শৈশবে আমার পাঠ্যপুস্তকের বাইরে সাহিত্য চর্চা বলতে ছিল রবিঠাকুররের একটা গান যা কেবল ছুটির দিনের আগের দিন হ্যাড স্যার (চাঁন মিয়া স্যার) আমাদেরকে তালে তালে গেয়ে শুনাতেন আমরা গলা মেলাতাম-মেঘর কোলে রোদ হেসেছে বাদল গেছে টুটি.....আজ আমাদের ছুটি ও ভাই.....
এভাবেই প্রাইমারী শেষ......
তারপর ক্লাশ সিক্সে পড়ি মানে আমি যখন উঁচা স্কুলে পড়ি তখন আমার এক চাচা এবং এক আন্টি যাদের একটা পারিবারিক লাইব্রেরী ছিল তাদেরকে প্রায়ই জিজ্ঞেস করতাম- এসব তাকে এগুলো কি বই?কোন ক্লাসের বই?
আমার আন্টি একদিন আমাকে একটা বই পড়তে দিলেন 'নৌকা ডুবি'।এটা পড়তে গিয়ে আমার মনে হয়েছিল রবীন্দ্রনাথ ভাল বাংলা পারতেন না!বাংলা অক্ষরে এসব কি আগডুম বাগডুম লিখেছে কিছ্ছু বুঝা যায় না!একটা পৃষ্টা পড়ে যে শব্দগুলো বাংলা মনে হত সেগুলো দাগ দিয়ে রাখতাম আর বলতাম যাক বাবা রবীন্দ্রনাথ কিছু কিছু বাংলাও জানতেন!
তারপর একদিন শরৎবাবুর' শ্রীকান্ত 'প্রথম খন্ড হাতে পেলাম কাকার পুরোনো বইয়ের স্তুপ ঘাটতে গিয়ে তাও বইয়ের একটা পাশ পোকায় খেয়েছে।বইটা পড়ে বাংলাসাহিত্যের সেনা কিশোর চরিত্র ইন্দ্র'র ব্যাপার সেপার পড়ে কিছু মজা পেলাম আর মনে হল শরৎ বাবু রবীন্দ্রনাথ থেকে কিছুটা হলেও বাংলা বেশি জানেন!
এবং তারও কিছুদিন পর-
আমার সেই চাচা একটা একটা বই হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন ভাতিজা এটা পড়।আমি বইটা হাতে নি(ই)।সুন্দর প্রচ্ছদে বইটার নাম 'নি'।বইয়ের লেখকের নাম একেবারেই অপরিচিত।কারণ কোন ক্লাশে ভদ্রলোকের কোন কবিতা ,গল্প কিছুই পড়িনি।তাই একটা দীঘ 'নি'শ্বাস নিয়েই পড়তে থাকি 'নি'।লেখকের নামের ব্যাপারে আগ্রহ না নিয়েই।বইটা পড়ি আর হাসি আবার কোথাও একটু অদ্ভুদ ঘটনায় মজা পাই।একটা পর্যায়ে বইটা শেষ হয়।তারপর চুপচাপ বসে থাকি।গল্পের নায়ক খুব সম্ভব মবিনুল ইসলাম বিএসসি।আর নায়িকা রূপা।বইটি পড়ে আমি একটা কষ্ট যেমন অনুভব করি আবার কিছুটা পাগলামিও বোধ করি।জ্যোৎস্না দেখতে ইচ্ছে হয়,ছুতে ইচ্ছে হয়।রাতের অন্ধকারে উঠোনের মাঝখানে শুয়ে শুয়ে তারাগুনি.........
ও হ্যা লেখকের নাম তারপর বইটা দেখে মুখস্থ করি।আর মনে মনে বলি এত সুন্দর বাংলা লিখতে পারেন লোকটা!তারপরও কোন বইয়ে উনার লেখা নেই কেনো?
যাই হোক মনে মনে 'হুমায়ুন আহমেদ' শব্দ দুটির বানান ভালো করে মুখস্ত করি।
ঐ শুরু আর কি!
কাকার সাথে দ্যাখা হলেই বলি কাকা ঐযে হুমায়ুন আহমেদর আর কোন বই আছে?
