বর্ষা পেরিয়ে এখন শরৎ।আকাশে সুন্দর রোদ।আর শরতের গতানুগতিক শাদা মেঘ।বর্ষণ এখন যদিও কম তবু প্লাবিত ভূমি থেকে পানি সরে যেতে অনেক দেরি। এ পানি চার থেকে পাঁচমাস থাকে।আমন ধান ঠাঁয় গলা পানিতে দাঁড়িয়ে।আমনের মাঠ ফেড়ে বয়ে যাওয়া নদীতে একটু পর পর সরো জাল পেতে বসেছে জেলেরা।বাতাস যখন গুমোট হয়ে আসে,ধানের পাতারা যখন নড়ে না একটুও ,রোদ যখন প্রখর তাপ ছড়াতে রাগ সাধনায় মগ্ন তখন কেউ কেউ 'চল'হাতে বেরিয়ে পড়ে নৌকা করে।তুখোর শিকারী গলোইয়ের একেবারে সামনে চোখের পলক না ফেলে দাঁড়িয়ে থাকে আর পেছনের পাটাতনে দাঁড়িয়ে আরেকজন পানিতে শব্দ না করে ধীরে ধীরে নৌকা এগিয়ে নেয়।ধান গাছের গায়ে,কাণ্ডে ছোট ছোট শ্যাওলা পড়ে সেই শ্যাওলা খেতে এসে মাছেরা যখন ঠোঁট লাগায় তখন ধানগাছ নড়ে ওঠে।আর তখনই শিকারী একটুও ভুল না করে,জলের ভেতর আলোক রশ্মি কতটুকু সামনে বা পেছনে দেখায় এসব না পড়েও মাছটিকে শিকার করতে ভুল করেনা।চলের ফলা বিদ্ধ হয়ে বড় বড় রুই কাৎলা ফাৎনা ঝাপটায়।একের পর এক বড় বড় মাছের ঝাপটানোতে নৌকার মাচাইলগুলো কাঁপতে থাকে।আমন ধানের ক্ষেতের আইল রেখাগুলো পরিষ্কার করে মানুষ কৈ মাছের জাল পাতে।একসময় সুতোয়বোনা জাল পাতা হতো আজকাল একরকম জাল এসেছে সূক্ষসুতায় বোনা এসব জালে মাছ বেশি আটকায়।
ছেলে মেয়েরা দল বেঁধে শালুক তুলতে বেরোয়।পানকৌড়ির মত ডুব দিয়ে দিয়ে তুলে আনে সুইন্ধা আর গায়া শালুক।গায়া শালকগুলো মাটির যত গভীরে সুন্দর করে ঘর পেতে বসে সুইন্দা শালুকগুলো ততটা না।কিন্ত্ত খেতে সুইন্দা শালুক সুস্বাদু।গায়া শালুকের স্বাদ কিছুটা তেতো।
দয়াল মিয়া শ্রীগরের হাট থেকে একশো হাত সূক্ষ্মসুতোর জাল নিয়ে এসেছে।সেই জাল দেখে মুর্শিদ অনেকটা উত্তেজিত।তাদের পাশের বাড়ির বিল্লাল,শামাল,অহাদ কাকারা এসব জাল পেতে অনেক মাছ ধরে।মুর্শিদ এতদিন শুধু দেখেই এসেছে আজ তারা নিজেরাই মাছ ধরবে। এসব ভেবে ভেবে মুর্শিদ যার পর নাই আনন্দিত।পরিচিত কারো সাথে দেখা হলেই বলে, আব্বায় না একশ হাত কারেন্ট কিনছে।অহন আমরা অনেক মাছ ধরুম।
প্রতিদিন সকালে দয়াল মিয়া মুর্শিদ মিয়াকে ঘুম থেকে তুলে জাল পাততে নিয়া যায়।যত ভোরে যাওয়া যাবে জাল পাতার তত ভালো জায়গাগুলোতে তারা জাল পাততে পারবে।
জাল পাতা শেষ হলে ছেলেকে শুধিয়ে দয়াল মিয়া বলে -
ভালা কইরা দেইখা রাখ বাড়িৎ থাইকা যাতে জালটা পাহারা দিবার পারস্।
ছেলেকে বাড়ি নামিয়ে দয়াল মিয়া সকালের হাটে চলে যায়।মুর্শিদ তাদের বাড়ির একটা উঁচু গাছে উঠে বসে যেন কেউ জাল চুরি না করে সেদিকে খেয়াল রাখে।একটুও চোখের পলক না ফেলে।দয়াল মিয়া হাট থেকে বাড়ি ফেরে।জালের মাছ খুলতে যায়।বেলে,গোলসে,খলসে..
