সম্প্রতি নেপালে গৃহীত শিক্ষা সংস্কার নিয়ে শাহাদাত উররাজির লেখার মন্তব্যে আমি বলেছিলাম পরীক্ষা পদ্ধতি পরিবর্তন করে মুখস্ত করে পাশ করার পরিবর্তে প্রকৃত জ্ঞান লাভ করেছে কিনা সে যাচাই করার পথ চালু করতে হবে। আমাদের প্রচলিত পরীক্ষাপদ্ধতি কতটা কার্যকর? এখানে শুধু একটা বিষয়, বাংলা, নিয়েই লিখছি ।
দীর্ঘদিন ধরে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এমন একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, যেখানে শিক্ষার্থীরা মূলত মুখস্থনির্ভর হয়ে পড়ে। পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য তারা ব্যাকরণ, রচনা, চিঠি লেখা কিংবা কবিতা ও গল্পের সারমর্ম মুখস্থ করে। ফলে, “প্রশ্ন কমন” পড়লে ভালো ফল হয়, আর না পড়লে ব্যর্থতা অনিবার্য হয়ে ওঠে।
এই পদ্ধতিতে একটি বড় সমস্যা হলো—শিক্ষার্থীরা প্রকৃত অর্থে বিষয়টি বোঝে না। তারা জ্ঞান অর্জনের পরিবর্তে তথ্য মুখস্থ করে পরীক্ষায় উপস্থাপন করে। এর ফলে বাস্তব জীবনে সেই জ্ঞান প্রয়োগ করার সক্ষমতা তৈরি হয় না। অথচ শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত বোঝা, বিশ্লেষণ করা এবং সেই জ্ঞানকে বাস্তব পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করতে পারা।
এই প্রেক্ষাপটে “রিডিং কম্প্রিহেনশন” বা পাঠ-বোঝার পরীক্ষা একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে। এই পদ্ধতিতে প্রশ্নপত্রেই একটি অনুচ্ছেদ বা লেখা দেওয়া থাকে, এবং সেই লেখার উপর ভিত্তি করে প্রশ্ন করা হয়। এখানে মুখস্থ করার কোনো সুযোগ নেই, কারণ উত্তর খুঁজে পেতে হলে শিক্ষার্থীকে প্রথমে লেখাটি মনোযোগ দিয়ে পড়তে এবং বুঝতে হবে। না বুঝলে সঠিক উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়।
পাঠ-বোঝার পরীক্ষার আরেকটি বড় সুবিধা হলো এটি শিক্ষার্থীর বিভিন্ন দক্ষতা একসাথে যাচাই করে—যেমন পড়ার ক্ষমতা, বিশ্লেষণ দক্ষতা, যুক্তি প্রয়োগ, এবং সমালোচনামূলক চিন্তা। এটি শিক্ষার্থীদের সক্রিয়ভাবে চিন্তা করতে উৎসাহিত করে, যা কেবল পরীক্ষার জন্য নয়, বরং সারাজীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হবে। নিচে দেয়া অনুচ্ছেদটি পড়ে তার নিচের প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।
অনুচ্ছেদ:
গণতান্ত্রিক সমাজে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে প্রায়ই একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা একটি উন্মুক্ত ও জবাবদিহিমূলক সরকারের কার্যকারিতার জন্য অপরিহার্য। তবে এই নীতিরও কিছু দ্বন্দ্ব রয়েছে। মতপ্রকাশের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা কখনও কখনও অন্যান্য সামাজিক মূল্যবোধের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়াতে পারে, যেমন জননিরাপত্তা, জাতীয় নিরাপত্তা এবং ক্ষতি প্রতিরোধ। উদাহরণস্বরূপ, ভ্রান্ত তথ্য বা উসকানিমূলক বক্তব্যের প্রসার অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে বা দুর্বল জনগোষ্ঠীকে বিপদের মুখে ফেলতে পারে। ফলে, সরকারগুলো প্রায়ই ব্যক্তিগত স্বাধীনতা রক্ষা এবং সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার কঠিন দায়িত্বের মুখোমুখি হয়। সমালোচকরা যুক্তি দেন যে মতপ্রকাশে যেকোনো সীমাবদ্ধতা গণতান্ত্রিক আদর্শকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে, অন্যদিকে নিয়ন্ত্রণের পক্ষে যারা, তারা মনে করেন যে বৃহত্তর স্বার্থ রক্ষার জন্য যুক্তিসঙ্গত সীমাবদ্ধতা প্রয়োজন।
প্রশ্ন:
নিচের কোনটি অনুচ্ছেদের বক্তব্যকে সবচেয়ে সঠিকভাবে বর্ণনা করে?
A. এটি গণতান্ত্রিক সমাজে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে সমস্যা উপস্থাপন করে এবং এর পক্ষে যুক্তি দেয়।
B. এটি গণতান্ত্রিক সমাজে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সম্পর্কিত জটিলতা উপস্থাপন করে, তা বিশ্লেষণ করে এবং বিপরীত মতামত তুলে ধরে।
C. এটি গণতান্ত্রিক সমাজে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে।
D. এটি গণতান্ত্রিক সমাজে সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে।
সঠিক উত্তর:
B. এটি গণতান্ত্রিক সমাজে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সম্পর্কিত জটিলতা উপস্থাপন করে, তা বিশ্লেষণ করে এবং বিপরীত মতামত তুলে ধরে।
সঠিক উত্তর পেতে অনুচ্ছেদ যেমন বুঝতে হবে, তেমনি প্রশ্নও পরিষ্কার বুঝতে হবে। বুঝতে হবে উত্তরগুলোর মাঝে কোথায় পার্থক্য !
অতএব, সময়ের দাবি হলো আমাদের পরীক্ষাপদ্ধতিকে এমনভাবে পরিবর্তন করা, যাতে তা মুখস্থনির্ভরতা কমিয়ে প্রকৃত জ্ঞান অর্জনকে গুরুত্ব দেয়। “রিডিং কম্প্রিহেনশন” পদ্ধতি সেই পরিবর্তনের একটি সহজ, কার্যকর এবং বাস্তবসম্মত উপায় হতে পারে। এর মাধ্যমে আমরা এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তুলতে পারব, যারা শুধু পরীক্ষায় নয়, বাস্তব জীবনেও সফলভাবে নিজেদের জ্ঞান প্রয়োগ করতে সক্ষম হবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

