আজ থেকে প্রায় ৩ বছর আগের কথা। হঠাৎ এক সকালে বিশেষ একটা ফোন কল পেয়ে একিসাথে বিষ্মিত, আনন্দিত এবং অভিভূত হলাম। যিন কল করেছিলেন তিনি তারেক মাসুদ, মাটির ময়নার পরিচালক কান চলচ্চিত্র পুরস্কার বিজয়ী তারেক মাসুদ। তিনি বললেন যে তার একটা লেখা বেরিয়েছে একটা দৈনিকে, পড়ে আমার মতামত জানাতে বললেন। আমার তখন বয়স আরো কম, এহেন অনুরোধে বলা যায় এক লাফে আকাশে উঠে গেলাম, এই ছিল আনন্দের অবস্থা। বিষ্মিতও হয়েছিলাম বিরাট, তারেক মাসুদ বাঙলা চলচ্চিত্রে য্যোতিস্কসম ব্যক্তিত্ব, আমার মতো ছোট এবং নগন্য মানুষকে তিনি তার লেখা পড়ে অভিমত দিতে বললেন, এইটা কেমনে হয়। তার উপরে তার সাথে আমার বিশেষ খাতিরও ছিলনা। আরজ আলী মাতুব্বর পাঠাগারের আয়োজনে কিছু চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজনের খাতিরে মনিপূরী পাড়ায় তার বাড়িতে তার সাহায্য প্রার্থনায় গিয়েছিলাম শ্রেফ কয়েকবার, সেই সুবাদে নিজের কিছু ছাপা হওয়া লেখাও তাকে পড়তে দিয়েছিলাম। প্রথম পরিচয়েই বুঝেছিলাম যে তিনি বাংলাদেশের আর দশজন খ্যাতিমান মানুষের মতো রাশভারী অথবা অহঙ্কারী না, মাটির ময়নার এই পরিচালক ছিলেন পুরোদস্তুর মাটির মানুষ। তাও তার ঐ ফোন নিয়া বিষ্ময় কাটেনাই বহুদিন, বন্ধুবান্ধবকে কাহিনীটা বলে বেরাতাম।
এই বিষ্ময় অবশ্য পরে আর থাকে নাই। নানান চলচ্চিত্র প্রদর্শনির কারনে আর পাঠাগারের প্রকাশনা পৌছে দিতে এরপর বেশ কয়েকবার দেখা করেছি তার সাথে। বুঝতে পেরেছিলাম যে, ছোট বড় খ্যাতি অখ্যাতি বিচার না করেই মানুষের সাথে সমান ব্যাবহার করার দূর্লভ গুনটুকু তার ছিল, একজন ভালো মানুষের এই গুন খানা বাংলাদেশের বেশিরভাগ খ্যাতিমান অথবা মহামানব টাইটেল পাওয়া অনেকের মধ্যেই দেখিনাই। আর তাই তার লেখা নিয়া আমার মতো অপাংক্তেও ব্যক্তির অভিমতও তার কাছে ফেলনা ছিলনা। এই কাহিনী পারলাম দুইটা কারনে। প্রথমত, হঠাৎ আজ আমাদের ছেড়ে চলে যাওয়া বাঙলা চলচ্চিত্রের এই মহান ব্যক্তিকে স্মরণ অথবা ধারণ করতে গেলে এই সুখ স্মৃতিটুকু ছাড়া তা করা আমার পক্ষে সম্ভব না, তাকে হারানোর বেদনায় আজ যতটাই আপ্লুত অনুভব করিনা কেনো। দ্বিতীয়ত, আমি চলচ্চিত্র অঙ্গনের মানুষ না, ভক্ত হলেও বাঙলা চলচ্চিত্র অঙ্গনে তার অবদানকে মাপামাপি করে তাকে স্মরণ অথবা ধারণ করার ক্ষমতা আমার নাই। আমি বরং তাকে যেইভাবে বুঝতাম, যেইভাবে জানতাম সেইভাবেই স্মরণ করতে পারি, এবং এরপরে ধারণ করার চেষ্টা করতে পারি। আর এইখানে তার ঐ প্রবন্ধ খানার কথা উল্লেখ না করে সেটা সম্ভব না।
