সেদিন ৩১ শে ডিসেম্বর /২০০৯ এর রাতে সবাই যখন ২০১০ এর আগমনে আনন্দ করছিলো.......
মনটা কেমন যেনো করে উঠলো।
মনে হলো এই যে দুই সংখ্যা দিয়ে বছর শুরু হলো..........আগামী ৯০ বছরে আমরা কেউই হয়তো পৃথিবীতে থাকবোনা,
কথাটা ২/৩বার বলেও ফেললাম।
কেউ শুনলো না ....কেউ যে শুনলো না বলি কি করে?
আমার ১৫ বছরের রাশীক বললো মাম্মা এভাবে বলো না........
হয়তো অনেকেই থাকবে।
দেখছোনা কত লেখালেখি হচ্ছে এইসব নিয়ে?
মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে।
Life expectancy rate 80.4 এখন কানাডাতে।
মনে মনে বললাম তাই যেনো হয়। তোমরা দীর্ঘজীবি হয়ো বাবা। সবাই ভালো থাকুক।সুস্থ থাকুক।
তবু ও মনের মধ্যে কেমন যেনো একটা গুন গুনানী। কেমন যেনো!
মাঝে মাঝে এমন হয়।
আর এমন হলেই অস্থির থাকি।
অসময়ে একটা ফোন আসলেই ভয় লাগতে থাকে।
এক তারিখ চলে গেলো । দুই তারিখ চলে গেলো।
ব্লগে বসি ঠিকই। কবিতা পোষ্ট করতে ইচ্ছা করেনা। তিন তারিখ সকালে দেরীতে ঘুম ভাঙে। শুনি কেউ একজন গাইছে,"শুয়াচান পাখি।আমার শুয়াচান পাখি।আমি ডাকিতেছি তুমি ঘুমাইছো নাকি।" সকালবেলা চোখ খুলে এমন মন খারাপ করা গান........ক্ষুদে গানরাজ এর সিডি চলছে।
গাইছে নিলয় নামের ছোট্ট ছেলেটা..........কাঁদছে।
আমি ও কাঁদলাম।
অসংখ্যবার শুনলাম ।
এত গভীর করে অনুভব করে গাইতে পারে মানুষ?
এত ছোট্ট একটা মানুষ।
সারাটাদিন যত কাজই করি গুন গুন করে এই সুর।
চোখ ভেসে যায়। আপার কথা খুব মনে হয়। রুমি ভাই এর কথা খুব মনে হয়। ২৩ বছরের ছেলেটাকে অকালে হারিয়ে ওরা কেমন করে থাকছে ভেবে কেমন যে লাগে। বেঁচে থাকাটাকে বোঝা ভেবে ওরা কেমন করে থাকছে ভেবে মনটা খুব খারাপ লাগে।
সন্ধ্যাবেলা ব্লগে বসেই এসবই লিখতে শুরু করি।
কবিতা নয়।
গল্প নয় ।আমার একটা মন খারাপ দিন।
"আজ সারাটা দিন কেমন উদাস করা।
জানালা দিয়ে চোখ মেলে তাকালেই বরফ সাদা চারিদিক। মনটা কেমন যে করছিলো...."
এই তিনটা লাইন লিখেছিলাম।
যা এখুনি ড্রাফটে খুঁজে পেলাম। ৪ তারিখে নামহীন শিরোণামে সেইভ হয়েছিলো।
একটা ফোন এলো।
ও ধরলো।
"হ্যালো ভাইজান"। ও বললো।
ঘড়ির দিকে তাকালাম। এত সকালে দেশের ফোন?
কে চলে গেলো ?
ওর দিকে তাকিয়ে আছি।
কার কথা বলবে?
এমন ফোন অনেকবার পেয়েছি দেশ থেকে.... ও বললো, রুমিভাই চলে গেছে। একটু আগেই হার্ট এ্যাটাকে।
আমার বড় বোনের ৩৮ বছরের সংগীটা। তাওহীদকে হারিয়ে ওরা খুব একা হয়ে পড়েছিলো। ওদের দুজনের সাথে কথা বললে যে দীর্ঘনিঃশ্বাস।
আপার সাথে একদিন কথা হয়নি....ফোন করলেই শুধু আর্তনাদ।
তবু ফোন করেছি। আমার ৭৬ বছর বয়সী মা মেয়ের শোক দেখে শক্ত হয়ে গেছেন। সব সামলাচ্ছেন।
গতকাল প্রথম বোন কথা বললো। কাঁদলো। হাসলো।
বারবার শুধু বললো ,"আমার ৩৮ বছরের বন্ধুটা চলে গেলো"।
মাত্র ৫৯ বছরে বয়সে হারিয়ে গেলো আমাদের পরিবারের আর ও একটা মানুষ। ২১ বছর বয়সে যে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলো। খুব মনে পড়ছিলো রুমিভাইকে। এই একটা মানুষ যে আমাদের পরিবারের একজন কবে হয়েছিলো আমার মনে ছিলোনা। ছোটবেলায় ঈদ মানেই নতুন জামা।পুতির মালা। সব বড়বোন আর রুমিভাই মিলে কিনতো।
ফাইভে বৃত্তি পাবার পর প্রথম হাতঘড়ি কিনে দিয়েছিলো এই রুমিভাই।
মৃত্যু নিয়ে আমার কোন ভয় নেই।
এ অবধারিত। বেঁচে থাকাটাই ম্যাজিক। আর তাই বেঁচে থাকাটাকে খুব দারুণ মনে হয় আমার...
তবে মাঝে মাঝে এই অভিবাসী জীবনটাকে বোঝা মনে হয়।
কত কাছের মানুষ সব হারিয়ে দিনে দিনে কি পাথর হয়ে যাচ্ছি।
নাকি বরফের মত হীমশীতল?
কষ্টের অনুভবগুলোকে চোখের পানিতে ভাসাতে ভাসাতে সেদিন আমার আপা রুমিভাই এর একমাত্র মেয়ে বানীর বাসায় যখন যাচ্ছিলাম ...বৈরী আব হাওয়ায় ৩০ মিনিটের পথ যেতে প্রায় ঘন্টা খানিক লেগেছিলো....
ভীষন রাগ হচ্ছিল আমার।
আমরা সবাই কেনো কাছে থাকিনা?
কাছে থেকেও কেনো এত দুরের হয়ে যাই সবাই?
সুখে দুখে পাশাপাশি থাকাটা বড় বেশী প্রয়োজন...
উডরফের দীর্ঘ পথ পারি দিতে দিতে শুধু মনে হয় ....কত ছোট্ট এই জীবন!
অথচ কি বিশাল তার আয়োজন!
(আমার প্রিয় ব্লগারদের কাছে ক্ষমা চাইছি। একটা খুব ব্যক্তিগত দুঃখ খুব বড় করে লিখবার জন্য। কদিন ব্লগে বসিনি। মনটা আসলে থিতু নেই। একেতো পরবাসী জীবনের একাকীত্বতা।তার উপর এমন সব বিয়োগ ব্যথা! ভীষন কষ্ট আসলে। সবাই ভালো থেকো। থাকবেন।আর দোয়া চাইছি আমার বোনের জন্য আর ওর মেয়েটার জন্য। খুব অল্প সময়ের বিরতিতে কাছের দুইটা মানুষকে হারিয়ে ওদের অনেক কষ্ট)
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই জানুয়ারি, ২০১০ ভোর ৫:৪৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


