আজ খুব ভোর বেলা ঘুম ভাঙলো যখন,বুকের মধ্যে কেমন ধরনের অস্বস্তি।বেড সাইড টেবিলের উপর রাখা গ্লাসে পানি এক ঢোকেই শেষ...।দুঃস্বপ্ন দেখছিলাম কি?নাকি কেউ আমার কানে ফিস্ফিস্ করে কথা বলছিলো অবিরত।কিছুইতো মনে নেই,বালিশটা উল্টিয়ে আবার ও ঘুমানোর চেষ্টা।নাহ্ এলোনা ঘুম।কিছুতেই এলোনা আর।
ঘড়ির দিকে তাকালাম।সময় চারটা চুয়াল্লিশ।কেমন অদ্ভুত লাগলো।মাঝে মাঝে এমন হয়।সারারাতই যখনই ঘুম ভাঙে,ঘড়ির দিকে তাকালে কখনো তিনটা তেত্রিশ,কখনো একটা এগারো দেখি....।
এই ধরনের মিলে যাওয়াকে কি বলে?
মনে আছে বয়স যখন পনের ষোল ছিলো,একধরনের মিলে যাওয়া খেলা খেলতে ভালো লাগতো।আমরা তখন রেলওয়ে কলোনীত থাকতাম ,পার্বতীপুরে...।হয়তো দুরে রেললাইনের উপরে ওভারব্রীজে মানুষের আসা যাওয়া দেখছি।বিকালে রাজশাহী মেইলটা যখন ছাড়ার সময় হতো,গার্ডের হুইসিল দেয়া শেষ। মনে মনে ভাবতাম ,এখুনি যদি একটা লোক ব্রীজ থেকে দৌড়ে নামে আর চলন্ত ট্রেনে উঠতে পারে তাহলে আমার কালকের দিনটা খুব ভালো যাবে।
আবার কখনো কোন চেনা মানুষ হয়তো হেঁটে যাচ্ছে।রাস্তার শেষ সীমনায় যেয়ে হঠাৎ ফিরে তাকাল,একদম আমার চাওয়ার মত করে।খুব ভালো লাগতো এমন মিলে যাওয়া খেলা খেলতে।জানিনা কোন সে কারনে ঠিক যা ভাবতাম তাই হতো।হৃদয়ের সেই সরলতার সমার্থক কিছুতেই পাইনা আর।
ঘুম না এলে আমার মধ্যে এক ধরনের অস্হিরতা পেয়ে বসে।অতীতের দিনগুলোতে ফিরে তো যাওয়া যায়না।ঘুরের ফিরে ভাবনায় সেই সব দিন এসে পড়ে।,ভাবনায় কত মুখ মনে পড়ে যায়,হয়তো সব মানুষের মধ্যেই এই ধরনের ফিরে যাওয়া আছে।
মুখ হাত ঢুয়ে নিঃশব্দে এসে বসলাম আমার নিজস্ব জায়গাটুকুতে।পড়ার টেবিলের চেয়ারে।সারা জীবনে সবখানে যখন কোন কষ্ট,অস্হিরতা আমাকে ছুঁয়েছে।এই একটা জায়গা যেখানে বসলে মনের ভিতরটা স্হির হয়ে আসে।ছোটবেলায় মা শিখিয়েছিলেন এমন অভ্যাস গড়ে তুলতে।ছোটবেলার খেলার সাথী বা অন্য কেউ যদি খারাপ ব্যবহার করতো কিংবা মন কষাকষি,খুব অস্হির হয়ে ঘুরতাম।মা বুঝতেন।বলতেন,যখন খুব মন খারাপ হবে,এমন একটা জায়গায় বসবে যেখানে বসলে তোমার ভালো লাগে।দেখবে সব কষ্ট খারাপ লাগা আস্তে আস্তে দুর হয়ে যাবে।এরপর থেকেই এই অভ্যাসটা।
ভোরবেলার পৃথিবীর একটা চমৎকার সৌন্দর্য আছে।কেন যে বেলা করে পড়ে পরে ঘুমাই.আকাশের দিকে তাকিয়ে এই কথাটা মনে এলো।
কাল থেকে প্রতিদিন ভোর বেলা উঠবো সেই ছেলেবেলার মত।
সাতটায় এলার্ম বাজলো ও ঘরে।এখুনি মলয় উঠে পড়বে,এক কাপ চা বানিয়ে ওকে দিলে খুব চমকে যাবে।খুশীও হবে, আবার বলবে উঠলে কেনো?অনেক কথা বলতে ইচ্ছে করছিলো ওর সাথে, কিন্তু ঘড়িতে সময় যেনো হুড় মুড় করে এগুচ্ছিলো।টুকটাক কথা সারতে সারতেই ওর কাজে যাবার সময় হলো।যাবার সময় মলয় গলাটা জড়িয়ে ধরে বললো ,বুঝতে পারছি অনেক কথা বলতে চাইছিলে।ইচ্ছে করছে কাজ ফাঁকি দেই,কিন্তু তা কি ঠিক হবে?
