শীত এসে পড়েছে, ভাবতেই ভাল লাগছে শীতের ভোরে কম্বল গায়ে দিয়ে ঘুম দেবার কথা মনে হতেই আরাম লাগছে। শীতের দিনে কম্বল ছাড়া আবার ঘুম হয় নাকি? এখন শহর কিংবা গ্রামে কম-বেশি সবাই কম্বল ব্যবহার করেন। কিন্তু এই কম্বল কারা তৈরী করেন? কি দিয়ে তৈরী করেন? কোথায় তৈরী করেন? তার কোনো কিছুই কি আমরা জানি? আমরা কি এও জানি পুরো একটি গ্রামের লোক এই কম্বল তৈরীর পেশায় নিয়োজিত বলে গ্রামটির নামই হয়ে গেছে কম্বলের গ্রাম? আজ আমরা জানব কম্বলের গ্রাম কেশুরবাড়ির কথা।
শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে যায় কম্বল গ্রামের তাঁতিদের ব্যস্ততা। কম্বল বানানোর ঝুট-কাপড় বাছাই ও তা থেকে সুতা তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকে মহিলা ও শিশুরা। গ্রামের ৬০০ তাঁতের সবকটিই খুটখাট শব্দে মুখর থাকে। ঠাকুরগাঁও থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড় সড়ক থেকে আরও ভেতরে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে কিসামত কেশুরবাড়ি গ্রাম। এখানকার সব মানুষই অভাবী। শুধু শীত এলেই তাদের আয়ের একটি পথ হয়, আর তা হচ্ছে কম্বল বানিয়ে খুব স্বল্প লাভে বিক্রি করা। এ জন্যই এ গ্রামের নাম হয়েছে কম্বল গ্রাম।
প্রায় ৩৭ বছর আগে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে সুরেন দেবনাথ, ননীগোপাল দেবনাথ ও প্রজন্ম দেবনাথ প্রথম এই গ্রামে তাঁতের কাজ শুরু করেন। যা পরবর্তীতে পুরো গ্রামকে দখল করেছে। গ্রামটিতে প্রায় ৫০০ তাঁতি বসবাস করেন। তারা প্রত্যেকে এক থেকে তিনটি তাঁতের মালিক। তাদের পরিবারের অন্য সদস্যের নিয়ে প্রায় দু'হাজার মানুষ তাঁতশিল্পে নিয়মিত কাজ করছেন। এর মধ্যে শিশু ও মহিলার সংখ্যাই বেশি। এরা বল সুতা ও পুরনো সোয়েটারের সুতা দিয়ে কম্বল, গায়ের চাদর, বিছানার চাদর, গামছা, তোয়ালে, জায়নামাজ, ব্যাগ, মাফলার তৈরি করেন। এই তাঁতশিল্পের কারিগররা কমবেশি সবাই ভূমিহীন।
একসময় হ্যান্ডলুম বোর্ডের দৃষ্টি পড়ে এই তাঁতিদের ওপর। সে সময় সরকারি সহায়তায় তাঁতিদের সঙ্গে বোর্ডের কর্মকর্তাদের বৈঠক হয়। একাধিক বৈঠকের পর সিদ্ধান্ত হয়, তাঁতিদের মধ্যে স্বল্প সুদে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হবে। তাঁতিদের ন্যায্যমূল্যে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশ সরবরাহ করা হবে। তাঁতিদের তৈরি করা কাপড় বোর্ড ক্রয় করবে, যা অন্যত্র বিক্রি করা যাবে না। সব তাঁতি সরকারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান। বোর্ড কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে ক্ষুদ্র শিল্পের জন্য এক থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া শুরু করে। বেশ কয়েকজন তাঁতি ঋণ গ্রহণও করেন। কিন্তু এ কর্মসূচি বেশিদূর এগোয়নি। পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। সুতা সরবরাহ বা তাঁতিদের কাছ থেকে কাপড় আর কেনা হয়নি। দীর্ঘদিন পর ওই ঋণ তাঁতিদের ঘাড়ে এখন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সামর্থ্য অনুযায়ী কয়েকজন তাঁতি ঋণ শোধ করলেও অধিকাংশই এখনো ঋণ শোধ করতে পারেননি। অনেক আবেদন-নিবেদনের পর আবারও এ ঋণ চালু করা হয় বছর চারেক আগে। কিন্তু সবার ভাগ্যে জোটেনি নানা শর্তের কারণে। পেয়েছেন মাত্র সিকিভাগের মতো, ১৬৩ তাঁতি। পুঁজি না থাকার কারণে শিল্পটি এখন হুমকির মুখে পড়েছে। জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁত বেড়ে চললেও তাঁতিদের আয় বাড়ছে না।
