somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার প্রিয় এক মানুষের কথা যে চোখের ডাক্তার কিন্তু নিজেকে কবি ভাবতে ভালোবাসে

১১ ই নভেম্বর, ২০০৮ সকাল ১০:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মানুষ হই

দেয়ালে হাত দিয়ে
প্রাচীরের বাঁধা অনুভব করে
অতিক্রম করার শক্তি
অর্জন করতে চাই।
প্রিয় মানব ও মানবী
আমাদের একটি পৃথিবী
একটাই রক্তের ধর্ম লাল
কারা কি করে তুলে দিলো
এতোটা দেয়াল,পৃথিবীময়?
কি করে
মানবের তরে প্রাক্বতিক এইসব
পাহাড় পর্বত নদ নদী
দ্বীপ চর আর
অভিন্ন পৃথিবী
হয়ে গেলো এক একটি মুক্ত স্বদেশ!
এতোগুলো দেয়াল,পাসপোর্ট ,ভিসা
ভৌগলিক সীমারেখা ভুলে,
জাতি ,ধর্ম,বর্ণ নির্বিশেষে
কি করে আমাদের এক হওয়া
যাবে?
হিমালয়ের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে উঠে
কে দু'হাত তুলে জানাবে
সমস্ত দেয়াল ভেঙ্গে,
এসো আমরা সবাই
মানুষ হই।

কবিতাটা যার লেখা ।যার কাছে আমার লেখালেখির হাতে খড়ি যার কাছে তার কথা প্রায়ই লিখবো ভাবি।
চিঠি বিষয়ক কিছু কথায় তার কথা লিখেছি।


আমার ভাইজান। যার তারুণ্যে সে চাঁদের হাট করতো। লালমনিরহাটে একটা পাঠাগার করেছিলো। আমাদের বাসার সমস্ত বই নিয়ে সেখানে দিয়েছিল।আমাদের কোন চোখের পানি আটকাতে পারেনি তাকে।(আমাদের প্রিয় সব বইগুলো এক সময় অন্যদের শো কেসে শোভা পেতো) ভাইজান তখন ঢাকা মেডিকেলে পড়তে গেছে। আমি তখন সবে স্কুলে যাচ্ছি মনে হয়....ভাইজানরা একটা দেয়ালিকা বের করলো....বৃষ্টি ঝরা মেঘ। আমার জীবনের প্রথম ছড়া লিখলাম। বহুবছর আমাদের বাসায় খাটের নীচে একটা ট্রাংকে সেটার অনেক গুলো কপি ছিলো।
আমি যখন স্কুলের বড় ক্লাসে যাই,মাঝে মাঝে খুলে দেখতাম......ছড়ার নাম মনে নেই ।চারটা লাইন মনে আছে....

"যেতে পথে দেখি আমি থুড় থুড়ে এক বুড়ো।
সব শুনে বুঝলাম তার নাই কোন যে কুড়ো।
সর্বনাশা বানের জল নিয়েছে সব কাড়ি
যত ছিল নাতি পুতি যত টাকা কড়ি।"

লেখাটা আমি কি লিখেছিলাম এভাবে ছন্দে ? নাকি মেজো বোন সুন্দর শব্দে,ছন্দে সাজিয়ে দিয়েছিলো ? কে জানে!
সেই তো শুরু.....

আর ভাইজান ,যার অনুপ্রেরণায় বই পড়া, ডাইরী লেখার মত দারুণ অভ্যাসগুলো....যে ঈদের ছুটিতে বাড়ীতে আসলে ব্যাগ ভরে বই আনতো.....নিজের টাকা বাঁচিয়ে। সেই আনন্দ আজ এত কাল পরে বসে ও পাচ্ছি।
স্মৃতি গুলো এতটাই কাছাকাছি মনে হচ্ছে......চাইলেই হাত বাড়িয়ে ছুঁতে পাচ্ছি সেইসব দিন।
নিজের জন্য ভাইজান আনতো ঈদসংখ্যা বিচিত্রা । নিজের বইগুলো রেখে ছুটির ক'দিন লুকিয়ে ভাইজানের বইগুলো পড়তাম। একদিন ভাইজানের বন্ধু দিলীপ দা এসে বলেন," কি রে তুই নাকি উপন্যাস পড়িস?"
পালিয়ে গেছিলাম ধরা পড়ে। ভাইজান কি করে বুঝলো আমি বিচিত্রার উপন্যাস গুলো গিলছি তখন।
ঈদের আনন্দে বন্ধুরা যখন ছুটে বেড়াচ্ছা আর আমি খাটের কোনায়,বারান্দার কোনায় বসে বুঝে না বুঝে শেষ করছি শওকত ওসমান,সেলিনা হোসেন, সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ, সৈয়দ শামসুল হক সহ আরো কত বরেণ্য লেখকদের লেখা।

