আবারও সেই নুরুজ্জামান০৮। উনি জাতীয়তাবাদ ও ইসলাম নিয়া পুস্ট দিছেন।
উনি বলেছেন ইসলাম জাতীয়তাবাদ প্রশ্রয় দেয় না, সমর্থনও করে না। বরং ইসলামের চরম উদ্দেশ্য হচ্ছে এমন একটি বিশ্বরাষ্ট্র (World state) গঠন করা, যাতে মানুষের মধ্যে বংশগত ও জাতিগত হিংসা-বিদ্বেষের সমস্ত শৃংখলা ছিন্ন করে সমগ্র মানুষকে সমান অধিকার লাভের জন্য সমান সুবিধা দিয়ে একটি তামাদ্দুনিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম করা হবে।
তাহলে ইসলামে কেন এত বিভক্তি ? কেন ইসলামে ৪টি মাযহাব। এই মাযহাব সৃষ্টির মাধ্যমে কি বিভেদ সৃষ্টি করা হয় নি ?
তাছাড়া পৃথিবী সব মতবাদই এই বিশ্বরাষ্ট্র গঠন করতে চায়। ইসলামও সেটি চায় এবং চেয়েছিল। এই চাওয়ার জন্য ইসলাম প্রচারের জন্য তরবারী হাতে নেমে পড়েছিলেন খলিফারা। তৎকালীন অর্ধপৃথিবী কেবল ভালো কথায় কব্জায় আসেনি, তার জন্য আরবীয় ঘোড়ার পিঠে চড়ে তরবারী হাতে অবিশ্বাসীদের কল্লা নামাতে হয়েছে। হযরত ওমরের পররাষ্ট্র নীতিতে মূল কথা ছিল তিনটি । তিনি পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোর কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন এভাবে - ০১) ইসলাম গ্রহণ করে বিশ্বাসী হও ০২) যিজিয়া কর দাও (অবিশ্বাসী হলে এই অতিরিক্ত কর দিতে হত) অথবা ০৩) যুদ্ধ কর। এই পররাষ্ট্র নীতি কি সম্প্রসারণবাদী বা সাম্রাজ্যবাদী নয় ?
সমাজতন্ত্রীরাও চায়, পৃথিবীর সবাই সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী হোক, পৃথিবীর সব রাষ্ট্র সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হোক। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরে রাশিয়া সমাজতন্ত্র রপ্তানী করার জন্য পূর্ব ইউরোপের দেশগুলি ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলি গলাধঃকরণ করেছিল। আফগানিস্তান দখল করে পুরো মধ্যপ্রাচ্য দখল করার নীল নকশা ছিল রাশিয়ার। কিন্তু দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় তাদের অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়ার কারণে তাদের সাম্রাজ্যবাদী ইচ্ছা পূরণ করা সম্ভব হয় নাই। তাছাড়া আফগান যুদ্ধে পরবর্তীতে আমেরিকা ও ইসরায়েলের গোপন সাহায্য ও মুজহিদ বা তালিবান গঠনের ফলে রাশিয়া আফগানিস্তান থেকে ভাগতে বাধ্য হয়।
অন্য দিকে বর্তমান গণতন্ত্রী আমেরিকা ও তার দোসরাও সারা পৃথিবীতে গণতন্ত্র রপ্তানী করে চলেছে। তারা যা ভাল মনে করে সেটাই এখন গণতন্ত্র। ইরাক, আফগানিস্তান দখলের পর তাদের টার্গেট এখন ইরান। মূল কথা হল, পৃথিবীর সব মানুষকে তারা গণতন্ত্র শিখাতে চায় । তারা ছাড়া এই পৃথিবীতে কেউ গণতন্ত্র বোঝে না।
এইভাবে যুগে যুগে নানা মতাদর্শ তাদের ভালোত্ব শেখানোর জন্য সম্প্রসারণবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী নীতি নিয়েছে। যখনই কোন রাষ্ট্রের শক্তির চরম বিকাশ হয়েছে, তারা পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের উপর হামলে পড়েছে সেই মতাদর্শ কাযেমের দোহাই দিয়ে। কথিত বিশ্বরাষ্ট্র (World state) গঠন করার নাম দিয়া তারা দুর্বল রাষ্ট্র ও জনগোষ্ঠীর উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে। একের পর এক দেশ দখল করেছে। হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ করেছে। আসলে কিন্তু ওই মতাদর্শের আড়ালে থাকে নিজের ক্ষমতা প্রদর্শন ও আর্থিক ফায়েদা। মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার নাম দিয়ে সাম্রাজ্যবাদী ও সম্প্রসারণবাদী নীতির কারণেই পৃথিবীতে এত রক্তপাত, এত যুদ্ধ, এত সংঘাত।
অন্য দিকে, ইসলামও জাতীয়তাবাদের উপর ভিত্তি করেই সৃষ্ট। যদি না হয়, তবে কিভাবে ?
