সবসময় আমি গোবেচারা ধরনের ছেলে।কারো সাথে নেই পাছে নেই।কিছুটা ভীতু ধরনেরও।খুব যে প্রতিবাদী তাও না।চুপচাপ ক্যাম্পাসে যাই, ক্লাস করে ফিরে আসি।প্রকৌশলী হত পারবো কিনা জানি না, তবে চেষ্টা করে যাচ্ছি।ক্যাম্পাসে কোথায় কি হয় তেমন খেয়াল করি না।তাই সকাল বেলা থেকেই ক্যাম্পাস যে কিছুটা থমথমে সেটা নিয়ে তেমন মাথা ঘামালাম না।সেদিন মাত্র দু’টো ক্লাস।একটা সকালে, আর একটা দুপুরে,লাঞ্চের পর।মাঝখানের সময়টা কোন এক ফাকা রুমে বসে কিছু একটা পড়ে কাটিয়ে দেয়া যাবে।দুপুরের লাঞ্চটা করে নেবো হলের ক্যান্টিনে।সকালের ক্লাসটা হলো না।এমন গাধা আমি তারপরো বুঝলাম না কিছু একটা হচ্ছে ক্যাম্পাসে।দুপুরে লাঞ্চ করতে যাবার সময় দেখলাম লাইব্রেরী বিল্ডিং এর সামনে জটলা।সাভাবিক কৌতুহলে এগিয়ে গেলাম।শুনলাম আমাদের নাসির ভাইকে নাকি ওরা ধরে নিয়ে গেছে।ওরা মানে ছাত্রদলের ছেলেরা।দু’দিন আগে আমাদের এক সিনিয়র আপুকে ছাত্রদলের ক্যাম্পাস শাখার কোন এক নেতা রেপ করেছে। ঘটনাটা জানতাম।খুবই খারাপ লেগেছিলো শুনে।কোথায় বাস করছি আমরা!স্বাভাবিক মধ্যবিত্ত মানসিকতায়ই কিনা জানি না, এসব ব্যাপার কেমন জানি গা সওয়া হয়ে গেছে।নিজের ওপর এসে না পড়লে বুঝি না।তাই কত সহজে লিখে ফেললাম!
নাসির ভাই হচ্ছেন আমাদের তিন সেমিস্টার সিনিয়র বড় ভাই।আমি 3/1 এ, তিনি 4/2 ।সবার দাবি ছাত্রদলের ওই নেতার ছাত্রত্ব বাতিল করতে হবে আর অন্যান্য জরিত সাহায্যকারীদের বিচার করতে হবে।ভি সি এতে রাজি হচ্ছেন না।তাই সবাই ঠিক করেছে আন্দোলন করে হলেও দাবি আদায় করতে হবে।আজব!কেউ একজনি এরকম জঘন্য অপরাধ করেছে তার বিচারের জন্যও আন্দোলন করতে হয়।কেবল সে একটি দলের সদস্য বলে!নাসির ভাই সেই আন্দোলনের পুরোধা।তাকে কখনো দেখিনি কোন দল করতে।রাজনীতি করতেও না।ভরাট গলা।আমাদের ডিপার্টমেন্টের বিতর্ক দলের একনিষ্ঠ সদস্য।যার কারনে প্রতিবার ইন্টার ডিপার্টমেন্ট ডিবেটে আমরা চ্যাম্পিয়ন হই।ডিপার্টমেন্টের অনুষ্ঠানে যিনি ভরাট গলায় গেয়ে ওঠেন মান্না দে’র গান।সেই নাসির ভাইকে নাকি ধরে নিয়ে গেছে।সবার মুখে উৎকন্ঠা।সবাই ঠিক করে রেজিস্টার বিল্ডিংয়ের সামনে সবাই অবস্থান নিবে।আমাদের,মানে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বসেন সেখানে।যতক্ষন পর্যন্ত ভিসি ছাত্রদলের সেই নেতার ছাত্রত্ব বাতিল না করবে আর নাসির ভাই ফিরে আসবেন ততক্ষন ভিসিকে বের হতে দেয়া হবে না।সবার সাথে আমিও চললাম।নাসির ভাইকে খুবই পছন্দ করি, নিজের ডিপার্টমেন্টের বড় ভাই, তাছাড়া এরকম একটা বিষয় নিয়ে যে ভিসি টাল বাহানা করতে পারে তার প্রতি ঘৃণাও ছিলো।আর কিছু করতে না পারি অংশগ্রহন করে নিজের ধিক্কারটা তো জানানো দরকার।আমরা যতো জন হবো, দাবির জোরও তত বাড়বে।
