২৫ মার্চ, ১৯৭১
সন্ধ্যা থেকেই আমরা বিভিন্ন বাসা থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করতে থাকি। আমরা ছাদের ওপর উঠে ঘটনা বোঝার চেষ্টা করছি। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারিনি। তবে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে যখন হামলা হচ্ছিল তখন বুঝতে পেরেছিলাম যে রাজারবাগে আক্রমণ হয়েছে। এ রাত সত্যিই ভয়ংকর, বীভৎস এক রাত। বলে বোঝানো যাবে না অবস্থাটা কী ছিল।
যুদ্ধে যাওয়ার সময় :
যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলাম। প্রথমে মাকে জানালাম, মা শর্ত দিলেন, ‘তোর বাবা যদি যেতে দেয় তবে যা।’ বাবা তখন সেত্রেক্রটারিয়েট সার্ভিস করত হোমস অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসে। ভয়ে ভয়ে বাবাকে বললাম, বাবা গম্ভীর মুখে বললেন, ‘যুদ্ধে যাবি ভালো কথা, তবে দেশ স্বাধীন না করে ঘরে ফিরবি না।’ আব্বার সেই কথা আজও কানে বাজে।
একটি অপারেশন :
সালদা নদীর তীর। ওপারে পাকবাহিনীর পাকা ব্যাঙ্কার। এপারে আমাদের কাঁচা ব্যাঙ্কার। কলাগাছ, বালুবস্তা দিয়ে তৈরি। সেই সময়ের ইপিআর, কিছু গ্রামের লোক ও আমরা ছাত্রদের সমন্বিত বাহিনী ছিল মুক্তিফৌজ। একদিন দুপুরে আমাদের লিডার গামছা চোখে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ার আগে বললেন, লক্ষ্য রেখ ব্রিজের নিচ দিয়ে যেন কোনো নৌকা না আসে। এলে সঙ্গে সঙ্গেই আমাকে ডাকবে। হঠাৎ দেখি নৌকা! ওস্তাদকে ডাকলাম। তিনি ঘুমের ঘোরে বললেন, ‘হু, বিরক্ত করবেন না, দেখতে থাকেন।’ ওস্তাদ মানুষ কিছু বলাও যায় না। এবার দেখি অনেকগুলো নৌকা। আবার ডাকলাম। তিনি বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘আরে ভাই দেখতে থাকেন, অসুবিধা নেই।’ দেখতে দেখতেই ১২-১৩টি নৌকা কাছাকাছি চলে আসে। এবার জোরে ডাকলাম, ‘ওস্তাদ, ওঠেন নৌকা চলে যাচ্ছে।’ তিনি লাফ দিয়ে ওঠেন এবং গামছাটা কোমরে বেঁধে বললেন, আমি ফায়ার না করা পর্যন্ত আপনারা গুলি ছুড়বেন না। কাজ হলো কথামতোই। আমার একটা ধারণা ছিল, পাকিস্তানি আর্মিরা বুঝি সাঁতার জানে না। ঠিক নয়। এ ধারণা ভুল। কিছু আর্মি জানের ভয়ে সাঁতরে নদীর ওপারে চলে গেল। এ অপারেশনে ১৩টি নৌকা রসদসহ ডুবে যায় এবং ৮১ জন সৈনিক মারা যায়। আমাদের বলা হলো, সাবধানে থাকবেন। ওরা আবার আক্রমণ করতে পারে। আক্রমণ হলে কোনো সাড়া দেবেন না। ভোরের দিকে শুরু হলো পাকবাহিনীর বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ। আমরা জমির আইল, মাটির বাড়ি খালের ধার দিয়ে লুকিয়ে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে চলে যাই। ওরা আমাদের ব্যাঙ্কার ভেঙে, টেলিফোন লাইন কেটে তছনছ করে সবকিছু জ্বালিয়ে দেয়।
উৎসঃসমকাল ২০ শে মার্চ ২০০৮
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা জুন, ২০২০ বিকাল ৪:৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



