এক নিঃসন্তান দম্পত্তি। একটি সন্তানের জন্য বিধাতার কাছে অনেক কান্নাকাটি করেও ব্যর্থ হয়। শেষে বিধাতার ইচ্ছাকে মেনে নিয়ে হাল ছেড়ে দেয় তারা। বিধাতার কাছে হাজির হয় অন্য রকম আর্জি নিয়ে।
তাদের আর্জি, যেহেতু বৃদ্ধ বয়সে দুনিয়াতে তাদেরকে দেখাশুনা করার কেউ নেই সেহেতু মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যেন তাদেরকে সুস্থ রাখা হয়, যেন অন্যের গলগ্রহ হয়ে তাদেরকে এক মুহূর্তও বেঁচে থাকতে না হয়।
দিনের পর দিন তাদের বিশেষ করে স্ত্রীর কাকুতি-মিনতিতে বিধাতার মন গলে এক সময়। তিনি সিদ্ধান্ত নেন এই দম্পত্তির মনের চাওয়া তিনি পূরণ করবেন। তবে এর আনুষংগিক প্রতিক্রিয়া বা ফলাফলগুলো কি হতে পারে এই নিয়ে তিনি চিন্তা করতে থাকেন। ভেবে ভেবে তিনি এই সিদ্ধান্তে আসেন যে ঐ দম্পত্তির সব ইচ্ছে তিনি পূরণ করবেন। যেহেতু কোন সন্তান তাদের দেয়া হয়নি সেহেতু তারা ভবিষ্যতে আরও যা যা চাইবে সব পূরণ করার নির্দেশ দেন তিনি তার দূতকে। এর ফলে যদি ওদের দুঃখ কিছুটা ঘুচে।
বিধাতা তার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দূত পাঠান ঐ দম্পত্তির কাছে। দূত এসে খবরটা জানাতেই খুশীতে লাফিয়ে উঠে স্বামী-স্ত্রী। তারা বার বার বিধাতাকে ধন্যবাদ জানায়। এভাবে নিশ্চিন্তে কিছুদিন কেটে যায় ঐ দম্পত্তির। নিজেদেন অনিশ্চিত ভাবিষ্যতে নিয়ে নিশ্চিত হয়ে মনের সুখ কিছুটা ফিরে পায় ওরা। হঠাৎ একদিন নতুন এক চিন্তার উদয় হয় স্ত্রীর মনে। স্বামীকে ডেকে বলে
যেহেতু ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা কেটে গেছে সেহেতু আর একটা আর্জি বিধাতার কাছে পেশ করলে কেমন হয়?
কি আর্জি? জিজ্ঞেস করে স্বামী।
আমরা বিধাতার কাছে দীর্ঘ একটা জীবন চাইতে পারি। সুখে-শান্তিতে অনেক দিন বেঁচে থাকব আমরা।
স্ত্রীর কথা শুনে স্বামী ভাবে প্রস্তাবটা মন্দ নয়। রাজী হয়ে যায় সে।
দুজনে মিলে আবারও বিধাতার দরবারে কান্নাকাটি শুরু করে-তাদেরকে দীর্ঘ জীবন দিতে হবে। যেহেতু তাদের কোন সন্তান নেই সেহেতু পৃথিবীর অনেক সুখ-ভোগ থেকে তারা বঞ্চিত।
এবারও বিধাতা তাদের আর্জি কবুল করেন।
এর কিছুদিন পর চাকুরী থেকে অবসরে যাবার সময় হয়ে আসে স্বামীর। চিন্তিত হয়ে পড়ে স্ত্রী। কি করে চলবে দু’জনার সংসার? ছেলে-পুলেও তো নেই যে দু’জনের ভরণ-পোষণ করবে। তার উপর তারা দীর্ঘ জীবন চেয়ে নিয়েছে বিধাতার কাছ থেকে। প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা দিয়ে কি সারা জীবন চলা যাবে?
আবারও বিধাতার কাছে আর্জি পেশ করে ওরা।
এবার বিধাতার কাছে ওদের চাওয়া ওদের খাওয়া-পরার ব্যবস্থা যেন বিধাতা নিজ হাতে তুলে নেন। তাদের আশা এর আগে বিধাতা তাদের সব আর্জি শুনেছেন, এবারও শুনবেন।
কিন্তু দিন যায়, মাস যায়। বিধাতার কাছ থেকে কোন সাড়া তারা পায়না। এদিকে ততদিনে স্বামীটি চাকুরী থেকে অবসর গ্রহণ করেছে। প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা যা পেয়েছে তাই দিয়ে চলছে সংসার। কিন্তু ভবিষ্যত চিন্তায় শংকিত হয়ে পড়ে স্বামী-স্ত্রী দু’জনই। বসে খেলে রাজার ভান্ডারও একদিন শেষ হয়ে যায়, তাদের তো এই কয়টা মাত্র টাকা। এরপর কি হবে?
