"যাই পেরিয়ে এই যে সবুজ বন
যাই পেরিয়ে ব্যস্ত নদী অস্রু আয়োজন
যাই পেরিয়ে সকাল-দুপুর-রাত
যাই পেরিয়ে নিজের ছায়া, বাড়িয়ে দেয়া হাত"
- বাড়ি ফেরা
০১
ড্রয়ার খুললেই দেখতাম। দেখলেই মনে পরতো। আর মনে পরলেই কষ্ট হতো। আচ্ছা, কেন আমি জিনিসটাকে এখান থেকে সরিয়ে ফেলি না- ভাবতাম। সরিয়ে ফেললেই তো আর দেখবো না। যেহেতু দেখবো না, তাই আর মনেও পরবে না। আর যেহেতু মনে পরবে না, তাই কষ্টও পাবো না। এই সব ভেবে-টেবেও আবার ভাবতাম, আসলেই কি? জিনিসটাকে সরিয়ে ফেললেই কি ব্ল্যাক র্বোডের লেখার মত সব যন্ত্রনা-দু:থ-কষ্ট মুছে ফেলা যাবে? কি জানি। কিন্তু জিনিসটাকে ড্রয়ার থেকে সরিয়ে ফেলতে ইচ্ছা করতো না। আচ্ছা থাকুক, নিজেই নিজেকে সান্তনা দিতাম। সরাবোনে। আছেই তো। কোথাও তো যচ্ছেনা। সরিয়ে ফেললেই হবে। এ আর এমন কি!
০২
"দোস্তো। ক্যামেরার ফ্লিমটা তোর কাছে না?" ও আমাকে প্রশ্ন করলো। "দিছ তো। ছবিগুলি প্রিন্ট করামু।"
সেদিন শেষ বিকেলে আমরা তিন জন দাড়িয়ে ছিলাম বুড়িগঙ্গার তীরের এমন এক স্থানে যেখানে নদীগুলোর বুক থেকে তোলা বালু নানা যায়গা থেকে এনে স্তুপ করা হয়, আবার এইখান থেকে তা নানা স্থানে চলেও যায়। এখন শেষ বিকেল হওয়াতে এখানের ব্যস্ততা ছিলনা। কোলাহলের মাঝেও একটু নিভৃতে গল্প করার মতন অবস্থার সুযোগটা নিতেই আমরা আমরা এখানে দাড়িয়ে ছিলাম।
"ফ্লিম?" ভেতরে ভেতরে বুঝতে পেরেও না বোঝা ভান করে ওকেই উল্টো প্রশ্ন করলাম, "কোন ফ্লিম?" জিজ্ঞেস করেই আকাশের দিকে তাকালাম। সন্ধা হয়ে আসছে। পাথিরা এদিক-ওদিক উড়ে যাচ্ছে। সম্ভবত, বাড়ি ফিরছে। আকাশ ছিল বিষণ্ন আর মেঘগুলোকে মনে হচ্ছিল মায়ের বকুনি খাওয়া মন খারাপ যত দুষ্ট ছেলে-মেয়েরদল।
"আরে! ভুইল্লা গেছোছ?" অবাক হয়ে ও আমার দিকে তাকালো। "মনে নাই, আমরা বনভোজনে গেছিলাম। দুইহাজার চাইর না পাচে জানি? আমি, তুই আর মাহাবুব যে গেলাম? ওই যে 'নয়া দিগন্ত' পত্রিকার একটা গ্রুপ আছে না? কি জানি নামটা?" নামটা মনে করার চেষ্টা করতে করতে ব্যার্থ হয়ে ও মাহবুবের দিকে তাকালো।
"প্রিয়জন।" পাশ থেকে মাহাবুব নামটা মনে করিয়ে দিল।
"আরে হ হ। ওই যে গাজিপুরে গেলাম যে। কি জানি নাম আছিলো জায়গাটার? গানচিল না কি গাংচিল? কি জানি মাহাবুব?" দ্রুত বলতে থাকলো কামরুল। আমি খেয়াল করলা, বলার সময় ওর চোখ এক অদ্ভুত আলোয় উজ্জল হয়ে উঠলো। "সন্জিব চৌধুরী আইছিল যে। একসাথে না আড্ডা দিলাম আমরা। আমি তো সন্জিব দার সাথে ছবিও তুলছিলাম। তরপর গান শোনাইলো না।" এই বলে ও চুপ করে গেল, যেন এখনি আবার গান শুনছে, যেন এখনি আবার দেখছে সন্জিব দা গানই গাইছে।
"মনে পরে, কি ভাবে হাসতো? হা হা হা," একটু চেষ্টা করেই থেমে গিয়ে বিব্রত হয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে মাহবুব বললো, "সম্ভব না, ওই রকম হাসা। হাসিটা যেন ক্যামন ছিল; অদ্ভুত!" মন্তব্য করলো ও।
"ও," দূরে, নদীটার অন্য পারে, নির্দিষ্ট কোন কিছুর দিকে না তাকিয়েই আনমনে বললাম আমি, "হাসলে মনে হতো শব্দেরা পাহাড়ে পাহাড়ে প্রতিদ্ধনিত হয়ে ফিরে আসেছে; মনে হতো, হাসির শব্দ গাছের ডাল-পাতা দুলে উঠছে; মনে হতো শান্ত ঢেউয়ের কোন সুখি সমুদ্র হঠাৎ করে একটু উত্তাল হয়ে উঠলো।"
ঠিক এই সময় মাঝনদী থেকে এক ঝলক ঠান্ডা বাতাস এসে আমাদের কাপিয়ে দিয়ে গেল। নদীর ওপারের গাছপালা আর বাড়িঘরের আড়ালে সূর্যটাকে আর মোটেও দেখা যাচ্ছিল না। তবে আকাশ, তার বিষণ্ন-দূর্বল আলোয় নিজেকে এবং মেঘগুলোকে জড়িয়ে রেখেছিল; আর সেই বিষণ্ন আলোয় আমরা হঠাৎ করেই যেন দেখছিলাম, নীড়ের দিকে ফিরে যাওয়া পাখি, কালো হয়ে আসা বুড়িগঙ্গার জল, খেয়া পারা-পারের নৌকা, তীরে নোঙ্গর করে রাখা বালুর্ভতি বলগেট আর পরস্পরকে। নিরবতাই যেন সহসা শব্দবাক্যছন্দে মেতে উঠিছিল আমাদের কে নিয়ে।
"আমি ছবিগুলি প্রিন্ট করামু।" কমরুল বলতে লাগলো, "তারপর আমার আর সন্জিব দার ছবিটা বড় করে বাধাই করাইয়া রাখমু।"
"আমিও।" মাহুবুবও সাড়া দিলো ওর সাথে। তারপর আমাকে প্রশ্ন করলো, "তুই ছবিগুলি প্রিন্ট করলেই তো পারিস। করছিস না কেন?"
