তিনটা উপাত্ত অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। মূল হচ্ছে বই-জ্ঞান অর্জনের প্রধান হাতিয়ার। অথচ যা হওয়া উচিত ছিল অন্তত আমাদের দেশে তা হচ্ছে না কিছুতেই। বই হচ্ছে-ভালো মন্দ সব মিলিয়ে। কিন্তু গড়ে উঠছে না কাংখিত পাঠক সমাজ। আমি এখানে স্কুল-কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য বই এর কথা বলছি না। এগুলো তো বাধ্য হয়ে পড়তেই হয় কোর্স সমাপনী পরীক্ষার ফলাফল তথা উজ্জল ভবিষ্যতের সম্ভাবনার হাত ছানিতে। কিন্তু এরপর? শিক্ষা জীবনশেষে কয়জন সেই পাঠাভ্যাস ধরে রাখে? উদাহরণ তো খুবই সহজলভ্য। একুশে বই মেলায় তিল ধারণের ঠাঁই থাকেনা। অথচ সেই অনুসারে বিক্রি হয়না বই। হুমায়ুন আহমেদ এর মতো গুটি কয়েক লেখকের প্রসঙ্গ এই সাধারণ আলোচনায় আসেনা। সাধারণভাবে বলা যায় যে, বই মেলায় মানুষের সমাগম আর প্রকাশকদের বই বিক্রির মধ্যকার বিরাট ফারাকের একমাত্র কারণ হচ্ছে বই পড়ার প্রতি মানুষের অনীহা। এজন্যই বই মেলায় আগত সবাইকে আমি পাঠক বলি না, বলি পরিদর্শনকারী। তবে হ্যাঁ, এদের মধ্যে সত্যিকার পাঠক কিন্তু থাকে। তারা বই এর টানে মেলায় আসে, পছন্দসই বইও কিনে।
আর এক শ্রেণীর পাঠক আছে। এরা মাগনা বই পেলে পড়ে। তাদের মতে, বই আবার কেউ কিনে পড়ে নাকি? এজন্য পয়সা খরচ করা বোকামী। আমি বলি এরাও পাঠক। বই কেনার সাথে এদের দূরত্ব আছে ঠিকই। কিন্তু উপহার হিসেবে বই দেয়া-নেয়ার প্রথাকে তো জিইয়ে রেখেছে এই শ্রেণীর পাঠকেরা। আমি উদারচিত্তে এই সমস্ত পাঠকদের বই উপহার দিয়ে থাকি। আশা একটাই। ছাই ভিক্ষা দিতে দিতে যেমন কৃপণ গৃহিনীর হাত খোলে তেমনি মাগনা বই পড়তে পড়তে এদের মধ্যে একদিন কিনে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠবে। একটা সময় ছিল বিয়ে, জন্মদিন বা এই জাতীয় অনুষ্ঠানের দাওয়াতে উপহার হিসেবে বই দেয়া হতো। ছোটবেলায় দেখেছি গ্রামাঞ্চলের বিয়েতে উপহার হিসেবে মোকছেদুল মোমেনিন বা বেহেশতী জেওর বা এই জাতীয় অন্য কোন কিতাব উপহার দেয়া হতো। সামান্য পড়ালেখা জানা বউটিকেও দেখতাম মনযোগ দিয়ে এই কিতাবসমূহ পড়ত। যদিও বিশেষ শ্রেণীর বই এগুলো, কিন্তু বই তো! বিশেষ একটি পাঠকসমাজও ছিল এগুলোর। শহরাঞ্চলের অনুষ্ঠানে এসব কিতাব উপহার হিসেবে দেয়ার রীতি না থাকলেও বই উপহার দিয়ার প্রথা যে একাবারে ছিলনা তা কিন্তু নয়। আজকাল তো শহরাঞ্চলে এসবের কথা ভাবাই যায় না। দাওয়াত কার্ডে যারা উপহার না নেয়ার জন্য অনুরোধ করেন তারা বাদে অন্য কোথাও বই উপহার দিলে আপনি চিহ্নিত হয়ে যাবেন। নানা মন্তব্য করা হবে আপনার রুচি বা আর্থিক সামর্থ নিয়ে। আজকাল অবশ্য গ্রামাঞ্চলেও ক্রমান্বয়ে সীমিত হয়ে আসছে বই উপহার দেয়ার প্রথা। বই পড়–য়া মানুষের সংখ্যা কমে যাবার এটাও একটা কারণ।