সবাই মিলে রেজিস্টার বিল্ডিংয়ের সামনে জড়ো হলাম।বসে পড়লাম রাস্তাতেই।সবাই দেখলাম আমার মতো গোবেচারা সাধারন ছাত্র ছাত্রী। ক্যাম্পাসের সবচেয়ে নিরীহ ছেলেটি বা মেয়েটি, যে কখনো সামান্য একটা র্যা লিতেও যায়নি তাকেও দেখলাম প্রচন্ড ঘৃণা নিয়ে বসে থাকতে।আমাদের শেহাব আর আমার রুমমেট সাইফুল সবাইকে পুরো অবস্থাটা জানালো।দু’জন গেলো ভিসির কাছে লিখিত দাবি নিয়ে।পেছনে তাকিয়ে দেখলাম আমাদের সাথে এসে যোগ দিয়েছেন জাফর স্যার (মুহম্মদ জাফর ইকবাল),ইয়াসমিন ম্যাডাম,সুশান্ত স্যার,গৌরাঙ্গ স্যার(গণিত অলিম্পিয়াডের প্রয়াত গৌরঙ্গ স্যার) রা।আমরা অন্যরকম সাহস পেলাম তাদের দেখে।তারাও এসে বসলেন আমাদের সাথে।অল্প পরেই নাসির ভাইকে দেখলাম ফিরে আসতে।কেমন যেন নিস্প্রভ। একপলক দেখেই বুঝে গেলাম প্রচন্ড অত্যাচার করা হয়েছে তাকে।কিছুই বললেন না তিনি।চুপচাপ এসে যোগ দিলেন আমাদের সাথে।এমন সময় খবর এলো ভিসি বলেছেন আমাদের দাবি মানা হবে।ছাত্রদল নেতার ছাত্রত্ব বাতিল করা হবে।সবাই চিৎকার করে উঠলো।আমরা জানতাম এতো এতো মানুয়ের দাবির কাছে ভিসিকে হার মানতেই হবে। কিছুক্ষণ পর ভিসি নিজেই নেমে এলেন।জানালেন দাবি মানা হবে।কেউ একজন বললো আমাদেরকে যেন একটা লিখিতো দেয়া হয় এ ব্যাপারে। ভিসি সেই আশ্বাস ও দিয়ে গেলেন। একটু অবাকই হলাম। যে ছাত্রনেতাদের তিনি বাসায় নিয়ে চায়ের দাওয়াত খাওয়ান এত সহজে তাদের শাস্তির দাবি মেনে নিলেন! ভালোও লাগছিলো আর কিছু করতে না পারি, অন্তত দোষী ব্যাক্তির শাস্তিতো নিশ্চিত করা গেলো।কিন্তু আমরা ভাবতেও পারিনি ভিসি আসলে আমাদের প্রতিশ্রুতির মুলো ঝুলাচ্ছেন। তিনি এর মাঝেই তার অতি বাধ্য ছাত্রনেতাদের বলে দিয়েছেন আমাদের একটা শিক্ষা দিতে।তাই ভিসি চলে যেতেই দেখা গেলো ক্যান্টিনের পেছন থেকে ছাত্রদলের মোটামুটি বড় একটা দল হাতে রড, লোহার পাইপ, রামদা হাতে এগিয়ে আসছে।তখন রেজিস্টার বিল্ডিংয়ের তিন তলার কাজ চলছিলো।কাছাকাছি এসে তারা আমাদের দিকে ভাঙ্গা আধভাঙ্গা ইট ছুড়তে লাগলো। আমরা সবাই সাধারন ছাত্রছাত্রী। কখনো কোন দাঙ্গা হাঙ্গামায় থাকি না।সবাই মোটামুটি ভয় পেলেও আমরাও পাল্টা ইট ছুড়তে লাগলাম। এতো ছাত্র ছাত্রী বৃষ্টির মত ইট ছুটে গেলো ওদের দিকে।একপর্যায়ে ওরা পিছু হটতে বাধ্য হলো।পালিয়ে গেল ক্যান্টিনের আড়ালে।আমাদের মনে হলো দেশ জয় করে ফেলেছি।পারলে একে অপরকে জরিয়ে ধরি। কিন্তু তখনি ক্যান্টিনের পেছন থেকে বোমা ফাটার আওয়াজ পেলাম। আর দেখলাম ছাত্রদলের আরো বড় একটা দল বেড়িয়ে এলো ক্যান্টিনের পেছন থেকে। এবার তাদের হাতে কাটা রাইফেল। আর রড, লোহার পাইপ, রামদা তো আছেই।ওরা সমানে ইট ছুড়ছিলো। আমার পাশেই একজনের মাথায় এসে পড়লো একটা ইটের চারভাগের একভাগের একটা অংশ। মাথা ফেটে রক্ত বেড় হয়ে এলো। রক্ত দেখে সবাই ভয় পেয়ে গেলাম। পিছু হটতে লাগলাম আমরা।কিন্তু পেছনে যাবার জায়গা নেই। কেবল আছে রেজিস্টার বিল্ডিঙ। যে যেভাবে পারলো দৌড়ুতে লাগলো। চারপাশে বৃষ্টির মতো এসে পড়ছে ইটের টুকরো।