আমার একটা বিশ্বাস আছে যে, সব লেখা, সব গান, সব সিনেমা সব বয়েসীদের জন্য নয়। সহজ কথায়, প্রতিটি লেখা, গান বা সিনেমা প্রত্যেকের জীবনে একটা নির্দিষ্ট বয়সে ভাল লাগা নিয়ে আসে। সেজন্যই শৈশবে কমিকস যতটা ভাল লাগে, কিশোর বেলায় ফেলুদা বা তিন গোয়েন্দার কাছে তা কিছুই নয়, আবার তরুণ বয়সে মাসুদ রানা, কুয়াশা সিরিজ ভাল লাগে। তারপর ধীরে ধীরে ভাল লাগে ক্লাসিক সাহিত্য- তখন সুনীল, শীর্ষেন্দু, বঙ্কিম, এমনকি রবীন্দ্র রচনাবলীও ততটা কঠিন মনে হয় না।
একই কথা গানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এসো গান শিখির ফেরদৌসী রহমানের সাথে কন্ঠ মেলাতে মেলাতে এক সময় মনে হয় এর চেয়ে ‘মেলায় যাইরে’ বা ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হল আকাশে’ অর্থাৎ ব্যান্ডের গান অনেক বেশি আকর্ষণীয়। সেসময় ব্যাকস্ট্রিট বয়েজ. বন জোভি বা আয়রন মেইডেনের চিৎকারে আলাদা শিহরণ জাগে। এরপর ভাল লাগে মেলোডি। কিশোর কুমার, লতা মঙ্গেশকর, মান্না দে যেমন ভাল লাগে তেমনি জর্জ মাইকেল, রিচার্ড মার্কস বা ব্রায়ান অ্যাডামসের গানও যথেষ্ট মুগ্ধ করে। রবীন্দ্র সঙ্গীত বা নজরুল গীতি কিংবা মেহেদী হাসান বা জগজিৎ সিংয়ের গজল প্রীতিটা আসে অনেক পরে।
ভিজুয়াল বিনোদনের জগৎটা শুরু মনে হয় কার্টুন ছবি দিয়ে। প্রতিদিন বিকেলে বিটিভি শুরু হওয়ার আগ থেকেই টিভির সামনে বসা। সূচনা সঙ্গীত, তারপর টিভি পর্দায় ঘোষকের অনুষ্ঠান সূচি, কুরআন, বাইবেল, ত্রিপিঠক পাঠ ধৈর্য্য ধরে শোনার পর আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত অর্থাৎ কার্টুন। বয়স বাড়ার সাথে সাথে টিভি নাটক বুঝতে শিখি, ইংরেজী সিরিয়াল যেমন নাইট রাইডার, দ্য এটিম, দ্য ফলগাই, ম্যাগগাইভারের প্রতি নেশা এসে যায়। মুভি অব দ্য উইকে ইংরেজী ছবির সামনে বসি- কাহিনী বোধগম্য হলে দেখি, না হলে খেলতে বের হয়ে যাই। পরিবারের বা প্রতিবেশীদের বড়দের দেখি ভিসিআরে হিন্দি, ভারতীয় বাংলা সিনেমা দেখে। সব সময় একটা আগ্রহ থাকেই ওদিকে। কিন্তু পরীক্ষার পরে ছাড়া ভিসিআরের সামনে বসার অনুমতি মেলে না।
মাঝে মাঝে ছুটির দিনে বাড়ীওয়ালার বড় ছেলে বাসায় ডেকে নিয়ে দেখায় টার্মিনেটর, প্রিডেটর, ইউনিভার্সেল সোলজার কিংবা ডেমোলিশন ম্যানের মত কিছু অদ্ভুত সব ছবি। ভাল লাগে কিন্তু সুযোগ একেবারে সীমিত। যাই হোক, একসময় স্কুল ছেড়ে কলেজে ভর্তি হই। বাসায় একটা পুরনো কম্পিউটার আসে। কিন্তু সে কম্পিউটার আর ক্যালকুলেটরে তেমন পার্থক্য খুঁজে পাই না। ততদিনে বাসার ভিসিআর নষ্ট হয়ে পড়ে আছে ঘরের এক কোণে। আর বাবা যোগ দিয়েছেন তাবলীগ জামাতে। বাড়িতে শব্দ করে টিভি দেখা বা গান শোনা নিষেধ।
