প্রথম অংশ
ঝড় বিগত রাতে আমিনুল ধলপহরের আলোয় নিজের শক্তপোক্ত ভ্যানখানা নিয়ে বের হয়। গত রাতের ঝড়ের অবশেষ বলতে বাতাসের গতর ঠন্ডা হয়ে আছে, লাল মাটির রাস্তায় জলপাই-আম-কাঠাঁল-দেতুই এমন অসংখ্য পাতার বিন্যস্ত সবুজ কোন গল্প বা কাহিনীকে সুগঠিত করে না, এই বিন্যাসে শেষমেষ ওই মাটির শয্যাই প্রধাণ হয়ে ওঠে। তার চোখে তাই অসংখ্য সবুজের মৃতদেহ, ঝড়ের ভয়াবহতার নিদর্শন হয়ে চিত্রিত হয়। ঝড়টা তবে ভয়াবহই ছিল, ভাবে সে। অথবা সমস্তরকমভাবেই সুখীকে না পাওয়ার আশংকা তাকে বিভ্রান্ত করে তুললে সে নেতিবাচকতাকেই নিজের মনে চাষ করতে থাকে। আর সেই নেতি দিনের শেষে তার কর্মক্লান্ত দেহখানাকে মৃতের চাদর হয়ে জড়িয়ে ধরলে সে ভাবতে থাকে-মানু মইলে তবে কোন কামেই আহে না, সেসুমে মাডি আর মানুতে মিলমিশ-জিন্দা মানুর কুন কামে লাগবো না আর ওই মরা মানু। কে বোঝে তখন আমিনুলের এই ভাবনা-কেউ না। এমনকি তাকে শুইয়ে জায়নাল যে ভ্যান টেনে নিয়ে আসলো সেও না। এই জায়নালই সকাল থেকে আমিনুলের কাজের সঙ্গী। আমতলিতে দাঁড়িয়ে ছিল তার জন্য। দূর থেকে আমিনুলের ঝড় বিভ্রান্ত চোখ জায়নালকে সুখী ভেবেছিলো। কিন্তু যখনই জৈষ্ঠ্যের কোন এক ভোরের বাতাসে সেই অবয়ব থেকে একটা বেগনি আঁচল বাতাসে উড়লো না-তখনই বুঝল ওই শরীরটা জায়নালের। যে শরীরে লজ্জা নাই-ঢাইকা রাখার কিছু নাই ওই শরীর কি আর সুখীর শরীর হব। না , একজনের শরীর আরেক জনের হয় না। যার শরীর তারই। কিন্তু শরীরে শরীরে এক হয়ে ওঠার বিষয় আছে। সেটা বোঝা এবং তার সম্পর্কিত কৌতুহল জায়নালের ষোল আনা। সে কুমাইরা গাছের আগা জোগাড় করে আনে আমিনুলের জন্য। এবং এই আগাই আমিনুলকে আবার করে সুখীর কথা মনে করিয়ে দেয়।
কুমাইরা গাছের আগা হাপে খায়। জগলুল কবরাজ আগে গেরামে বেচতো এই জিনিস। অহন নাই-অহনতো কতো গাছ গাছড়াই নাই। কুমাইরা গাছের লতাও নাই। কইমা গেছে। আরে, এই লতা পাওনকি অত সহজ। ছুডু কদু গাছের মত দেখতে, কাঁডা আছে, গাছের কুরি বাইর অইলেই হাফে খায়ালায়। কবরাজরা, ভাইলে ভাইলে থাহে, জঙ্গল মঙ্গলে ঘুইরা এইডা জোগাড় করে। আমাগো বারির পিছে একটা কুমাইরা লতা আছে-সআলে মুততে যায়া দেখলাম, মনে অইলো আমি আর তুমি মিইলা খাই। আমিনুলের ভ্যানে আয়েস করে বসতে বসতে জায়নাল বলেই যায় এসব কথা। আমিনুলের চোয়ালে তখন পিষ্ট হচ্ছে কুমাইরার লতা। গতরে শক্তি আসে-কামে জোর আহে এই লতা খাইলে। আইজ সুখী আইবো। সুখীর লগে দেহা আইবো। ভাবে আমিনুল-তার খালি গায়ের ঘাড় বগল ঘেঁষে চলে যাওয়া বাতাসে সে আর ঠান্ডা অনুভব করে না। নাসারন্ধ্রে কোত্থেকে ভেসে আসে সুখীর গন্ধ। কামের বেলায় নাগিণীও গন্ধ ছড়ায়-চম্পক গন্ধ। সুখীও তাইলে ওই দিন গন্ধ ছাড়ছিল-বোঝে নাই আমিনুল, কি বোকা সে বোঝে নাই। ভ্যানের চাকার ঘুর্ণন দ্রুত হয়। আমিনুলের চোখে সাপের নিষ্ঠুর দৃঢ়তা আসে, এবং তা ক্রমশ শীতল হতে থাকলেও কি আশ্চর্য গরম হলকা বের হয় নাক দিয়ে। ঘামতে শুরু করে প্রচন্ডভাবে। রাম-রাবণের শক্তি চিবিয়ে মৃত আম গাছের গুঁড়ি তোলে সে ভ্যানে, মোটা মোটা গুঁড়ির বেড় পাঁচজন মিলেও পাওয়া যায় না। সেই গাছও গন্ধ মেদুর হয়-মৃত আম গাছের শরীর হতেও তবে আতরলোবানের বাস আসে। কিন্তু কি আশ্চর্য-আম গাছ মরলেও মানুষের কাজে লাগে।