একটা বই দিলেন কাকা সেটার প্রচ্ছদটাই আমাকে পাগল করে দেয়।একেবারে রুপালী আসলে চাঁদের আলোর রং।নামটা মনে নেই।তারপর তাদের লাইব্রেরীতে হুমায়ুন আহমেদের যা আছে সব গিলতে থাকি আর আরো উঁচা ক্লাশে উঠতে থাকি।ফাঁকে অন্য কোন লেখকের বই পেলেও পড়তে চেষ্টা করি।
আরো কিছুপর.....
আমার হাতে হুমায়ুন আহমেদের বই দেখে একটু বোদ্ধা টাইপের লোক বল্ল হুমায়ুন আহমেদের বই পড় কেনো এসব পড়ে তো কিছুই শিখতে পারবে না!তিনি অনেক বড় বড় লেখকের নাম বলতে লাগলেন-রবীন্দ্রনাথ,বঙ্কিম,মাইকেল,নজরুল................
আমি মনে মনে বললাম আমিতো শিখার জন্যপড়ি না ।ভাল লাগে তাই পড়ি।ক্লাসের পড়া শিখতেই যা বিরক্তি লাগে!
তারপর হিমু হবারও ক্ষুদ্র চেষ্টা।পুরোপুরি না হলেও ভাব ধরে থাকতাম।
আমি যখন মিসির আলী ,হিমুদের নিয়ে ব্যস্ত তখন কেউ কেউ যখন হুমায়ুন আহমেদকে নিয়ে কটু কথা বলতো গায়ে আগুণ ধরে যেত।আর একটা কথা বলে নিই হুমায়ুন আহমেদ ভাল লাগতো বলে শুধু মাত্র হুমায়ুন আহমেদকে নিয়েই পড়ে থাকিনি কিন্ত তার সমালোচনা সহ্য করতে পারতাম না একেবারেই।
তারও কিছুপর
একদিন শরতের রামের সুমতি পড়ে কাঁদতে শুরু করি।বইটা পড়া শেষ হলে আম্মা কি কারনে যেন ডাকলেন।চোখ মুছে তারপর গেলাম আমআর কাছে আম্মা কি বললেন কানে ডুকলো না একদম ফুফিয়ে কান্না শুরু করলাম ইহি তুলে অ অ.....হুও....
যাকে বলে বেহুসের মত কান্না।আম্মা তো পুরা তাজ্জব পোলার কি হইলো?
মায়ের হাজার প্রশ্ন?ক্যামনে কৈ যে বই পইড়া কান্দন আইতাছে।
তারপর শুরু হলো বাছবিচারহীন পড়া। সামনে যা পাই তাই গিলি।
সমালোচকদের দলে আমিও একদিন
হুমায়ুন আহমেদের সমালোচকদের দলে আমিও একদিন যোগ দিই।হ্যা- কোন লেখক হইল?বড় বড় লেখকদের লেখা পড়লে তার রেশ থাকে অনেক দিন।আর হুমায়ুন আহমেদ?পড়ার পর কেউ কি বলতে পারবে সে কি লিখেছে?
তারপরও টিভিতে হুমায়ুন আহমেদের নাটক না হলে দেখতাম না।তার লেখা বই হাতে পেলে টুপিচুপি পড়তাম।অবশ্য এখনো পড়ি তবে চুপিচুপি না।
বড় লেখক যাদের বই আমি পড়েছি
শুধু বাংলা সাহিত্যের লেখকদের কথাই বলি তুলনা করাটা তো সম্ভব না।বিভূতি ,শরৎ,রবি,তারা,মানিক,নজরুল,বঙ্কিম,মাইকেল....... ..............................এবং আরো যারা আছেন..
তাদের লেখা পড়ে মনে হলো তাঁরা বাংলা সাহিত্যের প্রাণ।আধুনিক যুগের স্রষ্টা।
হুমায়ুন আহমেদকে নিয়ে বোদ্ধারা যা বলেন
হুমায়ুন আজাদ বলেন 'অপন্যাসিক'। কেউ কেউ বলেন চটকদার লেখক।সস্তা কথা সাহিত্যিক,উনার কোন আদর্শ নেই,তিনি পুঁজিবাদী লেখক।এসব লেখক নিজের সময়েই বর্তমান থাকেন তারপর আর কোনই অস্তিত্ব থাকেনা।........
ব্যক্তিগত জীবনের সমালোচনার কথা নাই বল্লাম!
