ন্যাংটাকালে ভয়ানক ভীতু ছিলাম। প্রাইমারি স্কুলে মেজোবোনের সাথে একই টেবিলে বসতাম। ছেলেরা এ নিয়ে যাচ্ছেতাই অপমান করতো। ওসবে পাত্তা দিতাম না। বাজার আর বাড়ির আসা যাওয়ার সামান্য পথটাও অনেক বড় মনে হতো। রাস্তায় মোটা কোন মানুষ, গরু অথবা বোরকা কোন মহিলা দেখলেই রাস্তা থেকে নেমে খালের কূল ঘেঁষে সাবধানে পা চালাতাম। তাদেরকে পার করলেই দিতাম দৌড়। এক দৌড়ে মায়ের আঁচল তলে। সম্ভবত ৫ম শ্রেনীতে উত্তীর্ণ হবার পর ছেলেদের সাথে বসা শুরু করি।
৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হবার পর আবিষ্কার করি সহপাঠি মান্না ভালো ছবি আঁকে এবং কবিতা লেখে। তাকে খুব ভালোভাবে অনুকরণ করার চেষ্টা করতাম। এক কথায় নকল। এভাবে পাঠ্য বইয়ে থাকা নবাব সিরাজউদ্দোলা, রবি, নজরুল সবার ছবিই আঁকা হলো। কবিতা লেখার চেষ্টা করতাম। হতো না। ছন্দ মিলতো না। ছন্দ না মিললে কবিতা হবে না- এমন কিছু মান্না থেকে শুনেছিলাম।
পুরো ৬ষ্ঠ শ্রেণী কবিতার পেছনে সময় দিতে থাকলাম। একসময় আমি ছন্দ মেলানো ছাড়া কথায়ই বলতে পারতাম না। যাকে যা বলতাম, তাই ছন্দ হয়ে যেতো। ৭ম শ্রেণীতে ওঠে কাজের কাজটি হয়ে যায়। বাংলা ক্লাশের দিদি তার প্রিয় কবিতা "আসমানী" নিয়ে বলছিলেন। দিদির সাথে আমরা খুব বদমায়েশী করতাম। আমি বললাম ছোটদের জন্য বড়রা কেন লিখে? ছোটদের লেখা ছোটরা লিখবে। দিদি ধরলেন আসমানীর মতো একটি কবিতা ব্ল্যাকবোর্ডে লিখে দিতে। গলাটা কিঞ্চিত শুকালেও হাঁটুতে কাঁপন লাগেনি। সোজা গিয়ে লিখতে শুরু করলাম। এক লাইনই আরেক লাইনকে টেনে নিয়ে আসছিলো। লিখে ফেললাম নূরী নামের একটি ছড়া কবিতা। দিদি প্রথমে চুপ থেকে বললেন, চুরি নাতো? আমি স্বগর্বে বলি - না। মাথায় হাত বুলিয়ে অনেক দোয়া নির্ভর কথা বললেন। সেই শুরু। দিদি প্রতিদিনই খবর নিতেন এবং লেখা কবিতাগুলো পড়তেন আর উৎসাহ দিতেন।
পাঠ্য বইয়ের কবিতা ছাড়া আর তেমন কোন কবিতাই পড়া হতো না। বাংলা কবিতা তখন অনেক এগিয়ে থাকলেও সে এগিয়ে থাকা নিয়ে আমার কোন ধারনাই ছিলো না। মনে যা আসতো তাই লিখতাম।
আমার বড়বোন ছিলেন সবচে' বড় পাঠক। নির্মাণের সময় থেকে পালিশ করা পর্যন্ত পর্যন্ত আঠার মতো লেগে থাকতেন। ৯ম শ্রেনীতে উঠার পর আপু টাকা দেন কবিতার বই কেনার জন্য। জেলা শহরে এসে সিনেমা হলে চিত্র নায়ক রুবেলের ছবি দেখে বাঁকি টাকার নজরুল কবিতা নিয়ে বাড়ি ফিরি। কিন্তু কোন কবিতাই মন দিয়ে পড়তে পারিনি।
সেই থেকে ২০০২ এর মার্চ পর্যন্ত একটানা লিখে গেছি। প্রেম বলতে আমার কেবল কবিতাই ছিলো। দ্বাদশ শ্রেনীতে পড়াকালীন সময়েও কোন মেয়ের প্রতি প্রচলিত প্রেম জন্ম নেয়নি। ঘাঁড় উঁচু করে বলি- কোন মেয়েকেই আমার জন্য নিরাপদ মনে হয়নি। বেশিরভাগ সময় আমার কবিতা নিয়েই কাটানো হতো। অবশ্য প্রচুর ক্রিকেটও খেলতাম। তবে কখনোই ক্রিকেট নিয়ে কবিতা লিখিনি!