সন্ধ্যা ঘনালে বাঁশ-শিমুল-গাব-কাঁঠালেরে ঢেউ পশ্চিমে গিয়ে তার অঞ্জলিখানা দিন শেষের সূর্যের প্রতি নিবেদন করে। আকাশের গায়ে গায়ে ভেসে চলা বহুবর্ণা মেঘেরা রাতের প্রহরী হবার সজ্জা নেয়। ট্যাঁ ট্যাঁ করে ডেকে চলে যাওয়া লাল ঠোঁটের টিয়া-কিচিরমিচির শালিক দিন শেষের আলোয় মিশে যায়। উ উ ডাহুক ডেকে ওঠে। আকাশের গায়ে মুচকি হাসির চাঁদ আজ কেমন প্রচ্ছন্ন-তারায় তারায় জ্বলে ওঠায় আজ কেমন ব্যকুলতা। কি সুখে আজ মেলে দেয়া ডানায় ঘুর ঘুর জোনাকি গাছতলার ছায়া খোঁজে। বোনের বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে গেলে খড়ের ওম ওম গন্ধও সুখীকে বাইরে ডাকে। বাতাসে বাতাসে একটা ফিসফিসানি নৈঃশব্দ্যকে দখল করে। তাতে কি সুর কি ডাক ভেসে আসে তা বোধগম্য নয় কোনকালেই-কেবল একটা প্রবল টান-একটা অমোঘ আকর্ষণ ডাক দিয়ে যায় তার উৎস অনুসন্ধাণে। সেই ফিসফিসানিতে হয়তো কৃষ্ণের বাঁশিই বেজে ওঠে- হয়তো সাপুড়িয়ার সুর শুনতে পেয়ে বাঁধ না মানা নাগিণী হয়ে যায় সুখী। শব্দহীন বেরিয়ে পড়ে অন্ধকারে। স্কুল মাঠে গিয়ে ঠিকই দেখতে পায় আমিনুলকে। আমিনুলই তার ইপ্সিত মানুষ হয়ে ওঠে-শিহরণ আর জাগরণের যাদুর কাঠি হয়ে ওঠে। খোলা আকাশের বাধাহীনতা তাদের ইতিহাস আর সমকাল বিচ্ছিন্ন করে তোলে। উড়ে উড়ে প্রেম করতে থাকা ফড়িং হয়ে যায় ওরা। চারখানা হাত পাখা হয়ে গেলে তারা মাটিতে পা লাগিয়েই উড়তে থাকে-কখন একটা দেতুই গাছের তলায় এসে হাজির হয় খেয়াল করে না। এই দেতুই গাছ একা একাই সেই রাতে মানব জন্মের রহস্য কে নিরাবেগ অবলোকন করে।
এবং মহাকালের আকাশ তলে যখন যুগে যুগে-সীমানায় সীমানায় সংঘাত আর মানব হত্যার মচ্ছব চলে-তখন আমিনুল আর সুখী জন্ম যাতনায় আস্থির হয়ে ওঠে। একের ভেতর অপরকে অনুভব করার যন্ত্রণা তাদের তীব্র হয়ে ওঠে। সেই যন্ত্রণার প্রশমন ঘটে কেবল মাত্র যন্ত্রণার অবশেষেই। তাই তারা নিরুপায় আর বোধ প্রধাণ হয়ে ওঠে। আবেশে-আবেগে জড়িয়ে আসে তাদের হাত-ঠোঁট। সুখীর বুকের ভেতর গুমরাতে থাকা আবদ্ধ মন মাংসে আর রক্তে স্তন হয়ে আমিনুলের হাতের তেলোয় মুক্তির আকাশ খুঁজে পায়। তপ্ত আমিনুলের শরীর জুড়িয়ে দিতে সুখী হয়ে ওঠে থৈ থৈ জলাশয়-যাতে ঝড় আসে, মেঘ আসে-সব কিছুই সে বুকে সয়। সেই জলাশয় আমিনুলের আলতো আঙ্গুলের ছোঁয়ায় থীর থীর কাঁপে, কাঁপুনি দুলিয়ে ওঠার আবেদন করে-হাসিতে আর গরম শ্বাসে। আর আমিনুল যেন কোন এক রহস্যের সন্ধান পায়। প্রথম কোন নারী শরীর আজ তার সামনে উন্মুক্ত। ডাকছে তাকে-আহ্বান করছে। সামালাতে পারে না আমিনুল-রক্তে তার বান জাগে-ছটফট করে ওঠে। এক অবুঝ আর দুর্দমনীয় ক্ষুধা জাগে তার। পেট