তারপর ভর্তি হলাম ভার্সিটিতে। এবার অনেক জেদাজেদির পর একটা মাল্টিমিডিয়া কম্পিউটার। সিডি রম থাকায় এবার আমায় পায় কে। দিনের বেলা অল্প শব্দে ছবি দেখি। আর রাতে দরজা আটকে দিয়ে হেডফোনে। বাড়ির আশে পাশে যত ভিসিডির দোকান আছে সবগুলোতে হামলে পড়লাম। ইংরেজী বা হিন্দি সিনোমর প্রতি এক আশ্চর্য ঝোঁক তৈরি হল। প্রতিদিনই কোন না কোন ছবি দেখা হত। স্কুল জীবন থেকে যে গল্পের বইয়ের নেশা সেটা ধীরে ধীরে কমতে থাকে, বাড়তে থাকে সিনেমার নেশা।
তখনও বাজারে ডিভিডি আসে নি। সিডিতে সিনেমা দেখার সমস্যা ছিল একটাই- একটা ডিস্ক ভাল থাকলে আরেকটা স্ক্র্যাচ ভর্তি। ফলে ছবি অর্ধেক দেখে বাকি অর্ধেক দেখার জন্য সিডি রমের সাথে যুদ্ধ। ব্রেভহার্ট বা ক্যাসিনো টাইপ সিনেমা আবার তিন ডিস্কে। এরপর থেকে সিনেমা ভাড়া নেয়ার সময় ভাল করে খেয়াল করতাম দুইটা ডিস্কই ঠিক আছে কিনা।
পাড়ার ভিডিও দোকান গুলোর ইংরেজী বা হিন্দি সিনেমার ভান্ডার যখন শেষ তখন এক ভিডিও দোকানের বড় ভাই উত্তম কুমারের একটি ছবি 'পথে হল দেরী' ধরিয়ে দিলেন। ছোটবেলা থেকেই উত্তম কুমার নামটা শুনে আসছি, কিন্তু কখনও তাঁর কোন ছবি দেখা হয়নি। একে তো মান্ধাতা আমলের ছবি, তার উপর সাদাকালো। উপায়ান্তর না দেখে ঐটা নিয়েই বাসায় ফিরলাম।
সেদিন থেকে উত্তম কুমার নামের ঐ 'ঠোঁটমোটা' লোকটি যেন আমাকে যাদু করল। অন্য কিছু আর খুঁজি না। শুধু উত্তম কুমারের ছবি। ভিডিও দোকানীকে অনুরোধ করি আরও ছবি নিয়ে আসতে। নিয়মিত ক্রেতা হওয়ায় তিনি আমার কথা রাখতেন। প্রতি সপ্তাহে উত্তম কুমারের নতুন নতুন ছবি নিয়ে আসতেন। আর আমিও মজা করে দেখতাম। আগেই ইন্টারনেট থেকে উত্তম কুমারের সব ছবির তালিকা নামিয়ে প্রিন্ট করে নিয়েছিলাম। এভাবে এক নাগাড়ে প্রায় ৬০ টি ছবি দেখা হল। ততদিনে স্টেডিয়াম মার্কেট, রাইফেলস স্কোয়ার, মেট্রো শপিং মলের কিছু দোকান চেনা জানা হল। যে সব ছবি দেখা হয়নি সেগুলো খুঁজে খুঁজে বের করে দেখতে লাগলাম। বছর দুয়েকের মধ্যে ভিসিডিতে উত্তম কুমারের যত ছবি পাওয়া গেল সব দেখে ফেললাম। (চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে ডিসেম্বর, ২০০৯ দুপুর ২:১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