মার্চ ০৭, ২০০২ বড়বোন মারা যাবার পর আর কবিতা লিখিনি।
ব্লগিং শুরু করার ক'দিন আগে যখন জেলা শহর মাইজদীতে বসবাস শুরু করি। বিষাদ নামে {তৌফিক বিষাদ (ব্লগার) } এক বড় ভাইকে নিজের পুরোনো লেখালেখির কথা বলি। উনি দেখলাম খুব উৎসাহ দিলেন। আরেক বড় ভাই, বলা চলে আমার শিক্ষক নুরুল আলম মাসুদ (প্রাক্তন ব্লগার), তিনি দিলেন বাঁধ ভাঙার আওয়াজের ঠিকানা। কোন পোস্ট পড়ার আগেই রেজি: করে নিই। ব্লগের প্রথম পাতায় "কাল পুরুষ" আর "সাজি আপুর' কবিতা পড়ে ভাবলাম নিজেও পুরোনো একটি কবিতা পোস্ট করি। লিখে শেষ করে পোস্ট করার আগে ১ম পাতায় গিয়ে "মুকুল" এর একটি পড়ে ভয় পেয়ে যাই। আর কবিতা পোস্ট করিনি। মুকুলের কবিতা আমার কাছে দুর্বোধ্য লেগেছিলো। ক'দিন খুব পড়লাম আর আজেবাজে কিছু লেখা লিখি।
বেশি বেশি নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা লেখার কল্যাণে ব্লগে আস্তে আস্তে বিদ্রোহী কবিতা লিখা শুরু করি। এটা পরিকল্পিত। স্রেফ নজরে আসার জন্য। সে কবিতাগুলোর অনেকগুলোই মুছে ফেলেছি। কোন কোনটা কেউ পড়ার আগেই। তারপর শুরু করি পড়া। ব্লগেই পড়তাম। ব্লগের বাইরে কেবল হুমায়ুন আজাদের "সবকিছু নষ্টদের অধিকারে চলে যাবে" পড়েছিলাম। তখন সমকালীন বিষয় নিয়ে বেশ কিছু প্রতিবাদী কবিতা লিখি। যার অনেকগুলোই আমার খুব প্রিয়।
তখনো "আন্দালীব" "মুক্তি মন্ডল" এবং "অশোক দেব" এর কবিতা পড়লে গা জ্বালা ধরে যেতো। এর মাঝামাঝি সময়ে আমার অফিসে ব্লগার "প্রণব আচার্য" র সাথে পরিচয় হয়। পরিচয়ের কৃতজ্ঞতায় ব্লগে তার কবিতা পড়তাম। একদিন একটি কবিতা খুব ভালো লেগে যায়। ওটা বারবার পড়ি। ওইদিন রাতে কবিতা লিখতে বসে দেখি আর ছন্দ মেলানোর প্রয়োজন পড়ছে না। ছন্দ ছাড়াই নিজের কবিতা পড়তে বেশ আরাম লাগছিলো। তখন আমার সাথে কবি ব্লগার বন্ধু "রাতিফ" আর "সাজি আপু"র সাথে বেশ যোগাযোগ হতো।
