গোয়া ভ্রমণের উপর আমার এই লেখাটি মাসিক দশদিক' ডিসেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের স্বর্গভূমি হিসেবে পরিচিত গোয়ায় অনুষ্ঠিতব্য ইন্দো-বাংলাদেশ জয়েন্ট বিজনেস কাউন্সিল এ যোগ দেবার সুযোগ আমার জন্য ছিল আমার কাংখিত অনেকগুলো পাওয়ার একটি। গোয়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা বহুবার বহুমুখে বহুভাবে শুনেছি। ভ্রমণপিপাসু ও প্রকৃতি প্রেমিক আমার মনে সেই থেকে একটি ইচ্ছে বাসা বেঁধে ছিল। ভাবতাম একবার যদি গোয়ায় যাওয়া যেত। কিন্তু ব্যক্তিগত উদ্যোগে শুধুমাত্র সখের বশে এমন একটা ইচ্ছার বাস্তবায়ন নিতান্তই অসম্ভব-এমনটা মনে হবার সাথে সাথে তা দমে গেছে অজান্তেই। কিন্তু অফিসিয়াল ট্যুরে গোয়া যাওয়ার সুযোগটা আসার সাথে সাথে সেই অবদমিত ইচ্ছেটা শতমুখী প্রবণতায় বার বার আমাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল। ১৭ মার্চ,২০১১ এ মিটিং--গোয়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের একটি অন্যতম কেন্দ্র মেরিয়ট রিসোর্টে। ১৬ তারিখে জেট এয়ার লাইন্সের ফ্লাইটে মুম্বাই হয়ে পরদিন গোয়ায়-টিকেট বুকিং এভাবেই দেয়া হয়েছে। কিন্তু তখনও ভিসা পাইনি। অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে অবশেষে ১৫ তারিখ বিকেলে পাসপোর্ট হাতে পেলাম। গোছগাছ করে পরের দিন বিমানে চেপে বসলাম। সাড়ে চারটায় মুম্বাই নেমে রাত ১২টা পর্যন্ত মুম্বাই শহর ঘুরে দেখলাম। আমার সফরসঙ্গী ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের এক জিএম সাহেব। বাকীরা সবাই আগের দিন চলে গিয়েছে।
পরের দিন অর্থাৎ ১৭-০৩-২০১১ তারিখ ভোর ৫.৫০ মিনিটে গোয়ার ফ্লাইট। ৭টায় গোয়ায় নেমে ১০ টার মিটিং এ যোগ দিতে পারার কথা অনায়াসে। যেহেতু খুব ভোরে ফ্লাইট সেহেতু রাত ১২টা থেকে আমরা এয়ারপোর্টেই বসে রইলাম এবং ভোরে যথাসময়ে যাত্রা শুরু করলাম। কিন্তু বিপত্তি একটা দেখা দিল। গোয়ার আবহাওয়া অনুকূল না থাকায় বিমান নামতে পারল না। ফিরে এলো মুম্বাই এ। সাড়ে আটটায় আবার যাত্রা শুরু করলাম আমরা। নয়টার পর নামলাম গোয়ায়। আমাদের জন্য গাড়ি অপেক্ষা করছিল সকাল থেকেই। কিন্তু প্রায় পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার দূরে পানাজি সিটিতে পৌঁছুতে বেজে গেল সাড়ে দশটা। ততক্ষণে মিটিং শুরু হয়ে গিয়েছে। জিএম স্যার সরাসরি মিটিং এ চলে গেলেও আমি একটু ফ্রেস হয়ে নেয়ার প্রয়োজনে প্রথমে গেলাম ষ্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার ষ্টাফ ট্রেনিং সেন্টারে। এখানেই আমাদের থাকার ব্যবস্থা করেছে ষ্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া। এটা গোয়ার রাজধানী পানাজি সিটির করম্বা বাস স্ট্যান্ডের সাথে অবস্থিত। এখান থেকে মেরিয়ট রিসোর্টে যেতে লাগে ১৫ মিনিট।