প্রবন্ধটা ছিল বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের আরেক কিংবদন্তী জহির রায়হান’কে নিয়া। মাটির ময়না দেখেছি বহুবার, মুক্তির গান দেখে চোখের পানি আটকে রাখতে পারিনি একবারও, এমনকি এই ছবির কথা কাউকে বলে বুঝাতে গেলেও আমি আবেগে আপ্লুত হই, সেই হিসাবে তারেক মাসুদের ভক্ত আমি ছিলাম বটে। কিন্তু সেই প্রবন্ধ খানা পড়ে তার চলচ্চিত্র বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গীরও বিশেষ ভক্ত হয়ে গেলাম। প্রবন্ধ খানায় তারেক মাসুদ আফসোস করেছিলেন এই নিয়া যে বাঙলা চলচ্চিত্রে জহির রায়হানকে বড় দরকার ছিল, কিন্তু তার অকাল প্রয়ানে যেমন আমরা তাকে হারিয়েছি, তেমনি তার মতো আর কেউ আসেও নাই। উদাহরণ দিতে গিয়া তিনি ‘জীবন থেকে নেয়া’র কথা পেরে উদাহরণ টেনেছিলেন। বলেছিলেন যে এই হলো সেই ছবি যেই ছবি না আর্ট ফিল্ম না কমার্শিয়াল বাঙলা ছবি, আবার এর দুইটাই। এই ছবি শিল্পকে অস্বিকার করে বানিজ্যে নামে নাই, আবার ‘আর্ট ফর আর্টসেক’ নামক আধুনিকতাবাদী বূলি ঝেড়ে জনবিচ্ছিন্ন এবং সমাজ ও মানুষের ক্ষেত্রে দায় দায়িত্বহীন শিল্পও হয়নাই। শিল্প আর জনমানুষের আকাঙ্খা আর তাদের জন্য সমসাময়িক মুক্তি সংগ্রামের অনুপ্রেরণা দেয়া এইসবই ছিল সেই ছবিতে। এমন আরো বহু চলচ্চিত্র তৈরি হোক এইটা ছিল তার কামনা। এই বিশ্লেষনটা মনে বেশ দাগ কেটেছিল। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে একদিকে যেমন বিন্দুমাত্র শিল্পমূল্যহীণ চলচ্চিত্রের আধিক্য তেমনি এর বিপরীতে শিল্পমানের ছবি নির্মান করতে গিয়া অথবা শ্রেফ নিজেকে আলাদা করতে গিয়া আর্ট ফিল্ম অথবা শর্ট ফিল্ম জাতীয় নামের ছায়ায় জনবিচ্ছিন্ন এবং অনেকাংশেই উদ্দেশ্যহীণ চলচ্চিত্র নির্মানেও নিজেদের সময় বিকিয়ে দেয় বহু নির্মাতা। এর মাঝখানে যেনো কিছু হওয়া সম্ভব না, অথচা পশ্চিমা দুনিয়ায় বহু খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা সেইটাই করে দেখাচ্ছেন দিনের পর দিন। চলচ্চিত্র নিয়া নেহায়েত মূর্খ মানুষ হলেও তারেক মাসুদের এই আক্ষেপ খানা বুঝতে আমার বিশেষ সমস্যা হয় নাই, সাধারণ মানুষ পড়ে বুঝবেনা এমন কিছু তিনি লেখেনও নাই। তবে আমি আবার ওনার মতো অতটা আক্ষেপ করিনাই। কারন জহির রায়হান না থাকতে পারে, আমাদের তারেক মাসুদ ছিলেন। একিসাথে শিল্পচর্চা করা আর জনগনের সাথে আলাপ করা এবং তাদের কিছু বলা, আবেগ অথবা উদ্দিপনা দেয়া, ইতিহাসের নানান দিকের পাঠ দেয়া এইটা তিনি বেশ ভালোই করতেন। আমি কোন তুলনায় যাবোনা, কিন্তু জহির রায়হান না থাকায় অথবা তার মতো আর কেউ না থাকায় তারেক মাসুদ আক্ষেপ করলেও আমি কোন আক্ষেপ করিনাই, কারন তারেক মাসুদ নিজে তো ছিলেন। অন্ধকারাচ্ছন্ন বাংলা চলচ্চিত্র অঙ্গনকে একাই আলোকিত করে তিনি ছিলেন।
