বিংশ শতাব্দির শেষ দশকের গোড়ার দিকের কথা। তখনও চাঁদাবাজি নামের নিপীড়নটা এতটা ভয়াবহ ছিল না। পাড়ায় হঠাৎ করে কলেজ পড়ুয়া বা কলেজ পাশ করা ছেলেদের (এবং সমবয়সি) ডাক পড়লো। কি ব্যাপার? তেমন কিছু না। কয়েক মাইল দুরত্বের বস্তি থেকে উঠতি বয়সের কিছু বখাটের আগমন ঘটেছে। যারা ভয় ভীতি দেখিয়ে মহল্লার দোকানগুলি থেকে চাঁদা আদায় করছে।
দিনটি ছিল বিজয় দিবস। জানতাম এই উপলক্ষ্যে ওরাও চাদাবাজির জন্য পাড়ায় ঢুকবে। সাত সকালেই স্মৃতি সৌধে ফুল দিয়ে এসে সবাই তৈরি হয়েই বসে থাকলাম। এক গ্রুপে প্রায় ১০-১৫টা ছোকরা। হাত খালি।তবে পকেটে যে এরা ক্ষুর নিয়ে ঘুরে সে তথ্যটি ছিল। তাই আচমকাই ওদের সাইজ করার প্লান করেছিলাম আমরা। এসেই মহল্লার যাকে সামনে পাচ্ছে, তার কাছেই বিজয় দিবসের চাদা দাবি করছে। না দিতে চাইলে বেশ কড়া করেই ধমক লাগাচ্ছে। ওরা এরকম করে পাড়ার প্রায় মধ্য খানে ঢুকে যেতেই, চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলে চোরের মার মারলাম। এমন মারের জন্য ওরা প্রস্তুত ছিল না। ফলে একেকজনের হাল যা হলো, শেষমেষ আমাদেরকেই হাসপাতালে ভর্তি করতে হলো। পুলিশের ঝামেলা অন্যভাবে মেটানো হলো।
এর সুফল অনেকদিন পাওয়া গিয়েছিল। ওই বস্তি থেকে তো দুরের কথা, আসে পাশের অনেকদুরের বস্তিতেও খবর রটে গিয়েছিল যে, যাই করো বাপু, ওই মহল্লায় মস্তানি করতে যেও না। অবশ্য বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সরকার আসার পর কখন বি এন পি কখনো আওয়ামি লিগের বেশে এদের নাম যশ অর্থ খ্যাতি অনেক বেড়ে গিয়েছে। ওদের গায়ে হাত তুলে সাধ্য কার?
প্রধানর সরকারি দলের ছত্রছায়াতেই এই চাদাবাজ সন্ত্রাসিরা বেড়ে উঠে। প্রতিদিন যে বিশাল পরিমান চাদা সংগৃহিত হয়, অভিযোগ আছে, তার ভাগ পায় নাকি একেবারে সবচেয়ে উচু থেকে শুরু করে সবাই।
শুধু চাদাবাকি কেন? হত্যা ছিনতাই রাহাজানি এসবের সাথে যদি প্রশাসন বা রাজনৈতিক দলের সংক্লিষ্টতা না থাকে, তাহলে নাকি ওই লাইনে উন্নতি তো দুরের কথা, বেড়ে উঠার আগেই ঝরে যেতে হয়।
ঢাকা শহরের এমন কিছু এলাকা আছে, যা সন্ত্রাসিদের জন্ম এবং বেড়ে উঠার জন্য কুখ্যাত। এর মধ্যে মিরপুর, মোহাম্মাদপুর, বাসাবো, খিলগাও, সুত্রাপুর, শাহজাহানপুর অন্যতম। মুলত ঢাকা শহরে যত রকম সন্ত্রাসি কার্যকলাপ হয়, সেটা এই সব এলাকায় অবস্থানরত সন্ত্রাসিরাই ঘটিয়ে থাকে। তার মানে এই নয় যে ওই সব এলাকার সবাই সন্ত্রাসি। সিংহভাগ ভালো মানুষই, গুটিকয় সন্ত্রাসিদের হাতে জিম্মি হয়ে আছে।
৯১ সালে বি এনপির ক্ষমতায় আসার পর দলে দলে সন্ত্রাসিরা ওই দলে ভীড়ে গিয়ে আইন শৃংখলার কি অবস্থা ঘটিয়েছিল, তা অতিষ্ঠ মানুষের ৯৬ সালে আঃ লিগকে ভোট দেয়া থেকেই বোঝা গিয়েছিল। আর সন্ত্রাসকে রাস্ট্রীয়ভাবে পালনের অপরাধেই ২০০১ সালে আঃ লিগের ভরাডুবির হয়েছিল।
এথেকে এই দুটি দল কি শিক্ষা নিয়েছিল জানি না, তবে র্যাব গঠন করে নিজ দলের ফ্রাঙ্কেন্সটাইনের অনেকেই বিএনপি নিকেষ করে দিয়েছিল। কোন সুবিবেচনা থেকে জানি না, তবে সেদিন আঃ লিগ এই সন্ত্রাসিদের পক্ষ্যে অনেক মায়া কান্না করেছিল। তাও তথাকথিত মানবাধিকারের ধুয়া তুলে। ফলে সন্ত্রাসিরা আঃ লিগের সমর্থন পেয়ে দল বদল করতে মোটেও পিছ পা হয়নি। এখন যখন বিভিন্ন যায়গায় র্যাবের হাতে সন্ত্রাসি মারা যাচ্ছে, তখন আঃ লিগের স্বরাস্ট্রমন্ত্রি হয় সেটা জাস্টিফায়েড করছে কিংবা অস্বীকার করছে।