বিধাতার কাছে কান্নায় একেবারে ভেঙে পড়ে স্বামী-স্ত্রী দুজন।
বিধাতা, তুমি যদি ব্যবস্থাই না করবে তাহলে আমাদের দীর্ঘ জীবনের আর্জি পূরণ করলে কেন? এখন আমরা কি করব?
ঠিক সেই সময়ে এক প্রতিবেশী ভদ্রলোক আসে তাদের বাড়িতে। তাদের খোঁজ-খবর নেয়। আলাপের এক পর্যায়ে ভদ্রলোক তাদেরকে একটি প্রস্তাব দেয়
বসে বসে খরচ করলে তো একদিন আপনাদের সব টাকা শেষ হয়ে যাবে। এরপর আপনাদের চলবে কি করে? এরচেয়ে টাকাটা আমার ব্যবসায়ে খাটান। আমি মাসে মাসে আপনাদেরকে রিটার্ণ দিব, এতে আপনাদের দিব্যি চলে যাবে। আর মূল টাকাটা তো থাকলই।
শুনে আঁৎকে উঠে স্বামী-স্ত্রী দুজনই। যদি বেহাত হয়ে যায় টাকাটা! তাহলে কি হবে? পথে নামা ছাড়া কোন কিছু করার থাকবে না।
প্রতিবেশীর প্রস্তাব নিয়ে অনেক ভেবেও দুজনে কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারেনা। অথচ কিছু একটা করা দরকার। আবারও বিধাতার কাছে ধর্ণা দেয় ওরা দুজন।
বিধাতা, আমাদের দায়িত্ব তুমি নিয়েছ। তুমি উপায় করে দাও আমাদের বেঁচে থাকার।
তাদের কান্নাকাটিতে আবারও মনযোগী হন বিধাতা তাদের প্রতি। দূত এসে জানায়
তোমরা এখন পর্যন্ত বিধাতার কাছে যা চাইছ সবই তো বিধাতা প্রথমেই কবুল করে নিয়েছেন। তোমরা বুঝতে পারনি। তাই মিছেই বিধাতাকে দোষারূপ করছ। তোমরা বিধাতার কাছে চাইতে জান। কিন্তু বিধাতা যখন তা দিয়ে দেন তখন নিতে জাননা।
দূতের কথায় স্বামী-স্ত্রী দু’জনই চিন্তায় পড়ে যায়। দূতের কথার অর্থ হলো বিধাতা তাদের সব চাওয়া পূরণ করে দিয়েছেন। তবে-----
প্রথম থেকে বিধাতার কাছে নিজেদের চাওয়াগুলো নিয়ে চিন্তা করে দুজনে। কিন্তু বেশীদূর এগোতে হয়না। শুরুতেই পেয়ে যায় সমাধান।
বিধাতার কাছে তাদের প্রথম প্রার্থনাই ছিল মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যেন তাদেরকে কারও গলগ্রহ না হতে হয়। আর বিধাতা তা কবুলও করেছেন। তার মানে তাদের ভরণ-পোষণ ও দেখ-ভালের সমস্ত দায়িত্ব বিধাতা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। আর ঐ যে প্রতিবেশী এসেছিল তার ব্যবসায়ে টাকা খাটানোর কথা বলতে সেও বিধাতার ইচ্ছায়।
নির্বোধ মানুষ আমরা কিছুই বুঝতে পারিনি। অবিশ্বাস করে প্রতিবেশীকে ফিরিয়ে দিয়েছি। ভুল করেছি আমরা।
বলতে বলতে সেই প্রতিবেশীর খোঁজে বেরিয়ে পড়ে স্বামীটি। সব শুনে প্রতিবেশী ভদ্রলোক জানায় যে তার পক্ষে আর ওদের টাকা নেয়া সম্ভব নয়। কারণ, তাদের বিশ্বাসের ভিত খুবই দুর্বল। কোন কিছু পেতে গেলে সবার আগে বিশ্বাসের ভিতকে শক্ত করতে হয়। তানাহলে পাওয়া তো দূরের কথা, যা আছে তাও হাতের ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে যাবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