বেশীর ভাগ ছাত্র ছাত্রই ঢুকতে চেষ্টা করছে রেজিস্টার বিল্ডিং এ। আমিও উপায় না দেখে সেদিকেই দৌড়ুলাম। কে কোথায় যাচ্ছে দেখার সময় নেই। সিড়ির কাছে এসে দেখলাম ছাত্রী যারা আমাদের সাথে যোগ দিয়েছিলো, তাদের কয়েকজন সিড়ির নীচে ফাকা জায়গাটায় আশ্রয় নিয়েছে।কারন সিড়ির মুখটাতে তখনো বৃস্টির মতো ইট এসে পড়ছে। রেজিস্টার বিল্ডিং এর নীচ তলায় কেউ নেই। সবাই আশ্রয় নিয়েছে দোতলায়। শব্দ করে ভাঙছে বিল্ডিংএর কাচের জানালা।মেয়ে গুলোকে বললাম দৌড়ে দোতলায় চলে যেতে।সিড়ির মাঝখানটায় এসে পড়ে গেলাম। মাথার উপর জানালার কাচ ভাঙ্গার আওয়াজ পেলাম। কথন যে নিজেকে টেনে টেনে দোতলায় চলে এসেছি নিজেও জানি না।সবাই দোতলায় এসে হাজির হয়েছে। শেহাবকে খুজলাম,সাইফুল কেও। কে যে কোথায় গেছে কে যানে।নীচ তলা ততক্ষনে দখল করে নিয়েছে ছাত্রদলের ছেলেরা।আমরা দোতলার বারান্দা থেকে দেখছি তারা চেষ্টা করছে দোতলায় উঠে আসার।সবাই মিলে সিড়ির দিকে ইট ছুড়তে লাগলাম। কোন ভাবেই উঠতে দেয়া যাবে না ওদের। জাফর স্যারের চেহারার দিকে তাকানো যাচ্ছিলো না। মনে হয় বিশ্বাসই করতে পারছেন না যা হচ্ছে তা। এভাবে যে সত্যিই ছাত্র-ছাত্রী-শিক্ষকদের উপর ঝাপিয়ে পড়া যায় তিনি মনে হয় বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। এর মাঝে আমরা শুনলাম আমাদের কয়েক বন্ধু নীচে ওদের হাতে ধরা পড়েছে। কে ধরা পরেছে সঠিক নামটা জানা যাচ্ছিলো না। এক একবার এক এক নাম শোনা যাচ্ছিলো। ইয়াসমিন ম্যাডাম এর মাঝে নীচে নেমে যেতে চাইলেন। চিৎকার করে বলতে লাগলেন আমার ছেলেরা নীচে মার খাচ্ছে, আমাকে যেতে দাও। জাফর স্যার দেখলাম কিছু বলছেন না। বাকরুদ্ধ হয়ে গেছেন। কি করা উচিৎ কি করা উচিৎ না কে বলে দিবে? কয়েকজন মিলে ম্যাডামকে টেনে নিয়ে এলো। এদিকে ওরা উঠে এসেছে দোতলায়। সিড়ি থেকেই ইট ছুড়ছে। আমার সামনে দেখলাম আমাদেরই এক বন্ধুর হাত ভেঙ্গে গেছে। কনুই থেকে ঝুলছে। ওরা প্রায় উঠে এসেছে দোতলায়।আমরা যে যেদিকে পারছি পালাচ্ছি।সবাই যে যে রুমে পারছে ঢুকে দরজা আটকে দিচ্ছে। দোতলার সিড়ির মুখে উঠে এসেছে ওরা।দোতলার বারান্দাও খালি হয়ে যেতে থাকে।কে কোথায় লুকিয়েছে জানি না।আমি পাগলের মতো দৌড়োচ্ছি।একটা দরজাও খোলা পেলাম না।বাথরুমও লক করে যে যেভাবে পেরেছে লুকিয়েছে।আমি আর কয়েকজন দৌড়ে দোতলার ছাদে উঠলাম। খোলা ছাদ। লুকানোর জায়গা নেই। নীচে তাকিয়ে দেখলাম দোতলার বারান্দার দখল নিয়ে নিয়েছে ওরা।কি করবো বুঝছি না।ছাদের এক কোনে পানির ট্যাংকি, তার পাশে ছোট্ট সানসেট।লুকানোর জায়গা এটা ছাড়া আর চোখে পড়লো না।সানসেটে গিয়ে নীচু হয়ে বসে থাকলাম।বসে নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে আছি।হঠাৎ দেখি পাশেই নাসির ভাই। সেও আমার সাথে দোতলায় কোন দরজা খোলা না পেয়ে এসে এখানে লুকিয়েছে।