ছাড়াও ক্ষুধা আছে-এটা সে জানতো না। ভাতেই যাদের জীবন মরণ তাদের জীবনে এই বৈচিত্র শ্রাবণের অনিবার্য বৃষ্টি হয়ে ওঠে। সারাদিন ধরে আশে তাপে জমতে থাকা আমিনুলের কামাকাংক্ষা ঝরে ঝরে পড়ে সুখীর ওপর। সুখীর ঘাড়ে জমে আছে ছাতিম গন্ধ, গলায় মহুয়া, হাতের আঙ্গুলে মাছের আঁশ আঁশ গন্ধও সে নাক দিয়ে চেটেপুটে খায়। এরপর স্বর্ণচাপা আর নাগকেশরও যখন সুখীর গায়ে সে খুঁজে পায়, কামিনী ভরা তলপেটের রহস্য যখন উন্মুক্ত হয়ে ওঠে তার সামনে-তখন আমিনুল ইতিহাসের সেই আদিম মানব হয়ে ওঠে-যে কোন এক রমনীর সৌন্দর্য্যে অবগাহন করে। অবুঝ কোন বালকের মতো সাঁতারের ভাবনা মাথায় না এনেই ঝাঁপিয়ে পড়ে সরোবরে। হাবুডুবু খায়-আবার ভেসে ওঠে-অমোঘ টানে আবার ডুব দেয়।
দুই শরীর অঙ্গভঙ্গিতে আর শব্দে হয়তো নৃত্য এবং সঙ্গীত তৈরি করে। কিন্তু তা শোনার কেউ থাকে না। আর থাকলেও তখন ফড়িং হয়ে উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে শরীরে শরীরে নিজেদের মিলিয়ে নিতে থাকা সুখী আর আমিনুলের চোখ আবেশে বন্ধ হয়ে আসে। সুখের তবে রাত দিন নাই। মানুষের ভেতরও তবে বাঁধ ভাঙার জোয়ার আসে। প্রচন্ড মেঘ ঘনায়,
প্রবল বর্ষণের উন্মাদনা জমা করতে থাকে। মানুষও তবে ভুমি আর বীজ হয়ে ওঠে। দুই শরীরে তারা করজোড় হয়। অজস্র না পাওয়ার শুণ্যতা কররেখা হয়ে উঠলে সুখ কেবল সুখই সেখানে জোয়ার নিয়ে আসে। নিশিথে পাওয়া মানুষের মতো তারা হয়তো জোড়দেহে ছুটে যায় মহাকাশে-আরেকটি মানব জনমের বীজ নামিয়ে আনে জাগতিক জীবনে। তাদের লালায়-ঘামে আরেকটি ভ্রুণ অংকিত হয় মানবের জঠরে। কি আশ্চর্য এই ভ্রুণ জন্মের ভবিষ্যৎ নাই-সমাজ নাই-সম্পত্তি নাই। তবুও সে মানুষ-তবুও সে প্রাণ।
জৈষ্ঠ্যের সেই রাতের সাক্ষী কোন মানব নয়। আসন্ন বর্ষার পথঘাট সাফ করতে ডাঁট নিয়ে আকাশে ঘোরাফেরা করতে থাকা মেঘেরা-তার ফাঁক গলে বেরিয়ে আসা নায়া আমের মতো চাঁদ-ঝিরিঝিরি তারা-জমাট বাধা সবুজ আর শনশন বাতাসই কেবল স্বাক্ষী থাকে মানব জগতের বিধি লঙ্ঘণ করা এই অপরাধের। সম্পর্কবীহিন সেই দেহজ মিলনের পাপটুকু হয়তো আকাশ নিজেই বহন করবে। হয়তো সেই দেতু্ই গাছ পরদিন সকালে লজ্জায় মাথা নিচু করবে। জোনাকি হয়তো সেই কান্ড দেখে জ্বলে উঠতেই ভুলে গেছে। হয়তো করা করা ডেউয়াগুলো একটু বেশিই বেড়ে উঠবে শরীরি সঙ্গীতের মুর্ছনা শুনে। পরদিনের উঠে আসা সুর্যের রোশনাই অন্ধকারের মতোই মিলিয়ে দিবে তাদের এই সঙ্গম শয্যাকে।
কারণ সেই রাতে মানবঘাতি সভ্যতার আড়ালে সুখী আর আমিনুল দুই শরীরে জোড় হয়ে কামনা করেছে নব জন্মের। কেবলমাত্র আবেগে আর ভালোবাসাতেই কেঁপে কেঁপে উঠেছিলো বারবার। যে কর্মে মানু জন্ম লয় ওই কর্মে পাপ নাইরে আমিনুল, ওই কর্মে পাপ নাই, তয় ভালোবাসা থাকতে অইবো। জায়নাল পরদিন আমিনুলকে একথা বলে।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই জুলাই, ২০০৯ রাত ১২:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