অথচ সন্ত্রাসিদের দলে স্থান না দেবার সুনীতিটি যদি বড় দুটি দলই গ্রহন করতো তাহলে সন্ত্রাস এভাবে জনগণকে কুড়ে কুড়ে খেত না।
২০০১ সালের পর অফিস পাড়াগুলিতে ছিনতাই মাত্রারিক্ত বেড়ে যাওয়াতে অতিষ্ঠ জনগণ ছিনতাই ধরেই হয় পিটিয়ে কিংবা পুড়িয়ে মেরে ফেলতো। ফলে ওই এলাকায় সন্ত্রাসি চাদাবাজি অনেকটাই হ্রাস পেয়েছিল।
আমাদের বিচার বিভাগের যা অবস্থা, তাতে মোটা অংকের টাকা বা সুস্বাস্থ্য সম্পন্ন রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া ন্যায় বিচার পাওয়া মুশকিল। ওদিকে সময়ের সাথে সাথে ছোট বড় অপরাধের ঘটনাগুলি আমাদের স্মৃতি থেকে যেমন হারিয়ে যায়, তেমনি পত্রিকাগুলিও ওই বিষয়গুলি নিয়ে আর গা করে না। আবার জেলে বসেই চিহ্নিত টপ টেররা নির্বিঘ্নে সারা শহরে যেভাবে সন্ত্রাসি কার্যক্রম চালাচ্ছে, তাতে আইনের শাসনের উপর আদৌ আস্থা রাখা যায় কি? যাদের ফাসিতে ঝুলে এতদিন মরে ভুত হয়ে যাওয়ার কথা, তারাই কি দিব্যি মনের সুখে বেঁচে থেকে অন্যের প্রাণের উপর নিয়ত হুমকি হয়ে আছে।
খোদ ঢাকা শহরে পিতা পুত্রকে হত্যা করে আড়াই শ টুকরা করে, রাজপথে ছড়িয়ে দেবার কথা মনে আছে? হ্যা এখন মনে পড়বে, যেহেতু আমি প্রসঙ্গটা টানলাম। অথচ অপরাধী ধরা পড়েছে? অনেকে বলেন, যে এই হত্যাকান্ডের মুল হোতারা সেই সময়ে তারেক রহমান কিংবা বাবরের আশ্রয়ে থাকার কারণে বেঁচে গিয়েছে। সরকার বদল হয়েছে। এখন ওই সন্ত্রাসিদের ফাসিতে ঝুলাতে বাধা কোথায়?
বড় বড় অপরাধীরা সব সময়েই রাজনৈতিক দলের পৃষ্ঠপোষকতায় থাকে। তাই এদের ধরাছোয়া যায় না। অথচ সাধারন মানুষ আত্মরক্ষার্থে আইন হাতে তুলে নিলে মামলা হামলা সব রকম হয়রানিরই মুখোমুখি হয়।
সাম্প্রতিক ঘটনায় মহল্লার মাস্তান কর্তৃক এক দম্পতির দিনে দুপুরে খুনের ঘটনায় গতানুগতিক প্রতিক্রিয়া দেখলাম। পত্রিকায় এক দুই দিন চিৎকার চেচামেচি, ব্লগে নিন্দা জ্ঞাপন, বিরোধি দল কর্তৃক সরকার ব্যার্থ, ইত্যাদি আস্ফালন। এর পর যে কে সেই। সবাই ভুলে যাব। কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে থেকে, এরা পুলিশ এবং রাজনৈতিক নেতাদের ম্যানেজ করে বহাল তবিয়তে বেঁচে থাকবে। চাই কি উঠতি সন্ত্রাসি তারকা হিসেবে পুরানো সন্ত্রাসি দলের যায়গাও পেয়ে যেতে পারে।
অথচ এই সব মস্তানদের জন্মের প্রারম্ভেই দমন করলে, আজ অন্তত নিরীহ এই দম্পতির প্রাণ সংহার হতো না।
উপদেশ দিয়ে যাই হোক, পরিবর্তন ঘটানো যায় না। এজন্য আত্মোপলব্ধি প্রয়োজন। পাশের বাড়িতে আগুন লাগলে সে আগুন নিজ ঘরে লাগতে কতক্ষণ? তাই সময় থাকতে এই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নিজ স্বার্থেই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। যেহেতু আমাদের দেশে আইন (বিশেষ করে সন্ত্রাস দমনে) একটি তামাশা ছাড়া কিছু নয়, তাই নিজ শক্তিতেই দানব শক্তিকে বিনাশ করতে হবে। সেই সাথে বিনাশ করতে হবে যারা আইনের ধারক বাহক রক্ষক হয়েও সন্ত্রাসিদের পক্ষালম্বন করে জনগণের মান-প্রাণ আর সম্পদ লুন্ঠনে সাহায্যের করে থাকে। এ ছাড়া বাঁচবার আর কোন পথ খোলা নেই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