বিমানের বিলম্বের কারণে আমাদের দেরী হচ্ছিল মিটিং এ যোগ দিতে। এয়ারপোর্ট থেকে পানাজি আসার পথে সেজন্য মনের ভিতর কোন উৎকন্ঠা কাজ করছিল না আমার। আমি মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে দেখছিলাম চারপাশের প্রকৃতিকে। ছবির মতো সাজানো ঘন সবুজের আবাহন আমাকে তন্ময় করে রেখেছিল পুরোটা সময়। আরব সাগরের নীল জলরাশির কোল ছুঁয়ে গড়ে উঠা সবুজ বন-বীথিকা আমাকে সেই মুহূর্তে বাস্তবের কাঠিন্যতা থেকে অনেক অনেক দূরে সরিয়ে রেখেছিল। আমি মনে মনে বললাম, এটাই তো আমি চেয়েছিলাম। স্বপ্ন ও ছবি যেখানে বাস্তবকে ছুঁয়ে যায় এমন একটা স্থান হচ্ছে এই গোয়া। গোয়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে মিশে আছে পর্তুগীজ শাসন আমলে গড়ে উঠা দৃষ্টি নন্দন বাড়িঘর ও অফিস ভবনসমূহ। প্রতিটি ভবনের নির্মাণশৈলিতে ভিন্ন মাত্রার আঙ্গিকতা-যা সহজেই দৃষ্টি কাড়ে পর্যটকদের। এসব দেখতে দেখতে আমি এসে পৌঁছে গেলাম ষ্টাফ ট্রেনিং সেন্টারে। জিএম সাহেব নামলেন না, চলে গেলেন মিটিং এ। আমি আমার জন্য নির্ধারিত ৭০৭ নম্বর কক্ষে পৌঁছে দ্রুত ফ্রেস হয়ে নিলাম। আধ ঘন্টার কম সময়ের মধ্যে নীচে নেমে এসে দেখি গাড়ি দাঁড়ানো। উঠে বসলাম মেরিয়ট রিসোর্ট এর উদ্দেশ্যে। যাওয়ার পথে মুগ্ধ দৃষ্টিতে চারপাশটা দেখছিলাম। সর্বত্র সবুজের ঘন আবাহন। ঘন ছায়া-বিথীকা আর পত্র-পল্লবে ঢেকে আছে চারপাশ। প্রকৃতি যেন এখানে একের পর এক বুনে গেছে সবুজের আলপনা। রাস্তার একপাশে সাগর আর অন্যপাশে সবুজ বনভূমি। মাঝে মাঝে দৃষ্টিনন্দন বাংলো প্যাটার্নের বাড়িঘর। ট্যুরিষ্টপ্রধান এলাকা বলে গোয়ার সর্বত্র রেষ্ট হাউজ বা রিসোর্ট কিংবা হোটেল চোখে পড়ে। দেখলে মনে হয় দু’হাতে সবুজের ঠাস বুনন সরিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে এক একটি বাংলো। যদিও মিটিংএ পৌঁছার তাড়া তবু আমি উৎসুক দৃষ্টিতে বার বার চারপাশটা দেখছিলাম। সামনে আরব সাগরের গভীর জলরাশি, দুই পাশে সবুজের উদ্বাহু আবেষ্টনী-এসবের মাঝে অপরূপ সৌন্দর্যখচিত এই রিসোর্ট। অতিথি-অভ্যাগতমাত্রই মুগ্ধ না হয়ে থাকতে পারবে না। আমাকে বার বার টানছিল সমুদ্রের কোল ঘেষে বিস্তৃত এর সামনের লবি। সুইমিং পুলের চারপাশে সারি সারি চেয়ার সাজানো। মনে মনে ভাবছিলাম একবার যদি বসা যেত এখানটায়। বসে নিজের সামনে নিজকে মেলে ধরা যেত যদি একটিবার। আরও কত কি মনে হচ্ছিল আমার। সুইমিং পুলের নীল স্বচ্ছ জলধারায় একবার নিজের প্রতিবিম্ব দেখার ইচ্ছেও মনে জাগছিল আমার। কিন্তু সবকিছুকে গলাটিপে ধরে আমাকে গিয়ে ঢুকতে হলো সভাকক্ষে।
