আমার সামনে যিনি বসে আছেন তার নাম এডলফ হিটলার। আমার মেসের ভাঙ্গা চকিতে বসে কুত কুতে চোখে আমার দিকে তাকাচ্ছেন। মনে হয় বোঝার চেষ্টা করছেন ভুল বশত তিনি কোথায় এসে পড়েছেন। তিনি যে সেই জার্মানির চ্যান্সেলর হিটলার, এই বিষয়ে আমার কোনই সন্দেহ নেই। নাকের নিচে সেই খাটো গোঁফ। পোষাকে আষাকে পুরো সামরিক আমেজ। এমনিতে আমার ইংরেজী জ্ঞান খুবই খারাপ। তার ওপর এই ব্যাটা যেভাবে ইংলিশ বলে সেটা বুঝতে আমার মোটামুটি জান খারাপ হয়ে গেলো। তার সাথে টুক টাক কথা বলে যেটা বুঝতে পারলাম, তিনি ভুল করে আমার মেসে সেধিয়ে গেছেন। তাও একা না, পুরো একটা টাইম মেশিন নিয়ে। সেটা এখন আমার ছোট রুমটার অনেকটাই দখল করে আছে। দেখতে খুবই বিদঘুটে। অনেকটা বাসা বাড়ির পড়ার টেবিলের মতো।
কাহিনী হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একদম গোড়ার দিকে, যখন হিটলার একে একে পোল্যান্ড, ফ্রান্স দখল করছেন তিনি তার পোষা বিজ্ঞানীদের এমন একটা মেশিন আবিষ্কার করে দিতে বলেছিলেন যেটা দিয়ে তিনি ভবিষ্যতে গিয়ে দেখে আসতে পারবেন যে যুদ্ধে তার জয় হবে, না পরাজয় হবে। তার বিজ্ঞানীরা উঠে পড়ে লাগলো এমন একটা টাইম মেশিন বানাতে। এর মধ্যে যুদ্ধে হিটলার হারতে শুরু করলেন। অবশেষে উনিশ শ পয়তাল্লিশের ৩০ শে এপ্রিল যখন তিনি বার্লিনের চ্যান্সেলর হাউজের নিচের বাংকারে লুকিয়ে ছিলেন আর চার দিক থেকে মিত্র বাহিনী বার্লিন দখল করে চ্যান্সেলর হাউজের দিকে এগুচ্ছে, তখন সেই বিজ্ঞানীদের একজন এসে বললো যে টাইম মেশিন আবিষ্কার হয়ে গেছে। তখন আর তিনি টাইম মেশিন দিয়ে কি করবেন? তিনি তো জানেন তিনি হেরে গেছেন। ওদিকে চারদিক থেকে মিত্রবাহিনী এগিয়ে আসছে। শেষে তিনি ঠিক করলেন যে তিনি টাইম মেশিনে করে পালাবেন, আর তার লোকেরা সবাইকে বলবে যে তিনি আত্মহত্যা করেছেন আর তার দেহ পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে।বাইরে তখন তুমুল গোলাগুলি।তিনি তার সদ্য বিবাহিত স্ত্রীকে রেখে রওনা দিলেন ভবিষ্যতের পথে দেখতে যে তার এই পরাজয় পৃথিবীকে কিসের পথে এগিয়ে দিলো।আপাতত তিনি আমাকে এটুকুই বলেছেন।
ভবিষ্যতে যেতে গিয়ে তিনি আমার মেসের রুমে এসে হাজির হয়েছেন, আর আমাকে বিশাল বিপদে ফেলেছেন।আমি থাকি একলা মানুষ। এই মিয়াকে কি খেতে দেই? জার্মানরা কি খায় তাও আমার জানা নেই। আমি কোন রকম একটা ডাবল ডিমের মামলেট বানিয়ে এনে দিলাম তাকে।বেচারার মনে হয় ভালোই খিদে পেয়েছে।যখন টাইম মেশিনে উঠেছে তখন উনিশ শো পয়তাল্লিশ, আর এখন দু হাজার নয়। টানা তিষট্টি বছর না খেয়ে আছে! আমার দেয়া মামলেট টা অর্ধেকটা দ্রুত খেয়ে নিলো।তারপর আবার কুতকুতে চোখে চারিদিকে তাকাতে লাগলো।পেটের খিদে মিটেছে ভেবে আমি তার সাথে একটু আলাপ করার চেষ্টা করলাম।কতদিনের জন্য ঢাকায় এসেছে, কি কি দেখানো যায় ঢাকা শহরের তারও একটা প্ল্যান তো করতে হবে।হাজার হোক বিদেশি অতিথি। সংসদ ভবনটা একবার দেখাতেই হবে, আর নারায়নগঞ্জের দিকে নাকি একটা তাজমহল মতো বানিয়েছে, ওটাও দেখানো যায়। বসুন্ধরা সিটিটাও দেখাতে হবে। এতো বড় মার্কেট জার্মান দেশে আছে কিনা কে জানে।আমি আমার হোচট খাওয়া ইংরেজী দিয়ে আলাপ শুরু করলাম।পাঠকদের সুবিধার জন্য আমি বাংলায় লিখছি।
-হিটলার সাহেব,আপনি কতদিন থাকবেন?