শীতকাল ছাড়া অন্য সময় এখানকার কাপড় বিক্রি হয় না। অন্য ধরনের কাপড় তৈরি করতে এখানকার তাঁতিরা অভ্যস্তও নন। তাছাড়া সে ধরনের তাঁতও তাদের নেই। তাদের তৈরি করা কাপড়ের মধ্যে সর্বাধিক পরিচিত কম্বল, যা গ্রাম ও শহরের দরিদ্র এবং নিম্ন আয়ের কাছে দারুণ সমাদৃত। এসব কম্বল ৮৫ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হয়। এতে তাদের লাভ থাকে সর্বোচ্চ ২৫ টাকা। যেসব কম্বল শীতকালে ১৫০ টাকায় বিক্রি হয় সেটি গরমের সময় তাঁতিরা মাত্র ৭৫ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হন।
তাঁতিদের আর্থিক সচ্ছলতা না থাকায় গরমকালে তৈরি করা কাপড় মজুদ করতে পারেন না। বাধ্য হয়ে সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি করতে হয় নামমাত্র মূল্যে। কাপড় বিক্রি করতে না পারলে পরিবারের কারও মুখে খাবার জোটে না। কারণ তাঁতিদের তৈরি কাপড়ের নির্দিষ্ট বাজার বা ক্রেতা নেই। প্রতিটি পরিবারের পুরুষ সদস্যরা কাপড় নিয়ে এ হাট থেকে ওই হাটে গিয়ে কাপড় বিক্রির চেষ্টা করেন। জেলার লাহড়ী, গড়েয়া, ভুলিল্গ, যাদুরানী, নেকমরদ, রামনাথ হাট, পঞ্চগড়ের ফকিরগঞ্জ, চাকলা হাট, পাঁচপীর হাট, দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জ, কাহারোল, রংপুরের শঠিবাড়িসহ আরও অনেক হাটে তারা সরাসরি ভোক্তার কাছে কাপড় বিক্রির জন্য ছুটে বেড়ান। শহর ও গ্রামের কোনো কাপড়ের দোকান তাদের তৈরি এ কাপড়গুলো ক্রয় করে না।
তাঁতি মহাদেব দেবনাথ বলেন, আমাদের তাঁত চলে বল সুতা ও পুরনো সোয়েটারের সুতা দিয়ে। এ সুতা এই জেলা বা আশপাশের জেলায় পাওয়া যায় না। সুতা আনতে হয় বগুড়া শান্তাহারের শাওয়ালহাট থেকে। আমরা ৮-১০ জনের একটি গ্রুপ একসঙ্গে গিয়ে সুতা কিনে গাড়ি ভাড়া করে নিয়ে আসি। যারা সুতা আনতে যায় তাদের টাকা সংকুলান না হলে অন্যরা ধার হিসেবে দেয়।
এই গ্রামে শিক্ষার আলো তেমনভাবে ছড়ায়নি। শিশুরা স্কুলে যাওয়ার বয়সে পা দেওয়ার আগেই তাদের তাঁতের কাজ শেখানো হয়। ফলে পড়ালেখার মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ হয় না। আর দু'একটি পরিবারে মাঝারি শিক্ষিত লোক পাওয়া গেলেও গ্রামটিতে কোনো সরকারি চাকুরে নেই। মহিলাদের প্রায় শতভাগই অশিক্ষিত। মেয়েরা এখনও স্কুলমুখো হয়ে ওঠেনি। গ্রামের মাঝখানে কিসমত কেশুরবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় অবস্থিত হলেও সেখানে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা খুবই কম।প্রায় নেই বরলেই চলে। তাঁতি পরিবারের হাতেগোনা কয়েকজন ছেলেমেয়ে এ বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে। আর তাঁতিদের বিনোদন? এটা বলতে কিছুই নেই।
আলোচিত ব্লগ
চলতি পথের গল্পঃ দুই

‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।
এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক
‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন
Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ
![]()
প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন
বাকি রইলো; কাঁচা কলা

স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।