একটায় শেষ হলো মিটিং। ফটোসেশন আর দুপুরের লাঞ্চ সামনের লবিতে। আমি লবিতে গিয়ে অবাক হয়ে গেলাম। ঘন নারকেল বিথীকার পা ছুঁয়ে সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে একের পর এক। শব্দহীন শান্ত সমুদ্রের ঢেউ এর ষ্পর্শমাখা বাতাস এসে ছুঁয়ে যাচ্ছিল সবাইকে। বাইরে কড়া রোদের তেজ থাকলেও বাতাসটা ছিল স্নিগ্ধ। আমার ২৪ জন অতিথি-অভ্যাগতদের কার কি মনে হয়েছিল জানিনা। কিন্তু খাওয়ার চেয়েও চারপাশের রূপের উপাসনায় বেশী মেতে ছিলাম আমি। খাওয়াশেষে ৩টায় আমরা বেরিয়ে এলাম। আমার কেবলই মনে হচ্ছিল জীবনের একটি বিকেল যদি কাটানো যেত এই রিসোর্টে তাহলে অন্তত জীবনকে উপভোগের একটা বড় দিক হাতের মুঠোয় এসে যেত।
ফেরার পথে আবারও সেই সুন্দরের হাতছানি, আমার মনের পরতে পরতে মুগ্ধতার কোলাহল, আবারও ভালো লাগার বিস্ময়ানুভূতি। কিন্তু রুমে ঢুকেই মনে হলো ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছে শরীর। গত এক রাতের জেগে থাকা এবং লম্বা একটা ভ্রমণের ক্লান্তি তাহলে এতক্ষণ কে ভুলিয়ে রেখেছিল ? গোয়ার রূপ বৈচিত্র এর মূল কারণ। কিন্তু এখন যেন আর শরীর চলছে না। গোসল সারার পর শরীরটা ঝরঝরে লাগলেও নিস্তেজ হয়ে আসছিল ক্রমশ। তাই বিছানায় এলিয়ে দেয়ার সাথে সাথে দু’চোখ ঘুমে জড়িয়ে এলো। ঘুম ভাঙলো বিকেল পাঁচটায়। আসরের নামাজ সেরে চা খাওয়ার জন্য নীচে নামলাম। দোতলার কেন্টিন থেকে চা খেয়ে রিসেপশনে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম যে আমার সাথের সবাই ইতোমধ্যে বেরিয়ে গেছে। অগত্যা আমি একাই কাছের কোন বীচে যাওয়ার মনস্থির করলাম। রিসেপশন থেকে তথ্য নিয়ে বের হলাম সবচেয়ে কাছে মিরামার বীচে যাওয়ার জন্য। কিন্তু ফোনে গাড়ি ডেকে বীচে যেতে যেতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। বীচের লোকজন তখন ফেরার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। আমি কিছুক্ষণ ঘুরে উঠে বসলাম যে গাড়িতে এসেছিলাম সেই গাড়িতে।
উল্লেখ্য যে ভারতের অন্যান্য জায়গার মতো গোয়ায় হলুদ-কালো ট্যাক্সি ক্যাব পাওয়া যায় না, রিকশাও চলেনা রাস্তায়। এখানে গাড়ির মালিকরা বেতনভিত্তিক চালকের মাধ্যমে তাদের গাড়ি ভাড়ায় খাটায়। ফোন করলে গাড়ি পাঠিয়ে দেয়। আরও একটি ভিন্নতা দেখলাম। গোয়ার রাস্তায় প্রচুর মোটর সাইকেল দাঁড়িয়ে থাকে। এগুলোকেও ভাড়ায় খাটানো হয়। যে কেউ ইচ্ছে করলে ভাড়া নিয়ে নিজে চালিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারে। ১৫০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া দেয়া হয় এক একটি মোটর সাইকেল। যে ভাড়া নিবে সে নিজে তেলের খরচ বহন করবে এবং সারাদিন যতখুশী যেখানে খুশী ঘুরে বেড়াতে পারবে। এক্ষেত্রে ড্রাইভিং লাইসেন্সের কোন প্রয়োজন হয়না। গাড়িগুলো চলছে অত্যন্ত সুশৃংখলভাবে, কোথাও কোন যানজট নেই। তিনদিন গোয়ায় অবস্থানের সময় কোন ট্রাফিক পুলিশও আমাদেও চোখে পড়েনি। যেন গোয়া রূপকথার কোন রাজ্য-যেটা মানুষের তৈরী বিধি-বিধানের অনেক উর্ধ্বে। আসলে কিন্তু তা নয়। ছবির মতো সাজানো