somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমরা যে আসলে কী চাই, নিজেরাও জানি না

১০ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১২:৫৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



কয়েকদিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়া খুললেই একটাই দৃশ্য—হতাশার গল্প আর সমালোচনার স্রোত। বিশেষ করে শিক্ষামন্ত্রী ড. এহছানুল হক মিলন সাহেবকে নিয়ে নানামুখী আলোচনা বেশ জমে উঠেছে। ক্ষমতায় আসার দুই মাসও পেরোয়নি, তার আগেই সাধারণ মানুষ হতাশ! কিন্তু প্রশ্ন হল : আমরা আসলে কী চাই? আমরা কি নিজেরাও সেটা জানি?

গতকাল থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় নেপালের শিক্ষামন্ত্রীর সাথে মিলন সাহেবের তুলনা শুরু হয়েছে। নেপালের মন্ত্রী পেরেছেন, আমাদের জন কেন পারছেন না? কথাটা শুনতে চমৎকার লাগে, কিন্তু 'দূরের ঘাস সবসময়ই বেশি সবুজ' দেখায়। নেপালে সংস্কার সম্ভব হয়েছে কারণ সেখানে সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে একটা নূন্যতম বোঝাপড়া ছিল। কেন্দ্রীয়ভাবে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলেই সেটা বাস্তবায়ন করা গেছে। আমাদের এখানে সেই পরিবেশ কই?

এখন একটা বড় দাবি উঠেছে যে, মিলন সাহেব কেন ছাত্র রাজনীতি বন্ধে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। কিন্তু এই দাবিটা কি আসলেও শিক্ষামন্ত্রীর একার পক্ষে সমাধান করা সম্ভব? CUET-এ যখন ছাত্রদল প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছিল, তখন DACSU কিন্তু ছাত্র রাজনীতি বন্ধের বিষয়ে একদম চুপ ছিল। মুখে দলগুলো অনেক বড় বড় কথা বলে, কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলই তাদের ছাত্র সংগঠন বন্ধ করতে আগ্রহী নয়। এটা কেন্দ্রীয়ভাবে সব দল মিলে সিদ্ধান্ত না নিলে একা মিলন সাহেব কী করবেন? তবুও সব কথা শুনতে হচ্ছে তাকেই।

আরেকটা সমালোচনা চলছে , মিলন সাহেব নাকি শুধু নকল ঠেকানোর পেছনে পড়ে আছেন, শিক্ষার মান বাড়াতে কিছুই করছেন না। কিন্তু একটু খোঁজ নিলেই দেখা যায়: মাত্র ১৮০ দিনের পরিকল্পনায় তিনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিল, বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস, ৩৭ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি করা, ২০০০ গ্রামে নতুন প্রাথমিক বিদ্যালয় আর বিনামূল্যে ট্যাব ও ওয়াইফাই সুবিধার মতো পরিকল্পনা রেখেছেন। এর মধ্যে খারাপ কোনটা ? বাস্তবায়ন হলে তো দেশেরই মঙ্গল। মজার ব্যাপার হলো, নেপালের শিক্ষামন্ত্রীর পরিকল্পনা আমরা মুখস্থ বলতে পারি, অথচ নিজের দেশের সরকারের পরিকল্পনা কয়জন জানি? এটাই আমাদের ট্র্যাজেডি।

এবার রমজানে স্কুল বন্ধ রাখার ঘটনায় আসি। বছরের শুরুতে ২৮ জানুয়ারি বই দেওয়া শেষ হলো, ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হলো-এর মধ্যে পড়াশোনা তেমন হয়নি বললেই চলে। তার ওপর রমজানে স্কুল বন্ধ রাখার একটা ‘পপুলিস্ট’ সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছে কোচিং ব্যবসায়ীরা। স্কুলে ক্লাস বন্ধ মানেই কোচিং সেন্টারে ভিড় বাড়া। অথচ কোচিংয়ে ২৭ রমজান পর্যন্ত ক্লাস চললেও শিক্ষার্থীদের বা অভিভাবকদের তেমন আপত্তি ছিল না। অনেক স্কুলে এখনো প্রথম মাসিক পরীক্ষাই হয়নি, করোনার আগে মার্চ মাসের মধ্যেই প্রথম পরীক্ষা হয়ে যেত। আগামী কয়েক বছরও জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে রমজান পড়বে, তাই এখনই একটা সুনির্দিষ্ট বার্ষিক পরিকল্পনা খুব দরকার।

ক্লাস ওয়ানের লটারি বাতিলের বিষয়টাও বেশ মজার। হাসনাত আব্দুল্লাহ দাবি তুললেন, আর মিলন সাহেব মেনে নিলেন। এখন সমালোচনা হচ্ছে যে বাচ্চাদের ওপর পড়ার চাপ বাড়বে, কোচিং ব্যবসায়ীদের পোয়াবারো হবে। কথাটা ঠিক। কিন্তু হাসনাত আব্দুল্লাহ নিজেই একজন কোচিং ব্যবসায়ী-সেটা নিয়ে কেউ একটা কথাও বলছে না! সব সমালোচনার তীর শুধু ওই মিলন সাহেবের দিকেই।

অনলাইন ক্লাসের ইস্যুতে আরেক দফা ঝড় উঠেছে। জ্বালানি সাশ্রয়ের কথা ভেবে অনলাইন ক্লাসের পরিকল্পনা এলো। বিরোধী দল বলছে ‘সরকারের পতন অনিবার্য’, অভিভাবকরা বলছেন ‘বাচ্চাদের মোবাইল আসক্তি বাড়বে’। সমালোচনাগুলো হয়তো ঠিক, কিন্তু এর মাঝেই আবার একদল দাবি করছেন-হামের প্রাদুর্ভাবের কারণে দুই সপ্তাহ সব স্কুল বন্ধ রাখতে হবে ! অর্থাৎ একদল বলছে বাচ্চাদের অনলাইনে ঠেলে দেওয়া যাবে না, আরেকদল বলছে স্কুলই বন্ধ রাখো। শেষমেশ মিলন সাহেব সিদ্ধান্ত নিলেন ‘তিন দিন অনলাইন, তিন দিন সরাসরি ক্লাস’। এতেও কারও মন ভরেনি। কেউ কেউ এখন বলছেন অনলাইন ক্লাস না করে তিন দিন ছুটিই দিয়ে দাও!