আমনের ক্ষেতের পানির রঙ ঘোলাটে হয়ে আসে।পানির এ ঘোলাটে রং বলে দেয় যে পানির নেমে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে।
কইরে মুর্শিদ? ল পাট কাটা খালি জমিডার মধ্যে জালডা পাইত্তা আই।
দয়াল মিয়া ছেলেকে বলে।
পানি মরা শুরু করছে।মরা ঘোলা পানিত্ মাছেরা ভালো মতন দেখবার পারে না ।
মুর্শিদ বাবার সাথে কোন কথা না বলে গিয়ে নৌকায় ওঠে।খালের পাশে খালি পাটের জমিটার লম্বালম্বি দয়াল মিয়া জালটা পাতে।
জাল পাতার পর চলে আসবে করেও কি মনে করে একটু থামে।
মুর্শিদ তুই পানিত নাম।নাইমা জালডার একটু দূরে দাঁড়ায়া থাখ। আমি বাজার থাইকা আইতাছি।
অতক্ষণ আমি পানিত খাড়াইয়া থাখুম?
হ! কাইলকা হুনছি অহাদের জালডা চুরি অইয়া গেছে।অহন মাছের মৌসুম আইতাছে।বেশি বেশি মাছ ধরা পড়ব আর হের লাইগা চুরের জাল চুরি করাও বাড়তাছে।একটু কষ্ট কর বাপ ,আব্বায় বাজারে যামু আর আমু।
ছেলেকে বুক পানিতে নামিয়ে দিয়ে দয়াল মিয়া সকালের হাট বাজার শেষ করতে যায়।
এদিকে মুর্শিদ জালের একটু তফাতে দাঁড়িয়ে থাকে।চুরি যাবার ভয়ে জালের নিশানা থেকে একটু পলক ফেলায় না।কিন্ত্ত অবাক কান্ড তার জালের উপরে অনবরত পাখির উড়াউড়ি বাড়ে।মুর্শিদ বিরক্ত হয়।ভাবে এইভাবে পাখিগুলান জালডার উপর উড়লে জালে মাছ ধরব?মরার পাখি!উড়ার আর জায়গা পাইলি না?
মনে মনে পাখিদের উপর মুর্শিদ ক্ষেপে যায।পানিতে যাতে শব্দ না হয় এমন করে শূণ্যে হাত উঠিয়ে মুর্শিদ পাখিদের তাড়াতে ব্যর্থ চেষ্টা করে।
একটা চিল ছু'মেরে তার জালের উপর থেকে একটা মাছ তুলে নিয়ে যায়।
মুর্শিদ ভাবে -ইস এই মাছটাতো আমার জালে লাগতে গেছিল!মরার চিল।হেই!
নিজের মুখের শব্দে মুর্শিদ ভয় পেয়ে যায়।শব্দ করা যাবেনা। শব্দ করলে মাছ জালে আটকাবেনা। কিন্ত্ত চিলগুলান যে জবর জ্বালাইতাছে।সে আবার শূণ্যে হাত তুলে ইশারায় চিল তাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করে একজায়গায় ঠাঁয় দাঁড়িয়ে।
মুর্শিদ খেয়াল করে দু'টো পাশাপাশি নৌকা আসছে তার দিকে।সেদিকে তাকিয়ে তার মনটা সুস্থির হয়।তার বাবা আসছে বলে।সাথের নাইয়াটি কে মুর্শিদ চিনতে পারেনি প্রথম। নৌকাটি আরো কাছে এলে বুঝতে পারে সে লোকটি পাশের বাড়ির মানিক চাচা।লোকটি খুব ভাল গান করে।প্রায় রাতেই তার বাবা মানিক চাচার সাথে গানের আসরে যায়।মুর্শিদ তাঁকে ভেতরে ভেতরে খুব পছন্দ করে।মানিক আর দয়াল মিয়া যতই কাছে আসতে থাকে মুর্শিদ একটা গানের সুর ততই স্পষ্ট শুনতে পায়।
বনো মালি তুমি
পরজনমে হইও রাধা
.........................................
নৌকাটি কাছে আসতেই দয়াল মিয়া দয়ার্দ দৃষ্টিতে তার ছেলের দিকে তাকিয়ে বলে -নৌকায় উঠ বাপ।
আব্বার কি খুব কষ্ট হইছে??
মুর্শিদ অভিমানী সুরে বলে-আমি কতক্ষণ পানিত খাড়াইয়া আছি আমার কষ্ট হইব না??
