somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সবার সেরা (ছেলেবেলা)

২৪ শে এপ্রিল, ২০০৮ বিকাল ৪:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

গল্প বলার শুরু সেই ছোট্ট বেলার থেকেই। তাও রীতিমত প্রফেসনালী! মানে প্রতিদিন দুয়েকটা গল্প বানাই আর বিক্রি করি। ক্রেতা আমার একজনই। আমার ছোট বোন! এবং আমার গল্প কেনাতে তার কোন আপত্তি নেই। প্রতি গল্প এক টাকা!! গল্প বেশি ভাল লাগলে দুইটাকা। আর না লাগলে আটআনা ফেরৎ। ও তখনো পড়তে পারেনাতো! তাই আমিও মওকা পেয়ে দুহাত ভরে কামিয়েনিই। আমার এই সব গল্প শুনে ও কখনো কাঁদে কখনো ভয়পায়, আবার কখনো হাসে। কখনোবা আবদার করে “এই মেয়েটাকে রাজকন্যা বানিয়ে দাও” আমিও বানিয়ে দেই! আর ও মুগ্ধ হয়ে বলে “আমার ভাইয়া সবাআ...র সেরা!!”। কিন্তু ও সেরা বললে কি হবে, আমার মধ্যে হচ্ছে গোড়ামী ভরা। আর সেই সব গোড়ামী আমি ওকেও শিখিয়ে দেই বেশ ভাল ভাবেই। যেমন, গল্প বলতে বলতে কোকিল ডেকে উঠলে আমি চুপ। পরে বলি “শোন, কোকিল ডাকলে কথা বলা যাবে না। খুব মনযোগ দিয়ে শুনতে হবে। কারণ ওর কথা যদি এক বার বুঝতে পার তাহলেই তুমি হয়ে যাবে একটা রাজকন্যা। আর যদি ও তোমার কথা শুনে ঊড়ে জায় তাহলে তুমি হয়ে যাবে দুওরানী! তাই চুপ্‌”।

এদিকে বড় হয়ে উঠছে ও। পড়তে শিখে ফেলছে দিনে দিনে। কিছুদিন পরেই স্কুলে যাবে! আমি একটু শঙ্কার সাথেই আমার এত বড় মার্কেটটা হারিয়ে যেতে দেখি। কিন্তু কি আর করা সবাইতো একদিন বড় হবে, নাকি?

বেশ কিছু দিন পর। আমার স্কুলে দিনগুল কাটছে যথারীতি বীভিষিকার মত। এমনিতেই ক্লাসে মার খেতে খেতে অস্থির। তার মধ্যে সব টিচারই মনে হয় খেপে গেছে আমার উপর। প্রায়ই বিভিন্ন রকম অভিযোগ পত্র সাইন করে আনতে হয় বাবা মার কাছ থেকে। আর এসবে বিরক্ত হয়েই, আমার বাবা নাকি ছোট সাইজের একটা লাঙ্গল, আর দুইটা বাছুর কিনে রেখেছে গ্রামে। আর কোন অভিযোগ আসলেই সোজা পাঠিয়ে দেবে গ্রামের বাড়ি। বাছুর টানা লাঙ্গল দিয়ে হাল চাষ করতে হবে তখন! আমাকে দিয়েতো এর চেয়ে বেশি কিছু হবেনা।

যথারীতি দুয়েক দিনের মধ্যেই আবার আরেক খানা পত্র পেয়ে গেলাম। স্কুলের পিছনে গীর্জার পাশে দীঘিটাতে অনেকগুল রাজহাঁস। ভাল মনে দেখতে গেছি এদের। হঠাৎ কি হল, সাবাই মিলে তাড়া করে বসল আমাকে! রীতিমত পেখম মেলে!! এদের তাড়া আর কামড় খেতে গিয়ে ক্লাসে পৌছাতে একটু দেরী হয়ে গেছে। ব্যাস আরেকটা পত্র পেয়ে গেলাম। ক্লাসে দেরী হওয়াতে দিদিমনির আপত্তি নেই। যত আপত্তি আমার অজুহাতে। রাজহাঁসে যে তাড়া করে, আবার কামড়ায়ও!! এমন কথা নাকি কেউ জীবনেও শোনেনি!!!