আসল কথাটা এবার বলে ফেলি। স্কুলে ক্লাস বন্ধ থাকলে সবচেয়ে বেশি খুশি হয় দুই ধরনের মানুষ: কোচিং ব্যবসায়ীরা আর সেই 'মোটাবুদ্ধি'র অভিভাবকরা, যারা স্কুলে বেতন দিতে রাজি আছেন কিন্তু স্কুলে ক্লাস হোক সেটা চান না। স্কুলে ক্লাস হলে তাদের শত আপত্তি, অথচ কোচিংয়ে ক্লাস হলে সেই একই অভিভাবক দৌড়ে যাচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে একদিন স্কুলে শুধু পরীক্ষা হবে, আর ক্লাস হবে কোচিং সেন্টারে। সচ্ছল পরিবারের সন্তানরা শিক্ষিত হবে, আর বাকিরা হয় ঝরে পড়বে নয়তো মাদরাসায় গিয়ে ভর্তি হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে এটা এখনই হচ্ছে, কিন্তু সেটা নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই।

মিলন সাহেব আসলে এই বিশাল প্রত্যাশার চাপ সামলাতে গিয়ে খাবি খাচ্ছেন। জনগণকে খুশি রাখতে গিয়ে একের পর এক পপুলিস্ট ডিসিশন নিয়ে যাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু দিনশেষে কাউকেই খুশি করা যাচ্ছে না। কারণ, জনগণ নিজেই জানে না তারা আসলে কী চায়। একটু ভেবে দেখুন-আমরা চাই শিক্ষার মান বাড়ুক, কিন্তু স্কুলে ক্লাস হলে আমাদের আপত্তি। আমরা চাই সংস্কার হোক, কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো ছাত্র সংগঠন ছাড়তে নারাজ।

মিলন সাহেবকে নিয়ে হতাশার কথা বলার আগে একবার নিজেদের জিজ্ঞেস করা দরকার: আমরা আসলে ঠিক কেমন শিক্ষামন্ত্রী চাই? আর সেই মন্ত্রী যদি আসলেও কোনোদিন সত্যিকারের কঠিন সিদ্ধান্ত নেন, আমরা কি তাকে সাপোর্ট করব? নাকি আবার এই সোশ্যাল মিডিয়াতেই তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ব? উত্তরটা আমরা সবাই জানি, শুধু মানতে চাই না।


সর্বশেষ এডিট : ১০ ই এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৭
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইরান যুদ্ধবিরতি ও ইসরায়েলের "ঘাস কাটা" এবং "মাটির স্তর সরিয়ে ফেলা" কৌশল

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৯ ই এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৭:৩৩


পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ কিছুদিন আগেই ট্রাম্পের নাম নোবেল পুরস্কারের জন্য প্রস্তাব করেছিলেন। ট্রাম্পের এই ভৃত্যসুলভ মিত্র মধ্যস্থতা করে আমেরিকা-ইসরায়েলকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করিয়েছে - এই খবর শুনে মনে সংশয় তৈরি... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুর ব্লগারদের পোস্ট নিয়ে একটা সংকলন বের করতে চাই

লিখেছেন ডার্ক ম্যান, ০৯ ই এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১:৫১

আমি একটা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান চালু করতে চাচ্ছি। তাই আমার প্রত্যাশা প্রথম বইটা হবে সামুর ব্লগারদের পোস্ট সংকলন।
আপনারা যদি চান, তাহলে আপনাদের লেখা যেকোনো প্রিয় পোস্ট সেখানে দিতে পারেন।... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনু কবিতা

লিখেছেন সামিয়া, ০৯ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:৫১



(১)
গল্প স্বল্প আড্ডার ভেতর
ডাকে পুরোনো দিন,
বিষন্ন স্মৃতির পাতা
ক্লান্ত বিলীন।

(২)
শোকের ধুলো জানালাতে,
বসে থাকে রোদ না মেখে,
হারিয়ে গেলো কারো মুখ
ভুল ঠিকানায় নাম লিখে।

(৩)
চায়ের ধোঁয়ায় মুখ লুকিয়ে
একাকী নিরালায়,
গল্প শেষেও... ...বাকিটুকু পড়ুন

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন 2026 : BJP কি জিততে চলেছে ?

লিখেছেন গেছো দাদা, ০৯ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১১:৪৫

আসন্ন বিধান সভা নির্বাচনে(2026) কি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে BJP জিততে চলেছে?
আসুন জেনে নিই প্রকৃত সম্ভাব্য রেজাল্ট।
রাজ্য সরকারের IB এবং মোদী সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র অনুসারে,কোন দল কত আসন পেতে পারে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা যে আসলে কী চাই, নিজেরাও জানি না

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১২:৫৬



কয়েকদিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়া খুললেই একটাই দৃশ্য—হতাশার গল্প আর সমালোচনার স্রোত। বিশেষ করে শিক্ষামন্ত্রী ড. এহছানুল হক মিলন সাহেবকে নিয়ে নানামুখী আলোচনা বেশ জমে উঠেছে। ক্ষমতায় আসার দুই মাসও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×