অনেকে বলেন, ভালো বই কোথায় যে বই পড়ব? আমি বলব এটা একটা ঠুনকো অজুহাত মাত্র। বই না পড়লে বুঝা যাবে কি করে যে ভালো বই প্রকাশিত হচ্ছে কি হচ্ছে না। তবে হ্যাঁ, অসংখ্য বই এর মধ্য থেকে বেছে নিতে হবে ভালো বইটা। সেজন্যে দরকার উপযুক্ত মানসিকতা আর বই এর জগতের সাথে নিবিড় যোগাযোগ। বছরে একবার একটু সময় করে বই এর দোকানে যাবেন আর এসে বলবেন পড়ার মতো ভালো বই নেই তা কি গ্রহণযোগ্য? পূর্বের প্রসঙ্গে একটু ফিরে যাই। বই কিনে পড়ার কথা বলছিলাম। বই এর পেছনে টাকা খরচ করাকে অনেকে অপচয় মনে করেন। এদের পয়সা আছে কিন্তু বই পড়ার মানসিকতা নেই। অথচ এমন পাঠক আছে যাদের বই কেনার সামর্থ নেই, কিন্তু তৃষ্ণা আছে বই পড়ার। এ প্রসঙ্গে একটা বাস্তব উদাহরণের কথা বলি। আমার বাসায় কাজ করতে এসেছিল একটা কাঠমিস্ত্রি। আমার পড়ার ঘরে বই দেখে তার আকর্ষণ বেড়ে যায় সেই ঘরের প্রতি। জীবিকার টানে কাজের ব্যস্ততা, তবু দেখি ফাঁকে ফাঁকে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে বই এর আলমারির সামনে। কাজ শেষ করে যাওয়ার দিন সে আমার কাছে বই চাইলে আমি তাকে আমার লেখা দুটো বই দিলাম। বই হাতে নিয়ে সে আমতা আমতা করে বলল, আপনার আলমারিতে বাচ্চাদের বই দেখেছি। আমার মেয়েটার জন্য একটা বই দিবেন? আমি খুশীমনে আমার লেখা ‘এক রাতের রাজকুমার’ বইটি ওর হাতে দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, মেয়ে পড়তে পারে? সে বলল, ভালো করে এখনও পড়তে পারেনা। স্কুলে দেইনি এখনও। তবে আমি পড়াশুনা করাতে চাচ্ছি।
ওর কথা শুনে আমি অবাক হলাম একজন দিনমজুরের অন্তরের মাহাত্ম দেখে। অনেক পয়সাওয়ালা শিক্ষিতজনের মনেও এই ঔদার্যটুকু খোঁজে পাওয়া যাবেনা।
বই নিয়ে যেহেতু এই লেখার অবতারণা সেহেতু আর একটা কথা না বললেই নয়। ধার করে বই পড়ার একটা পাঠকশ্রেণী কিন্তু আমাদের সমাজে আছে। যে কারণেই হোক, বই কেনার সাথে তাদের দূরত্ব থাকলেও বই পড়ার সাথে রয়েছে তাদের নিবিড় সম্পর্ক। কিন্তু এদের মধ্যে যারা বই ধার নিয়ে সেই বই আর মালিককে ফেরত দেবার তাগিদ অনুভব করেনা তাদেরকে কি বলব? তারাও বই এর পাঠক। বই এর জন্য টাকা খরচ করতে অনিচ্ছুক পাঠকদের সাথে এদের প্রকৃতিগত সাদৃশ্য তো আছেই বরং হীনমন্যতার লক্ষণ যেন একটু বেশী এদের মধ্যে। এরপরেও এরা পাঠক। সৈয়দ মুজতবা আলীর বইপড়া গল্পের সেই পাঠকের মতো। এদের ঘরে বই হবে, কিন্তু বই রাখার মতো কোন বুকসেলফ আদৌ কোনদিন হবে কিনা সন্দেহ আছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