এই শহরের মানুষের মনও সাজানো-গুছানো। এরা সহজে আইন ভাঙে না। তাহলে পর্যটকদের দৃষ্টি সরে যেতে পারে অন্যত্র। আর এমনটা হলে গোয়ার অর্থনৈতিক আয়ের মূল উৎসটাই নষ্ট হয়ে যাবে। পর্যটন শিল্প হচ্ছে গোয়ার অর্থনৈতিক আয়ের মূল উৎস। গোয়াবাসীরা কোন কিছুর বিনিময়ে এটাকে ক্ষতিগ্রস্ত হতে দিতে রাজী নয়। তাই ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়ের এই বাসিন্দারা যতটুকু পারে নিজেদেরকে গুছিয়ে পরিশীলিতভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে।
এর পেছনে অবশ্য রয়েছে গোয়াবাসীদের ঐতিহ্যগত কৃষ্টি ও সভ্যতা। ভারতের সবচেয়ে ক্ষুদ্র রাজ্য গোয়া ১৯৬১ সাল পর্যন্ত পর্তুগীজদের কলোনী ছিল। এর আয়তন মাত্র ৩,৭০২ বর্গ কিলোমিটার। ১৯৮৭ সালের ৩০ মে পর্তুগীজ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে ভারতের পঁচিশতম স্বাধীন রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। মাত্র দুটি জেলা (উত্তর ও দক্ষিণ গোয়া) নিয়ে গঠিত গোয়ার প্রধান শহরগুলো হচ্ছে পানাজি(রাজধানী), মারগাও, ভাসকো, মাপোসা ও পন্ডা। ৮২% শিক্ষিতের গোয়ার প্রধান ভাষা কনকানি ও মারাঠি হলেও জনগণ সাবলীলভাবে ইংরেজীতে কথা বলতে অভ্যস্ত। গোয়ার সীমান্ত এলাকার উত্তরদিকে রয়েছে মহারাষ্ট্র, পূর্ব ও দক্ষিণ দিকে রয়েছে কর্ণাটক এবং পশ্চিম দিকে রয়েছে আরব সাগর। গোয়ার সর্বত্র চোখে পড়ে কারুকাজখচিত মন্দির ও শ্বেত পাথরে তৈরী পর্তুগীজ আমলের চার্চ। এসব কিছুতে খোঁজে পাওয়া যায় ইন্দো-পর্তুগীজ সংস্কৃতির নিদর্শন। শুধু তাই নয়। গোয়ার কিছু সংখ্যক লোক এখনও পর্তুগীজ ভাষায় কথা বলে। গোয়ার নাগরিকরা অত্যন্ত শান্ত ও খোলামেলা। এরা পর্যটকদের অত্যন্ত ভালবাসে এবং তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করে। প্রচলিত আছে যে, গোয়ার কোন মানুষের সাথে পর্যটকদের সখ্যতা স্থাপনের অন্যতম উপায় হচ্ছে হাসিমুখে তাদের কুশল জিজ্ঞেস করা। আরও জানা যায় যে, গোয়াবাসীদের সবচেয়ে পছন্দের দিন হচ্ছে সোমবার। কারণ, এটা সপ্তাহের প্রথম দিন। এইদিন বেশী সংখ্যক পর্যটকদের আগমন ঘটে গোয়ায়। গোয়ার কিছু কিছু হোটেল রেষ্টুরেন্টের খাবার আইটেমে এখনও পর্তুগীজ স্বাদ খোঁজে পাওয়া যায়। তাই মার্কিন জনগণের কাছে গোয়া হচ্ছে অন্যতম পছন্দের পর্যটন নগরী। তাছাড়া গোয়ার দুই জেলায় রয়েছে বেশ কিছু বালুকাময় বীচ-যেগুলোতে পর্যটকরা অত্যন্ত খোলামেলাভাবে অবস্থান করতে পারে। উত্তর গোয়ায় রয়েছে ৭টি বীচ, এগুলো হচ্ছে: কেন্ডোলিম বীচ, সিনকোরিয়াম বীচ, বাগা বীচ, বেম্বোলিম বীচ, আরাম্বল বীচ, ভাগাটর বীচ ও কালিংগট বীচ। দক্ষিণ গোয়ার বীচগুলো হচ্ছে: বেনাউলিম বীচ, পাললিম বীচ, আগোন্ডা বীচ, মভরস ও কেভেলজিম বীচ এবং মিরামার বীচ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