কিন্তু এখন আর তিনি নাই। প্রাথমিক ধাক্কায় এটাই বারবার মনে হচ্ছে যে এখন আর তিনি নাই। সেইসাথে ভিষন উদ্বিগ্ন হচ্ছি এই ভেবে যে এখন আমাদের কি হবে? আমরা এখন কোথায় যাবো, কার কাছে যাবো। কার চলচ্চিত্র নিয়া আমরা গর্ব করবো, পর্দায় কার শিল্প সম্মত কাহিনীর সাথে আলাপ সালাপের মধ্য দিয়া আমরা কিছু একটা বুঝবো, কিছু একটা শিখবো, কিছু একটা হয়ে উঠবো। যাত্রাবাড়ি এলাকার মতো ঢাকার এক অপাংক্তেও এলাকায় চলচ্চিত্র প্রদর্শনির আয়োজন করতে গেলে এখন আমরা কার কাছে যাবো? নিজ দায়িত্বে প্রজেক্টর থেকে শুরু করে নিজের এসিস্টেন্টকে পর্যন্ত ঢাকার ধুলিধুসারিত অথবা কর্দমাক্ত আর ভাঙাচোড়া রাস্তার অল্পকিছু স্বপ্নবিলাসী তরুনকে সাহস যোগাতে কে পাঠাবেন? আমরা ভেবেছিলাম, আমরা চেয়েছিলাম তিনি দির্ঘজীবী হবেন। বাঙলা চলচ্চিত্রকে আরো সমৃদ্ধ করবেন। আমরা ভেবেছিলাম, নিজের ছত্রছায়ায় তিনি নিজের বেশ কয়েকজন উত্তরসূরী রেখে যাবেন, আর আমাদের মতো কিছু স্বপ্নবিলাসী তরুনদের আরো অনেক অনেক স্বপ্ন দেখার লাই দিয়ে যাবেন। আমরা চেয়েছিলাম যে, এই করতে করতে তিনি একদিন বুড়ো হবেন, আর আমরা বড় হবো। বড় হয়ে একদিন কঠিন কঠিন ভাষায় তার কাজের সমালোচনা লিখবো, সেই লেখায় আবগে, শ্রদ্ধা, খোচা সবই থাকবে। কিন্তু আমাকে এখন তার স্মরণ লিখতে হচ্ছে, ব্যক্তি মানুষটা আর না থাকায় তার মানবতার সত্ত্বাটুকু ধারণ করতে তার স্মৃতি নিয়া লিখতে শেষ হচ্ছে। আজ আমার আফসোসের শেষ নাই।
এতসব আক্ষেপের ধাক্কা কাটিয়ে নিজেকে অন্তত এইটুকু সান্তনা দিতে পারি যে তারেক মাসুদ নামচিহ্ন ধারণ করা ব্যক্তিটি বিদায় নিলেও তারেক মাসুদের আদতে মৃত্যুর কোন সম্ভাবনা নাই। তারেক মাসুদরা মরেন না। আমি ব্যক্তির মৃত্যুকে স্বিকার করে নিলেও মানবতার ধারক বাহক মানুষের মৃত্যুতে বিশ্বাস করিনা। ব্যক্তির শরীর হয়তো নাই হয়ে যায়, কিন্তু তার কাজ আর চেতনাই আসল মানুষ, মানবতার ধারক আর বাহক। পরবর্তি প্রজন্মের উপর ভর করে সে অমর, অবিনস্বর। এই মানবতা ঐশ্বরিক, মানুষ নিজেই এইভাবে ইশ্বর। তারেক মাসুদের মতো মানুষদের দেখেই আমি মানুষের মাঝে ইশ্বরের এই জন্ম অথবা আবির্ভাব এবং বেরে ওঠায় বিশ্বাস স্থাপন করেছি, করে যাবো। হয়তো জহির রায়হানই আমাদের মাঝে ফিরে এসেছিলেন তারেক মাসুদ হয়ে, কিন্তু এইবারও অকালে বিদায় নিলেন। তিনি আবার ফিরে আসুন, এই আমার আকাঙ্খা। তাকে স্মরণ এবং ধারণ করার তাই কোন বিকল্প নাই। এইটা করতে পারলেই আবার তারেক মাসুদের আবির্ভাব হবে আমাদের এই বাংলাদেশে, হয়তো এক বা বহু নামচিহ্নের মাঝে তিনি আবার আসবেন অন্ধকারের মাঝে আলো হয়ে জ্বলতে।
আমি তারেক মাসুদের অপেক্ষায় থাকবো।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই আগস্ট, ২০১১ রাত ১০:১৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