এতক্ষন খেয়াল করি নি। আরও দু’জন আছে আমাদের সাথে। নাসির ভাই বললেন চুপ করে বসে থাকতে, একটা শব্দও যেন না করি। সেটা মনে হয় আর বলে দেয়ার দরকার ছিলো না।বেশ কিছুক্ষন বসে থাকারপর শুনলাম পুলিশের গাড়ির সাইরেন। শুনলাম ছাত্রদলের ছেলেদের দৌড়ে পালানোর শব্দ। অনেক্ষন পর বের হয়ে এলাম। কিন্তু তখন ক্যম্পাসে জরুরী অবস্থা বা ওই রকম কিছু একটা জারি হয়েছে। তাই সবাই গিয়ে হাজির হলাম দোতলায়। এতক্ষন পর নিজের আর অন্যদের দিকে খেয়াল করলাম। সবার ভয় পাওয়া চেহারা। রুমের এককোনে হাত ভাঙ্গা ছেলেটাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয় হচ্ছে। মাথা ফেটে গেছে একজনের। তার মাথায় ব্যান্ডেজ করা হচ্ছে। কারো বা হাত ছড়ে গেছে। বাথরুমে হাতমুখ ধুতে গিয়ে তীব্র জ্বলুনী টের পেলাম হাতে। কখন যেন ছিলে গেছে। বাসায় একটা ফোন করা দরকার, টিভিতে খবর দেখে বাসায় চিন্তা করবে। ফোনটা হাতে নিয়ে বুঝলাম আমার নিজের তেমন ক্ষতি না হলেও সেটা বেশ ভালো ভাবেই আহত হয়েছে। অন্য একজনের ফোন দিয়ে বাসায় জানালাম ভালো আছি।অপেক্ষা করছি কখন বের হতে পারবো। হঠাৎ হঠাৎ খবর পাচ্ছি ছাত্রদলের ওরা নাকি আবার অ্যাটাক করবে। রাত বাজে ৮ টা। দুপরে খাইনি তা এতক্ষনে টের পেলাম। সবাই বসে আছি, এ ওর দিকে তাকাচ্ছি। কখন শেষ হবে এ অপেক্ষা?
পরিশেষ: অবশেষে রাত ১২ টায় জরুরী অবস্থা উঠে যায়। বিশেষ ব্যাবস্থায় একটা গাড়িতে করে মেয়েদের হলে আর একটা বাসে করে ছেলেদের যার যার মেসে পৌছে দেয়া হয়। ছাত্রদলের সেই নেতাকে সাময়িক ভাবে বহিঃস্কার করা হয়েছিলো। ছয় মাস পরেই সে আবার ফিরে আসে। আমাদের সামনে দিয়ে বুক উচিয়ে ঘুরে বেড়ায়। জাফর স্যার এই ঘটনাটা নিয়ে একটা উপন্যাস লিখেছিলেন ‘মহব্বত আলীর একদিন’ নামে। আর আমাদের ভিসি? দেড় বছর পর তীব্র ছাত্র আন্দোলনের মুখে ক্যাম্পাস ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন।
প্রায় দুই বছর পর ক্যাম্পাসে গিয়েছিলাম গত সপ্তাহে। একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট তুলতে। রিকশায় করে বিশাল এক কিলোমিটার গাছে ঢাকা রাস্তাটি পার হচ্ছি। মাঝামাঝি এসে দেখি একদল ছেলে, হাতে রড, লোহার পাইপ, রামদা । কিছুদূরে একদল পুলিশ। আরো কিছুদূর এগুতেই আর একদল ছেলে, হাতে রড, লোহার পাইপ, রামদা। সাধারন ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষকরা ক্যাম্পাস ছাড়ছে। কারন ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই গ্রুপের মাঝে মারামারি লেগেছে। ছাত্রদলের কেউ নেই এখন আর ক্যাম্পাসে। তাতে কি? ছাত্রলীগ আছে না? কবে সত্যিকার অর্থে শেষ হবে এসব?
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ সকাল ১১:০৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