ছেলের কষ্টের কথা ভেবে দয়াল মিয়া মনে মনে অনুতপ্ত হয়।কাগজ দিয়ে মোড়ানো একটা পুটলি ছেলের দিকে এগিয়ে দেয়।
-ও ভাতিজা তোমার জাল দেহি মাছে নিয়া যাইতাছে।
বাপ বেটার মাঝখানে এই প্রথম মানিক মিয়া কথা বলে।
যান! মিছা কথা ।জাল ঐ খুডার লগে বাঁন্ধা আছে।
মুর্শিদ আঙুল দিয়ে জালের খুঁটি দেখায়।
ভাতিজা দেখতাছোনা জালের উপর কত চিল উড়তাছে?জালে অনেক মাছ ধরছে হেই মাছ জালডারে পানির উপরে ভাসাইয়া তুলছে।এই মাছ দেইখা জালের উপর চিল উড়তাছে বুঝলা?
মুর্শিদ কৌতূহল ভরা দৃষ্টিতে তার দিকে তাকায়।
মানিক চল জাল তুলি।
দয়াল মিয়া মানিককে উদ্দেশ্য করে বলে।
জালের কাছে এসে মুর্শিদ দেখতে পায় পানির নিচে জালের মধ্যে ঝাকে ঝাকে মাঠের পিঠ রুপালী ঝলক দেয়।
ভাতিজা যেই মাছ লাগছে তুমি আর তোমার মা সারাবছর খাইলেও শেষ হইব না।
মানিক চাচার কথায় মুর্শিদ আস্বস্ত হয়।মুর্শিদ সত্যিই এত মাছ একসাথে কখনো দেখেনি।খুশিতে সে বাকরুদ্ধ।
শরতের শেষে যখন পানি নেমে যেতে শুরু করে তখন জেলেরা ছাড়াও গাঁয়ের ছেলে বুড়ো সবাই মাছ ধরার উৎসবে মেতে উঠে।খালের কিনারে, ছোট নদীর কিনারে পানি যখন ভাটিতে চলতে থাকে সেই পানির স্রোতের প্রতিকূলে দাঁড়িয়ে খুঁটি গেঁড়ে সেখান থেকে পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রী কোণ করে আরো গভীরে কিছুটা দূরত্বে আরেকটা খুঁটি গেঁড়ে কাছি টানা দেয় পানির উপরিস্তরে।তারপর সেই কাছির উপর কঁচুরিপানা দিয়ে একটা লম্বা আলের মত করে তীরের খঁটির সাথে একটি ঠেলা নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে স্রোতের দিকে মুখ করে।ক্ষাণিক বাদে যখন ঠেলা উঠায় তখন দেখা যায় ঠেলা জালের থইলাতে সের সের বৈচা মাছ।
এ সময়টা শিং মাছ ধরারও একটা দারুণ সময়।আর শিং মাছটা ধরা দেয় রাতে।দিনের আলোতে শিং মাছ নড়াচড়া করে না।দিনের আলো নিভে গিয়ে যখন অন্ধকার নেমে আসে তখন শিং মাছ গোঁফ নেড়ে নেড়ে বেরোয় ভাটির পানির দিকে। আমন ধানের ক্ষেতগুলো থেকে তীর তীর করে পানি নামে আর সেই সাথে অনেক মাছেরাও । যেখানেই কাঁদা পানি সেখানে কোনরকম একটা জাল ফেলে এলে সকালে দেখা যায় শিং মাছে পুরো জাল গেঁথে আছে।
দয়াল মিয়া শিং মাছ ধরবে বলে ভাবে ।তার জালের যে ছিদ্র সেটি শিং মাছ আটকাবার জন্য উপযুক্ত।
আইজ রাইতে শিং মাছ ধরুম জাগনা থকন লাগব পারবি না?