আমি বললাম ,আমি বুঝি কাজ এ যেতে বারণ করেছি?ও বললো দেখো টুনী তোমাকে আমি খুব ভালো করে চিনি।এক কাজ করো কোথাও যেয়ে ঘুরে আসো।দেখো ভালো লাগবে।মিলির কাছে যাওনা কেনো?ও তো আজকাল কাজ করছেনা।গল্প করে আসো।কিংবা বাসে ,মেট্রোতে চেপে যেখানে খুশী যাও।
তবে সাবধানে যেও।
ও যাবার পর খুব একা হয়ে পড়লাম।ঘরটা গোছালাম।ছোট্ট একটা এ্যাপার্টমেন্ট আমাদের।একটা মাঝারী সাইজের বেডরুম,ছোট্ট একটা বসার ঘর।কিচেনটা একটা লম্বা প্যাসেজের শেষ মাথায়,ডাইনিং টেবিলটাও সেখানে।কিচেনের একপাশ্বে একটা দরজা আছে ।ওদিক দিয়ে পিছনের বেলকনিতে যাওয়া যায়।টানা লম্বা বেলকনি।পাশের ফ্লাট আর আমাদের জন্য।মলয়ের খুব ফুল গাছের শখ।ফুল ঠিক নয়,গাছের শখ।নানা রকম পাতা বাহার।ও বলে ফুল তো ঝরে যায়,পাতাই ভালো।
বেলকনি ঘুরে এলাম।আসার সময় কিচেনের ছোট্ট ক্যাসেট প্লেয়ারটা অন করলাম।একটু জোরেই।মলয় বলে গাছেরা নাকি গান শোনে।আমি অবশ্য দুষ্টুমী করি।বলি,কানাডিয়ান গাছ ,বাংলা গান বুঝবে?ও বলে সংগীত বলে কথা।মান্নাদের গান বেজে উঠলো।"কি দেখলে তুমি আমাতে,এত সহজে কথা জানানো।"
হঠাৎ মনে পড়লো মান্নাদে আসছে মন্ট্রিয়লে।একক সন্ধ্যা হবে।
একটা কথা মলয় প্রায়ই বলে,দেখো টুনী, আমি জানি বিদেশের জীবন কখনোই দেশের মত নয়,এখানে নানা রকম সীমাবদ্ধতা আছে।সমস্যা আছে কিন্তু ভালো দিক ও তো আছে।ভাবো তো দেশে যখন কোন নামী দামী শিল্পীদের অনিষ্ঠান হতো,সবার প্রোগ্রাম দেখা আমাদের জন্য কত কঠিন ছিলো।কিন্তু এখানে সবার পক্ষেই তা সম্ভব।আমি সম্মতিসূচক মাথা নাড়ি।সত্যিই তো সেবার ঢাকাতে যখন ফারুখ শেখ আর আর শাবানা আজমী এলো" তুমহারি অমৃতা" করতে..কি যে ইচ্ছে করছিলো দেখতে যাই।দু'জনে তখনো পড়ালেখায়।মলয় অবশ্য চাইছিলো আমি একা যাই।আমি রাজী হইনি।
মন্ট্রিয়লে চৌদ্দ মাসে জীবনে কত কিছু দেখলাম।মলয় কাজে ব্যাস্ত থাকায় একা ও ঘুরেছি প্রচুর।ফ্রেন্চ ক্লাসের বান্ধবী লিমা,মাঝে ওর সাথেও ঘুরেছি অনেক।ও পেরুর মেয়ে।লিমা কিছুদিন হলো ফুল টাইম কাজ এ ঢুকেছে তাই দেখা হচ্ছে কম।
মা চিঠিতে জানতে চেয়েছে আমরা নায়েগ্রা বেড়াতে গেছি কিনা।মলয় বলেছে এবার ছুটিতে যাবে।ওরা অটোয়া আর কুইবেক সিটিতে বেড়াতে গেছিলো গত সামারে।কুইবেক সিটি।চমৎকার।স্বপ্নময় এক শহর।এবার নায়েগ্রা যাওয়া না হলে আগামী বছর আর যাওয়া হবে বলে মনে হয়না।
এখানে জীবন এমনই।ব্যাস্ততা।
ছুটির দিন গুলোতে ব্যাস্ততার সীমা নেই।কেনাকাটা।সবখানেই যদিও আমরা দুই জন একসাথেই যাই।
মলয় অনেক গল্প করতে পারে।ছুটির দিন গুলোতে ওদের সকাল হয়ে দেরীতে।দুজনে মিলে স্মৃতিচারণ।বিয়ের আগের জীবনের কত মজার মজার স্মৃতি।মনে আছে বরাবর আমি বেশি কথা বলতাম।আমি অনেক জোকস্ জানতাম।মলয়কে যখন বলতাম ওর হাসি যতনা পেতো জোকস্ শুনে তার চেয়ে বেশী হাসতো আমার হাসি শুনে।ও বলতো তোমার হাসি অসম্ভব ছোঁয়াচে।বিকালে মাঝে মাঝে মলয়ের দুই/তিনজন বন্ধুরা আসে।
শনিবার টা এভাবেই কাটে।গল্প আড্ডায়।
চলবে...।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জুন, ২০০৮ দুপুর ১২:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


