গতকাল ব্লগার নুরুজ্জামান০৮ ইসলামের সাথে জাতীয়তাবাদের সম্পর্ক নিয়ে একটি পোষ্ট দেন। যদি আমি ভুল না করে থাকি তবে, মূল বিষয়টি তিনি সম্ভবতঃ মাওলানা মওদূদীর "ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ" গ্রন্থ হতেই ধার নিয়েছেন; যদিও লেখায় তা স্বীকার করেন নি। যাই হোক, বিষয়টি এত বেশী বিস্তৃত আলোচনার দাবী রাখে যে, সেটি কখনোই ঐ ছোট্ট পোষ্টে বোঝানো সম্ভব নয়। ফলে ইসলামকে নিয়ে অনেকগুলো অপ্রীতিকর প্রশ্ন উঠে আসে। এর উপর ভিত্তি করেই শামীম ভাই (প্রিয় ব্লগার লেখাজোকা শামীম) বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সহকারে একটি যুক্তিভিত্তিক কাউন্টার পোষ্ট দেন। পোষ্টটি পাবেন এখানে।
আমি আশায় ছিলাম, কেউ হয়তো এসবের সন্তোষজনক উত্তর দেবেন (তথাকথিত ইসলামপ্রিয়দের তো কোনকালেই কোন অভাব ছিলো না এই ব্লগে!)। যাই হোক, কেউ এগিয়ে এলেন না। অতএব, এই অভাজন তায়েফ নিজের ছোট্ট মাথায় যা ধরে তাই নিয়ে দু'টি কথা বলার চেষ্টা করলো।
প্রথমেই বলে রাখি, এটি একটি কাউন্টার পোষ্ট। এর আগে আমি কখনোই কাউন্টার পোষ্ট দিই নি। কেননা, এতে কথার চাইতে অ-কথাই বেশী হয়। কিন্তু, শামীম ভাইকে যথেষ্ট যুক্তিবাদী বলে মনে হওয়ায় সাহস করে পোষ্টটা দিয়ে ফেললাম। স্বীকার করছি, সবগুলো প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর আমার জানা নেই। যতদুর বুঝি, ততদুরই বলার চেষ্টা করেছি।
প্রথমেই জাতীয়তাবাদ প্রসঙ্গ। আমি যেটা বুঝি, আমাদের সমস্যা হচ্ছে, আমরা জাতীয়তাবোধ (Nationality) আর জাতীয়তাবাদ (Nationalism)- এই দুই প্রকার চেতনার মধ্যে পার্থক্য করতে পারছি না। আমি যদি আমার জন্মভূমিকে ভালোবাসি আর Robert Browning এর মত বলি,"Open my heart and you will see/Graved inside it Italy", তবে সেটি জাতীয়তাবোধ। অপরপক্ষে, যদি বিশ্বাস করি, "My country is my country, Right or wrong", তবে সেটা জাতীয়তাবাদ। ইসলাম প্রথমোক্ত চেতনাকে উদ্বুদ্ধ করে আর দ্বিতীয়োক্তটিকে করে নিরুৎসাহিত। পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক কিংবা আরবীয়-ভারতীয়-চৈনিক-হাবশী যে জাতিরই অন্তর্গত হোক, একজন মানুষ যখন ইসলামে প্রবেশ করে তখন সে বিশ্বব্যাপী ইসলামী ভ্রাতৃত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশরূপে গণ্য হয়। কিন্তু তাই বলে ইসলাম তার জাতিগত পরিচয়কে মুছিয়ে দেয় না বরং তাকে সংরক্ষণ করতে বলে। আরো ভালোভাবে বোঝাতে গেলে হিজরতের সময় মক্কার দিকে ফিরে মহানবীর(স) মর্মস্পর্শী কথাগুলো পড়ে দেখতে হয়। নাড়ীছেঁড়া বেদনা বুকে নিয়ে তিনি মক্কা ত্যাগ করেন, মক্কার প্রতি ভালোবাসা তাঁর সারাজীবনই ছিল। কিন্তু, মক্কা বিজয়ের পরেও তিনি সেখানে আর কখনোই থাকেন নি, মদীনাই হয় তাঁর শেষ ঠিকানা। বিদায় হজ্জের ভাষনকে সামনে রাখুন। "কোন আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই অনারবের উপর"। বেলাল(রা), উসামা বিন জায়িদ(রা) কিংবা সালমান ফারসী(রা) আরব ছিলেন না।