"না।" একটা দীর্ঘস্বাস এড়িয়ে উত্তর দিলাম আমি, "আমার প্রিন্ট করার দরকার নাই।"
০৩
সেইদিন সন্ধার অনেক পরে, ঘুরে-ফিরে নিজেকে অযথাই ক্লান্ত করে বাসায় ফিরলাম। কোন কিছুই করতে ইচ্ছে করছিল না। না পড়তে, না লেখতে, না চুপ-চাপ বসে থাকতে। যখন মনের অবস্থা এই রকম হয়- কোন কিছুই ইচ্ছে করনা, তখন সত্যি সত্যিই আমাদের কিছু একটা করতে ইচ্ছে করে; কিন্তু ঠিক কি ইচ্ছে করে, সেই ইচ্ছেটাকে বেশিরভাগ মানুষই ধরতে পারে না। ফলে ওই সময়টা যত সংক্ষিপ্তই হোক না কেন, একটা দীর্ঘ বিরতিহীন দু:স্বময় অথবা দু:স্বপ্নের মতই লাগে; আর আমি যেহেতু এই বিষয়টা খুব ভালো করেই জনতাম তাই ভেতরে ভেতরে আমার আসলে কি করতে ইচ্ছে করছে তা খুজতে গিয়ে খুব চাপা সুরের আওভান শুনতে পেলাম। ফলে শেষ পর্যন্ত গানই শুনলাম; সন্জিব দার গান-
"আমি তো অচিনপুর, তেরো নদী-সমুদ্দুর, দূরে....
ছিলাম অতলে ঘুমো-ঘোরে
ভেবেছি জানবে না লোক, আমাকে ছোবে না শোক
ভেবে নেবো, কেউ কোথাও রুদ্দুরে হাসছিল
আমার ছিল বন্ধ কপাট, অন্ধ বাতাস হাসছিল........"
- কোথাও বাশি
০৪
মানুষ কি অচিনপূরে থাকে? না কি থাকে ঘুমের ঘোরে? না কি তেরো নদী-সমুদ্দুর দূরে? সবাই না হলেও খুজলে দেখবো, বেশির ভাগ মানুষই জাগরনের মাঝে ঘুমায়, ধরে রাখতে পারেনা তবুও হাত বাড়ায়, আর কাছে এসেও শেষ-মেষ চলে যায় দূরে। শুধু অল্পকিছু মানুষই থাকে যারা এর উল্টো; যেমন তিনি- ছিলেন স্বপ্নবাজ, হেরে যেতে পারেন তবুও স্বপ্নই ছিল তার বাজির তাস; অচিনপুরে, তেরো নদী-সমু্দ্দুর দূরে থেকেও ছিলেন কাছে; অতলো ঘুমো-ঘোরে থেকেও ছিলেন প্রচন্ড জাগরণে; চাননি কাউকে জানাতে, তবুও আমারা জেনে গিয়েছিলাম। শোককে ছুতে চাননি অথচো ছিলেন শোক সমুদ্রের নাবিক; আর তার ছিল লিরিকের পাল তোলা এক রহস্যময় সুরের জাহাজ; এবং শুধু কেউ কোথাও রদ্দুরে ভাসছে- এই ভেবে বন্ধ কপাটের ওপাশে থেকে সুখি হতে চেয়ে ছিলেন। সুখি হয়েছিলেন কি? মানুষ কি এই ভাবে সুখি হতে পারে? স্বপ্নবাজরা নিশ্চয়ই পারে। আমি পারি না। আমি স্বপ্নবাজ নই। তবে ইদানিং স্বপ্নবাজ হতে ইচ্ছে করে। কারণ বাজি ধরার জন্য স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই অবসিষ্ট নাই। বাকি সবই ছিনতাই হয়ে গেছে।
ক্যামেরার ফ্লিমটা ওরা নিয়ে গেছে। এখন ড্রয়ার খুললেও আর দেখি না। দেখি না, তবুও মনে পরে, তবে মাঝে মাঝে। মনে পরলেই কষ্ট হয়; কখনো অল্প, কখনো বেশি।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে ডিসেম্বর, ২০০৯ দুপুর ১:২৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