ছেলের দিকে তাকিয়ে দয়াল মিয়া কথাগুলো বলে।মুর্শিদ হ্যাঁসূচক মাথা নাড়ে।
সন্ধ্যা নামার ক্ষাণিক পরে দয়াল মিয়া দু'টো খুঁটি,একটি লণ্ঠন আর জাল নিয়ে নৌকায় উঠে।সঙ্গে মুর্শিদ।দয়াল মিয়া আমনের মাঠের দিকে তাকিয়ে চিন্তা করে কি যেন একটা।তারপর খালের বাঁক ধরে ছোট নদীর দিকে এগিয়ে যায়।এখন আর আমনের মাঠ দিয়ে নৌকা চালানো যায়না। একতো পানি কম তারউপর ধানগুলো ধন হয়ে এসেছে।পোয়াতি কান্ডগুলো শীষে পুষ্ট হয়ে আছে।আচমতিয়া ধানগুলো ইতোমধ্যে শীষ ছেড়েছে।ফুলপরী,কাতিবাজাল,বিলবাজাল ,পরসুমের শীষগুলো কিছুটা পরে বের হয়।পাকেও পরে।কৃষকের নতুন ধানের ভাত প্রথমেই আচমতিয়া ধান থেকে।সে ভাতের রং লাল কিন্ত্ত খেতে ভাল ।দুধ ভাত হলে আরো ভাল।
ছোট নদীতে এসে ক্ষাণিক ঘোরে দয়াল মিয়া আমনের মাঠ থেকে মাছ নামার একটা জান খুঁজে নিয়ে খুঁটি গেঁড়ে জাল পেতে বসে ।মুর্শিদ একটু পর পর শরীর চাপড়ায়।
মশা ধরছেরে?
উবা।
বলে দয়াল মিয়া হারিকেন থেকে বিশেষ কায়দায় কিছুটা কেরোসিন বের করে বাপেতে ছেলেতে শরীরে মাখায়।
দয়াল মিয়া জাল থেকে শিং মাছ খুলে আর একটু পর পর বলে দিছেরে ..দিছেরে..
মুর্শিদ ভয়ার্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস- করে কি হইছে আব্বা?
দয়াল মিয়া যতবার শিং মাছের গুতো খায় ততবারই বলে 'দিছেরে দিছেরে'।মুর্শিদ বুঝতে পারে তার বাবা আরেক্টা গুতো খেল।আমনের মাঠ থেকে তীর তীর করে নেমে আসা মাছে তাদের নায়ের মাচাইলের তল ভরে উঠে।হাতের ব্যথায় শরীরে তাপ আসে।সকাল হবার আগেই জাল গুটিয়ে বাড়ি আসে।জীয়ল মাছ অনেকদিন থেকে যাবে তাদের ঘরে।কিছু মাছ রোদে শুকানো হবে।
মাছ ধরার মওসুম শেষ।হেমন্তের শিশির পড়ে ফোটায় ফোটায় টুপটুপ করে।আমন ধানের আলগুলোতে নতুন ঘাস গজাতে থাকে।নতুন ঘাসের উপর শিশির পড়ে চিকচিক করে।আমনের সবুজ মাঠ ক্রমশ সোনারঙ ধারণ করে।
আরামদায়ক বাতাসে বসে পাটি বিছিয়ে মা-ছেলেতে গল্প হয়।ছেলে জিজ্ঞেস করে মা আমি আইছি কোনখান থাইকা?
মা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে তুই আসমান থাইকা পড়ছস আমার কোলে।
ছেলে উৎকণ্ঠিত হয়ে বলে আমি ব্যথা পাইছি না?
ভুলে যাওয়া ব্যথায় যেন সে শিহরিত হয়।
কৃষাণীর চোখে নতুন স্বপ্ন।নতুন ধান ঘরে তোলার স্বপ্ন।
ভীনদেশী ধান কাটোয়ারা দল বেঁধে ধান কাটতে আসে।সারাদিন চলে ধান কাটা ,ধান মাড়াই।দিনশেষে রাত হলে ধানকাটোয়ারা গানের মজমা বসায়।লণ্ঠনের মৃদু আলোয় রক্তিম হয়ে উঠে গায়েনের মুখাবয়ব।কামে ,ক্রোধে ,প্রেমে,বিরহে।
নতুন ধান ভানতে ভানতে বধূরা গীত গায়। চাল গুড়ো করে সকালে তৈরী হবে পিঠা পায়েস।ছেলেরা ঘুম থেকে উঠেই পাবে বাসন ভর্তি গরম পিঠা ।সেখানে ভাপ উড়ছে।
নবান্নে নতুন বিয়ের ধুম পড়ে যাবে।জামাই বউ আপ্যায়নে কেটে যাবে মৌসুম।রাত সঙ্গম শেষ হলে নববধূরা স্নান করে ভেজা কাপড় মেলে ধরবে ।ধান কাটা শেষে নারাময় মাঠে ছিটিয়ে দেয়া হবে মাস,কেলাই,মটরশুটির বীজ।সেই বীজ অঙ্কুরিত হয়ে সোনালী নারাময় মাঠ আবার সবুজ হবে। দিন যাবে।বধূরা পোয়াতি হবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