এরপরে আসি আসি মাযহাব (Schools of Thought) প্রসঙ্গে। শুধু ৪টি মাযহাবই নয়; আহলে হাদীস, শিয়া সহ আরো কয়েকটি উপদল ও রয়েছে। তবে, মাযহাব মানেই কিন্তু বিভক্তি নয়। মনে রাখতে হবে, মানবসমাজ একটি গতিশীল প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে, ইসলাম নিজেকে সকল সময়ের জন্য মানবজীবনের পথপ্রদর্শক হিসেবে উপস্থাপন করে। এমতাবস্থায়, খুঁটিনাটি বিষয়ে মতপার্থক্য থাকাটাই স্বাভাবিক এবং ইসলাম একে উৎসাহিতও করে। খেয়াল করলে দেখা যায় যে, মূল বিষয়ে কোন মতানৈক্য নেই, মতদ্বৈত্যতা ছোটখাট বিষয়ে এবং এতে একপক্ষ আরেক পক্ষকে ভুল বলে না। যেমন- নামায কত ওয়াক্ত পড়তে হবে, সেখানে কত রাকাআত ফরয তা নিয়ে সকলেই একমত, মতানৈক্য হল, হাত কোথায় বাঁধবো বুকে না পেটে-এই রকমের। আরেকটা ব্যাপার না বললেই নয়। ইসলাম যে বিশাল পরিধি নিয়ে কাজ করে তাতে শতাধিক দল-উপদল তৈরী হয়ে যাবার কথা । কিন্তু, মজার ব্যাপার হলো, সব মিলিয়ে এরকম ১০টাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
এবার, কুরআনের ভাষা আরবী হওয়া নিয়ে দু'টি কথা। পৃথিবীর সব ধর্মগ্রন্থই স্ব স্ব প্রচারকের মাতৃভাষায় রচিত হয়েছে। এতে এর অনুসারীদের পথনির্দেশিকা হৃদয়ঙ্গম করতে ভাষাগত সমস্যায় পড়তে হোত না। সমস্যাটা হলো কুরআনের বিশ্বজনীনতা নিয়ে। একটি আরবী কিতাব কী করে সকল ভাষার মানুষের পথপ্র দর্শক হয়?! যেটুকু বুঝেছি, তা হলো, কুরআন এক মহান বিপ্লবের ঘোষনা নিয়ে এসেছিলো আর সেজন্য প্রয়োজন ছিল একদল একনিষ্ঠ কর্মী। চুড়ান্ততম বর্বর ঐ জাতিকে পথনির্দেশ দিতে গেলে তাদের মাতৃভাষাতেই দিতে হবে। যতদুর জানি, কোন ম্যানুয়েল একাধিক ভাষায় অনূদিত হলে সমস্যা নিরসনে যে কোন একটি ভাষাকে মূল পাঠ হিসেবে রাখা হয় এবং যে কোন রকমের বিরোধে ঐ পাঠটিকেই আদর্শ বলে মানা হয়। (যেমন- বাঙলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ-১৫৩ অনু্যায়ী এ সংবিধান পাঠের ক্ষেত্রে বাঙলাকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে)। কুরআনের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। অন্য সকল ভাষার উপরে আরবীকে (সুনির্দিষ্টভাবে বললে কুরাইশ পঠনরীতি) প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। অন্যথায়, পরিভাষাগত সমস্যা সামলিয়ে একতাবদ্ধ থাকাটা সম্ভব হোত না! এর বাইরে পৃথিবীর প্রায় সকল প্রধান-অপ্রধান ভাষায় কুরআনের অনুবাদ হয়েছে। তাফসীরেরও অভাব নেই। এতে কুরআন বোঝার প্রতিবন্ধকতা অনেকাংশেই দুর হয়েছে। প্রশ্ন হতে পারে, সহজে যদি বোঝা যাবেই তাহলে এত এত তাফসীরের কী দরকার? রবীন্দ্রনাথের "শেষের কবিতা" কে নিয়ে শত শত রিভিউ লেখা হয়েছে; তার মানে এই নয় যে, শেষের কবিতা কেউ বোঝে না। বরং এত এত রিভিউ উপন্যাসটির বহুল পঠন ও তুমুল জনপ্রিয়তার পরিচায়ক। আর সত্যি কথা বলতে কি, এক আরবী ভাষাতেই কুরআনের যতগুলো তাফসীর আছে, অন্য সব ভাষা মিলিয়ে ও এতগুলো লিখিত হয়েছে কীনা আমার সন্দেহ।
অনেক লিখে ফেলেছি। পাঠকের ধৈর্য্য ফুরিয়ে যাবার আগেই তাই ক্ষান্ত দিলাম। শামীম ভাই সহ অন্যান্য সহব্লগারদের মতামত আশা করছি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