তাঁর লেখা নিয়ে তিনি যা ভাবেন
হুমায়ুন আহমেদের লেখা নিয়ে হুমায়ুন আহমেদ যা ভাবেন তাহল হুমায়ুন আহমেদ পজ্ঞাশ বছর পর তাঁর লেখার কি হবে ?টিকে থাকবে না হারিয়ে যাবে?তা নিয়ে
সন্দিহান!
তাপরও যা ভাবি
লেখাটা যেহেতু হুমায়ুন আহমেদকে নিয়ে তাই উনার সম্পর্কেই বলতে চাই।একজন হুমায়ুন আহমেদের লেখার পরিমাণ নেহায়েত কম না।যারা ইতিহাসের সাক্ষ্য দেন যে অমুকেরাও তাদের সময়ে জনপ্রিয় ছিলো এখন নেই ,,,,,,,,,,
কথাগুলোর সবটাই সত্যিনা।তাঁরা জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলতে পারেন তাদের সাহিত্য কর্ম হারিয়ে যায়নি যেতে পারেনা যদি যেত তাহলে তাদের রেফারেনস্ দেয়া যেত না।যাইহোক বলতে পারি হুমায়ুন আহমেদের বেলায় সত্যি হবেনা
কেননা (আমার ব্যক্তিগত অভিমত হলো) এখনো বাংলা সাহিত্যের অনেক বাঘা বাঘা সাহিত্যিকের লেখা( আমার) গলা দিয়ে নামতে চায়না এবং যেহেতু নতুন প্রজন্ম প্রযুক্তির কল্যানেই হোক আর যে কারনেই দিন দিন বই থেকে দূরে সরে যাচ্ছে তারপর ও যদি তারা বই পড়ার আগ্রহ প্রকাশ করে তাহলে হুমায়ুন আহমেদ হবে তাদের প্রথম সোপান।শরবত পেলে তারা জৈষ্টমধু চিবিয়ে দাঁতগুলো অচিরেই নষ্ট করতে চাইবে না।
অনেকদিন আগে একবার হুমায়ুন আহমেদের'শঙখনীল কারাগার' পড়ছিলাম একটি লাইব্রেরীতে বসে।পড়া শেষ হলে শেষের চিঠিটা পড়তে গিয়ে কখন কান্না শুরু হয় বুঝতে পারিনি পড়া শেষ করে উঠতে গিয়ে দেখি অনেোকেই আমার দিকে তাকিয়ে আছেন এমন করে যেন আমি একজন ল্যাংটা মানুষ।
হুমায়ুন আহমেদকে নিয়ে আজ যা ভাবি
১.হুমায়ুন আহমেদ আরো ভালো কিছু দিতে পারতেন যদি প্রকাশকেরা বান্ডিল বান্ডিল টাকা উনার দিকে বাড়িয়ে না দিতেন।
২.হুমায়ুন আহমেদ যেদিকে হাত দিয়েছেন সেখান থেকেই সফল একজন মানুষ।অত্যন্ত মেধাবী।
'১৯৭১' পড়ে আল মাহমুদ হুমায়ুন আহমেদের পিঠ চাপড়ে দিয়েছিলেন।
৩.তিনি মোহিনী শক্তির অধিকারী।তার লেখা পড়ার সময় মোহগ্রস্ত হয়ে যাই।তারপর আর বিশেষ কিছু মনে থাকে না।
৪.রবীন্দ্রনাথ যদি আধুনিক বাংলাসাহিত্যের স্রষ্টা হন তবে হুমায়ুন আহমেদ উত্তরাধুনিক যুগের স্রষ্টা।
৫.হুমায়ুন আহমেদ একজন 'লো' কোয়ালিটির লেখক তারপরও আমার সামনে পৃথিবী বিখ্যাত লেখকদের বই রাখলে সবগুলো বই হাতে নিয়ে হুমায়ুনের টা প্রথমে পড়ি।পড়া শেষ হলে বলি ধ্যাৎ এটা কোন লেখা হলো!
শেষকথা
হুমায়ুন আহমেদ আপনি সুস্থ হয়ে ফিরে আসুন এবং আমাদের জন্য আরো নতুন কোন শঙখনীল কারাগার লেখুন।
আরো একবার কাঁদি।
আর সস্তা কথাসাহিত্যিক, অপন্যাসিক বলে গালি দিই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