সঙ্গত কারনেই চিঠিটা বাবার হাতে পৌছায়নি। পরদিন ক্লাসে এসে চুপ করে বসে আছি এক কোনায়। পাশেই কোন গাছে কোকিল ডাকছে বোধহয়। মনযোগ দিয়ে বুঝার চেষ্টা করছি। এদিকে দেখি নাম ডাকা শেষ! আমাদের মনিটর নালিশ করে বসল। আমি নাকি চিঠি দেখানোর ভয়তে নাম প্রেজেন্ট দেইনি!! দিদিমনি একটা হুঙ্কার দিয়ে কানে ধরে নিয়ে গেল সামনে। কানধরে উঠবস আর বেতের বাড়িতেতো আমার কিছুই হয় না। তাই নতুন শাস্তি বিধান হল। মনিটর আমাকে স্কুলের সব ক্লাসে নিয়ে যাবে। আর আমি তার পিছনে কান ধরে হাটবো। রীতিমত গরু চোরের শাস্তি। কিন্তু আমার বেশ ভালই লাগল। আফটারঅল মনিটর আমাদের ফার্স্ট গার্ল। ক্লাসের সবচেয়ে কিউট মেয়েটা!

শাস্তি শুরু হল চার তলা থেকে। ও কেমনযেন নাচতে নাচতে আমার সামনে হাটে। আর প্রতি ক্লাসে গিয়ে সুরেলা কন্ঠে বলে “দিদিমনি আসি...” ... “ইয়েস” তার পর আমাকে অনেকটা ধমক দিয়েই বলে “এই আস্‌!” আমিও বুক ফুলিয়ে কান ধরে ক্লাসে ঢুকে সবার দিকে তাকিয়ে গর্বের হাসি দেই! এরকম পুলিশি দায়িত্ব পেয়ে মনিটর ও গর্বিত। কোন কোন ক্লাসে আবার শাস্তির কারনও ব্যাখ্যা করতে হয় তাকে। এর পর...“দিদিমনি যাআ...ই” ...“যাও”।

তো এরকম আসি যাই করতে করতে নিচ তলায় পৌছে গেছি আমরা। হঠাৎ করেই কি যেন হয়। ওজন বেড়ে যেতে থাকে আমার। শাস্তি তখন প্রায় শেষ। করিডোরের ঐ প্রান্তেই দেখা যাচ্ছে স্কুলের শেষ ক্লাস। ক্লাসটা নার্সারি এ। আমার বোনের। এখন আর ফার্স্ট গার্লের সাথে হাটতে পেরে গর্বিত মনে হয় না নিজেকে। পা টেনে টেনে হাটতে থাকি শুধু। যন্ত্র চালিতের মত। লজ্জা শরম কোন কালেই ছিলনা আমার, তখনো নেই। কিন্তু আমার বোনের তো আছে। প্রচন্ড লজ্জা পাবেও। তার 'সবার সেরা' ভাইয়াটার এই অবস্থা দেখে। ক্লাস চলছে। তাই চার দিক নীরব। সেই কোকিলটাই আবার ডাকতে থাকে তখন। থেমে থেমে মিহি একটা টানা সুরে। খুব মনযোগ দিয়ে না শুনলেও ওর কথা গুলো এবার যেন বুঝতে পারি আমি। খুব ইচ্ছে হয় মনিটরকে বলি ঐ একটা ক্লাস বাদ দিতে।

কিন্তু কোকিল ডাকছে যে!
এখন কি কথা বলা যায়?...
৬০টি মন্তব্য ৪৮টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×