মা খুব অনুযোগ করতেন ভাইজান বাড়ী আসলে ....।পড়ার বই এর মধ্যে লুকিয়ে গল্প বই পড়তাম এক সময়। ভাইজান শুনে বলতো ,"বই তো পড়ছে। আর ছাপানো হলে যে কোন বই হোক না কেনো ভালো কিছু তো শিখাবেই। আর ও বুঝে নেবে কোনটা ভালো কোনটা খারাপ।"
মনটা এত বড় হয়ে যেতো।

এই হলো আমার ভাইজান।
যার কাছে সারাজীবন উপহার বলতে পেয়েছি শুধু বই....।গত বছর ভাইজান যখন আমার এখানে বেড়িয়ে গেলো। ভাবীর পাঠানো শাড়ী কাপড়ের পাশে দেখি একটা প্যাকেট। ভাইজান আমাকে দিলো ।শাড়ি কাপড়ের আনন্দে যখন মশগুল আমি। এ একটা অদ্ভুত উপহার আমার জন্য। সাতকাহনের দুই খন্ড। দেশে গিয়ে প্রতিবারই কিছু করে বই এনেছি। এই বইটা কেনো যেনো আনা হয় নি।আনন্দে কাঁদলাম অনেকক্ষন নিজের ঘরে যেয়ে।
এই পৃথিবী সমান সুখ আমি কি করে বোঝাই । কাউকে ?

মন চাইছিলো ভাইজানকে জড়িয়ে ধরে বলি কি করে তুমি জানলা ঠিক এই বইটার জন্য আমার মন কেমন করতো? এই দীপাবলী চরিত্রটা পড়ে আমার তারুণ্যে কত উদ্দীপিত হয়েছি। নিজের নাম নিজে দিয়েছি দীপাবলি। বইটা পড়ে জলপাইগুড়ির সেই মেয়েটি আর লালমনিরহাটের রেলওয়ের সাহেব পাড়ায় বড় হওয়া আমি কেমন এক হয়ে যেতাম।

সেই ভাইজান নিজের পেশাগত কারনে অনেকদিন লেখালেখি থেকে দুরে ছিলেন( লেখালেখি থেকে দুরে কি করে বলি ! ছাপাছাপি থেকে আসলে। লিখে গেছেন) । নিজে চোখের ডাক্তার হওয়ায় অনেক ব্যস্ততা । অন্ধদের নিয়ে একটা প্রশিক্ষন স্কুলের দ্বায়িত্বে আছে ও।

গাছ খুব ভালোবাসে ও.....ঢাকা মেডিকেলে পড়ার সময় ভাইজানের নাম দেয়া হয়েছিলো মালি। নিজের খরচের টাকা বাঁচিয়ে,এর কাছে ওর কাছে টাকা নিয়ে ভাইজান গাছ লাগাতো।
ফজলে রাব্বি ছাত্রাবাস থেকে শুরু করে বকশী বাজারের অনেক গাছই আমার ভাইটার লাগানো।অনেক কৃষ্ণচূড়া রাঙায় পথঘাট।

ভাইজান পেশগত জীবনের সমান্তরালে এই যে প্রক্বতি প্রেম। এই যে লেখালেখি। মানুষের প্রতি প্রবল দ্বায়িত্ববোধ..........।কেমন আটকে গেছে ও। এর মাঝে দুইটা বই ছাপানো হয়েছে ।
কবিতা সমগ্র ১
কবিতা সমগ্র ২

যারা ওকে চিনেছে।
তারা তো চিনেছেই । খেপা মানুষ। যা ভালো লাগছে তাই করছে।
ভাইজানের জীবনের মনে হয় কোন না নেই......অনুতাপ নেই।
অকাতরে মানুষের জন্য করে গেছে। যাচ্ছে।আব্বা নেই অনেক বছর। আব্বার অসমাপ্ত কাজ গুলো ও করে যাচ্ছে। আব্বার আত্মা আশাকরি শান্তি পাচ্ছেন তার সফল উত্তরাধিকার এর কারনে।

যারা ওকে বুঝতে পারে তাদের কাছে ও অসাধারন একটা মানুষ।
আর দু'জন মানুষ হলো আমার মা এবং আমার ভাবী....যারা ছায়ার মত ভাইজানের এই সব সৃষ্টিশীলতায় পাশাপাশি আছে। আরো আছে আমার দুই বোন।কাছে দুরে থেকেও যারা ভাইজানের সব কাজে জড়িয়ে আছে।
ভাইজানের জন্য শুভ বোধ রাখছে।

