকা যে এর মাধ্যমে সব হয়। এই তেল মারা মানে তেল ঝড়ে ঝড়ে পড়া হাসিযুক্ত পা চাটা। সঙ্গমে যেমন তেলযুক্ত কনডম তেমনি প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে তেল ব্যবহারের উদ্দেশ্য একটাই-যাত্রাপথকে পিচ্ছিল করা, সহজ করা।
স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের শিক্ষকরা আমাদের প্রতিনিয়ত এই তেল মারাই শেখাচ্ছেন। নিয়োগ থেকে শুরু করে পদোন্নতির জন্য, ভিসি-প্রোভিসি হওয়ার জন্য গন্ডমূর্খ এমপি-মন্ত্রীদের পা চাটার মাধ্যমে তেল মারতেও তারা দ্বিধা করেন না। আমরা দেখছি এবং শিখছি। এসব মহান (?) শিকদের প্রণীত পাঠ্যসূচী এবং নিয়ম-কানুনও আমাদের তেল মারার শিক্ষাই দেয়। ...আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে আমি যেন সেই কাজ করি ভাল মনে। ছোটবেলায় শেখা আপাত নির্দোষ এ বুলিটি যে তৈলবিদ্যা শেখারই নামান্তর তা আমরা একটু চিন্তা করলেই বুঝি। এর মানে যে মহাজনদের যেকোন কথা হাসিমুখে মেনে নেয়া- তেল দেয়া তা আমরা বুঝি। পড়ার সময় পড়া, খেলার সময় খেলা। স্বাধীনতাহরণকারী এ বুলিটির আড়ালের কথাটা যে সময়মতো অফিসে যাও এবং মহাজনের কথামতো কাজ করো মানে তেল মারো, তা আমরা সহজেই বুঝি। কিংবা লেখাপড়া করে যে গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সে। মানে জ্ঞানার্জণ নয় পড়ালেখার উদ্দেশ্য একটাই তাহলো গাড়ি-ঘোড়া চড়া। সেটা যেভাবেই হোক। কারো পা চেটে হলেও। তারপর ইস্ত্রি করা শার্ট-প্যান্ট পড়া, কিন শেভড থাকা, কোট-টাই পড়া শেখার মাধ্যমে আমরা তৈলবিদ্যাই শিখি। নিজেদেরকে কোম্পানিগুলোর এক্সিকিউটিভ অফিসার হিসেবে যোগ্য করে তুলি। আমরা এসব শিখি এবং তৈলবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে উঠি। এ তৈলবিদ্যা যে যত বেশি আয়ত্ব করতে পারি জীবনে সে ততটাই উন্নতি করি। আমরা বিশ্বাস করতে শিখি তেলহীন বিদ্যা ফুঁটো পয়সার মতোই অচল।
আমাদের বিশ্বাস, চিন্তা-চেতনা,অস্তিত্ব, সমাজ, সংসার, আকাশ, বাতাস, চাঁদ, জোৎস্না, সূর্য এখন তেল নির্ভর হয়ে পড়েছে। অন্যকে কিভাবে তেল মারা যায় তার কায়দা কানুন জানতেই আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। নিজের জ্ঞান-বুদ্ধিকে শাণিত করতে নিজেকে তেল মারার কথা আমরা চিন্তাও করিনা। তেলখেকো বাজারি কুকুরের গায়ে যেমন লোম থাকে না, সর্বত্র এভাবে তেল মারামারির ফলে আমাদের সমাজ-সংসারও আজ লোমহীন হয়ে পড়েছে। আমাদের বিচার বুদ্ধিতে জট লেগেছে-মরিচা ধরেছে। তবে মরিচা সারাতেও কিন্তু তেল লাগে। এটা যে কোন তেল তা আমরা জানি। কিন্তু এখানে আমরা তা মারি কি? ##
১০টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×