প্রণব দা'র কবিতা ভালো লাগার পর আমার লেখায় একধরনের পরিবর্তন দেখতে পাই। তবে তখনো আমি বেশি বেশি প্রতিবাদী কবিতা লিখতাম। নিজের একান্ত অনুভূতি বা শিল্পের লেজ ধরা কবিতাও লিখতে পারতাম না। কিন্তু পরতে বেশ ভালো লাগতো। অশোক দেব এবং মুক্তি মন্ডলের লেখা গভীর মনযোগ বসাতে পারলেও আন্দালীবের কবিতায় মোটেও মন বসতো না। এরই মধ্যে প্রনব দা'র মুখে আন্দালীবের বেশি বেশি সুনাম শুনে তাকে জোর করেই পড়তাম। অফলাইনে থেকে থেকে তার কবিতা পড়তাম। আস্তে আস্তে আমার পড়ার আওতা অনেক বেড়ে গেলো। কবিতা পেলেই পড়তাম। এই পড়ার সূত্রে অনেক কবির কবিতায় নিজেকে টেনে নেয়ার টান অনুভব করতাম।
আস্তে আস্তে নিজস্ব ভাবনা এবং অনুভূতি নিয়ে লেখার চেষ্টা শুরু করি। তখন খুব বেশি ফিডব্যাক আশা করতাম। কিছু কিছু পেতামও।
যাই লিখি আর যাই পড়ি সবই ব্লগে। ব্লগের বাইরে নয়। এখনো বেশি বেশি পড়ার অভ্যেস করতে পারিনি। বাংলাদেশের অনেক কবির কবিতার সাথেই আমি অপরিচিত। এটা আমার এলার্জি। ব্লগের বাইরের কবিদের কবিতা পড়তে মোটেও ইচ্ছা হয় না।
ব্লগে মোস্তাফিজ রিপন, আকাশ চুরি এ দু'জনের গল্প পড়ে একসময় গল্প লেখার খুব ইচ্ছা হতো। কিন্তু পুরোটা লিখে শেষ করার পর দু;একটি লাইন ছাড়া কিছুই ভালো লাগতো না। তবুও জোর করেই ব্লগে প্রকাশ করতাম।
এখন পর্যন্ত দরদ দিয়ে লিখি বলে মনে হয় না। এমনকি বানানগুলোও ঠিকমতো দেখার ধৈর্য্য হয় না।
গ্রামের নোংরা রাজনীতির মধ্যে বড় হয়ে এবং সমমনা কোন বন্ধু ছাড়া কলেজ জীবন পার করারও অনেক পরে একরকম বুড়ো হয়ে এই "বাঁধ ভাঙার আওয়াজ" এ এসে পরিণত এবং প্রতিভাবানদের লেখা পড়েই কিছু লেখার সাহস পেয়েছি। ছন্দ থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছি। এখানে একটি পরিবারের সাথে নিজেকে বেঁধে নিয়ে কিছু না কিছু হলেও লিখতে পারছি।
একসময় স্বপ্ন ছিলো বাংলাদেশের একজন নামকরা লেখক হবো। এই ভাবনাটা যখন আমি নিজের লেখা কারোর সাথে মেলানোর সুযোগ পাইনি, তখনকার। এখন আর সেই ভাবনা নেই। বরং সেই ভাবনার কথা মনে উঠলে লজ্জা পাই। এখন কেবল নিজের জন্য লিখে যাবো। যা মনে আসে তাই লিখবো।
বাঁধ ভাঙার আওয়াজ নিয়ে অনেক অপ্রিয় কথা বলার ইচ্ছা থাকলেও কেন জানি শ্রদ্ধাবনত হতে ইচ্ছে করে। কি জানি হয়তোবা এখানে এসে অন্তত স্বপ্নের লেঝ ধরার সুযোগ হলেও পেয়েছি বলে!
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে মে, ২০১২ রাত ২:১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