ভাইজানের কথা লিখতে বসে আজ কত কথা মনে আসছে........সারাজীবন কিছুই তো করি নি ওর জন্য। গতবার ও যখন আমার এখানে আসলো মনে হচ্ছিল সব,সব ভালোলাগা জায়গাগুলোয় ওকে নিয়ে যাই। সব ভালো ভালো রান্না করে খাওয়াই। ১০ দিন ছিলো ....প্রতিদিন ঘুরেছি। এত ভালো লাগতো। আমার বিদেশ জীবনের শ্রেষ্ঠ ক'টাদিন গেছে । খুব প্রিয় একটা মানুষ নিয়ে নায়েগ্রা ফলসের পাশে দাঁড়িয়ে আছি। যার দেয়া বই পড়ে পড়ে পৃথিবীর কত দেশ মহাদেশ ঘুরেছি। যেই নায়েগ্রা ফলসের সামনে গেলে আগে চোখ ভেসে যেতো জলে। মনে হতো প্রিয় সব মানুষদের নিয়ে সব সুন্দর দেখি।

সেই প্রিয় ভাইজান আমাদের পাশে। ঘুরছে কথা বলছে। ঘাসের উপর শুয়ে রাইয়ান ওয়াসীদের সাথে খেলছে। আছে। কে জানে ওর ভাবনায় তখন কি ঘুরে বেড়াচ্ছে।
আমার ছোটছেলে রাইয়ান সারাক্ষন ট্রেন নিয়ে ঘুরতো।
এখান থেকে চলে যাবার পর ভাইজান লিখেছিলো ,চলে এসেছি অনেকদিন।অথচ রাইয়ানের সেই ট্রেনের শব্দ কানে শুনি।

রাশীক চুপচাপ স্বভাবের হলেও রাইয়ান খুব অস্হির বলে আমি চিন্তা করছি দেখে ভাইজান বললো দেখিস ও খুব ভালো ছেলে হবে।
সেই কথা মনে ধরে আছি।ওর সব দুষ্টামী ছাপিয়ে ভাইজানের কথাটাই বিশ্বাস করি। অবাক হয়ে দেখি রাইয়ান ও বদলে যাচ্ছে। গুনগুন করে গান গেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে সারা বাড়ী।
ভাইজান এর ছোটবেলায় কেমন ছিলো দেখি নি......রাইয়ান এর ছবি দেখে ভাইজান বলেছিলো ও নাকি ভাইজানের মত .......খুশীতে উত্তাল হয়েছি।
ভাইজানের পেশগত ব্যস্ততা এত বেশী ।এর পাশে ভলান্টিয়ার কাজ তো আছেই।
শুনেছি....ওদের সোনালী পার্কে শুরু হয়েছে লালমনিরহাটের ডায়েবেটিক হাসপাতাল। যেটা একটা বৃদ্ধাশ্রমের স্বপ্ন দিয়ে শুরু হয়েছিলো....

আমার কবি ভাইটার জন্য অভিনন্দন।

যে দু'টো হাত দিয়ে অপারেশন করে ও শত শত মানুষের দৃষ্টি ফিরে পেতে সাহায্য করে। যার হাতে লেখা হয় মানবতার কবিতা। ভালোবাসার কবিতা। তার জন্য একটা কবিতা পাঠিয়েছি কাল জন্মদিনে......কিন্তু মনে হলো আর ও তো পারি।

বলতে তো পারি ভাইজান তুমি আমার সারাজীবনের অহংকার হয়ে থেকো।
সব খানে। তোমার কথা বলতে গেলে এমন করেই যেনো খুশীতে ভাসি।
আমাদের জীবন শুরু হয়েছিলো যেই শ্রেষ্ঠ মায়ের জঠরে.......তার জন্য আমাদের ভালোবাসা তো রইলোই।শ্রদ্ধা সেই বাবাকে যে আমাদের মানুষ হতে শিখিয়েছিলো।

ভাইজানের জন্মদিন ছিলো কাল।(৯ নভেম্বর)।
ওর জন্য অনেক অনেক ভালোবাসা।
আল্লাহ যেনো ওকে দীর্ঘজীবি করেন।

যারা আমার এই এত্ত বড় লেখাটা পড়লেন কষ্ট করে তাদের জন্য অগ্রিম ভালোবাসা।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই নভেম্বর, ২০০৮ দুপুর ১:১৬
৪৪টি মন্তব্য ৪২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×