-থাকবো না।
কেমন যেন উদাস ভঙ্গিতে উত্তর দিলো আমার অতিথি।
-সে কি , আজই চলে যাবেন? আচ্ছা, দেরী করলে ভাবি সাব আবার চিন্তা করতে পারেন।
আমি মনে মনে খুশিই হলাম। থাকতে চাইলে এই ব্যাটাকে ঘুমুতে দিব কোথায়?
-আমেরিকার কি অবস্থা?আর বৃটেন?সোভিয়েট?
কথা নাই বার্তা নাই বেমক্কা আমেরিকা নিয়ে আলাপ জুড়ে দিলো দেখে একটু মেজাজটা গরমই হলো আমার। অবশ্য বড় মানুষ, বড় বড় জিনিস নিয়েই তো কথা বলবেন।
-আমেরিকা তো ভাই এখন সুপ্রিম পাওয়ার। তার উপ্রে কেউ নাই। বৃটেনও আমেরিকার পা চাটে। আর সোভিয়েট, সেইটাতো ভাঙছে কবেই।
আমি যতটুকু বুঝি বলে দিলাম।
-সোভিয়েট নাই? হায় হায়? কি বলছো তুমি।
হিটলার আর্তনাদ করে উঠে। আমি বুঝলাম না সোভিয়েট ভাঙছে বলে তার এতো কষ্টের কি আছে। সোভিয়েট তো তার শত্রু ছিলো।
-জ্বি, সোভিয়েট ভাঙছে অনেক আগে। তবে আপনের জার্মানি আছে।
সে তখনো সোভিয়েট ভাঙ্গার দুঃখে কাতর।
-কিভাবে ভাঙলো?ইহুদিরা এখন কোথায় আছে?
আমি আর কি বলবো, তাকে বললাম কিভাবে সোভিয়েট ভাঙলো, কিভাবে ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের জায়গা দখল করে নিলো, কিভাবে আমেরিকা আফগানিস্তান দখল করলো, ইরাকে ধ্বংস যজ্ঞ চালালো সব।অল্প জ্ঞান দিয়ে যতটুকু পারা যায় ঠিক তথ্যটা দেয়ার চেষ্টা করলাম।
সবশুনে মনে হলো হিটলার খুবই কষ্ট পেলো।বিড়বিড় করে বলতে লাগলো ‘তাহলে কি লাভ হলো, আমাকে হারিয়ে, কি লাভ হলো’
-কিসের কি লাভ হলো? আমি জানতে চাইলাম।
-এই যে, আমার এক নায়কত্বের অবসান ঘটাতেই তো আমাকে হারানো হলো।শেষ পর্যন্ত তো সেই এক নায়কই হলো। আমেরিকা কি কার্যত পুরো দুনিয়াকে চালাচ্ছে না? তাহলে আমি চালালে কি দোষ ছিলো? ইহুদিরা কি এখন মুসলমানদের মারছে না? তাহলে আমি ইহুদিদের মারলে কি দোষ ছিলো?
আমি আর কি বলবো। কিছুই বলার খুঁজে পেলাম না।
হঠাৎ কি ভেবে সে উঠে দাঁড়ালো। গিয়ে বসলো তার টাইম মেশিনে।
-কি হলো? কি করছেন?
আমি অবাক হয়ে বললাম।
-আমাকে এখন যেতে হবে। আমি আরো আরো ভবিষ্যতে যেতে চাই। আমার ধারনা আমি ভুল সময়ে এসে পড়েছি। আরো ভবিষ্যতে গেলে হয়তো জানতে পারবো আমাকে হারানোর ফলে আসলেই পৃথিবীর কোন লাভ হলো কিনা।আমার বিশ্বাস নিশ্চয়ই লাভ হয়েছে, নিশ্চয়ই পৃথিবীটা অনেক সুন্দর হবে একদিন। আমি সেই দিনটা দেখতে চাই। সে জন্য আমাকে আরো ভবিষ্যতে যেতে হবে। আরো ভবিষ্যতে।
এই বলে সে কি একটা হাতলে চাপ দিলো। টাইম মেশিন বনবন করে ঘুড়তে লাগলো। আর একসময় ঘুড়তে ঘুড়তে বাতাসে মিলিয়ে গেলো। রুমের মাঝে যেখানটায় এতোক্ষন একটা আস্ত টাইম মেশিন ছিলো, সেখানটা এখন ফাঁকা। এডলফ হিটলারের আধ খাওয়া ডাবল ডিমের মামলেট হাতে নিয়ে আমি বোকার মতো দাড়িয়ে রইলাম সেখানে।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১০ রাত ১০:৩১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