০১) ইসলাম তার আচার আচরণ ও পোশাক আশাকের মাধ্যমে আরব জাতির বৈশিষ্ট্যকেই তুলে ধরে, তাই নয় কি ? জুব্বা জাতীয় পোশাক তো আরবরাই পরিধান করে, তাই না ?
০২) কোরানের ভাষা আরবী। আরবদের ভাষাও আরবী। কোরান আরবী ভাষায় হওয়ায় সেটা আরবদের প্রতিনিধিত্ব করে না কি ?
০৩) বলা হচ্ছে, কোরান সকল মানুষের জন্য সংবিধান বা ইউজার ম্যানুয়াল। একটা সফটওয়্যারের ইউজার ম্যানুয়ালও আজকে পৃথিবীর প্রধানতম কয়েকটি ভাষায় রচিত হয়। কমপক্ষে ৬টি ভাষায় ইউজার ম্যানুয়াল থাকে। সে হিসেবে কোরান কেবল আরবী হওয়া মানে অন্য ভাষাগুলোকে অবহেলা করা নয় ? কোরান একই সাথে তৎকালীন সবগুলো প্রধান ভাষায় অবতীর্ণ হওয়া কি উচিত ছিল না ?
০৪) কোরানে যে সকল ঘটনা উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা আছে, তার সব গুলোই আরবীয়। মধ্যপ্রাচ্য থেকে বড় জোর পশ্চিম আফ্রিকা পর্যন্ত এই পরিধি। অথচ কোরান বিশ্ব মানবের। তাহলে উচিত ছিল না কি কোরানে অন্য জাতি গোষ্ঠীর কথা থাকা , কেবল আরব জাতির নয় ?
০৫) ইতিহাস বলে ভারতীয়রা প্রথম গণিতের জন্ম দেয়। বিশেষ করে শূন্যের ধারণা ভারতীয়রাই দেয়। পরবর্তীতে আরবীয়রা সেই ধারণা গ্রহণ করে। ভারতীয় মসলা ইউরোপে বিক্রি করত আরবীয়রা। কিন্তু কোন দিনও ইউরোপীয়দের ভারতে আসার পথ বাতলে দেয় নি। অর্থাৎ ভারতীয় সভ্যতা কোনভাবেই আরবীয় সভ্যতার চেয়ে কম দামি নয় ?
অনুরূপভাবে, চৈনিক সভ্যতাও যে খুব একটা দামি সভ্যতা তাও একটি হাদিসের মাধ্যমে স্বীকার করা হয়েছে।
এভাবে পৃথিবীর নানা জায়গায় নানা সভ্যতা পৃথিবীকে সমৃদ্ধ করেছে। কেবল আরবদেরকেই আমরা কেবল সেরা মনে করব ? অন্য সভ্যতাগুলো কি এই পৃথিবীতে ভাল ভাল অবদান রেখে যায় নি ?
০৬) একটা জাতির জাতীয়তাবোধ একদিনে সৃষ্টি হয় না। প্রথম কারণ হল একটি নির্দিষ্ট ভূমিতে বসবাস। একই ভাষায় কথা বলা। ধর্মাচরণের দিক থেকেও এক। সামাজিক রেওয়াজগুলোর মিল। সংস্কৃতিক আচার আচরণও এক। সবচেয়ে বড় কথা, নিজেকে ওই জাতির অংশ মনে করার অনুভূতি সৃষ্টি হওয়া মনে।
এভাবে সারা পৃথিবীতে নানা জাতি গোষ্ঠীর সৃষ্টি। সৃষ্টি তাদের মধ্যে জাতীয়তা বোধ। এই জিনিসটা কোরান সমর্থনা না করলেও টিকে থাকবে। এটাই বাস্তবতা। কোরান সেই বাস্তবতার বিরুদ্ধে কেন গেল ?
আমার মতো সাধারণ ক্ষুদ্র মানুষের মতামত : (এই মতামতের কোন দাম নাই)
এই পৃথিবীটা কারও একার নয়। সবার। তাই এই পৃথিবীতে বাস করতে হলে শিখতে হবে কিভাবে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করা যায়। ভাষা, ধর্ম ও মতাদর্শগত দিক থেকে পার্থক্য থাকাই স্বাভাবিক। সেটা মেনে নিয়ে অপরের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। অপরের মতামতকে শ্রদ্ধা করতে হবে।
নিজের মতটাই সেরা, অপরের মতটা ফালতু - এই মনোভাব সংঘাতের জন্ম দেয়। সৃষ্টি করে অশান্তি। আমাদের প্রত্যেককে অপরকে শ্রদ্ধা করতে হবে। কেবল নিজের কথা বলা নয়, তার কথাও শুনতে হবে।
দুর্বল, অসহায়, ছোট মানুষের মতামত ও আদর্শকে শ্রদ্ধা জানানোর সেই স্বপ্নের পৃথিবী কি কোনদিনও নির্মাণ হবে ? নাকি নতুন নতুন মতাদর্শের নামে কেবল সম্প্রসারণবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন চলবে ? কে জানে ?
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জুন, ২০০৯ দুপুর ১২:২৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


